» বোকানাথ

প্রকাশিত: ১৩. মার্চ. ২০১৮ | মঙ্গলবার

দিলরুবা আহমেদ

মৌ ভেবেছিল সে যা বলেছে ভালুকনাথ তার সব কথা শুনেছেন। এই মাত্র বুঝলো কিছুই আসলে শুনেননি এবং এখনও শুনছেন না ।
তার মানে আবারও কানে তুলা দিয়ে বসে আছেন। এই করেন সব সময়। রেগে থাকলে সে কথা বলতে আসলেই কানে তুলা। আজ এই নিয়ে গুনে গুনে সাত বার উপর থেকে নেমেছে। চার তলা থেকে নেমে আসা কি সহজ ব্যাপার! নাকি যেমন তেমন ব্যাপার! তারপরও এসেছে। নামতে নামতে যা কিছু ভেবেছে কিছুই বলতে পারেনি একবারও। প্রথম তিনবার উনি ছিলেনই না মেসে। ৪র্থ বার ছিলেন। তাকে দেখেই ঠিক তার চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে বাথরুমে চলে গেলেন। পঞ্চমবার লেপ মুড়ী দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাতে লাগলেন। ষষ্ঠবারও তাই। এবার জেগে আছেন দেখে তার একটু ভরসা হলো। এবার হয়তো বলা যাবে কথাগুলো। আজকের সারাটা দিনও চলে গেছে। রাগ হয়তো কমেছে দুইদিনে ,তবে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ভালুকনাথ তাকে দেখে একবার ভ্রু-কুচকে তাকিয়ে ছিলেন বটে, তারপরে তানপুরা নিয়ে বসে পড়লেন, থাকলেন বসে ধ্যানের ভঙ্গীতে। আর একবারও চাইলেন না। সব সাধনা যেন আজই শেষ করতে হবে। অনেক ভেবে শেষে সে, শুনছেন স্যার, শুনছেন মাস্টারজী ,বলে কয়েকবার ডাকারও চেষ্টা করেছে মৃদু সুরে স্বরে। ঊনি ফিরেও তাকালেন না। পরশু দিনের ঘটনার পর থেকেই বিরক্ত। গতকাল গান শিখাতেও উপরে আসেননি। তখনই সে বুঝতে পেরেছে ভয়াবহ গো¯সা করেছে ওই বুড়া। গো¯সা শব্দটা শুনেছেও ঐ রাগীমুখো মানুষটার মুখে। অভিমান করার অধিকার যার উপর তার উপর রাগ করাটাকে নাকি বলে গো¯সা করা। যতসব । কে দিয়েছে এনাকে তার উপর রাগ বা অভিমান করবার অধিকার।
মাথাটার টাক-টার উপর একটা মাছি বসেছে। মাছিটার পেটটা কেমন লালচে দেখাচ্ছে। এনার রাগের তাতে মাছির পেট পুড়ে গেছে মনে হয়। যার মাথা তার কোন খবর নেই আর ঐদিকে মাছি পুড়ে ছাই কিন্তু তার খুবই ইচ্ছে করছে একটা রামদা এনে মাছিটাকে দু টুকরো করে দিতে। এ লোকের মাথা খাবে শুধু সে। আর কেও ভাগ বসাতে পারবে না। কাছে গেল ,আরো কাছে। ফু দিলো। মাঝিটা উড়ে যাবে ভেবেছিল, উড়লো না। এত কাছে তারপরও ভালুকনাথ ফিরে চাইলো না। মাথায় হাত দিতে অবশ্য ভয় করছে। আবারও ফু দিল। এর কামড়ে এখন যে চারদিকে চিকন গুনিয়া নামের একটা অসুখ হচ্ছে সে-টা আবার হবে না তো,নাহ হবে না , এটা মাছি,মশা না,আর হলেওবা তার কি !!! এবার মাথা তুলে চাইলো। মাছি না,মাছি মাথা তুলে চায় নি ,মাথা তুলে চাইলো টাক মাথার মালিক। সেও দ্রুত আঙ্গুল তুলে টাক দেখিয়ে বললো, মাছি। মাছি ততক্ষণে উড়ে গেছে। উনি আঙ্গুল তুলে দরজা দেখালেন। মানে যাও, চলে যাও। এমন দিনও তার জীবনে আসার ছিল। ধাপাস করে সে পাশে বসে পড়লো । অনেকটা কাদু কাদু মুখে বললো,
