শিরোনামঃ-


» মৃত্যুঞ্জয়ী নারী

প্রকাশিত: ২৮. জুন. ২০২০ | রবিবার

কাজী আনারকলি

বহুদিন ধরে কপোত কপোতীর চলে প্রেম লীলা
নীরবে নিভৃতে লাল পলাশরূপ গোপন প্রণয়,
পাহাড়ের পাদদেশে ঝর্ণার কুলু কুলু ধ্বনিতে
মিলেমিশে একাকার মোহিনী মায়ার প্রলয়।

হঠাৎ একদিন প্রেমিকা কহে, এবার ঘরে তুলে নাও
দেহটা কেমন লাগে যে ভারী ভারী,
বিষাদের ছায়া নেমে আসে প্রেমিকের মনে
নারী কহে, আর তো লুকাতে নাহি পারি।

রক্ত চক্ষু করে প্রেমিক পুরুষ শুধায় , ভালো কি বাসিস আমারে ?
মৃদু হেসে নারী কহে, কোনো সন্দেহ আছে কি তোমার মনে ?
উদ্ভ্রান্ত পুরুষ কহে , ভালো যদি বেসেই থাকিস
আমার মাথার দিব্যি রইলো, একথা বলবিনে জনে জনে।

তুই তো বারবণিতা ! তুই তো অসতী !
গঙ্গার জলে ডুবে মরে আমারে মুক্তি দে,
আমার কাছে হবেনা কোনো আশ্রয়
এ চরম সত্যি কথাটা আজ জেনে নে।

প্রেমিক পুরুষের পায়ে ঠেকিয়ে মাথা-
কহে অভিমানী নারী
তুমি যা বলবে, আমি তাই মেনে নেবো ,
যদি বল, কৃষ্ণ পক্ষের যে কোনো তিথিতে
নদীতে ঝাঁপ দিতে , তবে তাই দেবো।

গহীন রাতের আঁধারে মনের কষ্ট লুকায়ে
প্রেমিক পুরুষের হাত ধরে পাপিষ্ঠা নারী কহে,
ওগো বন্ধু, আমারে নিয়ে চল সেথায়
যেথায় উদ্দাম গতিবেগে নদী বহে।

প্রেমিক পুরুষ হাতে ঝাঁকানি দিয়ে রুষ্ট চিত্তে বলে, তবে তাই চল
কী রে ?পায়ে শক্তি নাই ? হারামি,অপয়া ! চল তাড়াতাড়ি,
কলঙ্কিত করিস নে, এখনো কাকপক্ষী উঠেনি ডাকি,
লোকে দেখলে তোকে বলবে তুই কুলটা, তুই অসতী নারী !

দক্ষিণ সমুদ্র হতে উত্তাল অনিল আসে ধেয়ে
হতচ্ছাড়া নারীর চোখে মুখে আছড়ে পড়ে,
কালনাগিনী ফণা তুলে ছোবলে ছোবলে
তার আবীর মাখা ঠোঁটকে রক্তাক্ত করে ।

হৃদয় আকাশে বিজলী চমকে চমকে ওঠে
পুরুষের হাত ধরা নারীর হাত হয় আরও শক্ত,
জরায়ুর মুখে বিষ ঢেলে অসতীর চিত্র এঁকে
তারে অসতী বানালো কোন্ সে ভক্ত ?

প্রেম সমাজ সংসার সব আজ তার কাছে মিছে
নদীতে মিশে যাবে – এটাই ইতিহাস ! এটাই সত্যি !
ঐ তো নদী ! এখনি ভেসে যাবে সব প্রেম- রাগ-অনুরাগ
তার শ্লথ পায়ে ফিরে আসে বাঁধ ভাঙ্গা গতি।

পুলকে নারী উথলি উথলি শিহরিয়া ওঠে
গগনের পুঞ্জিভূত মেঘ বজ্রপাত হয়ে ঝরে,
মাতাল নদীর ঘূর্ণাবর্তে আজ প্রেমের সমাধি হবে
মৃত্যুঞ্জয়ী হবে নারী ! আলতো চুমু খায় পুরুষের করে।

