শিরোনামঃ-


» বিশ্ব অভিবাসী দিবসের আহবান

প্রকাশিত: ১৮. ডিসেম্বর. ২০১৭ | সোমবার

ম ইনামুল হক

বিংশ শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর দেশে দেশে আমরা সমাজতন্ত্রের পতন ও সেসব দেশে স্বৈরাচারের উত্থান দেখতে পেয়েছি। একবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় দেখতে পাচ্ছি গণতন্ত্রের পতন ও স্বৈরাচারের উত্থান। এই সময়ে উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিকভাবে নবায়নযোগ্য সম্পদ নির্বিচারে ধ্বংস চলছে, এবং জেঁকে বসছে প্রতারণামূলক কর্পোরেট সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে সমাজতন্ত্রের যুগে গড়ে ওঠা সমবায় এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোয় গড়ে ওঠা পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলি আকণ্ঠ দুর্নীতিতে পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন শক্তি তাদের পক্ষে মিথ্যা ও সাজানো প্রচারণা চালিয়ে পুরো সমাজকে বিভ্রান্ত করে চলছে। অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলি তাদের সামাজিক দায়িত্বের নামে যা করছে তা নিছক প্রতারণা। এই নষ্ট সংস্কৃতির ফলে কেবল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই নয়, সকল স্তরের মানুষ তাদের পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে। এর ফলে মানুষ হয় দেশ ছাড়ছে, নয় নিজ দেশেই হচ্ছে পরবাসী।

নিজ জন্মভূমির প্রতি হতাশাই মানুষকে দেশছাড়া করছে। একটি যুবক/যুবতী তার জন্মভূমিতে মনোমত কাজের সংস্থান পাচ্ছে না। সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলি দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ায় একজন দক্ষ কর্মী কাজে প্রণোদনা পাচ্ছে না। বাংলাদেশে শিশুদের জন্যে রয়েছে বিপুল ব্যাপ্তির শিক্ষা কার্যক্রম। কিন্তু শিশুরা তাতে সনদ পাচ্ছে, শিক্ষা পাচ্ছে না। সরকারী প্রতিষ্ঠানে যোগ্যরা নয়, অযোগ্যরা কাজ পাচ্ছে। এভাবে সন্তানদেরকে ঠিকমত শিক্ষা না দিতে পেরে ও যোগ্যতামত কাজে লাগাতে না পেরে যুব ও বৃদ্ধ সকলের মধ্যেই উন্নত ও সভ্য দেশে পাড়ি দেবার তীব্র বাসনা কাজ করছে। বর্তমান জীবন ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাই তাদেরকে দেশছাড়া করছে।

বিশ্বের প্রত্যেক দেশেই আছে অভিবাসী, যারা অন্য কোন দেশ থেকে এসে কাজ করছে বা তাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। কিন্তু তারা দেশের মাটিতেও তাদের অবস্থান হারাতে চাচ্ছে না। তারা নিজ দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে যোগান দিচ্ছে। তবে যারা বৈধ- অবৈধ নানাভাবে ধনী, তারা বরং বিদেশে টাকা পাচার করে সেখানে সেকেন্ড হোম করছে। সমাজের এই নতুন ধরণের বিন্যাস গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৃষ্টি করছে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা। সমাজের তরুন তরুনীরা বিদেশজীবনের মন ভুলানো গল্প শুনে প্রতারকদের কথায় অজানার পথে পা বাড়াচ্ছে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঁটাতারের বেড়া পার করছে, মরুভূমি ও সাগরে মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করছে। এভাবেই চলছে অবৈধ ড্রাগ ব্যবসা ও মানব পাচার।

বিশ্বের প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা সুবিধভোগী শ্রেণী সৃষ্টি করছে, যাদের দাপটে সমাজের বঞ্চিত অংশ, এবং সংখ্যাগুরু জাতির চাপে সংখ্যালঘু জাতিগুলি নিষ্পেষিত হচ্ছে। ফলে বাস্তুচ্যুত ও উদ্বাস্তু হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ ও পরিবার। বর্তমান সময়ের এই বৈশ্বিক পরিস্থিতি মানব সভ্যতার অস্তিত্বের প্রতি এবং পরিবেশ প্রতিবেশের প্রতি হুমকি। বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন এর প্রত্যক্ষ ফল। এই জলবায়ু পরিবর্তন মানব সৃষ্ট, যা নির্বিচারে বনসম্পদ আহরণ ও খনিজ উত্তোলন, দূষণকারী শিল্পপণ্য এবং শিল্প বর্জ্যের কারণে দুর্যোগ যেমন বটে; সেই সাথে মানুষের চাহিদা, ভোগ ও অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তা দূর করা সম্ভবও বটে। গ্রীন বিজনেস উদ্যোগ পরিবেশ বান্ধব ও পরিবেশ সম্পর্কিত ব্যাবসা এই সমস্যাগুলি দুর করতে পারে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। আজ বিশ্ব অভিবাসী দিবসে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারছি না যে, এভাবে চলতে থাকলে মানব সভ্যতার ঐতিহ্য ও কৃষ্টি ধংসের মুখে পড়বে।

