» বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু মানবতাবাদী লিন্ডসে এ্যালান চেইনী

প্রকাশিত: ০৪. নভেম্বর. ২০২০ | বুধবার

কুমার প্রীতীশ বল

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিদেশী বন্ধুদের অবদান আমরা সবসময় শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।তাঁদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করেছি।কিন্তু যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশের পুণর্গঠনের কাজে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকেএসে, যেসব মানবতাবাদী চিরস্থায়ী হয়ে এদেশকে নিজের মাতৃভূমির মতো আগলে রাখেন, তাঁদের অনেককেই স্মরণে রাখিনি।তাঁদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করিনি।তাই তাঁদের অনেকের অবদান বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে।এমনই একজন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু নিউজিল্যান্ডের নাগরিক মানবতাবাদী লিন্ডসে এ্যালান চেইনী।
তিনি এদেশে প্রথম এসেছিলেন ১৯৭০ সালে, তারপর ১৯৭২ সালে আবার এসে আর ফিরে যাননি।চেইনী এদেশে প্রথমএসে দেখেছিলেন প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত উপকূলে প্রাণহীন শবের সারি, শুনেছিলেন শূন্যতার হাহাকার।তারপর এসে দেখলেন পাকিস্তানীদের উন্মত্ত হিংসার আগুনে ছারখার সারাদেশের জনপদ, নিহত লাখ-লাখ মানুষ।তখন সুগভীর বেদনা ও সমবেদনার স্বরলিপি আর্ত করেছিল নিউজিল্যান্ডের এই নাগরিককে।

এ্যালান চেইনী নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনের উপশহরে খুব দরিদ্র পরিবারে ৩নভেম্বর ১৯৩১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শ্রমিক বাবা আর গৃহিণী মায়ের অনেক সন্তানের মধ্যে চেইনী উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন।মেধাবী হিসাবে তিনি বৃত্তি পেয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন।নিউজিল্যান্ডে বেড়ে ওঠা চেইনী আমেরিকায় স্থায়ী হতে চেয়েছিলেন।ওখানেই বিয়ে করেন।কিন্তু এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী-পুত্রকে হারিয়ে আমেরিকার পাট চুকিয়ে চেইনী বেরিয়ে পড়েন।
চেইনী ১৯৭২ সালের মার্চে যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশে দ্বিতীয়বার এসে এমন সব শিশু দেখলেন, যাদের পরিবার নেই, থাকার বাসস্থান নেই। ১০-১২ বছর বয়সী এসব শিশু স্কুলে না গিয়ে নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে।চেইনী দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত এসব ভাসমান শিশুর জন্য ‘কিছু একটা’ করতে চাইলেন।তিনি এমন ‘কিছু একটা’ করার চিন্তা করেন যাতে কাজের পাশাপাশি তারা পড়াশুনা করতে পারে । শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ পায়।চেইনী এ বিষয়ক একটি প্রস্তাবনা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন ফান্ড’র কাছে উপস্থাপন করেন।কিন্তু তারা এধরনের কোনো কর্মসূচি নিতে রাজী হলো না।তারপরও চেইনী থেমে থাকেননি।তাঁরমধ্যে এসব অসহায় শিশুর জন্য ‘কিছু একটা ’করার চিন্তার যে সূত্রপাত হয়, তা হারিয়ে যায়নি।তিনি চিন্তা এবং যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন।চেইনী ‘আন্ডার প্রিভিলাইজড চিলড্রেনস এডুকেশানাল প্রোগ্রাম’ (ইউসেপ) শুরু করতে গিয়ে অনেক বাধার মুখোমুখি হন।

অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন ছাত্র গোলাম হায়দার ফরিদের মধ্যস্থতায় চেইনী ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজের ইচ্ছার কথা জানান।
লিন্ডসে এ্যালান চেইনী ১৯৭৩ সালের ৩অক্টোবর, বুধবার সমাজকল্যাণ  ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় ইনস্টিটিউটের তিনটি রুমে ৬০জন কর্মজীবী শিশু নিয়ে একটি ‘বৈকালিক স্কুল ’চালু করেন।চেইনী এই স্কুলের নাম দিলেন,রোজগারী বালক সম্প্রদায় বিদ্যালয়।চেইনীকে সার্বিক সহযোগিতা করেন ঢাকাবিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য বোসপ্রফেসর ড. আবদুল মতিন চৌধুরী।চেইনী কার্যক্রমটি বঙ্গবন্ধু সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে শুরু করেন।এই কর্মসূচি তাঁর জীবদ্দশায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম এবং খুলনায় সম্প্রসারণ হয়।চেইনীর উদ্দেশ্য ছিল, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচি অনুসরণ করে ইংরেজি, বাংলা ওস্বাস্থ্যসম্পর্কে জ্ঞান দান করা।যেহেতু এরা রোজগারি শিশু, সেকারণে তাদের ৭/৮ঘন্টা শ্রেণি কক্ষে রাখা সম্ভবনা।তাই তাদের পাঠদানের সময় প্রথমে দুইঘন্টা এবং পরে আড়াই ঘন্টা করা হয়।তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের চিত্ত-বিনোদনের জন্য সপ্তাহে একদিন বিকাল বেলা শারীরিক শিক্ষাকলেজের শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শরীরচর্চার ব্যবস্থা করেন।

