শিরোনামঃ-


» যে স্বপ্নকে কেবল স্বপ্ন বলে অবহেলা করিনি

প্রকাশিত: ১৪. আগস্ট. ২০২০ | শুক্রবার


সালেহা চৌধুরী

আমার বরাবরই মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মৃিুজবুর রহমান একজন বিশেষ মানুষ। তাঁর ভেতরে অলৌকিকতা আছে। তিনি মেসাইয়া, তিনি এসেছেন আমাদের পৃথিবীটাকে বদলে দিতে। একদিন রাতে তাঁর কথা গভীর করে ভাবছিলাম। তাঁর মৃত্যুকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেক সময় কেটে গেল। বুকের ভেতর দাপাদাপি, হারানোর কষ্ট। মনে মনে ভাবছি আজ আমি তাঁকে নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখব। এমনতো কতই হয় একজনকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলে মানুষ তাকেই স্বপ্নে দেখে। সে রাতে আমি যে স্বপ্ন দেখেছিলাম সে এমন Ñ দেখছি রাস্তার পাশে কেউ যেন একটা নলকুপ দিয়েছে আর এক দল গরীব দুস্থ শিশু পরম তৃপ্তিতে পানি পান করছে। তাদের চিৎকার কথা হাসাহাসি দেখতে দেখতে সকাল হয়ে গেল।
আমি জেগে উঠলাম। মনে পড়লো পৃথিবীর নানা দেশের খাবার পানি না থাকার কষ্টের কথা। দীর্ঘ পথ হেঁটে তারা যায় পানি আনতে। আফ্রিকা মহাদেশে এই কষ্ট সবচেয়ে বেশি। যে পানি তারা আনে সেখানে ময়লা, পচা পাতা পোকা মাকড়, নানা অসুখের জীবানু কিলবিল করে।। ‘ওয়াটার এড’ নামের সংস্থা এদের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করে। লোকের কাছে টাকা চায়, সাহায্য দিতে বলে। আমি ওদের ফোন করলাম। বললাম প্রতি মাসে আমি কিছু টাকা দিতে চাই। ওরা বললো Ñ তাহলে ব্যাংকে একটা স্টান্ডিং- অর্ডার দিয়ে দিন। প্রতিমাসে ওখান থেকে টাকা আমাদের কাছে চলে আসবে। এরপর অনেক ধন্যবাদ জানায়।
আমি বাড়িতে ফোন করে আমাদের বাড়িতে তখন যে লোকটি বাড়ি পাহারা দিত তাকে বলি Ñ আমি গ্রামে কিছু নলকুপ দিতে চাই তুমি খোঁজ নিয়ে দেখ কাদের নলকুপ দরকার। তছির আমাদের পুরাতন ভৃত্য। আমার শশুর বাড়ি থেকে আমাদের সংসারে এসেছে। বয়স বাহাত্তর। অবশ্য প্রথমে ওর আত্মীয় স্বজন সকলের কথাই আমাকে বলে। পাঁচ মেয়ে এরপর চাচাতো মামাতো ভাইবোন। কাছের আত্মীয় কুটুম। আমি ভাবি ঠিক আছে ওদের অবশ্যই দরকার নলকুপের না হলে বলবে কেন? এটা তো কোন খাবার জিনিস না। যে খেয়ে ফেলবে। ওর নিজের পছন্দের লোকজন শেষ হলে তারপর এখানে ওখানে। ও বলে দিন দিন পানির গভীরতা বাড়ছে মানে পানির লেভেল সমানে নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। কলের খরচও বাড়ছে। এরপর আসে আর এক সিসটেম যাকে বলা হয় Ñ ভার্টিকাল। এই ভার্টিকাল সিসটেমে কল দেবার খরচ আরো একটু বেড়ে যায়। মানে ভার্টিকালি নল বসাতে হবে তাহলে পানি আসবে। পানির লেভেল নিচে নামছে তাই এ ব্যবস্থা। ( এই ঘটনা ভয়ের সকলে স্বীকার করেন কিনা জানি না।)
আমি লন্ডন থেকে দেশে গেছি। আমার নলকুপ দেবার বা কাদের নলকুপ লাগবে খবর দেবার পুরাতন ভৃত্য বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে। আমি প্রশ্ন করি Ñ কি খবর তছির তুমি এবার কোনখানে কল দিলা? ও হেসে বলে Ñ এবারে যেখানে কল দিলাম সেটা রাস্তার ধারে। আশে পাশে কোন কল নাই। ছোলপোলের খুব কষ্ট। এখন ভাবী রোজদিন কত ছোলপোল আসে পানি খায়। কত আনন্দ করে। মনে পড়ে গেল স্বপ্নের কথা। বললাম Ñ তুমি একটা ফটো তুলে আনতে পারবে?
একদিন যখন ফটো আসে দেখতে পারি আমার স্বপ্নের সেই দৃশ্য। একদল ছেলেপুলে খুব আনন্দে পানি পান করছে।
আমি যার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তারই কারণে স্বপ্ন টাকে অবহেলা করতে পারি নি। আমাকে কে যেন বলছে তৃষ্ণার্তকে পানি পান করাতে হবে। এ আমার বিশ্বাস। আজো টাকা যায় ‘ওয়াটারএডে’। খুব বেশি না। কিন্তু নিয়মিত। তছির মারা গেছে। ঢাকার বাসায় দিনে দুপুরে মৃত তছির এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। আজো সে দৃশ্য স্পষ্ট। তাহলে ঘটনা টি বলতে হয়। তছির মারা যাবার পর জুয়েল বলে একজন দশ বছর হলো আমার দেখাশোনা করে। অবর্তমানে বাড়ি পাহারা দেয়। একদিন ওকে বলি Ñ বাড়িতে তো খবরের কাগজের পাহাড় হয়ে গেছে। শিশিবোতল ওয়ালাকে বেচে দিস বা দিয়ে দিস তোর যা ইচ্ছা। ও বলে আচ্ছা। তখন দশটা হবে। আমি শোবার ঘর থেকে বাইরে বেরিয়েছি হঠাৎ দেখি একটু দূরে খাবার টেবিলের পেছনে একজন দাঁড়িয়ে আছে। আমি চিৎকার করে বলি Ñ জুয়েল তুই কি করেছিস রে? শিশিবোতলওযালাকে উপরে এনে বাড়ির ভেতরে ঢুকিয়েছিস? আমি এইসব বলতে বলতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি হঠাৎ মনে হলো এতো তছির। কাছে যেতে না যেতেই সেই মানুষ অদৃশ্য। হাওয়া। কিন্তু যে ভাবে ও আমার দিকে তাকিয়েছিল তাতে মনে হয়েছে কিছু একটা বলতে ও আমার কাছে এসেছিল। কি বলতে? এখন আর আমি কেন নলকুপ বসাই না? না অন্যকিছু। সকলে কি ওর মত যতœ নিয়ে কাজ করবে? জুয়েল একসময় নিচ থেকে ফিরে আসে। ও কোন কাগজশিশিবোতল ওয়ালাকে উপরে আনেনি। ও অবাক। বলে না আম্মা আমি তো কাউকে উপরে আসতে বলিনি। ( এ গল্প মানে এই নয় আমার সামান্য দানের গল্প করা। এই জন্য বলা Ñ কেবল তাঁর কথা ভেবে স্বপ্নকে স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দিতে পারিনি।)
পৃথিবীর সহ রহস্যের অর্থ আমার জানা নেই। জাতির আত্মা আমি আপনার নির্দেশ মনে করে আপনাকে ভালোবেসে এই টুকু করছি। আর সকলে যদি আপনার কথা মানে তাহলে ‘আমাদের পৃথিবী হয়ে যাবে আর এক পৃথিবী। আলোর ও ভালোবাসার পৃথিবী।’ সহজসরল দূণীর্তিমুক্ত পৃথিবী। ফিডাল কাস্ট্রো বলেছিলেন Ñ ‘আমি হিমালয় দেখিনি তবে শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেছি।’ আমি বলি Ñ আমি জানি তিনি নিজেই বিশাল এক ফুলের বাগান। তাঁর উদার হ্রদয় আর মানুষের জন্য ভালোবাসা তুলনাহীন। আমাদের নিঃস্ব করে তিনি চলে গেছেন।

তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি একটি কবিতা নিবেদন করছি Ñ

তবু অন্য পৃথিবী

দীর্ঘ পথ একা হেঁটে চলা
প্রতিক্ষা শান্তির বৃক্ষ, চন্দনের ঘ্রাণ,
আর ব্যপ্তি বটের।
ক্লান্ত প্রাণ বিভুঁয়ে খুঁজে ফেরে আত্মার
বিশ্রামাগার। দেশে ফেরার ভাবনা।
যেমন নদী পৌঁছে যায় সমুদ্রে।
একদিন জেনেছি ঘরে ফেরার উৎসবে
আর কোন সুখবর নেই।
কোন এক নির্মম কালো রাত
উৎপাটিত মহা-বৃক্ষ, আত্মার আলয়,
নদী যেতে পারে না সাগরে,
বিদীর্ণ হ্রদয়, বিচূর্ণ আঘাত !
নেই আর জাতির আত্মা
ধুকপুক হ্রদয় জেনেছে সে কথা। ্
এক সেঁজ আলো, এক আকাশ নীল,
নিঃস্ব পৃথিবী আজো আছে, আছে পাখি,
মহাসন্মেলনের গমগম স্মৃতি!
আহা সেই কণ্ঠস্বর! শব্দ শিলাবৃষ্টি
আমার পৃথিবী আজ অন্য পৃথিবী।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৫২ বার

Share Button