» রবীন্দ্রনাথ আমাদের সঙ্গে সব কাজে

প্রকাশিত: ০৭. আগস্ট. ২০২০ | শুক্রবার


সালেহা চৌধুরী

আজ রবীন্দ্রনাথের চলে যাওয়ার দিন। কিন্তু তিনি কি চলে গেছেন? না। তিনি আমাদের সঙ্গে, আমাদের ভাবনায়, মননে ও মনোজগতে সারাক্ষণ আছেন। আমার মনে পড়ছে ১৯৬১ সালের তাঁর জন্ম শতবার্ষিকীর কথা। আমি তখন কেবল হলিক্রশ কলেজে ভর্তি হয়েছি। পাশের বাড়ির মন্দিরার সঙ্গে রোজদিন কলেজে যাই। র‌্যাংকিন স্ট্রিট থেকে হলিক্রশ কলেজ। রিকশা ভাড়া এক টাকা। আসার সময় ওদের গাড়িতে বাড়ি আসি। পথে কত সব গল্প। কত সব সাহিত্য। শুনলাম রবীন্দ্রশতবার্ষিকী হবে। মন্দির হবে শ্যামা আর কামাল লোহানি ব্রজসেন। ওদের বাড়িতে রিহার্সাল হবে। আমি রোজদিন রিহার্সাল দেখতে যাই। রংপুর থেকে আমার আব্বা তখন ঢাকায় বদলি হয়েছেন। ঢাকার জগত আমার কাছে নতুন। রিহার্সেলের লোকজনের দিকে মানে যারা আর সব ভুমিকায় অংশ নেবেন, গান করবেন, তাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। ফাহমিদা মজিদ, ফরিদা মজিদ, দুলাল তালুকদার, এনামুল কবির, জাহেদুর রহিম, চৌধুরী আবদুর রহিম আরো কত কে? দেখি অবাক হয়ে। তারপর একদিন শ্যামা মঞ্চে নামে। অসাধারণ সেই অনুভূতি। সামনের সারিতে বসে সেই নৃত্যুনাট্য দেখার আনন্দ ভুলে যাই কি করে?
আজ অনেকদিন পরে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু লিখতে গিয়ে ১৯৬১ সালের সেই সোনালি সময়ের কথা বার বার মনে পড়ছে। আর মনে পড়ছে এক বিশাল গ্রন্থ। যে গ্রন্থ সংকলিত ও সম্পাদনা করেছেন সাহিত্য এ্যাকাডেমি দিল্লি। সেই বছর রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে সাহিত্য এ্যাকাডেমি, দিল্লি যে বইটি প্রকাশ করেন তাঁর কথা আমি তখন জানিনি। জেনেছি নব্বই এর দশকে যখন কানাইদা ( কানাই দত্ত, গ্রন্থকুটীরের কর্ণধার) কোলকাতা থেকে আমাকে রবীন্দ্র রচনাবলী এনে দেন এবং সঙ্গে দুটো বই দেন। একটি ‘গোল্ডেন বুক অফ ট্যাগোর’ এবং অন্যটি রবীন্দ্র জন্ম শত বার্ষিকী উপলক্ষেই সংকলিত দেশ বিদেশের নানা গুনীজনের লেখা বিশাল কলেবরের গ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথ ১৮৬১ -১৯৬১। সেইসব বিদেশী গুনীজনের ভেতর Ñ লেনার্ড এল্মহার্স্ট, ভিকটোরিয়া ওকাম্পো, মূলক রাজ আনন্দ, আরনল্ড আড্রিয়ান বেক, ভেরা ব্রিটেন, রিচার্ড চার্চ, তোসিকিকো ক্যাটায়ামা, পার্ল এস বাক এবং আরো অনেকে আছেন। বুদ্ধদেব বসুর রবীন্দ্রনাথের গদ্যের উপর রচনাটি বার বার পড়েছি। সবই ইংরাজিতে লেখা। কারণ যারা লিখেছেন এবং যারা পাঠ করবেন সকলে বাংলা জানেন না, তাই।
এর ভেতরে পার্ল এস বাকের ছোট লেখাটি আমি অনুবাদ করে দিলাম। এই নারী আমার অন্যতম প্রিয় লেখক। যার জন্ম ২৬ সে জুন ১৮৮২ এবং মৃত্যু ৬ মার্চ ১৯৭৩। আমার মত অনেকেই যার ‘গুডআথর্’ পড়েছেন এবং ভালোবেসেছেন।
তাঁর রচনার নাম Ñ এ ওয়ার্লড পোয়েট। বাংলায় যা বিশ্ব কবি।
