» বাংলা গানের চিরঞ্জীব স্রষ্টা পুলক বন্দোপাধ্যায়

প্রকাশিত: ১৫. সেপ্টেম্বর. ২০১৯ | রবিবার

সুমন দেঃ নামে পুলক। কাজেও পুলক। শ্রোতাদের আনন্দ দেওয়ার ভার তুলে নিয়েছিলেন নিজের কাঁধে। বাংলা গানের স্বর্ণযুগের ঔজ্জ্বল্য বেড়েছিল তাঁর মতো কিছু দক্ষ মণিকারের নৈপুণ্যে। হ্যাঁ তিনি পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় । ছোট বেলা থেকেই কবিতা লেখতেন পুলক । তবে সেটা কবিতা নাকি গান কেউ জানত না । তখন তিনি ক্লাস ফাইভ/সিক্সে পড়েন, সেরকম একটি লেখে পোস্টে পাঠালেন আনন্দমেলায়, ছাপাও হল, আর বিনিময়ে মানিওর্ডারে পেলেন ৫ টাকা । সেই থেকে অরো বেড়ে গেলো লেখা লেখি পুলক বাবুর । তিনি যখন ক্লাস টেনে পড়েরন অভিমান ছবির জন্য তিনি গান লিখ লেন । ছবির মিউজিক ডাইরেক্টর বম্বে টকিজের বিখ্যাত আর সি পাল (রামচন্দ্র পাল) । গানগুলো পোস্টে পাঠিয়ে ছিলেন পুলক বাবু । আর সি পাল কলকাতায় এসে গীতিকার কে দেখে ঘাবড়ে গেলেন, ভাবলেন এই বাচ্চা ছেলেটা গান লেখতেই পারেনা। অন্যের গান নিজের বলে হয়ত চালিয়ে দিচ্ছেন । শেষে জায়গায় বসে ছবির সিকুয়েন্স বুঝে গান লেখে স্বসন্মানে পাস করলেন গীতিকারের পরীক্ষা ।

মুহুর্তের মধ্যে সিকুয়েন্স বুঝে গান লেখা ঈম্বরদত্ত প্রতিভা ছিলো তার ।চলে গিয়েছিলেন সবাইকে অবাক করে। এতটাই আচমকা এসেছিল তাঁর আত্মহননের দুঃসংবাদ । জন্ম ২ মে ১৯৩৪, মৃত্যু ৭ সেপ্টম্বর ১৯৯৯। আমাদের সমাজে কি তা পায় আধুনিক গানের কোনও গীতিকার ? গান বিখ্যাত হলে সবাই পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে শিল্পী আর সুরকারের স্তুতিতে । সাফল্যের আর এক কারিগর গীতিকার যেন থেকে যান কিছুটা অলক্ষেই, প্রচারের আলোর অন্তরালে । এমনকী ক্যাসেট সিডি-র কভারেও তাঁরা প্রায়শই অনুল্লেখিত । সেরকম কোনও অভিমান কি লুকিয়ে ছিল পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হৃদয়ের গহিন গাঙে ? কেন ৬৪ বছর বয়সে ১৯৯৯-এর ৭ সেপ্টেম্বর তিনি গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হলেন ? আজীবন নায়ক নায়িকাদের ঠোঁটে গানের কথা বসালেন যিনি, তাঁর মনের অভিমান কেউ বুঝতে পারল না ? ৮৭ তম জন্মবার্ষিকীও চলে গেল সবার অগোচরেই । তাঁর বহু কথায় যিনি কণ্ঠদান করে অমর করে গেছেন সে-ই মান্না দে-এর জন্মদিন ঠিক আগের দিন, ১ মে । সেদিনটা কিন্তু অনুরাগীদের বিস্মৃত হয়নি। তবে গীতিকারের বেলায় রসিকজনদের এরকম বিমাতৃসুলভ আচরণ কেন ?যেমন লিখেছেন ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না, সেদিন নিশিথে বরিষণ শেষে, ও আমার চন্দ্রমল্লিকা, তেমনই সাজিয়েছেন কে প্রথম কাছে এসেছে-এর মতো কালজয়ী গান। চিরায়ত সাবেক থেকে নতুন পরীক্ষামূলক ।

