» বিপ্রতীপ সময়ে আমাদের প্রত্যাশা

প্রকাশিত: ২১. মে. ২০২০ | বৃহস্পতিবার


সুহেলী সায়লা আহমদ
সময়টা বিপ্রতীপ। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে নভেল করোনা ভাইরাস। বদলে গিয়েছে আমাদের জীবন-যাপন পদ্ধতি। আর অর্থনৈতিক, সামাজিক , সাংস্কৃতিক চিন্তা -চেতনায়ও যেন পাল্লা দিয়ে নতুনরূপে আবির্ভূত হচ্ছে।
করোনা ভাইরাসের আক্রমন কবে শেষ হবে আমরা জানি না। তবে এটা সুস্পষ্ট যে আমাদের চিন্তা চেতনা আর জীবনবোধে এসেছে পরিবর্তন। করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় শীর্ষ স্থানীয় অর্থনীতিগুলো যেমন হিমশিম খাচ্ছে তেমনি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামোর দেশগুলো যেন আরো নাজুক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশে দেশে লকডাউন চলছে। অনেকাংশে থেমে আছে জীবনের চাকা। ঘরবন্দি মানুষের দীর্ঘশ্বাস প্রলম্বিত হচ্ছে চার দেয়ালের কাব্যে। তবুও আমরা বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখবো। জেগে উঠবো মুক্ত প্রকৃতিতে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেব বলে। তার জন্য সবার আগে দরকার আমাদের সাহসী মনোবল।
এটাই স্বাভাবিক, যে যেকোন দূর্যোগ বা মহামারি মানুষের মনে এক ধরনের চাপ তৈরী করে। সাধারন মানুষের কর্মসংস্থান, বাসস্থান, চিকিৎসাসহ সকল ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তার আবহ তৈরী হয়েছে তা আমাদের মোটেও এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। তাই তৈরী হচ্ছে বা হয়ে গিয়েছে জীবন ও জীবিকার দ্বন্দ¦। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিটি দেশ তার অর্থনীতি নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করছে। করোনা ভাইরাস অর্থনীতির খোলস পরিবর্তনে যেমন ভূমিকা রাখছে তেমনি আমাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে পরিবেশ বান্ধব হবার জন্য। হতে হবে শ্রম বান্ধব।হতে হবে ধরিত্রী বান্ধব।আমাদের হতে হবে স্বাস্থ্য সচেতন। এই স্বাস্থ্য শুধুমাত্র শারীরিক নয় মানসিকও বটে। শারীরিক
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় খেতে হবে প্রয়োজনীয় সুষম খাদ্য। আর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খুলে দেব মনের জানালা।
যত্ন নিতে হবে মনের। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে আমরা আত্মিকভাবে একে অপরকে এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে
অবশ্যই হৃদয়ে আলিঙ্গন করতে পারি। শারীরিকভাবে মেনে চলবো সামাজিক দূরত্ব আর মানসিকভাবে যুক্ত থাকবো সামাজিক অঙ্গনে। র্অথাৎ সমাজের বুননের ধরনের এই পরিবর্তনকে মেনে নেয়ার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে সবার মাঝে।
মানুষ বরাবরই প্রতিকূল পরিবেশে লড়াই করে নিজের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। আপাতত সাহস, ধৈর্য আর দায়িত্বশীলতার সম্মিলন ঘটাতে হবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনাচরণে। উদ্বেগ ও উৎকন্ঠায় কাটিয়ে দিয়েছি আমরা কযেকটি মাস। জীবনজীবিকার অনিশ্চয়তার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে ঘরে থাকার সামাজিক চাপ নিয়ে আমরা কাটিয়ে দিয়েছি অনেকটা সময়। হয়তো আরো অপেক্ষার প্রহর রয়েছে বাকি।
প্রতিদিনের খবরের কাগজ খুলছি ভয়ে ভয়ে না জানি আজ কি শুনতে হয়! তবুও আমরা আশাবাদী। আঁধার কালো রাতের শেষে শিউলি ফোটা ভোর আসবেই। অশুভ শক্তির পরাজয় হবে। পথচেয়ে আছি প্রতিনিয়ত বিজ্ঞান গবেষনার ফলাফল জানতে। এ যেন অনন্ত প্রতীক্ষা শুধুমাত্র করোনামুক্ত পৃথিবীর প্রত্যাশায়। এই
প্রত্যাশা আছে বলেই ঘরে বসেই আমরা শিশুর হাসিতে মাতি, জীবন-সাথীর সাথে প্রেমের জোয়ারে ভাসি, হিংসা , বিদ্বেষ আর পরশ্রীকাতরতাকে ভুলে ভৌগলিক সীমা অতিক্রম করে প্রযুক্তির বদৌলতে প্রিয়জনদের সাথে আত্বিক সংযোগ স্থাপন করি।
পরিবারের মোহমায়া করোনাকালে মায়াজালের মত পরিবারের সদস্যদের আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে , বিপরীতে আমরা কখনো কখনো অসহনশীলতার পরিচয়ও দিচ্ছি লকডাউনের এই কঠিন সময়ে। পারষ্পরিক বোঝাপড়া ও সমঝোতার মাধ্যমে কিন্তু এই মানসিক সংকট কাটিয়ে আমরা ইচ্ছা করলেই এই সুযোগে পারিবারিক মাধুর্যগুলোকে উপভোগ করতে পারি।
ক্ষুদ্র নেতিবাচক মনোভাব পরিত্যাগ করে বরং উপলব্ধি করা যাক কেন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি , শিক্ষা ঐতিহ্য, সম্পদ , ক্ষমতা কোন কিছুই করোনা ভাইরাসকে প্রতিহত করতে পারছেনা । কেন দেশ কাল , জাতি , ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার সাথে সমান আচরণ করছে করোনা?
এই কঠিন করোনাকাল আমাদের স্মরন করিয়ে দিল আমরা “মানুষ”। ধনী , দরিদ্র, জাতি , ধর্ম, সাদা- কালো এগুলো বাহ্যিক আচরণ। ইচ্ছে করলেই তা ঝেড়ে ফেলা সম্ভব। এই অস্থির সময় কেটে গেলে আমরা আরো বেশী মানবিক হবো। কবিগুরুর
ভাষায় বলতে চাই
আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাধঁ অগ্নিরসতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন!
অলক্ষণের তিলক রেখা,
রাতের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দে’রে চমক মেরে,
আছে যারা অর্দ্ধ-চেতন!
*সহকারী অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান),মানবিক বিভাগ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , খুলনা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪৯৭ বার

Share Button

Calendar

August 2020
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031