» মহাবিপর্যয় থেকে বেঁচে যাবে জাতি

প্রকাশিত: ২৯. মে. ২০১৯ | বুধবার

এম. খছরু চৌধুরী
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠনের আগে ২০১৪ সাল সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৫৫৬ জন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ৮৩ জন স্যানিটারী ইন্সপেক্টর-সহ কোনো-কেনো পৌরসভা ও সিটিকর্পোরেশন নিয়োজিত স্যানিটারী ইন্সপেক্টরশীপ-সনদ-বিহীন জনবল দিয়ে খাদ্যস্থাপনা পরিদর্শন, নিবন্ধন, প্রিমিসেস লাইসেন্স, ফুডহেন্ডলারদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ইত্যাদি বিষয়াদি যতটা সম্ভব সম্পাদন করা হতো। একই ধরনের কাজে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমের অধীনেও ১০ বা ১২ জন স্যানিটারী ইন্সপেক্টর পদ রয়েছে। এই অঞ্চলে ১৮৬৪ সালে বৃটিশ গভঃ হাত ধরে খাদ্যভেজাল নিয়ন্ত্রণ কাজের গোড়াপত্তন হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে কাজটি সম্পাদন হতো বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ- ১৯৫৯ ও বিশুদ্ধ খাদ্য বিধি- ১৯৬৭’র অধীনে।
প্রয়োজন থাকা সত্তেও, ১৯৭৩ সালের বঙ্গবন্ধু সরকারের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর খাদ্যভেজাল নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট ২’শতাধিক রোগের প্রতিরোধে নিয়োজিত স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের পদের সংখ্যা আর বাড়ায়নি। সিটিকর্পোরেশন ও পৌরসভা গুলোর সেবা বিতরণ কার্যক্রমে স্যানিটারী ইন্সপেক্টর ও খাদ্যভেজাল প্রতিরোধে প্রত্যাশিত মনোযোগ পরিলক্ষিত হয়নি। বিদ্যমান বাস্তবতায় খাদ্যভেজালের পরিধি, ধরন-ধারণ, ভেজালকারীর সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যায়। খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট অসুখও বাড়তে থাকে জ্যামিতিক হারে! ক্যান্সার, কিডনি রোগ-সহ ভেজাল খাদ্য-সৃষ্ট অন্যান্য রোগের ব্যয়-বহুল চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ব্যাপক মানুষ দিশেহারা হতে থাকেন! মানব-সৃষ্ট এই অনাকাংখিত মানবিক-বিপর্যয় ঠেকাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বীয় আন্তরিকতায় প্রণয়ন করা হয় নিরাপদ খাদ্য আইন- ২০১৩। রহিত করা হয় বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ- ১৯৫৯ এবং খাদ্য ভেজালের প্রতিরোধে গঠন করা হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)।
বিএফএসএ ২০১৫ সালের ২’রা ফেব্রুয়ারি ভেজাল নিয়ন্ত্রণ কাজের দায়িত্ব নিয়ে পরিদর্শন কাজের জনবল বাড়ানোর পরিবর্তে আরও কমিয়ে দিলেন(?)। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৪৩ জন পরিদর্শককে দেশের ২৫ লাখ খাদ্যস্থাপনা পরিদর্শনের দায়িত্ব দিলেন! ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে সবমিলিয়ে জগাখিচুরি পন্থায় ৬৬৯ জন পরিদর্শককে বিএফএসএ এর কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। এখনোও সরকারের হাজার কোটি টাকা ব্যয়-বিনিয়োগে খাদ্যভেজাল নিয়ন্ত্রণ কাজের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত আরও ১৬০০ স্যানিটারী ইন্সপেক্টরকে কাজে লাগানো হয়নি(?)। সারে-চার বছর পেরিয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষ কিভাবে বা কোন পদ্ধতিতে ভেজালের লাগাম টেনে ধরবেন, কর্তৃপক্ষের তরফে উহারও কোন দিক-নির্দেশনা নেই। বিগত ৫ বছরের আগের চেয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ! ভেজালে-ভেজালে সয়লাব সারা দেশ! ভেজাল যেন দানবরূপে আবির্ভূত হয়েছে এই বাংলায়!
কর্তৃপক্ষের উচ্চপদস্থ ও নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন ভেজাল নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা আমদানি করতে ঘন-ঘন বিদেশ ভ্রমণে যান। মাঝে-মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গবেষক-বিজ্ঞানীর মত তথ্য দেন! জনমনে আতংক আরোও বাড়ে! তবে কি, ভেজালের দানবীয় আক্রমণ থেকে এই জাতির মুক্তি নেই? ভেজালের নিয়ন্ত্রণ কি অসম্ভব? মোটেও সে রকম নয়। কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার অভাবে পরিস্থিতি এমন হয়েছে!
যে কোন বড় কাজের পরিকল্পনায় প্রথমেই কোয়ালিটির প্রত্যাশা ভালো সংগঠন ও সংগঠক বা ম্যানেজারের বৈশিষ্ট্য নয়। কাজটি শুরু করতে হয় কোয়ান্টিটি দিয়ে। কাজের গুণগত মানের উন্নয়ন করতে হয় ধীরে ধীরে ও কাজের ধারাবাহিকতা দিয়ে। বিএফএসএ যদি প্রথমেই তার কর্মপদ্ধতি ও কর্ম-পরিকল্পনার মধ্যে – পরিদর্শকদের কর্মএলাকা নির্দিষ্ট করে দেশের ২৫ লাখ খাদ্যস্থাপনা’র নিবন্ধন ও ২৪ ঘন্টা নজরদারির জন্য কি পরিমাণ পরিদর্শক প্রয়োজন; এই সংখ্যাটা নির্ধারণ করতে পারতেন, তাহলে পরিস্থিতি এতটা অসহনীয় হতোনা! এখনোও সময় আছে, পরিস্থিতি উন্নয়নের। এক্ষেত্রে, স্বাধীনতা সেনিটারিয়ান পরিষদ (স্বাসেপ) এর নি¤েœাক্ত প্রস্তাবনা বিবেচনায় নিয়ে আমলাতান্ত্রিক বাধা অপসারন করে, সরকারের টাকায় প্রশিক্ষিত সকল স্যানিটারী ইন্সপেক্টর (২২০০) কে একযোগে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ-ই হবে উত্তম পন্থা।
“স্যানিটারী ইন্সপেক্টর(নিখাপ) পদে জনবল-কাঠামোর প্রস্তাবনা”
ক্রঃ নং যে সকল দপ্তর বা সংস্থাধীনে থেকে কাজ করবেন নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক/স্যানিটারী ইন্সপেক্টর এর অনুমিত
পদ সংখ্যা মন্তব্য
০১ মহামান্য রাষ্ট্রপতির বাস ভবন / বঙ্গ ভবন/কার্যালয় ০৪ জন ২৪ ঘন্টা ডিউটির জন্য
০২ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণ বভন ০৪ জন ২৪ ঘন্টা ডিউটির জন্য
০৩ বাংলাদেশ সচিবালয় ০২ জন

