» বাংলাকে পাথেয় করে এগিয়ে যাওয়ার দিন : অলিদ তালুকদার

প্রকাশিত: ২১. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | শুক্রবার

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ শুক্রবার। একই সঙ্গে মাতৃভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছরও পূর্ণ হচ্ছে । বাঙালি জাতির জন্য দিবসটি চরম শোক ও বেদনার; অন্যদিকে মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। রক্তস্নানের মধ্য দিয়ে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিন। সব বাধা অতিক্রম করে বাংলাকে পাথেয় করে এগিয়ে যাওয়ার শপথের সে দিনও আজ।

প্রতি বছরের মতো আজ সবার সব পথ এসে মিলে যাবে এক অভিন্ন গন্তব্য শহীদ মিনারে। হাতে হাতে বসন্তে ফোটা ফুলের স্তবক, কণ্ঠে নিয়ে চির অ¤øান সেই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি…’ ধীর পায়ে এগিয়ে যাবেন আবালবৃদ্ধবনিতা। ভাষাশহীদদের প্রতি নিবেদিত শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ঢেকে যাবে শহীদ মিনারের বেদি। শুধু কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নয়, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা সব শহীদ মিনারে ফুলেল ভালোবাসা জানিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে ভাষা শহীদদের।

১৯৫২ সালের অমর একুশের পথ ধরেই ’৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের চেতনা ও দেশপ্রেম ধারণ করে ত্রিশ লাখ শহীদের বুকের রক্ত আর অসংখ্য নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে মুক্ত হয় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ও প্রিয় বাংলাদেশ।

বাংলা মায়ের বীর সন্তানরা মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে আজ থেকে ৬৭ বছর আগে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি বুকের রক্তে রঞ্জিত করেছিলেন ঢাকার রাজপথ। পৃথিবীর ইতিহাসে সৃষ্টি হয়েছিল মাতৃভাষার জন্য আত্মদানের অভূতপূর্ব নজির। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালে মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গত কয়েক বছর ধরে দিবসটি পালন হচ্ছে। তাই দিবসটি শুধু বাঙালির নয়, পৃথিবীর সব ভাষাভাষী মানুষের। পৃথিবীর কয়েক হাজার ভাষাভাষী মানুষও দিনটি শ্রদ্ধাভরে পালন করছেন।

রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতি আজ একুশের মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচির আয়োজন করেছে দিবসটি উপলক্ষে।

যে কোনো জাতির জন্য সবচেয়ে মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার হচ্ছে মৃত্যুর উত্তরাধিকার- মরতে জানা ও মরতে পারার উত্তরাধিকার। ’৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি শহীদরা জাতিকে সেই মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন। ’৫২ সালের এদিনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠীর চোখ-রাঙানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসেন। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শংকিত করে তোলায় সেদিন ছাত্র ও জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।

তাদের এই আত্মদান নিয়ে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিম তার ‘বায়ান্নরও আগে’ প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘বরকত, সালামকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা বরকত সালাম আমাদের ভালোবাসে। ওরা আমাদের ভালোবাসে বলেই ওদের জীবন দিয়ে আমাদের জীবন রক্ষা করেছে। ওরা আমাদের জীবনে অমৃত রসের স্পর্শ দিয়ে গেছে। সে রসে আমরা জনে জনে, প্রতিজনে এবং সমগ্রজনে সিক্ত।’

তাদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে আমরা অমরতা পেয়েছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা বলতে পারি দস্যুকে, বর্বরকে এবং দাম্ভিককে; তোমরা আর আমাদের মারতে পারবে না। কেননা বরকত সালাম রক্তের সমুদ্র মন্থন করে আমাদের জীবনে অমরতার স্পর্শ দিয়ে গেছেন।’

বরেণ্য শিক্ষাবিদ আবুল ফজল একুশ নিয়ে তার এক লেখায় লিখেছেন, ‘মাতৃভাষার দাবি স্বভাবের দাবি। ন্যায়ের দাবি, সত্যের দাবি—এ দাবির লড়াইয়ে একুশে ফেব্রæয়ারি অনেকে প্রাণ দিয়েছেন। প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, স্বভাবের ব্যাপারে, ন্যায় ও সত্যের ব্যাপারে কোনো আপস চলে না, চলে না কোনো গোঁজামিল। জীবন-মৃত্যুর ভ্রূকুটি উপেক্ষা করেই হতে হয় তার সম্মুখীন।’

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে না হতেই পাকিস্তানিরা আমাদের মুখের ভাষা বাংলা কেড়ে নিতে চায়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঘোষণা দেন। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পূর্ববাংলার ছাত্র ও জনতা। প্রতিবাদের লড়াইয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলার ছাত্রসমাজ ওই ঘোষণার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকার রাজপথে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে প্রকম্পিত করে সারা পূর্ববাংলা। ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয় রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা অগণিত শহীদের রক্তে।

মায়ের ভাষার অধিকার ও রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছিল বীর বাঙালি জাতির লড়াই-সংগ্রাম আর বীরত্বের গৌরবগাঁথা অধ্যায়। রাষ্ট্রভাষার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখার কারণে বঙ্গবন্ধুকে কারাবরণ করতে হয়। শহীদের রক্তে রঞ্জিত অমর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠা, আত্মবিকাশ ও আত্ম-বিশ্লেষণের দিন। ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ-ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান রাষ্ট্রে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে জন্ম নেয় বিরোধ।

পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অস্বীকার করে কৃত্রিম ভাষা উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে।

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রেডটাইমস ডটকম বিডি । কাউন্সিলর- বিএফইউজে-বাংলাদেশ ও সদস্যঃ ডিইউজে ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৩২ বার

Share Button

Calendar

April 2020
S M T W T F S
« Mar    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930