» ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়

প্রকাশিত: ২৯. অক্টোবর. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

ডা: মুহাম্মদ ইশতিয়াক

প্রায় আট বছর প্রতীক্ষার পর গর্ভধারণ করে নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার ইভা ইসলাম। স্বামী তরিকুল ইসলাম একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। দীর্ঘ দিন পর গর্ভে সন্তান আসায় আনন্দে আত্মহারা এই দম্পতি। কিন্তু গর্ভকালীন নানা শারীরিক জটিলতার কারণে তাকে নির্ধারিত সময়ের আগেই নেত্রকোনার স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশনের মাধ্যমে প্রসব করানো হয় অপরিণত (প্রিম্যাচুর্ড) নবজাতককে। জন্মের পর পরই নবজাতকের শ্বাসকষ্টের সাথে সাথে খিঁচুনি হয়। এতে নবজাত শিশুর জীবন আরও সঙ্কটাপন্ন হয়ে ওঠে। গুরুতর অবস্থায় নেত্রকোনা থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। খুব দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নবজাতকের জন্য নিউবর্ন বেবি ওয়ার্ডে চিকিৎসা শুরু হয়। মাত্র ৫ থেকে ৬ দিনের চিকিৎসাসেবা এবং ডাক্তাদের আন্তরিকতায় সুস্থ হয়ে ওঠে নবজাতকটি। আদরের সন্তানটি সুস্থ হয়ে ওঠায় বাবা-মা স্বস্তি ফিরে পান। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট তরিকুল ও ইভা দম্পতি।

ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার গৃহবধূ শাহনাজ বেগমের প্রথম কন্যাসন্তান শায়লা। জন্মের পর পরই দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট। এর সাথে শিশুটির ছিল কম ওজনজনিত সমস্যা। সাধারণত শিশুর জন্মকালীন ওজন ২ দশমিক ৫ কেজি হওয়ার কথা বা তার বেশি হলে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়। সেখানে এ নবজাতকের ওজন ছিল মাত্র দুই কেজি। জন্মের পরেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নবজাতকটিকে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের (ভেন্টিলেটরি) সাপোর্টে রাখা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, সিজারের পর নবজাতকের শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা ছিল অত্যন্ত কম। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে পারায় শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।

কম ওজন আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে জন্ম নেয়া অপরিণত শিশুর আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসাসেবা এখন দেশেই হচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই সঙ্কটাপন্ন নবজাতকের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়। চিকিৎসাসেবার এই আধুনিকায়নে নবজাতকের মৃত্যুর হার অনেক কমে এসেছে। নবজাতকের কঠিন ও ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনে এখন আর কাউকে দেশের বাইরে কিংবা প্রাইভেট হাসপাতালে যেতে হয় না। এতে শিশুর পরিবার যেমন খুশি, তেমনি নবজাতকের সব রোগের চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও দক্ষ জনবলসহ সমন্বিত সেবা ও প্রচেষ্টায় সঙ্কটাপন্ন নবজাতকের প্রাণ বাঁচানোর ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নবজাত শিশুর জটিল ও মারাত্মক রোগের চিকিৎসায় বেসরকারি হাসপাতাল অত্যন্ত ব্যয় বহুল এবং বেশিরভাগ মানুষের নাগালের বাইরে। অথচ এই ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাচ্ছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়। এ হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডের এক তথ্যে জানা যায়, নবজাতক ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৬০ নবজাতক ভর্তি হয়। ওয়ার্ডে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ১৫টি ছাড়াও বেড রয়েছে আরও ৫০টি। অত্যাধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে ভেন্টিলেটরি সাপোর্ট মেশিন, ইনকিউবিউটর, ওয়ার্মার, ফটো থেরাপি, ব্লাড ও গ্যাস এনালাইজারসহ আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত করতে পুরো ওয়ার্ডকে করা হয়েছে আইসোলেটেড। ভর্তির পর কোনো বাবা-মা কিংবা স্বজনকে নবজাতকের জন্য কিছু করতে হয়না। কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও আয়া সবকিছু দেখভাল করে থাকে। অতি প্রয়োজনে অভিভাবকদের মাইকে ডাকা হয়। আন্তর্জাতিকমানের এমন সেবা পেয়ে সবাই খুশি।