০৪ জাতীয় সংসদ ভবন ০২ জন
০৫ জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও জাতীয় নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষাগার ০৪ জন
০৬ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় দপ্তর
০২ জন
০৭ ১২ টি সিটি কর্পোরেশনের ৪৬৪ ওয়ার্ডের জন্য ৪৬৪ জন
০৮ ৩২৯ পৌর সভাঃ- ‘ক’- শ্রেণী ১৭৭ * ৩ = ৫৩১ জন
‘খ’- শ্রেণী ১০৯ * ২ = ২১৮ জন
‘গ’- শ্রেণী ৪৩ * ১ = ৪৩ জন ৭৯২ জন

০৯ আইসিডিডিআরবি, ঢাকা ০২ জন
১০ ইসিডিআর, ঢাকা ০২ জন
১১ জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, ঢাকা ০২ জন
১২ জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউট, ঢাকা ০১ জন
১৩ জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসাপাতাল, ঢাকা ০১ জন
১৪ ৩ টি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের জন্য ১৪ জন ২৪ ঘন্টা ডিউটির জন্য
১৫ ২ টি সমুদ্র বন্দরের জন্য ০৮ জন ২৪ ঘন্টা ডিউটির জন্য
১৬ ১৩ টি স্থল বন্দরের জন্য ১৩ জন
১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সরকার আমলে ৪৯২ জন স্যানিটারী ইন্সপেক্টর এবং ৬৪ জন জেলা-স্যানিটারী ইন্সপেক্টর এর পদ সৃজন করার পর আজ অবধি খাদ্য ভেজাল নিয়ন্ত্রণে মাঠ-পর্যায়ে কাজের জন্য পরিদর্শকের একটি পদও আর বাড়ানো হয়নি।
১৭ ২৫ টি সেনানিবাস এলাকার জন্য ২৫ জন
১৮ ১০০-২৫০ শয্যার হাসপাতাল (৪৭ টি জেলা সদরে) ৪৭ জন
১৯ সরকারী-প্রা:-সামরিক-মেডিকেল-কলেজ ৭১ টির জন্য ৭১ জন
২০ পাবলিক-৩৭ টি, প্রাইভেট-৮৩ টি বিশ^বিদ্যালয়ের জন্য ১২০ জন
২১ স্কয়ার, ইউনাইটেড, ল্যাবএইড, ডেল্টা, এ্যাপোলো এর মত বিশেষায়িত/আধুনিক প্রাঃ হাসপাতালের জন্য ০৫ জন
২২ ৪৯২ টি উপজেলা নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক পদে ৪৯২ জন
২৩ ৬৪ টি জেলা নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক পদে ৬৪ জন
২৪ ৪৫৫৩ টি ইউনিয়নের জন্য ৪৫৫৩ জন
মোট পদ সংখ্যা = ৬৬৯৪ জন।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: স্যানিটারী ইন্সপেক্টর/নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক পদায়নে এই জনবল প্রস্তাবনার ধারণাপত্র ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন-চিত্রের আলোকে তৈরী করা হয়েছে। ভেজাল প্রতিরোধ ও খাদ্য-স্বাস্থ্যের উন্নয়নে পর্যায়ক্রমে উল্লেখিত পরিমাণ পরিদর্শক নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে, জরুরী ভিত্তিতে প্রতি ০৩ ইউনিয়ন এবং সিটি-কর্পোরেশনের প্রতি ০৩ ওয়ার্ডের বিপরীতে ০১ জন ও অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যায় অর্থাৎ, সাকুল্যে ২২৮৭ জন পরিদর্শক নিয়োগ করা অতীব প্রয়োজন।)

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪৭১ বার

Share Button

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031