» রবীন্দ্রনাথের শ্রীহট্ট ভাষণ

প্রকাশিত: ২৩. ডিসেম্বর. ২০১৯ | সোমবার


নৃপেন্দ্রলাল দাশ

১.
রবীন্দ্রনাথ যেমন কবি সার্বভৌম, তেমনি তিনি ভাষণভাস্কর। বাগীশ্বর তিনি বক্তৃতা শৈলীতে ও। পরিব্রাজন ও ভাষণ জীবনব্যাপী তাঁর জীবন পাত্রকে পূর্ণতা দান করেছে। পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই অবধাবিত ভাবে ভাষণ দান করেছেন। ১৯৩১ সনে অক্সফোর্ডে হিবার্ট বক্তৃতা দিয়েছেন ‘জবষরমরড়হ ড়হ গধহ’ নামে আবার একই বিষয়ে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কমলা বক্তৃতা’ ১৯৩৩ সালে ‘মানুষের ধর্ম’ নামে। ওরালটেয়ারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গধহ’ নামে ভাষণ দেন ১৯৩৩ সনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেন গবধহরহম ড়ভ অৎঃং নামে।
শান্তিনিকেতনে ১৩১৫ থেকে ১৩২২ এর মধ্যে ‘শান্তিনিকেতন’ ভাষণ দান করেন ১৩ খ-ে যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। রামকৃষ্ণ জন্ম শত-বার্ষিকীতে সভাপতির ভাষণ দিয়েছিলেন ইংরেজিতে ১৯৩৭ সালে। ভারতীয় দর্শন কংগ্রেসে ১৯২৫ সনে ‘ঞযব চযরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ ড়ঁৎ ঢ়বড়ঢ়ষব’ নামে সভাপতির ভাষণ দান করেন।
হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত ভাষণ ঝধফযধহধ (১৯১৪) নামে প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকায় যেসব বক্তৃতা দিয়েছেন সেগুলি চবৎংড়হধষরঃু (১৯১৭) নামে প্রকাশিত হয়েছে। জাপানে প্রদত্ত ভাষণ ঘধঃরড়হধষরংস (১৯১৭) নামে প্রকাশিত হয়েছে। ঈৎবধঃরাব টহরঃু নামে ১৯২২ সালে আরেকটি ভাষণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের এই বক্তৃতা বিষয়ের সুমেধা ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই শ্রীহট্ট ভাষণকে অনুভবের সত্যে প্রকাশ করবো।

২.
বাঙ্গালীর সাধনা
৬ নভেম্বর, ১৯১৯, ২০ কার্তিক, বৃহস্পতিবার ১৩২৬ লোকনাথ রতনমনি টাউন হলে সিলেটের সর্বস্তরের জনগনের পক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এক গন সংবর্ধনা দেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া) সাহেব। সকাল দশটায় সভা আরম্ভ হয়। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের সমাবেশ হয়। সভার প্রারম্ভে সভাপতি আবদুল মজিদ উর্দু ভাষায় মহাকবিকে উদ্দেশ্য করে বলেন-
ডক্টর সাহেব রবীন্দ্র্রনাথ ঠাকুর, আপযো সিলেট মে তশরীপ লে আয়ে, ইসলিয়ে সিলহেট কা হামারে সব বহুত খুশ হওয়া ……. ইত্যাদি।

উর্দু বক্তৃতা শুনে রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করেন তিনি বাংলায় না ইংরেজিতে ভাষণ দেবেন। উর্দুতে তো কিছুই বলতে পারবো না।

১৩২৬ বাংলার পৌষ সংখ্যা প্রবাসী পত্রিকায় এই ভাষণ প্রকাশিত হয়। ভাষণটি অনুলিখন করেন মনোরঞ্জন চৌধুরী ও উপেন্দ্র নারায়ন সিংহ। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত কবি প্রণামের পরিশিষ্টে ভাষনটি মুদ্রিত হয়। প্রায় এক ঘন্টা ব্যাপী রবীন্দ্রনাথ ভাষণ দান করেন। প্রথমে আস্তে আস্তে ও পরে উচ্চ কণ্ঠে কবি ‘বাঙ্গালীর সাধনা’ বিষয়ে ভাষণ দান করেন।

