» বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি: নিজেদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা

প্রকাশিত: ০৪. নভেম্বর. ২০১৯ | সোমবার


ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

দুপুরে ইন্ডিয়া হ্যাবিট্যাট সেন্টারে লাঞ্চের ফাঁকে তুমুল আড্ডা। সাথে দৈনিক কালের কণ্ঠের ইমদাদুল হক মিলন ভাই, দৈনিক সংবাদের আলতামাস কবির ভাই আর অনুজ প্রতিম রাশেক রহমান। আমাদের হোস্ট ইন্ডিয়ান টাইমস-এর একজন সিনিয়র সাংবাদিক। অতএব আড্ডা জমতে বাধ্য। দিল্লীতে আমদের এবারের যাওয়াটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে। কিছুক্ষণ আগেই দুই সরকার প্রধানের উপস্থিতিতে স্বাক্ষর হয়েছে একগুচ্ছ চুক্তি। চুক্তিগুলোর বৃত্তান্ত তখনও পুরোপুরি জানি না। রাতে ডিনারে আমাদের জমানার তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা আর আজকের মাননীয় পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম ভাই বলছিলেন বাংলাদেশ ফেনী নদী থেকে ত্রিপুরার সাবরুম মহকুমার জন্য খাবারের পানি সরবরাহ করবে। বাংলাদেশ সরকারের হয়ে তিনি সকালে ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন। ইন্ডিয়া হ্যাবিট্যাট সেন্টারের লাঞ্চের আড্ডায় বসেই টের পাচ্ছিলাম এই চুক্তিগুলোকে বিতর্কিত করার জন্য এরই মধ্যে দেশে নেমে পড়েছে একদল লোক। আর সন্ধ্যায় হোটেলের রুমে ঢুকে ফেইসবুকে লগইন করতেই বুঝলাম ভারতীয় দালালী আর ভারতের কাছে দেশ বিক্রির পুরাতন বস্তাপচা তত্ত্ব আবারও ফেনী নদী, এলপিজি আর রাডারের নতুন মোড়কে ভরে বাঙালিকে আরও একবার গেলানোর চেষ্টা চলছে পূর্ণোদ্যমে।

ভারতে থাকতেই আর দেশে ফিরেও এসব নিয়ে ঘাটাঘাটির চেষ্টা করেছি। মন দিয়ে পড়েছি বাংলাদেশ ভারতের যৌথ বিবৃতিটি। পড়ার এবং শোনার চেষ্টা করেছি ভারতের কাছে আরও একদফা দেশ বিক্রির পক্ষে আর বিপক্ষে যত লেখা আর আলোচনা। ভেবেছিলাম লিখব না। দেশের জন্য যার এত অবদান, যার কারণে দেশ আজ দেশের গণ্ডি ছাপিয়ে বিশ্বময় আলোচনায়, সেই নেত্রীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জবাব বাঙালিই দিবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বোরহানউদ্দিন কাণ্ডের পর মনে হয়েছে লেখা উচিত।

