» বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলানা সাহেবদের অবদান

প্রকাশিত: ২৯. জুলাই. ২০২০ | বুধবার

সৌমিত্র দেব

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই আমাদের দেশের আলেম ওলামা মৌলানারা সবসময় ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা করেছেন । ইংরেজরা ভারতীয়দের মনোভাব বোঝার জন্য কংগ্রেস নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে । পরবর্তীকালে তাদের “ভাগ করো ও শাসন করো” নীতি অনুযায়ী মুসলমানদের জন্য আলাদা দল গঠন করে । নাম রাখে – মুসলিম লীগ । শুরুতে মৌলানা সাহেবেরা ইংরেজ প্রতিষ্ঠিত এই দুটি দলের কোনটিতেই আগ্রহী ছিলেন না । পরবর্তীকালে কংগ্রেসের মধ্যে মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধীর ্মতো নেতাদের কারণে কিছুটা পরিবর্তন আসে । কংগ্রেসের গণমুখী চরিত্র দেখে এই দলের প্রতি আগ্রহী হন তারা ।

ইসলামের ইতিহাসে খেলাফত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । একজন খলিফা নেতৃত্ব দেবেন সমগ্র মুসলিম বিশ্বের । আবুবকর, উমর, ওসমান ও আলী এই চার খলিফার সময়কাল ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদীন নামে পরিচিত । এদের পর খেলাফতের সেই গৌরব হারিয়ে যায় । দেশে দেশে বাদশাহি শাসন কায়েম হয় ।অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (১৮৭৬–১৯০৯) অটোমান সাম্রাজ্যকে পশ্চিমা আক্রমন ও ভাঙন থেকে রক্ষা করার জন্য এবং ঘরে বসে পশ্চিমা দেশীয় গণতান্ত্রিক বিরোধীদলকে পরাস্ত করার জন্য তার প্যান-ইসলামবাদী কর্মসূচি চালু করেছিলেন। তিনি উনিশ শতকের শেষদিকে জামালউদ্দিন আফগানি নামে একজন রাষ্ট্রদূত ভারতে প্রেরণ করেছিলেন। ] অটোমান রাজার কারণে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ এবং সহানুভূতি সৃষ্টি করেছিল। খলিফা হওয়ায় উসমানীয় সুলতান বিশ্বজুড়ে সমস্ত সুন্নি মুসলমানদের নামমাত্র সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তবে, এই কর্তৃত্বটি বাস্তবে কখনও ব্যবহৃত হয়নি।

বিপুল সংখ্যক মুসলিম ধর্মীয় নেতারা খেলাফতের পক্ষে মুসলিমদের সচেতনতা বাড়াতে এবং মুসলমানদের বিকাশের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। মুসলিম ধর্মীয় নেতা মাওলানা মেহমুদ হাসান অটোমান সাম্রাজ্যের সমর্থন নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের আয়োজন করার চেষ্টা করেছিলেন।
এটি খিলাফত আন্দোলন যা ভারতীয় মুসলিম আন্দোলন (১৯১৯-১৯২৪) নামেও পরিচিত, ইসলামী খেলাফত পুনরুদ্ধার করতে ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানরা শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী জওহর ও আবুল কালাম আজাদ এর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ অভিযান করে।

খেলাফতের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে মৌলানা সাহেবরা মুসলিমলীগ নেতাদের কাছে যান নি । বরং কংগ্রেসের সভাপতি মহাত্মা গান্ধীকে নেতা বানিয়েছেন । এভাবেই ভারতের হিন্দু মুসলমান সম্মিলিত ভাবে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন করেছে । আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা দেখে কংগ্রেসের বাইরে থাকা বিভিন্ন বিপ্লবী গ্রুপ ও সেখানে অংশ নেয় । এই আন্দোলন দমনে ব্রিটিশ শাসক তীব্র দমন নিপীড়ন চালায় । আন্দোলনে থাকা বিপ্লবীরাও পাল্টা আঘাত করে । এ সময়েই হঠাত করে সহিংসতার অভিযোগ তুলে গান্ধীজী আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান । অহিংস রাজনীতির নামে আন্দোলন বন্ধ করলেও তিনি আসলে সরে গিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক কারণে । তুর্কী বীর কামাল পাশার নেতৃত্বে সে সময় আন্তর্জাতিক ভাবেই খেলাফতের অবসান ঘটেছে । কিন্তু গান্ধীজী মৌলানা সাহেবদের কাছে সেই ব্যাখ্যা না দিয়ে নিজেকে অহিংসার মহামানব হিসেবে দাড় করালেন । তবু মৌলানারা তাকে ত্যাগ করলেন না। কারণ তাঁর মধ্যে তারা পেয়েছেন উদার জাতীয় নেতার বৈশিষ্ট্য ।

এক পর্যায়ে যখন পাকিস্তান প্রস্তাব সামনে এলো উচ্চ শিক্ষিত বড় বড় নেতারা বিভ্রান্ত হলেন তখনো অবিভক্ত ভারতের শীর্ষস্থানীয় মৌলানারা সেই ফাঁদে পা দেন নি । এদের মধ্যে ছিলেন ভারত ভাগের সময় কংগ্রেসের সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ , জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ এর সভাপতি মৌলানা হোসেন আহমদ মদনী ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাটা মৌলানা আবুল আলা মওদুদী। এদের মধ্যে মৌলানা মওদুদী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তা মেনে নেন এবং পাকিস্তানে চলে যান । কিন্তু তার দল ভারতে রয়ে যায় বহাল তবিয়তে ।

অন্যদিকে একজন মাত্র বিখ্যাত মৌলানা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন । তিনি আসাম মুসলিম লিগের সভাপতি ভাসানী । পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরেই তিনি এর প্রতারণা বুঝতে পারেন। আর দেরী না করে পাকিস্তান ভাঙার জন্য উঠে পড়ে লাগেন । ভাসানী ছাড়াও আওয়ামীলীগে সভাপতির পদ অলংকৃত করেছিলেন আরেক মৌলানা, তিনি আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ । বাঙালি নেতাদের মধ্যে প্রথম পাকিস্তান কে আসসালামুয়ালিকুম বলেছেন মৌলানা ভাসানী । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রথম বাংলাদেশ সরকারের সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতিও ছিলেন মৌলানা ভাসানী ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক মৌলানা যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। কেউ বা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন । কিন্তু ঘাতক ও দালালদের তালিকায় তাদের সংখ্যা খুব কম। গোলাম আজম অধ্যাপক ছিলেন, মৌলানা ছিলেন না । কাদের মোল্লা নামে মোল্লা , মৌলানা ছিলেন না। সাকা , ফকা কোন চৌধুরী মৌলানা ছিলেন না । তবে অনেক স্বঘোষিত মৌলানা ধর্মের নামে অধার্মিক কার্যকলাপে জড়িত ছিল । এদের কারণে এই লেবাসটাই অপমানিত হয়েছে ।
আমাদের দেশে বামপন্থী রাজনীতিতেও অনেক মৌলানা অবদান রেখেছেন । এদের মধ্যে আছেন পীর হাবীবুর রহমান এমপি , মৌলানা আহমেদুর রহমান আজমী, মৌলানা হোসেন আলি। স্বঘোষিত ভণ্ড মৌলানাদের ভিড়ে
পীর হাবিবের মতো উদার ও অঘোষিত মৌলানার খবর কেউ রাখে না ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৩৫ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031