“বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ত্রিপুরা সহ চারটি রাজ্যের অবদান ‘’

প্রকাশিত: ১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০২০

“বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ত্রিপুরা সহ চারটি রাজ্যের অবদান ‘’

ইমরান আহমেদ চৌধুরী

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ আমার জীবনের সবচে’ বড় ঘটনাবহুল উপাখ্যান । এক জন ১১ বছর বয়সী বালক শরণার্থী ছিলাম আমি ; ত্রিপুরার রাজধানী থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে আগরতলা শাভ্রুম হাই ওয়ের পাশে সূর্যমনিনগর স্পেশাল ক্যাম্পের রুম নম্বর এ ১ – এ ২ বাসিন্দা আমি এবং আমার পরিবার . মে মাস থেকে ১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত । ১৭ ই এপ্রিল থেকে আপন নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে গৃহহারা আমার পরিবার – কসবা থানার ৭ টি গ্রামে ১৩ দিন বর্বর পাকিস্তান আর্মির তাড়া খেয়ে পলায়ন করার পর আর কোন জায়গা যখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না । তখন এক দিনে ১৭ মাইল পায়ে হেঁটে মা, চার ভাই ও বোন সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে ধ্বজনগর দিয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করি । জীবনে মৃত্যুর ভয় কাকে বলে জানতাম না আগে ; যখন মুসলিম পাকিস্তানী বর্বর হিংস্র আর্মি মসুল্মান বাঙ্গালী দের কে, বাঙ্গালী হিন্দু দের কে নির্বিচারে পশুর মত হত্যা যজ্ঞে লিপ্ত ঠিক তক্ষনি আশ্রয় নেই ভয়ে ভয়ে ইন্ডিয়া তে যাদের ব্যাপারে সারা জীবন শুনে এসেছি অপপ্রচার , শুনেছি ভয়াত্তক গল্প ; কিন্তু আমরা যখন ত্রিপুরাতে প্রবেশ করলাম তখন দেখলাম সচক্ষে ত্রিপুরাবাসীর এক ভিন্ন মানবিক রূপ ।

​ধ্বজনগরের পার্শ্ববর্তী সীমান্তের ওপর পাড়ে ত্রিপুরার গ্রামের মানুষের সম্ভাষণ এবং মহানুভাবিতা। আজও প্রকাশ্য দিবালোকের মত মনের পর্দায় ভেসে উঠে সেই স্মৃতি গুলো । সেদিনই সেই অল্প বয়েসেই উপলব্ধি করতে পারলাম যে, ধর্ম মানুষ দের বিভাজিত করে মনে হয় , আর মানবতা অবস্থান করে সকল ধর্মের উপড়ে । সেই দিনের সেই আতিথেয়তা এবং মানবিকতা জীবনেও ভুলতে পারব বলে মনে হয় না । ঐ গ্রামের ( পান্ডপপুর নাম টা ছিল মনে হয় ঐ গ্রামের) এক বর্ধিষ্ণু পরিবার তাদের বাড়ির একটা ঘর এ আমাদের থাকতে জায়গা দেয় – তার আগের দিন ১৭ মাইল হেঁটে ক্লান্ত, অবসন্ন অবস্থায় ধ্বজনগর মসজিদের পাশেই সীমান্ত লাইন অতিক্রম করে একটা কাঁঠাল বাগানে খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাই আমরা ৬ জন । অনেক দিন পর ইন্ডিয়ায় প্রবেশ করতে পেরে নিরাপত্তার চাঁদর গায়ে দিয়ে খোলা আকাশের নীচে গুমিয়েও নিরাপদ অনুভব করেছিলাম সে রাতে ।

