» মুজিববর্ষের প্রধান সমন্বয়ক কবি কামাল চৌধুরীর কথা

প্রকাশিত: ১১. অক্টোবর. ২০১৯ | শুক্রবার

রিপন শান
সমকালীন জীবন ও প্রকৃতিপ্রেমের নন্দনভাবনায় সমৃদ্ধ  , মুক্তিযুদ্ধের উদার মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত , আধুনিক বাংলা কবিতার শক্তিমান কবি কামাল চৌধুরী- বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী অর্থাৎ আসন্ন মুজিববর্ষের প্রধান সমন্বয়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ।  ইতোমধ্যে তাঁকে মুখ্যসচিবের পদ মর্যাদা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সত্তর দশকের সুপরিচিত আধুনিক বাঙালি কবি কামাল চৌধুরী, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন সদস্য হিসাবে সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব হিসেবে গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে অবসর গ্রহণ করেন ।


তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন ছিল বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও বৈভবে ভরপুর। এখানেই কাব্যলক্ষ্মীর সাথে নিবিড় সখ্য, কাব্য আত্মার কাছে  চিরসমর্পণ । এখানেই রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, তসলিমা নাসরিন সহ সমসাময়িক কবিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা । এখানেই কবিতার সঙ্গে চিরকালের গাঁটছড়া । এখানেই নিজেকে কবিতা পথিক বানিয়ে এগিয়ে গেছেন অন্তহীন গন্তব্যে। কবিতা লিখতে লিখতেই এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন সমাজবিজ্ঞানে। কিন্তূ সেখানেই শেষ নয়। ২০০০ সালে সরকারি চাকুরীর অবসরেই নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের বিষয়বস্তু ছিল “গারো জনগোষ্ঠীর মাতৃসূত্রীয় আবাস প্রথা ”। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৮১’র বাংলা একাডেমি বইমেলাকে উপলক্ষ্য করে একদল তরুণ কবি জীবনের প্রথম কাব্যগ্রন্ত প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন । কামাল চৌধুরী তাদেরই একজন। এ উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্রাবিড় প্রকাশনী। একুশের বইমেলাতেই বেরিয়েছিল কামাল চৌধুরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ” মিছিলের সমান বয়সী ” যাতে কবিতা ছিল ৪৮টি। কবিতাগুলোর ভাষা ও শৈলী বলে দেয় মাটি ও মানুষের প্রতি কবি কামাল চৌধুরীর দায়বদ্ধতা কতোখানি ।
১৯৮২ সালে কামাল চৌধুরী বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন সদস্য হিসেবে চাকুরী গ্রহণ করেন। বিভিন্ন পদে চাকুরীর পর ২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব থাকাকালে তিনি একই মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন। পরবর্তীকালে কিছু সময়ের জন্য তথ্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ থেকে ২০১৪ তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর মার্চ ২০১৪ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তাকে সরকারের সিনিয়র সচিব হিসেবে পদোন্নতি প্রদান করা হয়। ২০১৬  সালের শেষ দিকে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রীর মুখ্যসচিব হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী ২০১৩ সালে ইউনেস্কো নির্বাহী বোর্ডে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে ‍ নিয়োগ লাভ করেন। এই নিযুক্তি ছিল ২০১৩- ২০১৭ মেয়াদের জন্য। অধিকন্তু তিনি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউনেস্কো নির্বাহী বোর্ডের ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ২০১৩ থেকে ২০১৫ মেয়াদে। ২০১৬ সালে তিনি ইউনেস্কোর নির্বাহী বোর্ডের কনভেনশনস অ্যান্ড রেকমেনডেশনস- সিআর কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন। ইউনেস্কোর পাঁচটি সাবসিডিয়ারি কমিটি রয়েছে যার মধ্যে সিআর কমিটির একটি। এর সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা বর্তমানে তিরিশ। কনভেনশনস অ্যান্ড রেকমেনডেশনস কমিটি বছরে দুইবার সভায় মিলিত হয়ে ইউনেস্কোর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন সনদ ও সুপারিশ বাস্তবায়ন বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনসমূহ মূল্যায়ন করে। একই সঙ্গে ইউনেস্কোর সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে। এ কমিটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ে আইএলও-ইউনেস্কোর যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন মূল্যায়ন করা । 


কবি কামাল চৌধুরীর কবিতার বিষয়বস্তু প্রেম ও দ্রোহ । সমাজবাস্তবতা ও জীবনচেতনা তাঁর কবিতায কাব্যকর্মের মূলশক্তি। গীতিময়তা তাঁর কবিতার অন্যতম সৌন্দর্য। তাঁর অন্যতম কাব্যগ্রন্থ ” টানাপোড়েনের দিন ” যাতে তিনি মুক্ত ছন্দে নতুন এক কাব্যভাষার অনুশীলন করেছেন। বাংলা কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়। কামাল চৌধুরীর পুরো নাম কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী। ১৯৫৭সালের ২৮ জানুয়ারি ড. কামাল  আব্দুল নাসের চৌধুরী জন্মেছেন কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিজয়করা গ্রামে। বাবা আহমদ হোসেন চৌধুরী ও মা বেগম তাহেরা হোসেনের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ১৯৭৩ সালে নারায়ণগঞ্জের গোদনইল হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা কলেজ থেকে  এইচএসসি পাশ করেন তিনি। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়ন করে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

