বাংলাদেশের খাসিয়া জনগোষ্ঠি ও তাদের লোকউৎসব

প্রকাশিত: ১:২৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০১৯

বাংলাদেশের খাসিয়া জনগোষ্ঠি ও তাদের লোকউৎসব

সৌমিত্র দেব

বাংলাদেশের খাসিয়া আদিবাসীরা মূলত: সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা। সিলেট বিভাগের চারটি জেলাতে খাসিযা পুঞ্জি আছে। পুঞ্জি মানে গ্রাম। শহর থেকে দূরে বনের গভীরে তারা পুঞ্জি গড়ে তোলেন এবং সেখানে পান চাষ ও জুম চাষই তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। জাফলং এলাকায় একসময তাদের কমলার বনও ছিল। অনেকের মতে খাসিয়ারা বর্তমানে সংখ্যালঘু হয়ে পড়লেও একসময় গোটা সিলেট অঞ্চলেই তাদের রাজত্ব ছিল।

খাসিয়ারা নিজেদেরও ‘খাসি’ বলে পরিচয দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও অন্য ভাষাভাষী মানুষদের কাছে ‘খাসিয়া’ বলে পরিচিত। ভারতের উওর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের কর্তৃত্ব খাসিয়া ও গারোদের হাতে। খাসিয়া, গারো ও জয়ন্তিয়া এই তিন পাহাড় নিয়ে মেঘালয় রাজ্য। আর সেখানে রাজ্যত্বও করছেন খাসিয়া, গারো ও জয়ন্তিয়া জনগোষ্ঠী। গবেষকরা মনে করেন খাসিয়া ও জয়ন্তিয়াদের পূর্বপুরুষ এক। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজ শাসকরা তাদের ’ভাগ করো এবং শাসন করো ’ নীতি অনুসারে খাসিয়া ও জয়ন্তিকদের মধ্যে বিভক্তির রেখা টেনে দেয়।

সৎ, পরিশ্্রমী ও শান্তি প্রিয় এই আদিবাসী মানুষেরা প্রাচীনকাল থেকে নদী- পাহাড়, গাছ- পালা অর্থাৎ সনাতন ধর্মের অনুসারি ছিলেন। তাদের মধ্যে একটি রূপকথা প্রচলিত আছে। রূপকথাটি হলো ‘ ষোল জন খাসিয়া স্বর্গে বাস করতেন। তারা পৃথিবী থেকে বেড়ে ওঠা একটি লম্বা গাছকে স্বর্গ সমান উচুঁ হতে দেখলেন। তাঁরা গাছটিকে পৃথিবী ও স্বর্গের মাঝখানে একটি সোনালী সেতু ঘোষণা করে ওই গাছ বেয়ে নামতে শুরু করলেন। সাতজন পৃথিবীতে নেমে আসতে পারলেন । কিন্তু এর মধ্যে গাছটি কাটা পড়ে যায়। নয়জন আর নামতে পারলেন না । আবার স্বর্গে ফিরে যেতেও পারলেন না । তারা রয়ে গেলেন স্বর্গ আর পৃথিবীর মাঝামাঝি জায়গায় । অন্যদিকে যে সাতজন পৃথিবীতে চলে এলেন তারা নির্মাণ করলেন সাতটি কুটির। খাসিয়াদের ইতিহাসে এই সাতটি কুটির সভ্যতা নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন।

যেকোন আদিবাসী বা জাতি সত্তার কাছে ধর্ম ও নৈতিকতা অন্তর্যমজ বিষয়। খাসিয়ারাও তার ব্যতিক্রম নয়। তাদের উৎসবের মধ্যে সেকারণেই ধর্ম ও নৈতিকতার প্রভাব রয়েছে। খাসিয়ারা অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠি। তাদের জীবন,ক্রিয়াকর্ম ও চিন্তাচেতনা ধর্মীয় চেতনা দ্বারা গভীরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। তাদের জীবনে ঈশ্বরের ভূমিকা সম্পর্কে তারা অত্যন্ত সচেতন। ধারণা করা হয় ব্রিটিশরা আসার আগেখাসিয়া রাজ্য সিলেটের কিছু অংশসহ খাসিয়া পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তখন পর্যন্ত খাসিয়ারা তাদের আদি ধর্মপালন করতেন। কিন্তু তাদের রাজ্যে ব্রিটিশ প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা হবার পর সেখানে খ্রিস্টান ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটে। খাসিয়ারা এই নতুন বিশ্বাসকে স্বাগত জানান এবং হাজার হাজার খাসিয়া খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে অবশ্য মিশনারীরা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। খ্রীষ্টান ধর্ম খাসিয়াদের জীবনে সুদুরপ্রসারী পরিবর্তন আনে।

