বিদেশে দেশি অনুষ্ঠান শিল্পীদের মূল্যায়ন

প্রকাশিত: ২:২০ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯

বিদেশে দেশি অনুষ্ঠান শিল্পীদের মূল্যায়ন


রোকসানা লেইস

গীতবিতান ছূঁয়ে বলছি, পড়তে গিয়ে এক জায়গায় যখন পড়লাম, সমরেশ মজুমদার এবং কবির সুমনকে হেটেলের সামনে এয়ারপোর্ট থেকে যিনি নিয়ে এসেছেন তিনি, গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার পর, প্রায় দুই তিন ঘন্টা তারা হোটেলের দরজায়, কেউ এসে তাদের নিয়ে যাবে এই অপেক্ষায় কাটিয়ে দিলেন। এক পর্যায়ে সুমন খিস্তি খেউর শুরু করার পর অনুষ্ঠানের লোকের কানে পৌঁছাল তারা অপেক্ষা করছেন।
এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে যা দেখেছি, শুনেছি। শিল্পী লেখকদের বিদেশে ডেকে এনে এভাবে মূল্যায়ন করেন অনেকে। কিন্তু এমন ঘটনা সমরেশ মজুদার বা কবীর সুমনের বেলাও ঘটেছে ভাবতেই খারাপ লাগছে ভীষণ।

একজন গানের নামী শিল্পীকে অনুষ্ঠান শেষে নামাতে গিয়েছিলাম উনার আমন্ত্রণকারীর বাসায়। অনুষ্ঠান শেষে সেই শিল্পীকে বেঁচে দিয়েছিলেন, শহরের কিছু উঠতি টাকাওলার কাছে আমন্ত্রণকারী। যারা উনাকে শীতরাতে নায়েগ্রা দেখানোর জন্য অস্থির ছিল। কিন্তু তিনি আমার গাড়িতে উঠে, আমাদের কজনকে অবলম্বন করে নিজেকে নারী খেকোদের থেকে রক্ষা করেছিলেন।
কিন্তু যখন উনাকে আমন্ত্রণকারীর বাড়িতে নামাতে গেলাম তিনি দরজা খুলে দিলেন না অনেকক্ষন। শীত বরফের মাঝে স্যান্ডেল পায়ে, শাড়ি পরে সে শিল্পী বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি করলেন অনেকক্ষণ। মাঝে মাঝে আমার গাড়িতে বসে হিটারে গরম হয়ে আবার দরজা নক করছিলেন। আমি উনাকে রেখে আসতে পারছিলম না। রাগ হয়ে বলছিলাম, আমার বাসায় থাকবেন চলেন।
শিল্পী কি অসহায় ভাবে ভাই ভাই দরজা খুলেন বলে করুণ আর্তনাদ করছিলেন। তিনি অসহায় ছিলেন। ঘরের ভিতর উনার ব্যাগ পাসপোর্ট যাবতীয় জিনিস রয়েছে তাই ঝগড়া নয় মিনতি করে তিনি ভিতরে ঢুকার কৌশল নিয়েছিলেন। এক সময় দরজা খুলে, এতরাতে তার বাসায় শব্দ করার জন্য পুলিশ ডাকার হুমকি দিয়ে ঘরে ঢুকতে দিলেন অবশেষে।
পরে শুনেছি আমন্ত্রণকারীর স্ত্রী দরজা খুলে দিতে চাইলে তাকে আটকে রেখেছিল লোকটা।
এমন সব লোকজন এ শহরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। একজন শিল্পীর কোন মূল্য এদের কাছে নেই। লোক দেখানো অনুষ্ঠান করে নিজের নানারকম উদ্দেশ্য হাসিল করে।
এরা নিজেদের আবার শিক্ষিত বলে। সমাজে বেশ নাম নিয়ে অবস্থান করে অনেক লোকজন এদের পিছনে ঘুরঘুর করে। এসব লোকজনের অনুষ্ঠান আমাকে আর টানে না। বিদেশে ঘুরে গেছেন এমন শিল্পীদের সাথে কথা বললে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হননি, তেমন কাউকে পাওয়া মুসকিল হবে। বিদেশের বড় বড় শহর গুলোর চেনা চিত্র।

