» বাবার নাম

প্রকাশিত: ৩০. অক্টোবর. ২০১৮ | মঙ্গলবার

শেলী সেনগুপ্তা
গ্রামের সবাই কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। কেউ জোরে কথা বলে না। শিশুরাও শব্দ করে কাঁদতে ভুলে গেছে। বাড়ির চালে বসে কাক ডাকছে, তাও বেশ সতর্কস্বরে যেন অন্য কেউ শুনতে না পায়। গ্রামের একপাশে হরিহর মাষ্টারের বাড়ি। আশেপাশে আরো কিছু হিন্দু বাড়ি আছে, তবে ওদের বাড়িটায় একেবারে শেষ প্রান্তে। হরিহর মাষ্টারের বাড়ির পাশেই একটা বাঁশঝাড় আছে, ওটা ছাড়িয়ে গেলে হামিদ মাতব্বরের বাড়ি। দু’বাড়ির সীমানায় একটা টিউব অয়েল আছে। দু’বাড়ির খাওয়ার জলের যোগান হয় ওখান থেকেই।
হরিহর মাষ্টারের বড় ছেলে রাহুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। একরাতে গ্রামে ফিরে এসেছে, সাথে দুই বন্ধু। ঢাকায় নাকি প্রচন্ড গোলাগুলি হয়েছে। প্রচুর লোককে হত্যা করা হয়েছে। ওরা কোন রকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে। দু’দিন বাড়িতে ছিলো। এর মধ্যে রাহুলকে কেউ হাসতে দেখেনি। কি যেন ভাবছিলো শুধু,আর সারাক্ষণ কি এক প্রতীজ্ঞায় হাতের আঙ্গুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছিলো। দু’দিন বাড়িতে থেকে কোথায় যেন চলে গেলো।
এখন গ্রামের সবাই কেমন যেন কানাঘুষা করে, নিজেরা যার যার মতো করে কথা বলে, একে অন্যের দিকে সন্দেহের চোখে দেখে। হরিহর মাষ্টার এখনো স্কুলে যায়, শূন্য স্কুলে কিছুক্ষণ বসে , সবক’টা ক্লাসরুম ঘুরে ঘুরে দেখে তালা দিয়ে ফিরে আসে। রাজন দফতরী এখন আর স্কুলে আসে না, একদিন খবর নিতে গিয়ে বাড়িতে তালা ঝুলছে সবাই বললো, একরাতে কাউকে কিছু না বলে কোথায় যেন চলে গেছে।
হরিহর মাষ্টারের দুই ছেলে দুই মেয়ে , বড় ছেলে রাহুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, মেয়ে মালতি গ্রামের কলেজে ভর্তি হয়েছে , ছোট মেয়ে অদিতি মেয়ে ক্লাস নাইনে , আর ছোট ছেলে নেহাল এইটে পড়ে। ওদের মা মারা গেছে বেশ কয়েক বছর আগে। মালতিই এখন সংসার সামলাচ্ছে।
আজকাল প্রায় শোনা যাচ্ছে, গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা আনাগোনার কথা। ওরা মিলিটারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চায়। হরিহর মাষ্টার তটস্থ হয়ে থাকে ছেলে মেয়েদের জন্য, নেহাল আর অদিতি স্কুলে যাচ্ছে না। বাবার কাছে বসে ইংরেজি গ্রামার শিখছে। মালতি ছোটবেলা থেকে একটু চুপচাপ, এখন যে আরো নীরব হয়ে গেছে। নিঃশব্দে চলাফেরা করে, কখন কোথায় থাকে বোঝা যায় না।
হামিদ মাতব্বরের ছেলে রমজানকে বখাটে বললে কম বল হবে, সে এখন মালতিদের বাড়ির আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়, হঠাত করে শিস দিয়ে ওঠে, যখন মন চায় গানের দু’এক কলি গেয়ে ওঠে। মাঝে একবার হরিহর মাষ্টার বাইরে এসে জানতে চেয়েছিলো, এ বাড়িতে কোন কাজ আছে কিনা? চোখের ওপর চোখ রেখে জানতে চেয়েছিলো, ‘রাহুল এখন কোথায়?’ মালতি দ্রুত হরিহর মাষ্টারকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলো, তারপর কলসী নিয়ে টিউব ওয়েল থেকে জল আনতে চলে গেলো। অনেক্ষণ যখন ফিরে এলো তখন মেয়েটা একদম বিপর্যস্ত, ওর অপর দিয়ে যেন বিশাল ঝড় বয়ে গেছে। কলসীটা নিয়েই বাড়ির পেছনের পুকুরে নেমে ডুবের পর ডুব দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষুধায় কাতর নেহাল বারবার ডেকে পুকুর থেকে তুললো। তারপর থেকে আর কখনো হামিদ মাতব্বরের ছেলেটা আর বাড়ির আশেপাশে আসেনি, মাঝে মাঝে টিউব ওয়েলের পাশে দাঁড়িয়ে মালতিদের পুকুরে ঢিল ছোঁড়ে। মালতি তখন জল আনতে যায়।
গ্রামে রীতিমত অরাজকতা চলছে। প্রায় সকালেই ঘুম ভেঙ্গে কোন কোন হিন্দু বাড়ি জনশূন্য দেখা যায়, পোষা কুকুর বাড়ির আশেপাশে কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়ে খাবারের সন্ধানে অন্য কোথাও চলে যায়। অনেক দিন পর পর আবার এসে দেখে যায় প্রভু ফিরেছে কিনা। হরিহর মাষ্টার বুঝতে পারছে না কি করবে, রাহুলের কোন খবর নেই, কেউ কেউ বলছে সে মুক্তিযুদ্ধে গেছে, মালতি একেবারেই পাথর হয়ে গেছে। এর মধ্যে হামিদ মতব্বরের ছেলে এসে বলে গেছে ভিটেমাটি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই, এখানে নিরাপত্তার অভাব হবে না। মালতি তখন ভাবলেশহীন।
মাঝে মাঝে গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে মিলিটারি জিপ যায়, কখনো মিলিটারিরা গাড়ি থেকে নেমে কোনকোন বাড়িতে হামলা করে, মেয়েদের তুলে নিয়ে যায়, কাউকে বাড়ির লোকের সামনে ধর্ষণ করে বয়েনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারে। বাড়িতে আগুন দিয়ে চলে যায়। মালতি তখন অদিতি আর নেহালকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে থাকে। ওরা বলে,
ঃ দিদি, ভয় করছে।
মালতি সান্ত্বনা দেয়,
ঃ কিচ্ছু হবে না, আমি থাকতে তোদের কিচ্ছু হবে না।
গ্রামটা হিন্দুশূন্য হয়ে গেলো। কতকাল শেষ পরিবারটা চলে গেলো, যাওয়ার সময় বিনোদ রায় হরিহর মাষ্টারের সাথে দেখা করে গেছে, বলেছে,
ঃ মাষ্টার, এখনো কেন বসে আছো?
ঃ কি করবো?কোথায় যাবো?
ঃ যেখানে ইচ্ছে চলে যাও, সোমত্ত মেয়ে নিয়ে অজগরের মুখের কাছে কোন সাহসে বসবাস করছো?
ঃ রমজান যে বলে গেলো, কোন সমস্যা হবে না, সে আমাদের দেখে রাখবে।
ঃ জানি না তুমি কি ভাল বুঝছো, তবে কাজটা ভাল হচ্ছে না। এটা তো বেড়ালের মাছ পাহারা দেয়া হয়ে গেলো।
বিনোদ রায় চলে গেলো। ওদের যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে মালতির বুক কাঁপিয়ে নিশ্বাস বের হলো। হরিহর মাষ্টার চমকে উঠলো ওর নিশ্বাসের শব্দে। ক্লান্ত পায়ে মালতি রান্নাঘরে চলে গেলো। মেয়েটা যেন কেমন হয়ে গেছে, কথা বলে না। প্রায় রাতেই ওর ফুঁফিয়ে কাঁদার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়, জিজ্ঞেস করলে কিছু বলে না, ওর কান্নার শব্দ শুনতে শুনতে আবার ওরা ঘুমিয়ে পরে।