অতীতের দাস ব্যবসা নতুন মোড়কে ফিরে আসছে; যেখানে দারিদ্রের জালে আবদ্ধ মানুষ জানে না, সে কার হাতে পড়েছে, সে কোথায় যাচ্ছে। বর্তমানে আদম ব্যাবসায়ীরা জনশক্তি রপ্তানির নামে সবচেয়ে বড় ধনী হচ্ছে, ও সরকার কিনে নিচ্ছে। যারা শ্রম বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় বন্দী, তারা জানে না তারা কবে মুক্তি পাবে। এইরুপ ভবিষ্যৎ জেনেও শিক্ষিত কি অশিক্ষিত, পুরুষ ও নারী তার শ্রমশক্তিকে পুঁজি করে অন্ধকারে ঝাঁপ দিচ্ছে। সারা বিশ্বে আমদানী রফতানী একটা স্পষ্ট রুপ নিয়েছে; যেখানে আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় যাচ্ছে শ্রমিক। এরা বৈধভাবে যাওয়া শিক্ষিত ভদ্রলোক হোক, বা অবৈধভাবে যাওয়া আদম ব্যাপারীর পাঠানো মানুষ হোক। এই পথে আগে যেত মেধা ও শিল্পের কাঁচামাল। এখন মেধার স্থান নিয়েছে যন্ত্র। কাঁচামাল এখন উৎসের দেশে থেকেই বিদেশী পুঁজির শিল্পে ব্যবহার হচ্ছে। এর ফলে হচ্ছে বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে। দেশে দেশে বিদেশী পুঁজি আকর্ষণ করার লক্ষ্য কার স্বার্থে? স্থানীয় সম্পদ স্থানীয়ভাবে নিঃশেষ করে যে পণ্য তৈরি হচ্ছে তার নিম্নমানেরটি স্থানীয়দের ভোগের জন্য, উন্নত মানেরটি উন্নত দেশের মানুষের ভোগের জন্য। এই শিল্প উৎপাদন বিদেশী পুঁজিকে দিচ্ছে মুনাফা ও তাদের নাগরিকদের স্বাচ্ছন্দমূলক উন্নত জীবন; স্থানীয় দেশগুলির মানুষকে দিচ্ছে প্রতারণামূলক মজুরী ও দূষিত পরিবেশে নিম্নমানের জীবন।

বিশ্ব ব্যবস্থায় সারা পৃথিবী এখন সত্যিই একটি বিশ্বগ্রাম, যেখানে একটি পাড়ায় আছে, শিল্প, শ্রমিক, দূষণ, ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রকৃতি আর অন্য পাড়ায় আছে সুদৃশ্য ঘরবাড়ী ও অবিকৃত প্রাকৃতিক পরিবেশ। এই পৃথিবীতে যে দূষণ হচ্ছে তা নিবারণের কোন বাস্তব পদক্ষেপ নেই; নবায়নযোগ্য মিঠা পানি ও প্রাকৃতিক বন রক্ষার ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেই। সবাই জীবাশ্ম জ্বালানী নিঃশেষ করতে ব্যস্ত। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ শেষ হতে হতে মানুষ অভিযোজনের মাধ্যমে যে জীবনের দিকে যাবে তা কল্পনা করা যায় না। ইতিমধ্যে বিশ্ব ঋণসর্বস্ব কর্পোরেট অর্থনীতির খপ্পরে পড়ে অর্থসম্পদের নিয়ন্ত্রণ ১% মানুষের হাতে গিয়ে ৯৯% মানুষ প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে। সারা বিশ্বের সকল দেশ ক্রমবর্ধমান ঘাটতি অর্থনীতির দিকে ছুটছে (বিশ্ব ৬৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশী)। তাই আমরা কেবল উদ্বেগ প্রকাশই নয়, মানব সভ্যতার অধঃগতির এই ধারার মোড় ঘুরিয়ে দেবার জন্যে সারা বিশ্বের ব্যবসা ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন চাচ্ছি।

আমরা প্রতারণামুলক ব্যবসা দূর করতে পণ্যের প্রকাশ্য ও মিডিয়া প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব করছি। কোন ক্ষেত্রেই কোন প্রতিযোগিতামূলক প্রচারণা চলবে না।. আমরা সমবায় ও ব্যাঙ্ক আইনের পরিবর্তন একে দখল করে রাখার দুর্নীতির গোড়া উপড়ে দিতে চাই। খেলাপি ঋণ মউকুফ, জাল সম্পত্তির বিপরীতে ঋণ প্রদান ইত্যাদি দুর করতে ব্যাঙ্ক বা সমবায় উদ্যোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। আমরা শেয়ার বাজারের প্রতারণা মূলক ব্যবসা রোধ করতে চাই। উন্নয়ন, আবিষ্কার, প্রযুক্তি, পুরস্কার ইত্যাদির গালভরা প্রচারণার চাইতে প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা বেশি জরুরী।

আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, বিশ্বের প্রতারণামুলক অর্থনীতিগুলি পড়ে যেতে বাধ্য। যেসব দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাড়াচ্ছে যেমন গ্রীস, বাংলাদেশকে সেসব দিকে নজর রেখে চলতে হবে। ভারতের অর্থনীতি অনুসরণ করলে দুর্বল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা। মাথাপিছু ঋণ বৃদ্ধি হলেও জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে প্রতারণামূলক উন্নয়ন দেখানো বন্ধ করা দরকার। আঞ্চলিক তারতম্য থাকলেও বিশ্বের অর্থনীতিতে বিরাট ঘাটতি চলছে, কিন্তু তা’ দূর করার ব্যাপারে অর্থনীতিবিদদের কোন ফর্মুলা নেই। বিশ্বব্যাপী অভিবাসনের কারণে উন্নত দেশগুলির সামাজিক শৃঙ্খলা ও অর্থনীতি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে, কিন্তু তা’ ঠেকানোর জন্যে কোন সংস্কারমূলক ব্যবস্থা নেই। আজ বিশ্ব অভিবাসী দিবসে আমরা পৃথিবীর সকল দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতাধারীদেরকে বাস্তব পরিস্থিতির দিকে ঘুরে তাকাবার আহবান জানাচ্ছি।

ম ইনামুল হক, ০১৮১৭-১২৩৬৩১

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৪৪ বার

Share Button