এবারের বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে চুক্তিগুলো নিয়ে অপপ্রচার বেশি হয়েছে তার দুইটি ত্রিপুরা কেন্দ্রিক। ভারতের এই ক্ষুদ্র প্রদেশটির কাছে আমাদের ঋণ কোনোদিনও শোধ হবার নয়। একাত্তরে ত্রিপুরার চৌদ্দ লাখ অধিবাসী আপন করে নিয়েছিলেন পনের লাখ বাংলাদেশী শরণার্থীকে। এমনকি ত্রিপুরার রাজপরিবার আগরতলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত তাদের রাজ প্রাসাদটিও উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন এপার থেকে যাওয়া শরণার্থীদের জন্য। ত্রিপুরার আগরতলা, মেলাঘর, সাবরুম- এসব জায়গার নাম বাদ দিয়ে একাত্তরের ইতিহাস লেখা অসম্ভব। যে সাবরুমে খাবারের পানি সরবরাহ করা নিয়ে এত কথা, সেখানকার অধিবাসীরা দেড়শ একরেরও বেশি ব্যক্তিগত জমি দান করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে একটি উদ্যান নির্মাণে। যতদূর জানি সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর পৃথিবীর বৃহত্তম টেরাকোটা ম্যুরাল। স্থাপিত হয়েছে জাতির পিতার বিশাল আবক্ষ মূর্তি। এই মুহূর্তে সাবরুমে খাবার পানি সরবরাহের জন্য ডিপ টিউবয়েলের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে ভূগর্ভে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যেমন ভারত, তেমনি আমরাও। কারণ ভূগর্ভের পানি আন্তর্জাতিক সীমানা মানে না। আর যে পরিমাণ পানি ফেনী নদী থেকে সাবরুমে সরবরাহ করা হবে তা নদীটির গ্রীষ্মকালীন সর্বনিম্ন প্রবাহের মাত্র ০.২৩ শতাংশ। নিশ্চিত জেনে রাখুন আমি-আপনি এই ঢাকা শহরে প্রতিদিন দাঁতব্রাশ কিংবা কাপড় ধুতে গিয়ে এরচেয়ে ঢের বেশি পানি অপচয় করি।

আর যারা যুক্তি দেখান যে, তিস্তার পানি না পেয়ে ফেনীর পানি দিয়ে দেয়াটা একটি কূটনৈতিক অপরিপক্কতা, তারা কি একবারও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক প্রজ্ঞাটা বোঝার চেষ্টা করেন? দেশে কিছু অবুঝ আর বুঝেও না বোঝা শ্রেণির আপত্তি সত্ত্বেও ফেনী নদীর পানি দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুধু তার মানবিক দিকটাকেই যে আরেকটু উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তাই নয়, বরং এতদিন যে মমতা ব্যানার্জী ঘরে বিরোধিতার যুক্তি দেখিয়ে তিস্তার পানি বণ্টনে গাইগুই করে আসছিলেন তিনিও এখন ব্যাকফুটে। পাশাপাশি একটি স্বাধীন জাতি হিসাবে আমাদের ত্রিপুরার কাছে যে ঋণ, তার কিছুটা হলেও শোধ হয়েছে এর মধ্যে দিয়ে। মাত্র ০.২৩ শতাংশ পানির বিনিময়ে এই অর্জনগুলো আমার কাছেতো বাড়াবাড়ি রকমের বেশি বলেই মনে হয়।

ভারতে গ্যাস বিক্রির গপ্পোটা আরও চিত্তাকর্ষক। গল্পের শুরু বিদেশী এক প্রচার মাধ্যমের একটি খবরের সূত্র ধরে। তারাই প্রথম প্রচার করেছিল যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভারতে গ্যাস বিক্রির চুক্তি করে এসেছেন। ঘণ্টাখানেক পরে তারা অবশ্য তাদের খবরটি প্রত্যাহার করে নেয়, কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। এমনকি বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রাণও হারিয়েছেন এক শিক্ষার্থী। বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ বিদেশ থেকে এলপিজি. আমদানি করছে ট্যাংকারে ভরে। দেশে একাধিক বেসরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে সেগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণ করে মেটানো হচ্ছে দেশের চাহিদা। আপনি, আমি, আমরা অনেকেই আমাদের রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহার করছি এই এলপিজি। দেশের চাহিদা পূরণ করে বাড়তি এলপিজি ত্রিপুরায় রপ্তানি করায় দোষের যে কি তা হাজার চিন্তায়ও আমার মাথায় ঢোকেনি। আমিতো বরং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাদের রপ্তানি বাস্কেটে একটি নতুন পণ্য সংযোজনের জন্য। আর যারা অর্বাচীনের মত এর বিরোধিতায় মেতেছেন, আমারতো ভয় হয় কোনোদিন তারা হয়তো আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টস রপ্তানির বিরুদ্ধেও কথা বলবেন। কারণ আমরাতো থান কাপড় আমদানি করে, এদেশে স্টিচিং শেষে বিদেশে রপ্তানি করে বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার আয় করছি। আর এইসব বোদ্ধাদের জ্ঞাতার্থে বোধ করি এটাও জানানো জরুরি যে ভারত থেকে প্রতিদিন ভারতীয় গ্যাস পুড়িয়ে উৎপাদিত ১৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত যোগ হচ্ছে আমাদের জাতীয় গ্রিডে। আমরা যখন অন্যের তেলে কৈ ভাজছি, তখন আমাদের বোদ্ধারা কেন বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করে চলেছেন তা বুঝতে বোধ করি কারো বাকি নেই।