খ্রীষ্টান হবার পর তাদেও উৎসব হয়ে ওঠে বড়দিন। প্রতিদিন চার্চে খ্রীস্টিয় কায়দায় শুরু হয় খাসিয়াদের সংগীত। ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত খাসিয়া রাজ্য ,গোটা সিলেটসহ পুরো মেঘালয় রাাজ্যটাই ছিল আসাম প্রদেশের অন্তর্ভক্ত। কিন্তু ১৯৪৭ সালে গনভোটের মধ্য দিয়ে সিলেটের প্রধান অংশ অন্তর্ভক্ত হয় পাকিস্তানে এবং আসামের বাকি অংশ পড়ে যায় ভারতে। পরবর্তীকালে আবার আসাম খন্ডিত হয়ে খাসিয়াদের আলাদা রাজ্য মেঘালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের মূল সংস্কৃতি সেখানেই চলে যায়। তবে সেখানেও খ্রিষ্ট্ান ধর্ম ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে তাদের মূল সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে কিছু কিছু উৎসব এখনো মেঘালয়ে বেশ জাকজমকের সঙ্গে পালিত হয়। যেমন নংক্রেম উৎসব। মেঘালয় রাজ্যের একটি এলাকা নংক্রেম। সেখানে বছরে একবার নংক্রেম উৎসব হয়। পাচঁদিন ব্যাপী এই উৎসবে মূলত: পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। হাজার হাজার মানুষ মেতে ওঠে নৃত্যগীতে । তবে এই নৃত্যেও বিশেষত্ব হলো , শুধুমাত্র অবিবাহিত পুরুষ ও কুমারী মেয়েরাও এই নৃত্যে অংশগ্রহণ করতে পারে। স্বয়ং রাজকুমারীরাও কুমারী হলে এই নৃত্যে অংশ নেন। বাংলাদেশ থেকেও উৎসাহী খাসিয়া তরুণ তরুনীরা নংক্রেম উৎসবে যোগ দিতে যান। মেঘালয়ের রাজধানী শিলং – এ ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় উয়েকিং উৎসব। প্রতি বছর মার্চ অথবা এপ্রিল মাসে ফসল লাগানোকে কেন্দ্র করে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়॥ এছাড়া জয়ন্তিকা হিলসেও খাসিয়াদের প্রতিবছর জুলাই মাসে ৩ দিন ব্যাপী নাম ’ বে ডিং খলাম’ উৎসব হয। বাংলাদেশের জাফলং – এ বল্লা পুঞ্জিতে প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে পাঁঠা বলির উৎসব করেন খাসিয়ারা। তবে শুধূ পাঁঠা বলি নয়; এই দিনে মুরগী বলিও দেওয়া হয়। পান, সুপারী ও নিজেদের বানানো মদ পরস্পরের মধ্যে বিতরণ করে। পিয়াইন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে কবুতর উড়িয়ে দেন আকাশে। খাসি ভাষায় মš উচ্চারণ করেন পুরোহিত রোগ মুক্তির জন্য প্রাথৃনা করেন সমবেত হয়ে। তবে বল্লা পুঞ্জিতে খাসিয়া বসতি এখন আর আগের মত নেই। জাফলং – এর কাছেই জৈন্তাপুরে খাসিয়াদের আরেকটি উৎসব পালিত হয়। শীতকালের এই উৎসবের নাম ‘হকতয়’ । তারা পূর্ব পূরুষদের আত্মার সদগতি কামনায় এই উৎসব আয়োজন করেন। উৎসবাদির নানান পিঠা তৈরি হয়। আয়োজন হয় নৃত্য সংগীতেরও।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com