এক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় কম ওজন ও মারাত্মক শ্বাসকষ্ট নিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম নেয়ার কারণে প্রিম্যাচুর্ড নবজাতকদের অন্তত ২৫ শতাংশ মারা যেত জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। শিশু ওয়ার্ডের ভেতরে আলাদাভাবে মাত্র ৪টি বেডে দেওয়া হতো নবজাতকের চিকিৎসাসেবা। বর্তমানে তা ১৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। নবজাতকের মৃত্যুর এই উদ্বেগজনক হার কমিয়ে আনতে গত ২০১৩ সালের জুলাই থেকে এ হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের উন্নয়নে নবজাতকের ওয়ার্ড আলাদা করে দেওয়া হয়। ইউনিসেফের সহায়তায় এ সময় নবজাতক ওয়ার্ডে দেওয়া হয় বিশ্বমানের বিছানাসহ প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। এসব আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণসহ লোকবলের দক্ষতা বাড়াতেও সহায়তা দিচ্ছে ইউনিসেফ।

মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষায় এমনি আরেকটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা দক্ষিণের মাতুয়াইলে অবস্থিত শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। প্রায় দুই দশক ধরে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে এ প্রতিষ্ঠানটি, যা অর্জন করে নিয়েছে মাতুয়াইলসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার নিম্ন আয়ের মানুষের আস্থা। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতাল সেবার পাশাপাশি নানা রোগের গবেষণা ও প্রশিক্ষণেও অবদান রাখছে। সদ্যজাত থেকে নানা বয়সী শিশুর কলকাকলীতে সকাল শুরু হয় ঢাকার মাতুয়াইলে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে ২০ টাকার বিনিময়ে শিশু ও মায়েরা স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে থাকেন। নিম্ন আয়ের মানুষদের বিনামূল্যে ওষুধসহ বিভিন্ন সেবার সুযোগ থাকায় শুধু ঢাকা নয়; নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী এমনকি কুমিল্লা থেকেও রোগীরা আসেন সেবা নিতে। প্রতিদিন গড়ে এ ইনস্টিটিউটে প্রায় পনের শ’ রোগীকে সেবা দেন এখানকার চিকিৎসকরা। শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য সেবায় অনন্য নজির স্থাপন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাছিম, মাতুয়াইল মা ও শিশু হাসপাতালে একটি ৫০ বেডের স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট (স্ক্যানু) উদ্বোধন করেন। এরপর থেকে এ হাসপাতালে শিশু রোগী ভর্তির সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নবজতকের মৃত্যু হার ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এখন পর্যন্ত দেশের ৩৮টি জেলায় ৫৫ টি হাসপাতালে স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট (স্ক্যানু) স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া আরো নতুন স্ক্যানু বিভিন্ন পর্যায়ের হাসপাতালে স্থাপনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকার স্ক্যানু সেবা পর্যায়ক্রমে সব জেলায় সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

২০১১ সালে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ের পর বর্তমান সরকার জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬, মানবদেহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ২০১৮সহ নানাবিধ আইন কাঠামো প্রণয়ন করেছে। জাতীয় পুষ্টি পরিষদ গঠনের মাধ্যমে দেশে পুষ্টিসেবা জোরদারকরণ, নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস প্রচলনের মাধ্যমে মা ও শিশুস্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্বারোপ, উচ্চতর স্বাস্থ্য শিক্ষায় নতুন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনসহ নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতীয় সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদি ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি কর্মসূচি ২০১৭-২০২২-এর বাস্তবায়ন চলছে। এ কর্মসূচিটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’র স্বাস্থ্যবিষয়ক সূচকগুলো অর্জনে এ উন্নয়ন কর্মসূচি বিরাট ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশে ৫ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, প্রসবকালীন শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণ, সেপসিস এবং কম ওজন শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী। যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। দেশের প্রতিটি এলাকায় গড়ে ওঠা কমিউনিটি ক্লিনিক মা ও শিশু প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। পাশাপাশি জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসমূহে চালুকৃত স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট গুরুতর অসুস্থ নবজাতকের চিকিৎসায় একটি কার্যকর মডেলে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বহু শিশুর প্রাণ রক্ষা পাচ্ছে। নবজাতকের মৃত্যুহার হ্রাসে সরকারের এ অগ্রযাত্রা সার্থক করতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১০৮ বার

Share Button

Calendar

November 2020
S M T W T F S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930