​বিচ্ছিন পরিবার পিতা সিলেট এ ই পি আর চাকরিরত ছিলেন – ২৫ শে মার্চের পর থেকে আর কোন খোঁজ খবর নাই, বড় বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রীনিবাসে অধ্যয়নরত ছাত্রী তারও কোন খবরাখবর জানি না সেই কাল রাত ২৫ শে মার্চ থেকে । এক কাপড়ে ঘর থেকে জীবনের ভয়ে পালিয়ে এসেছি, নেই কোন কাপড় চোপর, নেই কোন বিছানা পত্র, নেই কোন পয়সা করি – একে বারে কপর্দকহীন উদবাশ্তু আমরা সেদিন । অথচ কয় দিন আগেও আমাদের ছিল একটা সচ্ছল পরিবার, মা ও বাবা দুজনই সরকারি চাকরিজীবী , ভাল আয় , সুন্দর পরিপাটি ঘুছানো ঘর, গান বাজনা হত প্রায়ই বাড়ির ছাদে জ্যোৎস্না রাতে , বসতো রবীন্দ্র সঙ্গীতের আসর অথবা কবিতা আবৃতির আড্ডা আর আজ আমরা পথের ভিকারী তুল্য প্রায় । কি বিচিত্র এই জীবন !

​ঐ হিন্দু পরিবারের বাড়ির ছোট্ট ঘরে আমরা থাকতে লাগলাম, ওনাদের বাড়ির ভিতর দিয়ে পুকুর, টিপ কল, রান্না ঘর ব্যবহার করতে লাগলাম আমরা দিব্বি ; আমাদের কে ওনারা ( দুঃখিত, ঐ মহা মানব পরিবার তার নাম টা মনে নেই এখন ) টাকা দিলেন কিছু কাপড় চোপর, হাড়ি বাসন, বিছানা পত্র কিনার জন্য । এ ঋণ কি জীবনেও শুধানো যায় ? কোন ভাষায় লিখে এ মহানুভবতার কৃপা আমার পক্ষে প্রকাশ করা মোটেও সম্ভব নয় । এভাবে আমরা থাকলাম ওনাদের অতিথি হয়ে ১০ – ১২ দিন – ইতিমধ্যে, জানতে পারলাম আমাদের পিতা শমশের নগর ( সিলেট জেলায় ) বিমান বন্দরে ২৭ ই মার্চ সে ই প্রথম সমগ্র সিলেট এর মধ্যে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং বর্তমানে ত্রিপুরার শেষ প্রান্তে কৈলাসশহরে ক্যাম্প করে ওখান থেকে যুদ্ধ করছেন । এর দু এক দিন পরেই আমরা সূর্যমনিনগর শরণার্থী শিবিরে থাকার অনুমতি পাই। আবার সব তল্পিতল্পা, গ্যাঁটটি বোস্কা নিয়ে ঐ অতিথিসেবক পরিবার এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাই সূর্যমনিনগরে । যুদ্ধ ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হতে থাকে চতুর্দিকে – লক্ষ লক্ষ শরণার্থী উপচে পরতে থাকে ত্রিপুরায়, হাজার হাজার মানুষ শরণার্থী শিবির ছাড়াও রাস্তার ধারে, জঙ্গলে, গ্রামের পাশে খোলা মাঠে ছাপরা বানিয়ে, স্ক্লুলে, কলেজে, সরকারি অফিস আদালতের বারান্দায়, বাসের ছাউনি তে, আগরতলা, বিসালগড়, গকুলনগর, বিশ্রামগঞ্জ , মেলাঘর, সোনামুড়া কাঁঠালিয়া, রাঙ্গামুড়া, শিদ্ধিনগর, নিদয়া এই সব এলাকায় সরকারি নির্মিত শরণার্থী শিবির ছাড়াও জয় বাংলার লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় ত্রিপুরা । তখনো ভারত তথা ত্রিপুরার অর্থনীতি বেশ ভঙ্গুর অবস্থায় এরই মধ্যে ১৪ – ১৫ লক্ষ শরণার্থীদের থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা, বস্ত্র ব্যবস্তা করা মুখের কথা নয় । ত্রিপুরার জনসংখ্যা তখন ছিল ১৬ লক্ষ আর আমরা রিফ্যুযি ছিলাম ১৪ লক্ষ । ত্রিপুরা সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা । কিন্তু তদুপরি, কোন শরণার্থী কে কখনো কোন ভাবেই বুঝতে দেয় নাই তাদের উপর বর্ণিত চাপ । ১৪ লক্ষ মানুষের থাকার প্রয়োজনে, ঘর বানানোর জন্য , লাকড়ির জন্য পাহাড়ের পর পাহাড় বৃক্ষ বিহীন হয়ে গেছে – সে যে কি বিশাল পরিবেশ দূষণ , যানবাহন সমস্যা, খাবার পানি এবং মহামারি থেকে নিজ দেশের জনগণ কে নিরাপত্তা দেওয়া – এই সব সমস্যায় নিম্মযিত ত্রিপুরা – কিন্তু শরণার্থী অতিথি দের ঘুণাক্ষরেও উপলব্ধি করতে দেয় নাই । তারপর তো মুক্তি বাহিনীর ট্রেনিং, ক্যাম্প, চিকিৎসা, লজিস্টিক, রেশন, গোলাবারুদ তো রয়েই গেল।