স্যার আপনি ভালুকের মতন দেখতে নন। আমাদের স্কুলের গানের টিচারের নাম দিয়েছি আমরা ভালুকনাথ। কারণ উনি দেখতে পুরাপুরি ভালুকের মতন। নাচের ম্যাড়ামের নাম প্রজাপতি। ওটা নিয়েই আমি ফোনে আলাপ করছিলাম। আপনি ভুল বুঝেছেন।
জবাব নেই ওইপক্ষের। চুপচাপ।
আবার বললো, আপনাকে নিয়ে কেন আমরা খারাপ ভাববো বা বলবো।
উনি আবার সেতার বাজাচ্ছেন। বাজিয়েই যাচ্ছেন। জবাব দিচ্ছেন না।
আম্মার দেওয়া সেই তিন হাজার টাকা এখনও ব্যাগে আছে। গানের মাস্টারের জন্য আম্মা প্রতি মাসের সাত তারিখে টাকা তার হাতে দেয়। স্যারকে পটিয়েছে সে এই কারণেই। ৫৮ বছরের বৃদ্ধ এক একলাবাসী রোগা শোকা আবার ঐদিকে পেটওয়ালা লোকের জন্য তার বিশেষ কোন অনুরাগ থাকার কথা নয়। গানের প্রতিও বিশেষ কোন ভালবাসা নেই। নেহাতই পারিবারিক চাপে চালিয়ে যাচ্ছে। নিচের তলাটা যেদিন থেকে মেস করেছে সেদিন থেকেই নিত্য নতুন ভাড়াটে আসে আর যায়। তবে এই ভালুকনাথ আছেন বহুদিন। তার বাবা ছেলে ছোকরাদের ভাড়া দেন না তার কারণেই । আর তাই যত দুনিয়ার সব বেকে যাওয়া ঢলে পড়া মানুষের ঢল নেমেছে এই বাসায়, কে করবে এদের সাথে সেই তথাকথিত ঢলা এন্ড ঢলি। তারপরও সে করে। করতে মজা লাগে। তার এক চোখ নাচানীতে সবাই কাত। মাস্টার মশাইয়ের প্রতি মাসের গান শেখানোর টাকাটার থেকে তিন/চার হাজার গত পাঁচ মাস ধরেই সে নিয়ে নিচ্ছে কয়দা করে ,বিভিন্ন ধরনের ফাঁকি দিয়ে। মা জানতেও পারছেন না। আর মাস্টারজী তো তাকে যেন দিয়েই ধন্য। এখন এই ভালুকনাথ ঢ়িল মারলেই সর্বনাশ। ঢ়িলা হতে দেওয়া যাবে না এ বন্ধন। কিন্তু তাকাচ্ছেও না। কেন যে খেয়াল না করে মিতার কাছে গল্প করছিল এই বুড়াভামের গরুগিরির ,বলেছিল বোকারাম কোথাকার এই ভালুকনাথ। ঐ ঢং করে চোখে পানি এনে হাত খরচার অভাবের কথা নাঁকি স্বরে -সুরে বয়ান করতেই কাজ হয়েছে। নিজের পকেট থেকে তো আর দিচ্ছে না ভালুকনাথ,তার নিজের মায়েরটাই সে রাখছে। মা-বাবা তো ভেবেছিল বুড়া মানুষ, মেয়ে পটাবে না। সেটা করেনি , তবে না পটালেও পটেছে তো বটেই, তারও তো একটা শাস্ত্রী আছে না! সে তো কোন অন্যায়ই করছে না। ঐ লোকের বিশ্বাস ভঙ্গের একটা জরিমানা থাকবে না! থাকবে। তাই সে আদায় করছে।
কেন্দে পড়ে চেঁচিয়ে উঠে বললো, গরুজী সরি সরি গুরুজী আপনি কথা না বললে আমি যাব না। আমি ঠাই বসে থাকবো। দরকার হলে সারারাত। উপরে না গেলে সবাই নেমে আসবে। এই মেসের অন্যান্যরাও ফিরবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তখন অনেক প্রশ্ন উঠবে। ভাল লাগবে আপনার সেগুলো শুনতে।।
তারপরেও তাকাচ্ছে না। বুঝলো আরো জলে ডোবাতে হবে চোখগুলো।
সেও তাই ফুঁপিয়ে উঠে বললো,
আমি যদি আমার বাকীটা জীবন আপনার পায়ে পড়ে থাকি তাহলে মুখ তুলে চাইবেন। আপনার অবহেলা আমার সয় না মাস্টারজী। কেমন করে ভাবছেন আপনাকে ভালুকনাথ ডাকবো। আপনি তো আমার পরম ভালবাসার জন শ্রদ্ধার ধন।
এবার একটু করে মুখ তুলে চেয়ে দেখলেন, তারকানাথের দুচোখ দিয়ে পানি পড়ছে। গলছে তাহলে। বেশ বেশ, দারুন! আরেকটু গলে পড়তে হবে। কিছু বলার আগেই শুনলো, মাস্টারজী বলছেন,