বাঙ্গালীর সাধনা, সন্ধান ও সিদ্ধি

শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথ এক দর্শন প্রস্থানে উপনীত হয়েছিলেন। যাকে নাম দিয়েছিলেন ‘মানব ধর্ম’। তাঁর জীবন দেবতা তত্ত্বেরই এক পরিচিত রূপ যেন এই দর্শন। শ্রীহট্টে প্রদত্ত ভাষণ ‘বাঙ্গালীর সাধনা’ ও সেই অনুভবেরই সমীপবর্তী। তাঁর দার্শনিক প্রত্যয় এখানেও মানবসত্যে সুনিকেত তুল্য।
ভাষনের প্রারম্ভে রবীন্দ্রনাথ বলেন,
‘আজ আপনাদের কাছ থেকে এই যে অভ্যর্থনা লাভ করলেম সে জন্যে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। কিন্তু সেই সঙ্গে একটি কথা না বলে থাকতে পারিনে যে, উচ্চমঞ্চে স্বতন্ত্র হয়ে বসে জনসংঘের কাছে নিজের যশোগান স্থির হয়ে শোনা বড় কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষার হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের চেষ্টা অনেকবার অনেক স্থলে করেছি, সে চেষ্টা অনেকবারই নিষ্ফল হয়েছে।’

এই সৌজন্য শোভন সম্ভাষণের পর মহাকবি তাঁর মূল বক্তব্যে বলেন ‘আজ এই সভাতে আপনাদের সঙ্গে আমার এই যে যোগ হল সে কেবল মাত্র সাহিত্যের যশ নিয়ে নয়। এর ভিতরে একটি গূঢ় কথা আছে যা খ্যাতির চেয়ে অনেক বড়। সে কথাটা এই যে বাংলাদেশের লোক আপনার মধ্যে একটি শক্তির জাগরণ- অনুভব করছে।’
এই জাগরণই তাঁকে মানবিকী প্রত্যয়ে শক্তিমান করেছে। তাঁর মানব ধর্মে আছেন মানবদেবতা, ঈশ্বর নেই। সে কারণেই তিনি মুক্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন এক ধ্রুববাণী। এক গোধূলি পর্যায়ের চিরায়ত বিশ্বাসের কথা। সে কথা তাঁর সমগ্র জীবনের পূর্ণতাকে প্রকাশ করে।

রবীন্দ্রনাথের মানবতত্ত্বকে মধ্যযুগের সন্ত সাধক ও বাউলেরা মানুষরতন বোধকেই বিস্তারিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ লোক কবিদের দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন কারণ তারা গানে ও বাণীতে ভেদহীন মানুষের কথাই বলেছেন। ঞযব জবষরমরড়হ ড়ভ গধহ ভাষণে তাই তিনি বলেছেন এড়ফ-সধহ (ঘধৎধ ঘধৎধুধহধ) রং ঃযবু ফবভরহরঃরড়হ, রঃ রং হড়ঃ ধ ফবষঁংরড়হ

হে চিরকালের মানুষ, হে সকল মানুষের মানুষ,
পরিত্রাণ করো
ভেদচিহ্নের তিলকপরা
সংকীর্ণতার ঔদ্ধত্য থেকে।
হে মহান পুরুষ, ধন্য আমি, দেখেছি তোমাকে
তামসের পরপার হতে
আমি ব্রাজ, আমি জাতিহারা।

‘আমি এটা অনুভব করি যে, ভারতে বাঙ্গালীর একটি বিশেষ সাধনা আছে।’ এই অনুভবকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন সকল ভেদের মুলে গিয়ে অভেদকে দেখা। যারা দেখেছেন তাঁরা ভক্ত সাধক। তারা বড় সেনাপতি বা বড় রাষ্ট্রনীতিক নন। তারা মাটির কাছাকাছি মানুষ। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন জাপান বা ইংল-ের মত জাতিগত সহজ ঐক্য আমাদের নেই।
ধর্মে ও আচারে বিরোধ আছে।
আমাদের সম্মিলনের সহজ-সূত্র ও তিনি দেখিয়েছেন- ‘আমাদের দেশকে আমরা যদি মাতৃভূমি বলেই মানি তা হলে সর্ব্বত্র মাতাকে উপলব্ধি করা চাই।
বাঙালির সাধনার স্বরূপ সম্পর্কে তিনি তাত্ত্বিক ভাষণ দান করেন। বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে তিনি এক নিজস্ব প্রস্থানে বিচার করেছেন। রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক কুল লক্ষণ বিচার করে তাই রবীন্দ্র ভাবুক ড. ভবতোষ দত্ত লিখেছেন- ‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর’ জীবনের শেষ দশকে একটি সুস্পষ্ট দার্শনিক প্রত্যয়ে উপনীত হয়েছিলেন, তার নাম তিনি দিয়েছিলেন- মানুষের ধন।১