সব দিকেই ছিল তাঁর অনায়াস গতি ।তাঁর মধ্যে লুকিয়ে ছিল একটি রসিক মন । মাঝে মাঝেই উঁকি দিত কলমে। প্রথম কদম ফুল ছবির আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না, বা বসন্ত বিলাপ ছবির লেগেছে লেগেছে আগুন তাঁর রসবোধেরই পরিচয় ।আবার এই বহুমুখী প্রতিভার সৃষ্টি কালজয়ী হয়ে আছে কতদিন পরে এলে একটু বোসো, সেদিন তোমায় দেখেছিলাম, ওগো কাজলনয়না হরিণী-র মতো গানে। তাঁর কথার সঙ্গে যুগলবন্দি হয়েছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অবিনশ্বর কণ্ঠের। মান্না দে-এর জাদু কন্ঠে কালজয়ী হয়ে আছে সেই তো আবার কাছে এলে, ও ললিতা ওকে আজ চলে যেতে বল না, জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই, আবার হবে তো দেখা, কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায়-এর মতো যুগোত্তীর্ণ গান। কে ভুলতে পারে শ্যামল মিত্রর গলায় আমি তোমার কাছেই ফিরে আসব ! শুধু গায়করাই নন। তাঁর শব্দমালা থেকে বঞ্চিত হননি গায়িকারাও। লতা মঙ্গেশকরের কিন্নরকণ্ঠে আজ মন চেয়েছে, আশা ভোঁসলের মাদকতাপূর্ণ জাদুতে দ্বীপ জ্বেলে ওই তারা, একের পর এক রত্নরাজি পেয়েছে বাংলা সঙ্গীত মহল । গীতা দত্ত, সতীনাথ মুখার্জি, আরতি মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকা, অরুন্ধতী হোম চৌধুরী, হৈমন্তী শুক্লা—কার কণ্ঠে নেই পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা !

১৯৩১-এর ২ মে। হাওড়ার এক সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে। শিল্প নাটক সাহিত্য, সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখায় তাঁর পরিবারের ছিল অবাধ বিচরণ । স্কটিশ চার্চ কলেজের গানপাগল ছেলেটা কলম ধরেছিলেন মূলত ছবির জন্য । পাশাপাশি ছিল অজস্র আধুনিক গান, পুজোর রেকর্ড । পরিচালক, চিত্রনাট্যকারদের বিশেষ পছন্দের ছিলেন তিনি । ছবির গতি, মুড অনুযায়ী মনের মতো গান লেখা ছিল শুধু মুখ থেকে কথা খসার অপেক্ষা। হাওড়া এলাকায় জন্মগ্রহণকারী প্রথিতযশা ভারতীয় বাঙালি সুরকার ও গীতিকার ছিলেন । এছাড়াও, বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম ছিল । তাঁর শৈশবকাল কাটে হাওড়ায়। সেখানেই তিনি বড় হন। তাঁর পরিবার শিল্পধর্মী কর্মকাণ্ডের সাথে নিবীড় সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। নাটক, সাহিত্য ও সঙ্গীতকলায় আত্মিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন তিনি। কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন। ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্র জগতে সঙ্গীতের সুরমূর্ছনায় সমৃদ্ধি আনয়ণে স্বকীয় ভূমিকা রাখেন । হেমন্ত, মান্না দে, গীতা দত্ত, লতা, আশা, হৈমন্তী, শ্যামল, ভূপেন, প্রতিমা, উৎপলা, অরুন্ধতী, সতীনাথ, অনুপ, আরতী মুখোপাধ্যায়সহ অনেক জ্ঞানী-গুণী শিল্পী তাঁর সুরোরোপে গান গেয়েছেন ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শঙ্খবেলা’ চলচ্চিত্রে তাঁর সুরোরোপিত গান আজও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। লতা ও মান্নাদে’র দ্বৈত গান ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ এবং লতা’র কণ্ঠে ‘আজ মন চেয়েছে’ চলচ্চিত্রটিকে ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়। এছাড়াও, ১৯৬৯ সালের ‘প্রথম কদম ফুল’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘আমি শ্রী শ্রী ভজ হরি মান্না’ গান রচনা করেন।

৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৯ তারিখে তাঁর দেহাবসান ঘটে। হুগলী নদীতে লঞ্চ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।তবু কি তিনি যথার্থ সম্মান পেয়েছেন ? এ বছর তাঁর ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিলো, কেউ স্মরণ করেনি সে দিনটা…

এতো রাগ নয়
এ যে অভিমান
এ শুধু তোমায় চাওয়ার
আরো বেশী কাছে পাওয়ার
ছল ভরা গান
এ যে অভিমান।
জানো না কি আকাশ নিজেই
সাধ করে চায় মেঘের কালো
যাতে ঐ পুরোনো চাঁদ নতুন করে লাগে ভালো
অভিমান এমনি করেই অনেক বেশী
আরো অনেক বেশী বাড়ায় মনের টান
এতো রাগ নয়
এ যে অভিমান।মাঝে মাঝে মন্দ হলেও মন্দ কি
কাঁটা না বিঁধিয়ে হাতে
তুললে গোলাপ আনন্দ কি
মাঝে মাঝে মন্দ হলেও মন্দ কি
আসলে একটু করেই বেসুরো গাই মাঝে মাঝে
যাতে ঐ একটানা সুর সুর নতুন করে বুকে বাজে
বিরহের জ্বালার পরেই মধুর লাগে
বড় মধুর লাগে মিলন সুধা পান
এতো রাগ নয়
এ যে অভিমান।

তথ্য সুত্র: উইকেন্ড ক্লাসিক বাংলা রেডিও, উইকি এবং অনলাইনে বিভিন্ন সাইট হতে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২০১ বার

Share Button

Calendar

November 2019
S M T W T F S
« Oct    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930