দেশ থেকে শিল্পী এনে কেন বড় বড় অনুষ্ঠান করতে হয় বিদেশে। শিল্পীরাও বুঝতে পারেন না আবহাওয়া। বিদেশের আমন্ত্রন পেয়ে গদগদ হয়ে যান উৎসাহে। কার আমন্ত্রেনে কোথায় যাচ্ছেন, কোথায় থাকবেন কি ব্যবহার পাবেন এসব বিষয়ে ভাবেন না। পাছে যদি আমন্ত্রন বাতিল হয়ে যায় এই ভয়ে। বিদেশে আসার আগে নিজেদের রাইটস নিয়ে যদি তারা এক বিন্দু ভাবতেন তা হলে অনেক সমস্যা বন্ধ হয়ে যেত। অনেক টাকার কথা বলে আনা হলেও শেষ পর্যন্ত টাকা কড়িও কিছু দেওয়া হয় না অনেক সময়।
সচেতন, শিক্ষিত অনেকেরই নিজস্ব অধিকারের অনেক বিষয় সম্পর্কে ধারনা নাই। তাছাড়া বিদেশ আসার জন্য অনেকে এসব নিয়ে ভাবার কোন কারণ দেখেন না। বিদেশে মানুষ খারাপ আচরণ করতে পারে তা তারা ভাবতেও পারেন না।
এমন নয় যে সব আয়োজন খারাপ । বর্তমানে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে । এক সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লোক আনা এক ধরনের ব্যবসাও ছিল। বর্তমানে তেমন সুযোগ নেই ইমিগ্রেশন সিস্টেম অনেক কঠিন হয়ে যাওয়ার জন্য। তবু যে হচ্ছে না তা নয়।
তবে যে কোন আমন্ত্রিত শিল্পীর, বিদেশে যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয়ে ভালো করে জেনে নিয়ে তবেই বাইরে পা বাড়ানো উচিত বলে মনে করি।
কোথায় থাকবেন। কারো বাড়িতে না হয়ে হোটেলে রাখলে ভালো। সেই বুকিং নিজের নামে দেখে নেওয়া। অনুষ্ঠানে আসা যাওয়ার জন্য উবার বা ট্যাক্সির ব্যবস্থা।
কি পরিমান টাকা পাবেন তা আগেই অর্ধেক হলেও নিয়ে নেয়া।
সম্পর্কটা শিল্পী এবং আয়োজকের মধ্যে রাখাই ভালো।
তবে বাঙালিরা হোটেলে থাকতে পছন্দ করেন না। অন্যের ঘাড়ে চেপে চলতে পছন্দ করেন। নিজে কিছুই করতে চান না। অচেনা এই ভয়ে। অথচ নিজেই চলা যায় বাসে ট্রেনে চড়ে, কম খরছে। সেই সাহসটুকু থাকলেই হয়। কারো উপর নির্ভর না করে নিজের দায়িত্বে অনুষ্ঠান করে দিয়ে চলে যেতে পারেন।
থাকা খাওয়ার খরচসহ নিজের মতন চলতে পারলে অনেক সমস্যা কখন গাড়ি আসবে এমন অপেক্ষার সময় নষ্ট হবে না।
যে দেশে যাচ্ছেন সে দেশ সম্পর্কে কিছুটা ধারনা নিয়ে, নিজে চলতে পারার মানসিকতা নিয়ে যদি শিল্পী, লেখক, কবি বিদেশে যান তবে কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে কবে না। বিদেশে যাচ্ছি এই আবেগে উদ্বেলিত না হয়ে, বিদেশে আসার আগে কেন আপনাকে আমন্ত্রন করা হলো। আপনি বিদেশে যাওয়া ছাড়া আর কি পাবেন। এই বিষয়ে ভেবে নিন। পরিস্কার কথা বলে নিন। অর্থ কড়ি না পেলেও একজন আমন্ত্রিত অতিথির মূল্যায়ন টুকু যেন পান সে বিষয়টা ঠিকঠাক করে নিন প্লেনে চড়ার আগে।
আপনার শিল্পকে আপনি যদি মূল্যায়ন না করেন তবে অন্যরা মূল্যায়ন করবে কেন। কাজেই নিজের আত্মসচেতনতা তৈরি করে অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকুন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com