কবি কামাল চৌধুরীর কবিতায় সমসাময়িক প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। তার প্রথম গ্রন্থের নাম- মিছিলের সমান বয়সী । যার মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে তার কবিসত্তার প্রধান প্রবণতা।   তাঁর কবিতায় রবীন্দ্রনাথ , জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান অবিরল জলের ধারায় সমকালের গান গেয়ে ওঠেন।” বিকেলের কথা মনে আছে ভাঁটফুল
বৃষ্টিতে ভিজে বেড়াতে যে এল কারাপিছল রাস্তা কাদামাখা আঁকাবাঁকাবেড়াবার সুখ দুর্ভোগে দিশেহারা।”কবি কামাল চৌধুরীর কবিতা সম্পর্কে কবি মোহাম্মদ রফিক মন্তব্য করেছেন, “স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জনমানুষের বেদনামথিত উত্থান-পতনের ইতিহাস জানতে হলে আরো কারো কারো সঙ্গে অবশ্য পাঠ্য কামাল চৌধুরীর কবিতা। যে কোনো কবির পক্ষে এই এক বিরাট অর্জন।” তার মতে, ” কামাল চৌধুরী রোমান্টিক ধারণার শেষতম প্রতিনিধিদের একজন। তবে তিনি ব্যতিক্রমী প্রতিনিধি। ব্যতিক্রমী এই কারণে যে, অনুভূতিকে নিজের ভেতরের আত্মস্থ করে নিয়ে ধারণ করে রক্তে-মাংসে-মজ্জায় তাকে দিতে পেরেছেন বস্তুর সংহতি। শব্দ উপমা ও চিত্রকল্পের যথাযথ সংযোজন মূর্ত হয়ে উঠেছে এক সংবেদনশীলতায়- যা একই সঙ্গে কবির নিজের এবং পাঠকেরও বটে। তখন তিনি পাঠক আর প্রতারকবন্ধু নয়, সে কবিরই কাব্যবিশ্বের একান্ত বাসিন্দা। এই সংযোগ বা সংহতি ধ্রুপদী কবিতার অন্যতম লক্ষণ।” সরকার মাসুদ লিখেছেন, “কামাল চৌধুরীর কবিতা মিশ্র অনুভূতির জন্ম দেয়। তিনি প্রধানত রোমান্টিক আবার আধুনিকও। মূলত প্রথানুগ এই কবি কখনও কখনও প্রথাগত কাব্যের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা পেরেছেনও। ছন্দ তাঁর কবিতার এক উল্লেখযোগ্য দিক। তবে বিশুদ্ধ গদ্যকেও তিনি অনেকবার ব্যবহার করেছেন। সেই গদ্য যখন সৃজনী মাত্রা অর্জন করেছে কেবল তখনই তা হয়ে উঠেছে ফলপ্রসূ।”
কামাল চৌধুরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ মিছিলের সমান বয়সী প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। এরপর চাকুরী জীবনের ব্যস্ততা তাকে কবিতা থেকে কিছুটা দূরে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৮১ থেকে ১৯৯০ – টানা নয় বছর কোনো কবিতার বই প্রকাশিত  হয়নি । এই বন্ধ্যাত্ব কেটে যায় ১৯৯১ তে। এ বছর প্রকাশিত হয় কামাল চৌধুরীর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ” টানাপোড়েনের দিন “। অতঃপর একে একে আরো আটটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে :  এই পথ এই কোলাহল (১৯৯৩), এসেছি নিজের ভোরে (১৯৯৫), এই মেঘ বিদ্যুতে ভরা (১৯৯৭), ধূলি ও সাগর দৃশ্য (২০০০), রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল (২০০৩), হে মাটি পৃথিবীপুত্র (২০০৬), প্রেমের কবিতা (২০০৮) এবং পান্থশালার ঘোড়া (২০১০)। ১৯৯৫-এ  প্রকাশিত হয়েছে কবি কামাল চৌধুরীর একটি বাছাই সংকলন ” নির্বাচিত কবিতা ” । এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ তে প্রকাশিত হয়েছে  তার এগারোটি গ্রন্থ থেকে তিন শত নয়টি কবিতা  নিয়ে অনবদ্য কাব্যসঙকলন ।  এছাড়াও ২০০৭-এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কিশোর কবিতা সংকলন ” আপন মনের পাঠশালাতে “। ১৯৯৫ সালে আলী রীয়াজ-এর সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন ” সত্তর দশকের কবিদের কবিতা “। বাংলা সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য বিভিন্ন সময়ে গণমানুষের কবি কামাল চৌধুরী অর্জন করেছেন নানান পুরস্কার: রুদ্র পদক (২০০০) , সৌহার্দ্য সম্মাননা পশ্চিমবঙ্গ(২০০৩), কবিতালাপ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৪) , জীবনানন্দ পুরস্কার (২০০৮),সিটি- আনান্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার (২০১০) , দরিয়ানগর কবিতা সম্মাননা (২০১০)  এবং বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০১২) । জয়তু কবি কামাল চৌধুরী । জয়তু মুজিববর্ষের প্রধান সমন্বয়ক । বাংলা কবিতার আধুনিক শিল্পশক্তিতে এগিয়ে যাবেন অনতিক্রম্য উচ্চতায়- এই শুভকামনা কবিতাপ্রেমিক সকল বাঙালির ……।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪২৯ বার

Share Button

Calendar

June 2020
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930