​নয় টি মাস ত্রিপুরার জনগণ, রাজনৈতিক নেতারা, সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তা, শ্রমিক, সাংবাদিক, ডাক্তার, নার্স , তরুণ ও বয়স্ক বুদ্ধিজীবীরা প্রদান করে গেছে নীরব এক মহান সেবা । মানবতার দাঁড়িপাল্লায় ওঁদের অবস্থান হিমালয়ের চূড়ায় । ওঁদের ঋণ শোধ করা আদৌ সম্ভব হবে কিনা তা আমার জানা নেই । বাংলাদেশ এর স্বাধীনতায় ত্রিপুরা তথা ভারতের অবদান অপরিশোধ যোগ্য এক মানবিকতার শ্রেষ্ঠত্ব ।

​কেন জানি বারবার মনে হয় এটা একেবারে একটা এথনিক রেস জাতীয় কোন প্রকার আত্মিক সম্পর্ক । সম্পূর্ণ পৃথিবী যখন আমাদের উপর আনিত গণহত্যা, বলৎকার, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে, একটা এথনিক ক্লিনযিং থেকে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল । তখন আমাদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়েছিল কেবল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়া, আসাম এবং ত্রিপুরা । এই চার টি রাজ্য সর্বমোট ১ কোটি বাংলাদেশি শরণার্থী কে নিরাপত্তা দিল । তা না হলে আরও কয়েক লক্ষ মানুষকে অনায়াসে হত্যা করত ঐ বর্বর, পিশাচ পাকিস্তানি আর্মি । এবং এই চার টি রাজ্যের চাপেই হয়ত বা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহায়তা দিতে ।

​গত কয়েক দিন আগে একটি একাডেমিক রেফারেন্স লাইব্রেরিতে একটা রিসার্চ প্রবন্ধে পড়লাম, বাংলাদেশি স্বাধীনতা যুদ্ধের মোট অর্থনৈতিক ব্যয় হয়েছিল ২১ বিলিয়ন ডলার ( ১৯৭১) যদি এর তিন ভাগের এক ভাগ ভারত ব্যয় করে থাকে তাহলে তা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার (১৯৭১) এ যার আজকের মূল্য ৯৭ বিলিয়ন ডলার (৩.৯% হারে মুদ্রাস্ফীতি হিসেবে)।

​ভারতে ১৯৭১ সালে একজন রিফ্যুজি হিসেবে, তদানীন্তন বৃহতর সিলেট ​জেলার মধ্যে আমার পিতা এ ডি ( এসিস্টেন্ট ডাইরেক্টর ) ফজলুল হক চৌধুরীই তার ইপিআর কোম্পানি কে নিয়ে শমশেরনগর বিমান বন্দর থেকে পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বিদ্রোহ করেছিলেন । পরবর্তীতে ত্রিপুরার কৈলাসশহর – আসামের – মাসিমপুর, করিমগঞ্জ , ডাউকি থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিল দেশ স্বাধীন করার জন্য তার সন্তান হিসেবে । ভারতে ট্রেনিং প্রাপ্ত এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সহোদর হিসেবে । আমি এবং আমার পরিবার এবং এক কোটি শরণার্থী সহ সকল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এর পক্ষ থেকে এই কয়দিন আগে উদযাপিত বিজয় দিবস এর লগ্নে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি ভারতের জনগণ সকাশে ।

ছড়িয়ে দিন