» মানবী

প্রকাশিত: ২৬. সেপ্টেম্বর. ২০১৯ | বৃহস্পতিবার


শেলী সেনগুপ্তা
দিল্লিতে সার্ক কালচারাল প্রোগ্রামে একটা মেয়ে কবিতা পাঠ করলো। তার আগে কি চমৎকার ইংরেজিতে কথা বললো। সবাই অবাক হয়ে ওর কথা শুনছে। কি চমৎকার করে বলে গেলো,
‘ আমার নাম মানবী, আমার বাবা জন্মেছে হিন্দু পরিবারে, আর মা বাংলাদেশের এক সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে। আমি তাদের ভালোবাসার সন্তান। তবে আমার কোন ধর্ম নেই অথবা পৃথিবীর সব ধর্মই আমার। বাবা আমার নাম রেখেছেন মানবী। নামের আগে বা পরে কোন পদবী নেই। বাবা আমাকে মানুষ করতে পেরেছেন কিনা জানি না , তবে অনেক যত্নে বড় করেছেন। কখনো নিজের মতামত আমার উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন নি। সবসময় সত্যটা আমার সামনে তুলে ধরেছেন, আমি আমার মতো করে বুঝে নিয়েছি। আমার মাকে কখনো দেখি নি। বাবা বলেছেন, মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, কেন গেছেন বা কোথায় গেছেন, বাবাও জানেন না। অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারেন নি। অনেক খুঁজেছেন, তারপর একসময় আমাকে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সবার কাছ থেকে দূরে চলে এলেন। আমি আর বাবা এখন শ্রীলংকায় থাকি। বাবা-মেয়ের ছোট্ট সুখের সংসার, আমরা ভালো আছি। মা থাকলে হয়তো আরো ভালো থাকা হতো’।
মানবীর কথাগুলো শুনতে শুনতে অনেকের চোখ জলে ভিজে উঠলো। শুভাশিস এসেছিলো মেয়ের কবিতা আবৃত্তি শুনতে, কথাগুলো শুনতে শুনতে ধীরে ধীরে হলঘর থেকে বের হয়ে গেলো। বাইরে বাগানে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আকাশের দিকে ভেজা চোখে তাকিয়ে মনে মনে বলছে, ‘ কোথায় গেলে তুমি জয়িতা? আমাকে আর আমাদের প্রেমের ফসল মানবীকে ফেলে তুমি কোথায় গেলে? কতদিন হয়ে গেলো তোমার কোন খবর পাই না। বলেও গেলে না কি অপরাধ ছিলো আমার।’

খুব সকালে জয়িতাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েই শুভাশিস টাকার খোঁজে বের হয়েছে। জয়িতা পুর্ণমাস গর্ভবতী। ডাক্তার বলেছে ওর সিজার করতে হতে পারে। অনেক টাকা দরকার। এতো টাকা কোথা থেকে যোগার হবে তাও সে জানে না। শুধু নিজের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবার মনে হয়েছে রক্ত বিক্রি করার কথা, পরে মনে মনে হাসলো। রক্ত বিক্রির টাকা দিয়ে কি অপারেশনের খরচ হবে?
