» বন্ধ হলো বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতাল

প্রকাশিত: ০৭. জুলাই. ২০২০ | মঙ্গলবার

বন্ধ হলো বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতাল। করোনাভাইরাস পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া, নিয়ম বহির্ভূতভাবে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় এবং মেয়াদপূর্তির পরও লাইসেন্স নবায়ন না করায় এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মঙ্গলবার ওই হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখা বন্ধের নির্দেশ দেয়। এরপর সন্ধ্যায় উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কে রিজেন্ট হাসপাতালের শাখাটি ‘সিলগালা’ করে দেয় র‌্যাব।

উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের ১৪ নম্বর সড়কে রিজেন্টের প্রধান কার্যালয়ও বন্ধ করার কাজ চলছে বলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানিয়েছেন।

বেসরকারি এ হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মহামারীর সঙ্কটকে পুঁজি করে তারা জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে রোগীদের ঠকাচ্ছিল, চুক্তি ভঙ্গ করে তারা সরকারের সঙ্গেও প্রতারণা করে আসছিল।

অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় মেডিকেল প্র্যাক্টিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবটরেটরি রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ওই হাসপাতালের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পরপরই গত মার্চে রিজেন্ট হাসপাতালকে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করেছিল সরকার। কিন্তু আবাসিক এলাকার মধ্যে গড়ে তোলা হাসপাতালে এভাবে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা দেওয়া নিয়ে তখনই আপত্তি জানিয়েছিলেন স্থানীয়রা।

তাদের আপত্তির মধ্যেই রিজেন্ট হাসপাতালে কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা চলতে থাকে। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা আদায়সহ বিভিন্ন অভিযোগ আসতে থাকে রোগী ও স্বজনদের তরফ থেকে।

এর মধ্যেই নমুনা পরীক্ষা না করে করোনাভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার ১৪টি অভিযোগ জমা পড়ে র‌্যাবের হাতে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সিল ও প্যাড নকল করে সেসব রিপোর্ট তৈরি করা হলেও র্যাব খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ওইসব সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসব নমুনা পরীক্ষা করেনি বা রিপোর্টও দেয়নি।

ওই অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান শুরু করে র্যাব। এরপর মঙ্গলবারও সেখানে অভিযান চলে। দুই জায়গাতেই বেশ কিছু অনুমোদনহীন টেস্ট কিট এবং করোনাভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট পাওয়ার কথা জানানো হয় র্যাবের পক্ষ থেকে।

রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তিন ধরনের অপরাধের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলছে র‌্যাব।

হাসপাতালটির সঙ্গে সরকারের চুক্তি ছিল, কোভিড-১৯ রোগীদের কাছ থেকে চিকিৎসার জন্য তারা কোনো টাকা নেবে না, সরকার ওই ব্যয় বহন করবে। কিন্তু রোগীদের কাছ থেকে তারা লাখ লাখ টাকা আদায় করেছে। আবার সেসব রোগীর চিকিৎসার জন্য তারা সরকারের কাছেও বিল করেছে।

চুক্তি অনুযায়ী ভর্তি রোগীদের কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য তাদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়ার কথা নয় রিজেন্ট কর্তৃপক্ষের। সে অনুযায়ী আইইডিসিআর বা নিপসমের মত সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তারা ৪ হাজার ২০০ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করিয়েছে বিনামূল্যে। কিন্তু সেই পরীক্ষার জন্য তারা রোগীপ্রতি সাড়ে তিন হাজার টাকা আদায় করে ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এর বাইরেও বহু রোগীর কাছ থেকে তারা নমুনা পরীক্ষার জন্য টাকা নিয়েছে, কিন্তু পরীক্ষা না করে ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে বলে র‌্যাবের অভিযোগ।

র‌্যাবের নির্বাহী হাকিম সারোয়ার আলম বলেন, রিজেন্ট হাসপাতাল যে পরিমাণ পরীক্ষা করিয়েছে, নমুনা সংগ্রহ করেছে তার তিন গুণ বেশি।

“অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষকে তারা ভুয়া প্রতিবেদন দিয়েছে, যা বড় ধরনের অপরাধ, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।”

উত্তরা ১১নম্বর সেক্টরে একটি ভবনের চারটি ফ্লোর নিয়ে গড়ে তোলা ৫০ শয্যার ওই হাসপাতালের জন্য রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়েছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। এরপর ২০১৭ সালে তারা মিরপুরে হাসপাতালের একটি শাখা খুলে সরকারের অনুমোদন নেয়।

কিন্তু লাইসেন্সের মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পর তা আর নবায়ন করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যেই তারা আবার কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

সোমবার রিজেন্টের দুই হাসপাতাল বন্ধের সিদ্ধান্ত জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও আরটি-পিসিআর পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া, তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও লাইসেন্স নবায়ন না করাসহ আরও অনিয়ম তারা করেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।”

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রিজেন্টের উত্তরার হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ার পর র‌্যাব-১ এর অপস অফিসার সিনিয়র এএসপি মোর্শেদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সোমবারের অভিযানের পর অনেক রোগী চলে গিয়েছিলেন। সর্বশেষ চারজন রোগী ছিলেন, তারাও আজ চলে গেছেন। হাসপাতাল সিলগালা করে সিকিউরিটিকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

রিজেন্ট হাসপাতালের অন্যতম কর্ণধার মো. সাহেদ অভিযোগ অস্বীকার করে সোমবার বলেছিলেন, র‌্যাব যেসব অভিযোগ নিয়ে এসেছিল, তার ‘কিছুই তারা পায়নি’। কিন্তু মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আদেশ হওয়ার পর বক্তব্য জানার জন্য তাকে পাওয়া যায়নি।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, অভিযান শেষ করে তারা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সোমবার যে আটজনকে আটক করা হয়েছে, তাদের ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে। মামলার কাজ শেষ হলে রিজেন্টের প্রধান কার্যালয়ও সিলগালা করে দেওয়া হবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২১২ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031