হরিহর মাষ্টার রেডিওটা কানের কাছে নিয়ে বসে থাকে সারাদিন। স্বাধীন বাংলা বেতার শোনে। আজকাল আর রমজানকে দেখা যায় না। কোথায় যেন চলে গেছে। হামিদ মাতব্বর এখন মাঝে মাঝে হরিহর মাষ্টারের সাথে কথা বলতে আসে। বলে, তারা নাকি দেশ স্বাধীন হওয়ার অপেক্ষায় আছে। সে নাকি শেখ মুজিবের জন্য কোরান খতম দিয়েছে। হরিহর মাষ্টার দ্বন্দ্বের মধ্যে পরে যায়, সারাজীবন জানতো হামিদ মাতব্বর মুসলিম লীগ করে, হঠাত করে কিভাবে আওয়ামী লীগ করার কথা বলে?
ভাবতে ভাবতে মাথা ধরে যায়, তখন ভাবনার হাল ছেড়ে দেয়।
দেখতে দেখতে বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। একদিন শোনে দেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে। গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। ওরা এখন প্রকাশ্যে হেঁটে বেড়ায়, খুব ইচ্ছে করে রাহুলের খোঁজ নিতে, কি শুনবে, তাই কাউকে জিজ্ঞেস করে না।

