» বরেণ্য শিল্পী মুর্তজা বশীর অনেকটা নিরবেই চলে গেলেন

প্রকাশিত: ১৬. আগস্ট. ২০২০ | রবিবার

বরেণ্য শিল্পী মুর্তজা বশীর অনেকটা নিরবেই চলে গেলেন ।করোনা কেড়ে নিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের প্রথম দিকের শিক্ষার্থী, বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের এই বড় শিল্পীকে। আমাদের শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তিনি এক অনন্য মানুষ । শুধুমাত্র নিজের সৃজন অন্বেষণ আটকে রাখেননি ছবি আঁকায়। শিল্পের নানা শাখায় নিমগ্ন করেছেন নিজেকে। লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস ও কবিতা। নিজের লেখা কবিতাগ্রন্থ ‘টাটকা রক্তের ক্ষীণরেখা’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন নিজেই। ছোটগল্প ‘কাচের পাখির গান’ (১৯৬৯), উপন্যাস ‘আলট্রামেরীন’ (১৯৭৯), কবিতা ‘ত্রসরেণু’ (১৯৭৬), ‘তোমাকেই শুধু’ (১৯৭৯), ‘এসো ফিরে অনসূয়া’ (১৯৮৫), বিবিধ বিষয়ে নির্বাচিত লেখা ‘মুর্তজা বশীর : মূর্ত ও বিমূর্ত’ (২০০১), গবেষণা গ্রন্থ ‘মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশী সুলতান ও তৎকালীন সমাজ’ (২০০৪), গল্পগ্রন্থ ‘মিতার সঙ্গে চার সন্ধ্যে, অমিতাক্ষর’ (২০০৮) এবং ‘গল্পসমগ্র’ (২০০৮) প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি গবেষণা প্রবন্ধ উপমহাদেশের বিভিন্ন জার্নালে ছাপা হয়, যা তাকে একজন নিবিড় গবেষক হিসেবে স্বীকৃতি ও খ্যাতি দিয়েছে। ছবি আঁকার পাশাপাশি তার সাহিত্যকর্মও সমান কৃতিত্বের দাবি রাখে। ১৯৫৪ সালে গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস থেকে চিত্রকলা ও ড্রইং নিয়ে প্রথম বিভাগে পাস করেন। ১৯৫৬-৫৭ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে চিত্রকলা এবং ১৯৫৭-৫৮-তে ফ্রেসকো নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। ফ্লোরেন্সের গ্যালারি লা পারমানেন্তেতে ১৯৫৮ সালে তাঁর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। দেশে ও বিদেশে তাঁর একক চিত্র প্রদর্শনীর সংখ্যা ২০টি। তাঁর ম্যুরাল চিত্রের সংখ্যা ৭টি। ১৯৭৩ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং সেখান থেকে অবসরগ্রহণ করেন।

১৯৬৩ থেকে ১৯৬৪, প্রায় আড়াই বছর চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে জড়িত থেকে কোনো ছবি আঁকেননি তিনি। হুমায়ুন কবীরের উপন্যাস ‘নদী ও নারী’র চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে অনেক পরিবর্তন করে যখন দিল্লিতে তাঁর কাছে পাঠানো হয়েছিল তখন দ্বিধা থেকে যায়, তিনি অনুমতি দেবেন কি-না। শুধু অনুমতি নয়, হুমায়ুন কবীর চিত্রনাট্যের প্রশংসাও করেছিলেন। পরিচালক জহির রায়হানের জন্যও চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন। কিন্তু চলচ্চিত্র শিল্প থেকে তিনি সম্পর্ক ছিন্ন করে আবার ছবি আঁকায় যুক্ত হলেন। কখনো থেমে থাকেননি বাংলাদেশের শিল্প ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পী।

ইংরেজি সাহিত্য পড়তে শুরু করেছিলেন ষাটের দশকে, সেই সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যও। একবার তো স্প্যানিশ কবি গার্সিয়া লোরকার কবিতার চরণকে অবলম্বন করে এঁকেছিলেন ছবি। বিচিত্র জীবনের মুর্তজা বশীর টেনে নিয়ে যায় আমাদের। তাঁর সামগ্রিক জীবনটি আমাদের অনুভূতিকে অধিকার করে ফেলে। আমরা আক্রান্ত হতে থাকি। কিন্তু তিনি সৃষ্টি করেন নতুন কোনো বিষয়ের অমর সব চিত্রকর্ম। এভাবে ভ্রমণশীল মুর্তজা বশীর এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়কে এঁকে বিমোহিত করে রাখেন আমাদের। নিরন্তর তিনি নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে থেকেছেন প্রবহমান এবং ব্যতিক্রমী। বছর পাঁচেক ধরেই ভুগছিলেন লাংসের সমস্যায়। লোকসান্নিধ্যে যেতে পারেন না মানুষের নিঃশ্বাসনিঃসৃত কার্বন ডাই অক্সাইড ক্ষতিকর বলে। সর্বক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে নিঃশ্বাস নিতে হতো। তাঁর স্নেহধন্য শিল্পী প্রীমা নাজিয়া আন্দালিব বলেন,
তিনি আমায় শিখিয়েছেন সদা জাগ্রত, পিপাসিত শিল্পী হতে। শিল্পীত জীবন চর্চা সম্ভব, ধারণও হয়তো করা যায়, কিন্তু শিল্পীত জীবন ছাপিয়ে যায় সদা বিচিত্র, একাগ্র, নিমগ্ন মুর্তজা বশীর। আমার কাছে দুষ্টুমি করে কালো রঙের ব্যবহার শিখতে চাইতেন, প্রাণময় আইভরি ব্ল্যাক, আর আমাকে শেখাতেন, একই রঙের যেন পুর্নব্যবহার না ঘটে। কারণ, স্বীয় রঙের মাঝেই তার বৈচিত্র নিহিত। এ যেন, সীমার মাঝে অসীম তুমি, বাজাও আপন সুর, আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ, তাই এতো মধুর।’ আমার প্রতি অনুভবে আপনি থাকবেন, মায়েস্ত্রো।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৮৪ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031