সেসঙ্গে একদল ছাত্রকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্যান্ডদল তৈরি করেন।অন্যরা ব্যান্ডদলের বাজনার সঙ্গে শরীর চর্চা করত।এরাই বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে স্টেডিয়ামে কুচকাওয়াজ ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নিত।
চেইনী ১৯৭ ৪ সালের গ্রীষ্মকালে ঢাকার রায়ের বাজার বস্তিবাসীর কিশোর-কিশোরীদের আম খাওয়ানোর উদ্যোগ নেন।এটা পরে ম্যানগোফেসটিভ্যাল নামে পরিচিতি লাভ করে।এসময় তিনি দেখলেন, শুধু কিশোররা আম খেতে লাইনে দাঁড়াচ্ছে।কিশোরীরা বস্তির জানালা অথবা দরজার আড়াল থেকে হাত বাড়িয়ে আছে।স্বেচ্ছাসেবকরা জানালার ও দরজার কাছে গেলে দেখতে পায় কিশোরীরা হাত আড়াআড়ি করে বুক আচ্ছাদন করে আছে, ঘরের বাইরে আসার মতো বস্ত্র নেই।ঘটনাটি চেইনীকে আবেগাপ্লুত করে।তিনি ঘোষণা দেন, এই কিশোরীরা   ইউসেপ বৈকালীক স্কুলে আসলে পোশাক পাবে।তিনি তাৎক্ষণিক ভাবে দর্জি নিয়োগ দেন।সবার জন্য পোশাক, দুপুরের খাবার এবং বইয়ের ব্যবস্থা করেন।তখন ছেলেদের ও ইউসেপ লেখা গেঞ্জি দেওয়া হয়।
চেইনীদেখলেন, সারাদিনকাজশেষে ¯কুলেএসেশিশুরাপড়াশুনায়মনোযোগদিতেপারছেনা।কারণহিসেবেতিনিআবিষ্কারকরলেন, প্রায়সবশিশুইক্ষুধার্তথাকে।চেইনীতাদেরখিঁচুড়ীখাওয়ানোরব্যবস্থাকরলেন।
চেইনীর এই কার্যক্রম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান অবগত ছিলেন।তাই তিনি ১৯৭৪ সালের ফ্রেবুয়ারি মাসে সেগুনবাগিচার ১১৫ নম্বর বাড়িটি (বর্তমান২৫সেগুনবাগিচা) চেইনীকে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নামমাত্র ভাড়ায় বরাদ্দ দেন।  ১৯৫৭-৫৮সালে  বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান টি বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন এই বাড়িটি ছিল তাঁর সরকারি বাসভবন।চেইনী শিশুদের খাদ্যের পাশাপাশি বাসস্থান নিশ্চিত করতে সেগুনবাগিচার ঐ বাড়িতে একটি হোষ্টেল চালু করেন।হোষ্টেল তদারকির জন্য সুপারিন্টেনডেন্ট, মেডিক্যাল অফিসার, সমাজকর্মী এবং শরীরচর্চার প্রশিক্ষক নিয়োগ করেন।শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।মেডিকেল  অফিসার কমিউনিটিতে চিকিৎসা  দেওয়ার জন্যও যেতেন।ছাত্রদের পাশাপাশি তাদের বাবা মাকে সেবা দেওয়া হতো, এমনকি ওষুধও দেওয়া হতো।
চেইনী১৯৮২সালেকৃষিভিত্তিকশিক্ষাকেসময়োপযোগীওবাস্তবমুখীকরারজন্যগাজীপুরজেলারকাশিমপুরেজমিকিনেতিনতলাবিল্ডিংকরেকৃষিপ্রশিক্ষণবিদ্যালয়স্থাপনকরেন।এইবিদ্যালয়েরউদ্দেশ্যছিল, কৃষকপরিবারেরছেলেদেরসাধারণশিক্ষারসঙ্গেসময়োপযোগীবিজ্ঞানভিত্তিককৃষিশিক্ষাপ্রদানকরা।এরফলেশিক্ষার্থীরাআধুনিকবিজ্ঞানসম্মতচাষাবাদসম্পর্কেক্লাসরুমেতাত্ত্বিকএবংমাঠপর্যায়েহাতেকলমেশিক্ষাগ্রহণেরসুযোগপাবে।কিশোররাএধরনেরশিক্ষাকার্যক্রমেসার্বক্ষণিকথাকতেঅনাগ্রহীহলেতাদুইবছরপরবন্ধহয়েযায়।
চেইনীরস্বপ্নছিল, ইউসেপএকটিআর্ন্তজাতিকপ্রতিষ্ঠানরূপেদক্ষিণ-পূর্বএশিয়ায়আবির্ভূতহবে।বাংলাদেশএরনেতৃত্বেথাকবে।বাংলাদেশেরনেতৃত্বেনেপাল, ভারত, পাকিস্তান, ভুটানওমালদ্বীপেসম্প্রসারিতহবে।কিন্তুতিনিশেষপর্যন্তনেপালছাড়াঅন্যদেশেসম্প্রসারণকরতেপারেননি।
ইউসেপযখননিজকৃতিত্বেআরোআলোকিত, আরোঅগ্রসরমান, তখন১৯৮৬সালের১৫সেপ্টেম্বরইউসেপেরভাগ্যাকাশেনেমেআসেশোকেরকালোছায়া।প্রতিদিনেরমতচেইনীগুলশানেরবাড়িতেরাতেরখাবারখেলেন, পরেরদিনেরজন্যকাজেরপরিকল্পনাকরলেন, হোষ্টেলেরছেলেদেরখোঁজ-খবরনিয়েঘুমাতেগেলেন।ঘুমাতেযাবারআগেবলেগেলেন, পরদিনমিরপুরেইউসেপেরক্যাম্পাসেগাছলাগাবেন।এপর্যন্তসবইঠিকছিল, কিন্তুপরদিনসকালেচেইনীরসেইঘুমআরভাঙ্গেনি।একদীর্ঘ, সফল, গর্বিতওউজ্জলতমজীবনকাটানোরপরমাত্র৫৫বছরবয়সেলিন্ডসেএ্যালানচেইনীহৃদযন্ত্রেরক্রিয়াবন্ধহয়েমারাযান।জন্মভূমিথেকেঅনেকদূরেএসেচেইনীনিজেরআরেকটিযেদেশবাংলাদেশকেনিজেরদেশহিসাবেভেবেনিয়েছিলেন, যেদেশেরমানুষকেআপনকরেনিয়েছিলেন, সেখানেইশেষসময়পারকরেচলেগেলেনপরপারে।এখানেইথেকেগেলেনচিরতরে।