বিদায় বন্ধু বরেষু , বিদায় ! ভালো থেকো
রূপ রস গন্ধ ভরা এই বসুন্ধরা কত সুন্দর !
আরও বেশি সুন্দর এ নদীর নিকষ কালো জল !
নারীর হাত ধীরে ধীরে শিথিল হয়, তাকায় প্রেমিক নর।

দৃঢ় কণ্ঠে বলে, তোরে বড্ড ভালোবেসেছিলাম
দুজনার মাঝে এসে দাঁড়ালো যে কিন্তু
কেমনে রুখি তারে ,
আমি যে ব্রাহ্মণ, তুই শূদ্র ! আমাদের প্রেম
সমাজ মানবে না-
আমি এসে খুঁজে নেব, অপেক্ষায় থাকিস ওপারে !

মটামট পত্রে ভরা বৃক্ষ শাখা ভেঙ্গে পড়ে
নারী চক্ষুপত্র উন্মীলন করে ,অধরপল্লব কামড়ে বলে,
আমি ভালোবাসিলাম অনাদি কালের মৃত্যুকে
আমি মৃত্যুঞ্জয়ী হব ! নদীই আমার ভালোবাসা ! হাত চেপে ধরে গলে।

পরদিন খুব প্রত্যুষে প্রেমিক পুরুষ নদীর পাড় ধরে হেঁটে যায়
ঐ তো ! ওই খানে- বালুচরে কী দেখা যায় ?
কার অসাড় দেহ পড়ে আছে ? কিংকর্তব্যবিমূঢ় যেনো !
লোকে লোকারণ্য হলো নদীপাড়, কান্নার রোল উঠে বায়।

কে যেনো বলে উঠে ক্ষীণ কণ্ঠে , দেখেছো ? ঠোঁটের কোণে এখনও হাসিটি লেগে আছে !
নারীর মৃত্যু রহস্য- রহস্যই থেকে যায়-
বালি মাখা নারীর নগ্ন পদতলে
ছোট ছোট প্রশান্ত ঢেউ এসে প্রণাম জানায়।

চারিদিকে উঠে রব, শ্মশানে নিয়ে চল, শ্মশানে-
প্রেমিক পুরুষ কাছে গিয়ে মাথায় হাত রেখে কহে ছাড়িয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস,
না, শ্মশানে নয়। এখানেই, নদী পাড়ে হবে তার সমাধি স্থল
ও যে সতী ! ও যে মৃত্যুঞ্জয়ী ! ও যে আমার বিশ্বাস !

ও ! তাহলে তুমিই নাটের গুরু ! চুপ কর।
ঘনিষ্ঠ বন্ধুবর কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে,
মুহূর্তেই দুচারজন শবচৌকি নিয়ে আসে,
ত্বরা করে নারীকে নেয় কাঁধে তুলে ‌।

নারীর বাড়ির উঠোনে রাখা হয় শবচৌকি
মা দেয়ালে মাথা ঠুকে, বাবা বুক চাপড়ায়,
ডাণ্ডা হাতে খাকি পোশাকধারীরা আসে ,
পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে , নারীর শব মর্গে যায়।

অতঃপর ! কত কাটাছেঁড়া ! আবার কত জোড়া তালি !
প্রেমিক পুরুষ বারবার কহে , নদী পাড়ে হবে তার সমাধি,
শ্মশানে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে চিতার আগুন
কে শোনে কার কথা ! অশান্ত নদী বয়ে চলে নিরবধি।

কাব্যিক রাতের গভীরতা বাড়তে থাকে ক্রমশ
সুনসান নীরবতা ! ইপ্সিত ইচ্ছে পূরণ করতে প্রেমিক হয় শ্মশানচারী !
নারীর দেহভস্ম মুঠোয় পুরে নদীতে ভাসিয়ে দেয়
যদি পাপমুক্ত হওয়া যায় ! পারায়ে যায় বালিয়াড়ি !

১৪/০৫/২০২০

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৩১ বার

Share Button