সিলেট জেলার সমাজ সংহতির কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘এই যে এ জিলায় হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি বাস করে এরা বাঙালী জাতি রচনার বিচ্ছিন্ন উপকরণভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধ।’ এসব কথা বলার আগে তিনি বলেছেন- বাঙালীর শক্তি যদি সৃষ্টি শক্তি, যদি আত্মোৎর্জ্জনের শক্তিই হয়, তা হলেই নানা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন জাতির উগ্র বিরোধের সমাধান করে এক বিরাট সভাকে সে গড়ে তুলতে পারবে।

বাঙালির সাধনাকে তিনি ঐতিহাসিক নানা স্তরের ভাব ও বিরোধের মধ্যে স্থাপন করেছেন। তাঁর মৌল দৃষ্টি সহায়ে দেখাবার চেষ্টা করেছেন বাঙালি জাতির সত্ত্বার মধ্যেই নিহিত আছে এক সমন্বয় ধর্ম। যা স্থানিক নানা রূপ সহ পূর্ণতার সাধনাই করেছে। যাকে মানবধর্ম বলা হয়েছে। প্রাচীন ভারতের উপনিষদের দর্শনে, পুরান কাহিনীতে তা প্রবাহিত হয়েছিল। পরে ব্যক্তি প্রভায় বিস্তারিত হয়েছে, বুদ্ধের নিরীশ্বরবাদী নৈতিকতায়, প্রভু যীশুর প্রেমে, ইসলামের সাম্যে আর লোকায়ত বাউল ফকিরের মানবিক বোধে। এই মানবিকী বিদ্যাকে রাধাকৃঞ্চন বলেছেন- - True humanism tells us that there is something more in man than is apparent in his ordinary consciousness, something which frames ideals and thoughts a finer spiritual presence, which makes him dissatisfied with more earthly pursuits.2 মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকীতে কবির ভাষণ সম্পর্কে মন্তব্য করা হয় এভাবে-

gyivwiPvu` K‡jR evwl©Kx‡Z Kwei fvlY m¤ú‡K© gšÍe¨ Kiv nq Gfv‡e-
Let us hope Rabi Babis speech will when the outlook of our students and in spire them to think noble thought. speak noble words and perform noble acts (Murarichand College Magazine 1919 voll-III, No-2)

‘ভবিষ্য’ পত্রিকার পাঠের সঙ্গে মূল ভাষণের অমিল অনেক ক্ষেত্রেই প্রকট। আকাক্সক্ষার মূল সুর সেখানে প্রতিধ্বনিত হয়নি।