শুভাশিস ব্যানার্জি যখন জয়িতা ইসলামকে বিয়ে করলো তখন থেকে দু’পরিবারই ওদের ত্যাগ করেছে। ওরা থাকার মতো বাসাও ভাড়া পাচ্ছিলো না। পরে অনেক কষ্টে জয়িতার মায়ের বান্ধবী সাবেরা খালার পরিত্যাক্ত গ্যারেজে সংসার সাজিয়ে নিলো। গ্যারেজটার ব্যবহার হচ্ছে আর বিনে পয়সাতে বাড়ি পাহারাদার পেয়ে তিনিও খুশি। মাঝে মাঝে বিদেশে গেলে বাড়ি দেখাশুনা করার জন্য কাউকে তো পাওয়া গেলো।
শুভাশিস এখনও চাকরি পায় নি। তাতে একটুও ভেঙ্গে পড়েনি। ওরা দু’জনেই টিউশনি করে। তাতে যা আসে দু’জনের ভালোই চলে যায়। সংসারে সুখের অন্ত নেই। ভালোবাসা যেন প্রতিদিন ফুলেফেঁপে উঠছে। দু’জন দু’জনকে চোখে হারায়।
প্রতিদিন টিউশনি শেষ করে ঘরে ফিরে জয়িতার একবার সাবেরা খালার সাথে দেখা করতে হয়। নিঃসন্তান এ নারী জয়িতাকে যত ভালোবাসেন শুভাশিসকে তত অপছন্দ করেন। তাই প্রতিদিনই তিনি পরামর্শ দেন শুভাশিসকে ছেড়ে দিতে। ওর চেয়ে ভালো পাত্রের সাথে বিয়ে দেয়ার দায়িত্বও তিনি নিতে চান। জয়িতা সব শুনে চুপচাপ চলে আসে। চুপ করে থাকাটাও তিনি পছন্দ করেন না।
এর মধ্যে যখন শুনলেন জয়িতা মা হতে চলেছে তখন তিনি খুব রেগে গেলেন। ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। হয়তো এ সংসারটা মন থেকে চাইছিলেন না।
জয়িতা আর টিউশনি করতে পারছে না। শরীর মানছে না, তাছাড়া এতো দুরে যাওয়া আসাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। শুভাশিস ওকে টিউশনি করতে নিষেধ করলো। ওর টিউশনিগুলোও শুভাশিস করা শুরু করলো, তাতে ওর ঘরে থাকা কম হয়। আর যখন ফিরে আসে তখন এতোটায় ক্লান্ত থাকে যে জয়িতার সাথে কথা বলা বা ওর খোঁজখবর নেয়াও হয়ে ওঠে না। তারপরও যতটুকু পারে দু’জনে মিলে জীবনটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
একদিন শুভাশিস টিউশনি থেকে ফিরে দেখে জয়িতা ব্যথায় কাতরাচ্ছে। সে এক দৌড়ে সাবেরা খালার কাছে গিয়ে বলতেই তিনি ড্রাইভারকে ডেকে বললেন, গাড়ি বের করতে। সে রাতেই ওকে হাসপাতালে ভর্তি করলো। সারারাত যমে মানুষে টানাটানি করার পর ভোরের দিকে সিজার করে একটা মেয়ে হলো। মেয়েকে কোলে নিয়ে বাবা আর মেয়ে একবার কাঁদে আবার হাসে। সব আনন্দ ছাপিয়ে শুভাশিসের মাথায় ঘুরছে টাকার চিন্তা। জয়িতাকে নিয়ে যাওয়ার আগে টাকা শোধ করতে হবে। হাসপাতাল থেকে এখনও বলে নি কত টাকা বিল হয়েছে। জয়িতা এখনও বেশ দুর্বল, ওর শীর্ণ মুখে স্বর্গের হাসি। দুশ্চিন্তা লুকিয়ে রেখে শুভাশিস ওর সাথে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছে।
দুপুর নাগাদ সাবেরা খালা এসে জয়িতাকে দেখে গেলেন। মেয়ে বা শুভাশিসের দিকে ঘুরেও দেখলেন না। যেভাবে এসেছিলেন, সেভাবেই গজ গজ করতে করতে চলে গেলেন। জয়িতাকে বলে শুভাশিসও বের হয়ে গেলো। দু’একদিনের মধ্যে টাকা যোগার করে ওদের এখান থেকে রিলিজ করে নিয়ে যেতে হবে।
সবকিছু ঠিক আছে , কিন্তু টাকা না দেয়াতে ডাক্তার জয়িতাকে রিলিজ করছে না। শুভাশিস প্রতিদিন আসে, জয়িতা আর মেয়েকে দেখে ফিরে যায়। টিউশনি করতে করতে ও ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। এখনও সব টাকা যোগার হয়নি। প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গাতে ধন্না দিচ্ছে ধারের জন্য। কেউ ধার দিচ্ছে না। ওর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে।
ঘরে বসে মন খারাপ করে কান্না করছিলো। এমন সময় সাবেরা খালার ড্রাইভার লতিফ দরজা নক করে ভেতরে এলো। তারপর বেশ কিছু টাকা দিলো। বললো,
ঃ ভাইয়া , আগে আপারে রিলিজ কইরা লইয়া আহেন, মা-বাইচ্চারে ক’দিন হসপিটালত ফালাইয়া রাইখবেন?
ঃ ভাই, তুমি যে টাকা দিলে, তা কবে শোধ করবো?