‘আজ আমি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু লিখতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পেরে খুবই সুখী ও সন্মানিত বোধ করছি। আজ আমরা সকলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তাঁর জন্মদিনে স্মরণ করছি। পশ্চিমের জগতে গান্ধিজির পরেই যে নাম সকলে জানে তিনি রবীন্দ্রনাথ। এও জানি এই দুইজনের কথা পশ্চিমের জগতে একই ভাবে আলোচিত হয় না। তাঁদের দুইজনের অবদান দুই রকম। তাঁদের দুইজনের প্রভাবও দুই রকম। গান্ধিজির প্রভাব রাজনৈতিক জগতে। তবে অমিলের ভেতরে মিলও আছে। যদিও আমরা জানি রবীন্দ্রনাথের প্রভাব আমাদের মননে আমাদের সৌন্দয়বোধের কাছে। তিনি মন ও আত্মার কারবারী। রবীন্দ্রনাথ মানুষের মন ও চেতনাকে বার বার ধাবিত করতে চেয়েছেন ঈশ্বরের দিকে। গান্ধিজী মানুষের সেবার ভেতর দিয়ে ঈশ্বর সেবার কথা কি বলেননি? রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর কোন সংকীর্ণ ঈশ্বর নন। যে ঈশ্বর প্রয়োজন মত মানুষ নিজে সৃষ্টি করে সেই ঈশ্বর নন। রবীন্দ্রনাথ ধরতে চেয়েছেন সমস্ত পৃথিবীর আত্মার নির্মল সুরটি। যে সুর কোন সংকীর্ন গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয় বরং সবকিছুর উর্দ্ধে।
আর তাইতো আমি বলি সত্যিকার অর্থে তিনি বিশ্বকবি। তাঁর নির্বাচিত শব্দাবলীর হাতিয়ারের আসল কথাইতো সৌন্দর্যবোধ। যে বোধ আমাদের ইন্দ্রিয়ের কাছে আবেদনময়। কিন্তু তা কোনকালেই ইন্দ্রিয়সুখের কথা বলে না। সেখানে কেবল ঈশ্বর আর মানুষের ভালোবাসার কথা নেই আছে মানুষের ভালোবাসার কথা। যে ভালোবাসার রূপরেখা বিশ্বজনীন ও অর্নিবান। যে ভালোবাসাই একদিন ঈশ্বরকে কাছে এনে দেয়। এক বিশাল গভীর সৌন্দর্যবোধ ছড়িয়ে যায় সারা পৃথিবীতে। মানুষের হ্রদয় বোঝে সে সৌন্দর্যের বাণী। আমাদের পৃথিবীতে এমন কবি দরকার। প্রশ্ন জাগতে পারে এই কবি কি আমাদের অতীতে ঠেলে দেন না ভবিষ্যতের কথা বলেন। তিনি যদি ভবিষ্যতে ঠেলে দিতে চান তাহলে তিনি আমাদের হারাবেন কারণ তাঁর মত ভবিষ্যতদ্রষ্টা আমরা নই। তাঁর মত অšর্তদৃষ্টি আমাদের নেই। আর তিনি যদি কেবল অতীতে আমাদের ঠেলে দেন তাহলে আমরা কেউ বয়স্ক হব না আমাদের বোধ আর বুদ্ধির বয়স বাড়বে না। রবীন্দ্রনাথ এসব পরিহার করেন। যদিও তাঁর দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে মানুষের ভবিষ্যতে। মানুষ সেই ভবিষতে পৌঁছাবে বর্তমানের ভেতর দিয়ে। তার লেখা ভালোত্ব ও সৌন্দর্যবোধের মিশ্রনে এক ধরণের প্রেরণা যার সারাৎসার Ñ ভালোবাসা। কবি বর্তমানেই বাঁচেন, সৌন্দর্যবোধ চিরকালের এবং তাঁর চিন্তার আবেদন অপরাজেয়। মানুষের আত্মার প্রশান্তি। মনের তৃপ্তি এবং গভীর গোপন হ্রদয়ের সুচারু অভিলাষের কবি তিনি। মহান কবি জানতেন মানুষের সত্যিকার অর্থে কি প্রয়োজন। আর সেই কারণেই আজ আমরা তাঁর শতবর্ষ পালন করছি। এই যন্ত্রনাময় পৃথিবীতে তাঁকে মনে করা শুভ। বার বার ভাবতে হয় সেই সৌন্দর্যবোধের কথা যা ফুলের মত অম্লান। রবীন্দ্রনাথ নামের মহৎকরি বার বার সেই খবরই দিয়েছেন যাকে এক কথায় বলা যায় Ñ বিশ্বমানবের সৌন্দর্যবোধের বাণী। এই বাণী চিরন্তনী। এ আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়। যা বর্তমানের এবং চিরকালের। আজ আমি অনেকের সঙ্গে এক হয়ে তাঁর কথা ভাবছি, তাঁর বাণীকে মনে করছি, তাঁকে দেখা বা জানার স্মৃতিতে ভরপুর হয়ে আছি।