আকাঙক্ষা

মুরারিচাঁদ কলেজের ছাত্রাবাসে মহাকবি আকাক্সক্ষা বক্তৃতাটি দান করেন ২১ কার্তিক ১৩২৬। কবি প্রণামে বলা হয়েছে ১৮ কার্তিক। সেটা সঠিক নয়। প্রায় চার হাজার শ্রেুাতার সামনে রবীন্দ্রনাথ ভাষণ উপস্থাপন করেন। ছাত্ররা শোভাযাত্রা সহকারে কবিকে হোস্টেলে নিয়ে যায়। তখন এম.সি. কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন জ্যোতি বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ অপূর্ব চন্দ্র দত্ত। ‘আকাক্সক্ষা’ নামের ভাষণাটি ২১ কার্তিক ১৩২৬, ৭ নভেম্বর ১৯১৯ দুপুরে প্রদত্ত হয়। মহাকবি নিজেই বক্তৃতাটির ইংরেজি অনুবাদ করেন ‘ঞড়ধিৎফং ঃযব ভঁঃঁৎব’ নামে। ১৯২০ সনের জুন মাসের ‘মডার্ণ রিভিয়্যূ’ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। ‘শান্তিনিকেতন’ পত্রিকার পৌষ সংখ্যা ১৩২৬ বাংলায় আকাক্সক্ষা মুদ্রিত হয়।
শিলচর থেকে প্রকাশিত নগেন্দ্র চন্দ্র শ্যাম বি.এল. সম্পাদিত ‘ভবিষ্যৎ’ পত্রিকার ১ম বর্ষ, শেষ সংখ্যা, আশ্বিন, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ ‘আকাক্সক্ষা’ ভাষণটির একটি ভিন্ন পাঠ- ‘ছাত্রদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের উপদেশ’ নামে প্রকাশিত হয় ভাষণটি প্রদানের সাত বছর পর। সেখানে বক্তৃতার তারিখ ভুল ছিল। ১৯১৯-১১ নভেম্বর সকাল ৮ টা। সৈয়দ মুর্তাজা আলী তাঁর জীবন কথা- ‘আমাদের কালের কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন তৎকালীন ছাত্র আবদুল্লাহ চৌধুরী, সৈয়দ মোস্তফা আলী, সৈয়দ মুর্তাজা আলী ও সৈয়দ মুজতবা আলী ভাষণটি অনুলিখন করে ছিলেন। ‘কবি প্রণামে’ লেখা হয়েছে পাদটীকায় অনুলেখক হচ্ছেন উপেন্দ্রনারায়ন চৌধুরী ও মনোরঞ্জন চৌধুরী। সব লেখন মিলিয়েই শুদ্ধ পাঠ তৈরী করা হয়।

‘নোটবুকের পত্রপুট মেলে ধরে মুষ্টি ভিক্ষা’ করাকে রবীন্দ্রনাথ ধিক্কার দিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন তাঁর ‘আকাক্সক্ষার দারিদ্র ও উন্নয়ন শতবর্ষ পূর্বে সিলেটে রবীন্দ্রনাথের ভাষণ-
প্রবন্ধে বলেছেন- ‘আকাক্সক্ষা প্রবন্ধে (ভাষণ) ইউরোপের উচ্চাকাক্সক্ষা ও বৃহত্তর জ্ঞানান্বেষণের পেছনে ক্ষমতা লিপ্ততার অন্তর্লীন যোগাযোগ রবীন্দ্রনাথের চোখে বড় হয়ে দেখা দেয়নি।’ ‘কালান্তরে’ এসে ১৯৩৭ সালে তাঁর মনোভঙ্গির পরিবর্তন হয় বলে তিনি মন্তব্যকার হয়েছেন। লার্নিং ক্রাইসিস বা জানার সংকট বিষয়ে তিনি অর্থনীতিবিদ ল্যাল্ট প্রিচেটের ভাবনার ও বিবরণ দিয়েছে।

আমরা মনে করি আকাক্সক্ষার দারিদ্রই মানুষের চরম দারিদ্র। রবীন্দ্রনাথ সেই দুঃখ হরণেরই গান গেয়েছেন।

‘আকাক্সক্ষা’ বক্তৃতা শুনেই সৈয়দ মুজতবা আলী রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি লেখেন এই প্রশ্ন করে- কীভাবে আকাক্সক্ষাকে বড়ো করা যায়? উত্তরে রবীন্দ্র্রনাথ লিখেছিলেন, এত দূর থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায় স্বার্থশূন্য হয়ে কাজ করে আকাক্সক্ষাকে বড়ো করা যায়। এই একটি বক্তৃতাই মুজতবা আলীর জীবনকে পাল্টে দেয়। তিনি বহুভাষাবিদ প-িত ও রবীন্দ্র পরিকররূপে খ্যাতকীর্তি ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন আকাক্সক্ষাকে বড়ো করে। এই ভাষণ এক কালজয়ী প্রভাব ফেলে ছিল সিলেটের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে।

সূচনায় রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘এই যে ছাত্ররা এখানে আমাকে আহ্বান করেছে এটা আমার আনন্দের কথা। ছাত্রদের মধ্যে আমার আসন আমি সহজেই গ্রহণ করতে পারি। সে কিন্তু গুরুরূপে নয়, তাদের কাছে এসে, তাদের মধ্যে বসে’।