সবশেষে রাডার তত্ত্ব। বলা হচ্ছে, ভারতীয় সহায়তায় যে রাডারগুলো কেনা হবে তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে ভারতীয়দের হাতে। এটি সর্বৈব মিথ্যা। রাডার নিয়ন্ত্রণ করবে আমাদের কোস্টগার্ড, সমুদ্র বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের নতুন বিশাল জলসীমায় নজরদারির কাজে। যারা এসব বানোয়াট তথ্য বাজারে ছাড়েন তাদের উদ্দেশ্যতো পরিষ্কার, কিন্তু যারা এসব বিশ্বাস করেন তাদের কি ধারণা আমাদের সাবমেরিন দুটো চালায় চীনারা আর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ আছে নাসার নিয়ন্ত্রণে? যদি সেরকমই বিশ্বাস করেন তাহলে তারা এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন না কেন সেটাও আমার কাছে পরিষ্কার না।

আসলে ভারত-বাংলাদেশের সর্বশেষ চুক্তিগুলো বাংলাদেশের আরেকটি অনন্য কূটনৈতিক বিজয় ছাড়া আর কিছু নয়। আর এমন বিজয় আমরা দেখেছি দফায়-দফায় এই সরকারের জমানায়। দেখেছি যখন আমরা বিনাযুদ্ধে করেছি সমুদ্র জয় কিংবা ভারত-বাংলাদেশ স্থল বিনিময় চুক্তিতে, যেখানে ভারতের ভৌগলিক আয়তন কমেছে আর বেড়েছে আমাদেরটা। একটু যদি মন দিয়ে ভাবেন, দেখবেন- সিরিয়া থেকে আরাকান কিংবা লিবিয়া থেকে ভেনেজুয়েলা, পৃথিবীতে দেশে-দেশে যত হানাহানি তার মূলে ‘জ্বালানী’, আর আগামীর পৃথিবীতে সব সংঘাতের উৎস হবে ‘পানি’।

আজকের উদীয়মান আর আগামী পৃথিবীর অর্থনৈতিক পরাশক্তি বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে আজ এবং আগামীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর সিমবায়োটিক গ্রোথ নিশ্চিত করার মূলই হচ্ছে জ্বালানী আর পানির ক্ষেত্রে সংঘাত নয়। বরং সহযোগিতা। আর কেউ বিষয়টা বুঝুক বা না-ই বুঝুক, এটি যথার্থই অনুধাবন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তার কাছে বাংলাদেশ আর ইদানিং বিশ্বের প্রত্যাশাটাও এমনই। আমাদের সৌভাগ্য আমরা একজন বঙ্গবন্ধুকে হারালেও একজন শেখ হাসিনাকে পেয়েছি। অতএব আপনার, আমার এবং আমাদের অনাগত আগামীর স্বার্থেই আমাদের উচিত ক্ষুদ্র ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে তার হাতকে শক্তিশালী করা। কেউ এসে বলল ‘উঠ ছুড়ি তোর বিয়ে’ আর আমরা সাথে সাথে তিনটা লাফ দিলাম এমনটা অন্তত আমাদের কাছে প্রত্যাশিত নয়।

লেখক : অধ্যাপক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও উপদেষ্টা রেডটাইমস ডটকমডটবিডি

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১১৩ বার

Share Button

Calendar

November 2019
S M T W T F S
« Oct    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930