আমি সেই দেশকে অভিবাদন জানাই যে দেশের আলোতে হাওয়াতে তিনি বড় হয়েছেন, সেই মা ও বাবাকে স্মরণ করি যারা তাঁকে পৃথিবীতে এনেছেন, তাঁর প্রতিভা বিকাশে ভুমিকা রেখেছেন, তাঁকে যতœ করে প্রতিপালন করেছেন। আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাদের জন্য।’
এই হলো পার্ল বাকের কথা। যিনি রবীন্দ্রনাথে খুঁজে পেয়েছেন বিশ্বজনীনতা, ভালোবাসা, সৌন্দর্যবোধ, ঈশ্বর, এবং বর্তমানের কথা। আমরা যখন শুনি তাঁর গান আমরা কি নিজেদের ভাগ্যবান মনে করি না? সাহিত্যের অন্যান্য দিকের কথা বাদই থাকলো। কেবল গানই আমাদের চিরকালের আনন্দ ও সৌন্দর্যবোধের কথা বলে যাবে। ‘তখন বিন্দু বিন্দ ঝরে জল’ এই তো রবীন্দ্রনাথের চলে যাওয়ার গান। সেই বিন্দুতে কি থাকে? কেবল আনন্দ ও ভালোবাসা। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন , রবীন্দ্রনাথ আমাদের সেই গৃহদেবতা যাকে আমাদের মনে করতেই হয়।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবিদসে কোন গভীর শোকের কথা আমার মনে পড়ছে না। কেবল মনে পড়ছে তিনি যা দিয়ে গেছেন সেই সোনার ফসলের কথা। তিনি সবসময় আমাদের মধ্যে থাকবেন।
মন্দিরাদের বাড়ি আমাকে প্রথম রবীন্দ্রনাথকে অনেক বেশি ভালোবাসতে শেখায়। আমাদের বন্ধুত্ব আজো অটুট। যাদের ওদের বাড়িতে দেখেছিলাম তাদের অনেকেই এই পৃথিবীতে নেই। কিন্তু আমরা আজো আছি। আমার মেয়ের নাম দিঠি আর ওর মেয়ের নামও যে দিঠি। কেমন করে? সে তো অনেক বড় গল্প।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৩১ বার

Share Button

Calendar

September 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930