ঢাকারকাকরাইলচার্চেধর্মীয়আনুষ্ঠানিকতাশেষেতাঁকেনারিন্দাখৃস্ট্রানকবরস্থানেসমাহিতকরাহয়।
মাত্র৬০জনকর্মজীবীশিশুনিয়েচেইনীযেযাত্রাশুরুকরেছিলেনতাআজএদেশেরসুবিধাবঞ্চিতশিশুদেরআলোকবর্তিকাহিসাবেকাজকরছে।চেইনীপ্রতিষ্ঠিতইউসেপএখন১০টিজেলায়১০টিকারিগরিও৩২টিসাধারণবিদ্যালয়, ১৭টিকারিগরিআউটরিচসেন্টারসহপ্রায়১০০০জনশিক্ষকওকর্মকর্তা-কর্মচারিরসমন্বয়েপরিচালিতহচ্ছে।বাৎসরিকপ্রায়৩৫,০০০শিক্ষার্থীকেইউসেপবাংলাদেশনানাভাবেসহায়তাকরে, এদেরমধ্যেপ্রায়১৫০০০শিক্ষার্থীকারিগরিবিদ্যালয়েরমাধ্যমে৩৭টিট্রেডেরচাহিদাভিত্তিকযেকোনোএকটিতেপ্রশিক্ষণনিয়েউত্তীর্ণহলেইউসেপবাংলাদেশশোভনকর্মসংস্থানেসহায়তাকরছে।এইপথচলারঅনুপ্রেরণাকারীচেইনীযেযাত্রাশুরুকরেছিলেনতাতেস্বপ্নছিল, প্রত্যাশাছিল।তাঁর স্বপ্নের পরিধি কত বিশাল ছিল তা অজানা থাকলেও তাঁর স্বপ্নের বীজ ছড়িয়ে গেছে লক্ষ স্বল্পসুবিধাভোগী শিশুর অন্তরে।একবিংশ শতাব্দীর অগ্রযাত্রায় যদিও বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে, তবু স্বপ্ন দেখে শ্রেষ্ঠ হবার।স্বপ্ন দেখে দক্ষতা আর সাহসিকতার সংমিশ্রণে স্বল্প সুবিধাভোগী শিশু-যুবারা সামাজিক অবকাঠামো পরিবর্তন করে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাবার।এগিয়ে যাবার এইযাত্রায় বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু নিউজিল্যান্ডের নাগরিক মানবতাবাদী লিন্ডসে এ্যালানচেইনীর স্বপ্নই হোক বাস্তবতা, এটাই হোক আজকের অঙ্গীকার।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫৭ বার

Share Button

Calendar

November 2020
S M T W T F S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930