: বাসায় যাও। অন্ধকার হয়ে আসছে।
: কাল আসছেন তো আমাকে গান শেখাতে।
: আসবো, যাও এখন।
বেরিয়ে এসেই মচকা মেরে একটা হাসি ছাড়লো, হাত তুলে ধিং, ধিং করে নাচতে নাচতেই বেশ সশব্দেই হাসলো, অন্ধকারে দাড়িয়ে বললো,
শালা ভালুকনাথ দূর বেটা, যা মর গিয়া, যা, উফ না না , টাকাটা যতদিন পাচ্ছে ততদিন বাচুক, হি হি ।
ভালুকনাথের দরাজ গলা ভেসে আসছে, গাইছে, কেন রজনী না পোহাতে…
জোরেই হেসে মৌ বললো, ওরে বুদ্ধু এই রজনী আর পোহাইছে।
রহিম চাচা, মেসের বাবুচী ,হঠাৎ কোত্থেকে বেরিয়ে এসে সিড়ির আলোটা জালিয়ে দিল। চেয়ে আছে তার দিকে। এই বুড়ার আবার কি হল। শুনেছে কিছু? শুনুক। বাবুচীই তো। কে পাত্তা দেয়। চেয়ে আছে। কিছু বলছে না। সাহস আছে নাকি যে কিছু বলবে। থাকবেই তো তাকিয়ে। তার চেহারাটা যে কিটি মার্কা ,না তাকায়ে থেকে করবেটা কি!
মুখ বাঁকায়ে ঠোটে উল্টায়ে চলে যেতে গিয়ে শুনলো বাবুচী বুডা বলছে , দুনিয়াটা অন্ধকারে ভরে যাচ্ছে।
সেও ঘুরে দাডায়ে সমান তেজে জবাব দিল, সন্ধ্যার সময় আলো পাবেন কোথায় !
:তোমরা মানবিক হলে আর হৃদয়বতী হলেই আলোয় দুনিয়া ভরে যেত।
অ্যা -রে – রে -রে ,এও হৃদয় ধরে টানছে। এও তার হৃদয় দখল করতে চায় নাকি। হলো কি এই দুনিয়ার। ১৬ বছরের এই জীবনে কম তো দেখলো না। সবই এক গোয়ালার গরু, বললোও তাই, জোরেই বললো। বাবুর্চীকে অত পাত্তা দেবার কিছু নেই। যদিও মাস্টারজী বলেন একই অফিসে কাজ করতেন তারা দু’জন। এখন ঐ লোকের থাকার কোন জয়গায় নেই দেখে এখানে এসে উঠেছে। রাধতে পছন্দ করে। তাই সবার জন্য রাঁধছে। কিন্তু তার মতে যে রাধে মেসে সেই বাবুর্চী । কোন লাট সাহেব না, হু। উঠে যাচ্ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে ডাক এলো,
: শোন মা, ভালুকনাথ বলে আর ডেকে যে আমার বন্ধুকে নিয়ে তোমরা হাসাহাসি করছিলে সেও কিন্তু আড়ালে তোমাকে একটা নামে ডাকে।
সর্বনাশ, চমকে উঠে মৌ ফিরে তাকায়।
:কি ডাকে ?
:ও ডাকে ময়না পাখী। ওর মেয়ের নামটাও তাই ছিল। মেয়েটি মারা যাবার পর সে আর কোনদিন গ্রামে ফিরে যায়নি। সব মেয়েকেই আমার ভাই এক ঘরেই ফেলে এক গোয়ালেই রাখে, মমতার গোয়ালা সে ।
ময়না পাখীর বকবকানি বন্ধ হয়ে গেছে। দাড়ায়ে আছে চুপচাপ। ছিঃ ছিঃ শব্দটা যেন কোত্থেকে ছুটে ছুটে এসে ছুয়ে দিচ্ছে তাকে। ব্যাগের ভেতর টাকাটা আছে , মনে হচ্ছে যেন একটা আস্ত শাপ ধরে পুরে রেখেছে। কিল বিল করছে একটা অস্বস্থি।
আপন মনেই বললো, ধুর ছাই , কি হলো এটা,এমন লাগছে কেন, যেন অপরাধী।
মৌ জানে না যে ভালবাসার বহু রূপ, অতটুকু জীবনে এতটুকুর বেশী সে আর দেখেছেইবা কতটুকু!!

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৮৯৮ বার

Share Button

Calendar

October 2018
S M T W T F S
« Sep    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031