একদিন দেশ স্বাধীন হলো। সবাই খুব খুশি। কিছুক্ষণ পর পর জয়বাংলা শ্লোগান হচ্ছে। অদিতি , নেহাল উঠোনে নেমে আনন্দ করছে। পাড়ার ছেলেরা কোথা থেকে যেন লাল সবুজ পতাকা যোগার করে এনেছে। সারা গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু মালতি চুপচাপ বসে আছে ঘরে কোনে। হামিদ মাতব্বরের বাড়ির মেয়ে মহলে কানাঘুষা চলছে, মালতির পেটা বাচ্চা। কথাটা হরিহর মাষ্টারের কানে এলো। স্তব্ধ হয়ে বসে আছে সকাল থেকে। বুঝতে পারছে না কি করবে। মালতি কিছুই বলছে না। শুকনো চোখে দুরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাত হামিদ মাতব্বরের বউ এসে দরজায় দাঁড়ালো,
ঃ হ্যারে মালতি, মিলিটারিরা যে তোর ইজ্জত লুটেছে আমাদের বলিস নি কেন?
মালতি চমকে উঠে। মহিলা আঙ্গুলের চুন দাঁতে লাগিয়ে বলে,
ঃ শোন, তোর তো আর এখানে থাকার দরকার নেই, তুই থাকলে অদিতির বিয়ে হবে না। শুনলাম শহরে তোদের মতো মেয়েদের জন্য একটা আশ্রয়কেন্দ্র করেছে সেখানে চলে যা। গ্রামের মান ইজ্জততো বাঁচবে।
পাশে দাঁড়ানো ছিলো হামিদ মাতব্বরের ছোট ভাই এর বঊ,
ঃ পারলে পেটের বাচ্চাটা খসাইয়া ফেল, এইটা তো পাপ।

মালতি গ্রাম ছেড়ে বের হয়ে পড়েছে। অদিতি, নেহাল আর বাবার জন্য নিজের পরিচয়কে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। রমজান কথা রেখেছে, প্রতিদিন ওকে খুঁবলে খেলেও অদিতি আর নেহালের কিছু হয় নি। আপনভোলা বাবাতো বেঁচে আছে। মালতি যুদ্ধে জিতে গেছে, হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে, ক্লান্তিতে পা ভারি হয়ে আছে। কিন্তু থামলে তো চলবে না , সামনে আরেকটা যুদ্ধ আছে। এবারের যুদ্ধটা ওকে একাই করতে হবে।
এলোমেলো পায়ে হাঁটছে , মনে হচ্ছে আরেক কদম দিলে পড়ে যাবে। একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো, এখানে নির্যাতিতা মেয়েদের নাম লিষ্ট করা হচ্ছে। আশ্রয় দেয়া হচ্ছে। মালতি পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ঠোঁটদু’টি শক্ত করে মুড়ে রেখেছে। কিছুতেই বাবার নাম বলবে না। অদিতির বিয়ে হতে হবে, নেহালের সামনে এখনো সারাজীবন পড়ে আছে। বাবাকে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে সবাই একনামে চেনে।
টেবিলের সামনে ক্লান্ত কিন্তু মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো মালতিকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পরও বাবার নাম বললো না।
তখনই পেছন থেকে একজন জানতে চাইলো,
ঃ মা, তোমার নাম কী?
ঃ মালতিরানী,
ঃ বেশ।
হাতে কার্ড নিয়ে মালতি বাড়ির ভেতর যাচ্ছে। তাতে লেখা –
‘ মালতি রানী’
পিতাঃ শেখ মুজিবুর রহমান
ঠিকানাঃ বাংলাদেশ ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৫০ বার

Share Button

Calendar

December 2018
S M T W T F S
« Nov    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031