ঃ কুনু সমইস্যা নাই, মাসে মাসে কিছু কিছু কইরা দিয়া দিয়েন।
ঃ তুমি আমাকে বাঁচালে ভাই।
শুভাশিস ছুটে গেলো জয়িতাকে রিলিজ করে আনতে।
এখন জয়িতা ঘরে ফিরলেই সে একটু নিস্তার পায়। মেয়েটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে সব কষ্ট সহ্য করে নেবে ওরা। শুভাশিস আরো পরিশ্রম করবে। অনেক অনেক পরিশ্রম দিয়ে মেয়ের জন্য সুখ কিনে আনবে।
ভাবতে ভাবতে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে সোজা জয়িতার কেবিনে চলে এলো।
অবাক হয়ে দেখলো বেডে জয়িতা নেই, অন্য এক মহিলা শুয়ে বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে। মহিলা ওর দিকে বেশ বিরক্ত হয়ে তাকালো। শুভাশিস বিব্রত হয়ে বের হয়ে আসলো।
নার্সেস কেবিনে খবর নিতে গেলো। কেউ কিছু বলতে পারলো না। জয়িতার কথা বললেই সবাই চুপ করে থাকে। মাথায় হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়লো। ডুকরে কেঁদে উঠলো ‘জয়িতা জয়িতা’ করে। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর একজন বয়স্ক নার্স বললো,
ঃ কেন বুঝতে পারছেন না , তিনি কোথায় গেছেন আমরা কেউ জানি না। বেবি ওয়ার্ডে বাচ্চাটা আছে, তাকে নিয়ে যান।
বাচ্চার কথা শুনে শুভাশিস যেন প্রাণ পেলো। টাকা বুঝিয়ে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এলো। ফিরে এলো সাবেরা খালার গ্যারেজ ঘরে। সাবেরা খালাও দেশে নেই। তাই জয়িতার কোন খবর নিতে পারছে না। আর জয়িতাদের বাড়ির গেইট থেকে ওকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়া হলো । সাবেরা খালার বাসায় থাকতে থাকতে একসময় নোটিশ এলো ঘর ছাড়তে হবে। তখন অনেক চেষ্টা করে শ্রীলংকার একটা স্কুলে চাকরি যোগার করে শুভাশিস চলে এলো। মেয়েকে দেখাশুনা আর স্কুলে পড়িয়ে সময় কাটছে। বেশ লম্বা সময় এখানে কাটিয়ে দিলো। মানবী দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেলো। জীবনের প্রতি মেয়েটার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ প্রখর, লেখালেখির হাতও খুব ভালো। বাবার উৎসাহে খুব লিখে যাচ্ছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে সে বেশ নাম করেছে। ইংরেজি সাহিত্যে বেশ দখল আছে। মানবীকে নিয়ে খুব গর্ব করে শুভাশিস।

চুপচাপ বাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে শুভাশিস, পেছনে হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। কবিতা পাঠের সেশন শেষ। এখন লাঞ্চব্রেক। সবাই খাবারের ঘরের দিকে যাচ্ছে। অনেক সাথে গল্প করতে করতে মানবীও বের হয়ে এলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে বাবাকে খুঁজছে। শুভাশিস এগিয়ে গেলো। মানবী দৌড়ে বাবার কাছে চলে এলো।
ঃ বাবা, তুমি চলে এলে কেন? আমার কবিতা শুনলে না তুমি?
ঃ শুনেছি মা, তুই তো আমার মনের মধ্যে অবিরাম বেজে যাচ্ছিস মাগো।
ঃ তুমি যে কি বল না বাবা, চল খাবে চল।
বাবা মেয়ে হাত ধরাধরি করে খাবার ঘরের দিকে যাচ্ছে। এমন সময় বেশ কিছু ছেলে মেয়ে এসে মানবীকে ঘিরে ধরলো। ওর কবিতার প্রশংসা করছে। শুভাশিস পিছিয়ে পড়লো। ওরা বেশ কিছুদূর যেতেই এক যুবক এসে মানবীর হাত ধরলো। ওরা পরস্পরের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালো। সে চাউনিতে কি ছিলো তা শুভাশিস বলতে পারবে না। শুধু মনে হচ্ছে এভাবেই ওরা অনন্তকাল পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকুক। আজ যদি জয়িতা সাথে থাকতো তাহলে এ আনন্দ ভাগ করে নিতে পারতো। জয়িতা জানলোই না তাদের ভালোবাসার সম্পদ মানবী নিজের ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫৫১ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031