এই বক্তৃতার প্রারম্ভিক পর্বে তিনি বৃদ্ধদের সম্পর্কে বলেছেন- ‘বুড়োদের ওপর বাঁধা হুকুম রয়েছে জায়গা ছেড়ে দেবার মধ্যে।’ ‘অসীমের তো জরা নেই’ তাই সৃষ্টিকে পেছনে বাঁধা পড়তে দিতে চান না রবীন্দ্রনাথ। বৃদ্ধ সেজে তিনি উপদেশ দিতে চান না কেবল নবীনদের কাছে সহ্য আকাক্সক্ষার কথা বলতে এসেছেন। তিনি আমাদের দারিদ্রকে বলেছেন ‘আত্মারই দারিদ্র’। বিদ্যালয়ে ছাত্ররা ভর্তি হয়েছে ‘শিখব না আমরা পাশ করব’। এ কথা বলেই আকাক্সক্ষাকে বড়ো করার কথা বলেছেন।

সারা পৃথিবীতে য়ূরোপ শিক্ষকতার ভার পেয়েছে গায়ের জোরে নয়। গায়ের জোরে গুরু হওয়া যায় না। ইউরোপের মানুষ বিপুল আকাক্সক্ষাকে নিয়তই নানা ক্ষেত্রে প্রকাশ করছে এবং জয়ী হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এ জন্যেই আকাক্সক্ষাকে বড় করার কথা বলেছেন।

‘আকাক্সক্ষা’ ভাষণটিতে রবীন্দ্রনাথ উপনিষদ থেকে চারটি বাণী উৎকলন করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যাবে সিলেটের’ই সুসন্তান সুখময় সপ্ততীর্থ রচিত সংস্কৃত অনুশীলনে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে। কল্যানী শঙ্কর ঘটকের ‘রবীন্দ্রনাথ ও সংস্কৃত সাহিত্য’ গ্রন্থে তথ্যনিষ্ট আলোচনা আছে শম্পা মজুমদারের রবীন্দ্র সংস্কৃতির ভারতী রূপও উৎস (১৯৭২) গ্রন্থে।

‘আত্মানং বিদ্ধি’ মানে আত্মাকে জানো। ছাত্রদের সামনে তার এই চরম উপদেশ। ‘নাল্পে সুখম-িত’ অল্পেতে সুখ নেই। ভুমাই সুখ। এই ভূমাকেই বিশেষভাবে জানতে হবে।

‘আকাক্সক্ষা’ বক্তৃতাটির মূল কথা হলো ‘শক্তি কারো বড়, কারো ছোট- কিন্তু আকাক্সক্ষাকে আমরা ছোট করবো না।’ ছোটকাল থেকেই আমরা আকাক্সক্ষাকে খর্ব করি। মহৎ মানুষ এ জন্যে জন্মগ্রহণ করে না। বড়ো আকাক্সক্ষা আমাদের নেই। সমাপ্তিতে এসে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
‘যখন না দিতে পারি তখন কেবল হয়ত ভিক্ষা পাই, যখন দিতে পারি তখন আপনাকে পাই।’

‘Personality’ ’ ভাষণ গ্রন্থে বিশ্বকবি এ রকম মনোভাবের কথাই বলেছেন-We have seen that forms of things and their changes have no absulute reality at all.

শতবর্ষ পরে ও রবীন্দ্রনাথের ‘আকাক্সক্ষা’ বক্তৃতার প্রতিপাদ্য বিষয় বাতিল হয়ে যায়নি। এখন ও নানা অন্ধ বিশ্বাসে আচারে, সংকীর্ণ বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়ে প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের আকাক্সক্ষাকে ছোট করে চলেছি। বাঙালি উচ্চবিত্ত সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠাচ্ছে, আমরা নিমজ্জ্বিত হচ্ছি পপ গানে। দর্শন এখনও চর্বিত চর্বনে সীমাবদ্ধ উন্নত চিন্তন ও বিজ্ঞান মানমতার কোথাও মহত্তম আকাক্সক্ষার কোন চাষবাস নেই। চিরসখা রবীন্দ্রনাথ আকাক্সক্ষাকে বড় করার কথা বলে গেলেও আমরা বাসন হয়েই আছি।১.

ভবতোষ দত্ত-বাঙালির মানবধর্ম (১৪০৬), মিত্র ও ঘোষ, কল-৭৩, পৃষ্টা-৮২
Radha Krishna- Eastern Religions and western though-1986, P-25.

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৮৯ বার

Share Button

Calendar

July 2020
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031