শিরোনামঃ-


» রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম , উত্তাল সারা দেশ

প্রকাশিত: ১৮. ডিসেম্বর. ২০১৯ | বুধবার

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ঘোষিত স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের নাম আসায় উত্তাল সারা দেশ । রাজাকারের তালিকায় আগুন দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার চক্রবর্তী । ক্ষোভ আর সন্দেহের মধ্যে দ্রুত ভুল সংশোধন করে নতুন তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের নেতারা ।
সেই সঙ্গে এই ভুলের পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও করেছেন ।

সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, দালাল আইনের আওয়তায় তালিকাভুক্ত রাজাকারদের গেজেট অনুসরণ করা হলে এই বিভ্রান্তি তৈরি হত না। রাজাকারের এই তালিকা প্রকাশের আগে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা ছিল জরুরি।

বিজয় দিবসের আগের দিন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ১০ হাজার ৭৮৯ জন ‘স্বাধীনতাবিরোধীর’ ওই তালিকা প্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের সরকারের কাছে বিভিন্ন মহল থেকে স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকা প্রকাশের দাবি করা হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে।

তারই প্রেক্ষিতে প্রথম দফায় এই তালিকা প্রকাশের পর বরিশাল, বরগুনা, রাজশাহী, বগুড়া ও ঝালকাঠি জেলার মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও আওয়ামী লীগ নেতাদের কয়েকজনের নাম এ তালিকায় দেখে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধারা। কোথাও কোথাও বিক্ষোভ কর্মসূচিও দেওয়া হয়েছে।

রাজাকারের তালিকায় আগুন দিয়েছেন বরিশালের মুক্তিযোদ্ধা ও আইনজীবী তপন কুমার চক্রবর্তী। মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর অশ্বিনীকুমার হলের সমানে এই প্রতিবাদ জানান তিনি।

এর আগে রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) বরিশাল জেলা শাখা।

সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার চক্রবর্তীর মেয়ে ও শহীদ জায়া উষার নাতি মনীষা চক্রবর্তী বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা তপন চক্রবর্তী ও শহীদ জায়ার নাম রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা শুধু শহীদ পরিবারের জন্য নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব মানুষের জন্য লজ্জাজনক। বরিশাল বাসদের সদস্যসচিব হওয়ায় আমার পরিবারের সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন আচরণ করা হয়েছে

রাজাকারের তালিকায় নাম এসেছে রাজশাহীর অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ নামে একজনের, যাকে বলা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা গোলাম আরিফ টিপুর নামই রাজাকারের তালিকায় তুলে দেওয়া হয়েছে।

ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর যোদ্ধা টিপু মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত রাজাকারের তালিকায় আমার নাম যুক্ত থাকায় আমি হতবাক, বিস্মিত, মর্মাহত ও অপমানিত।

বুঝে পেলাম না কোথা থেকে এই শক্তিটা তারা পেলেন। মনে হয় মুক্তিযোদ্ধা সংস্থায় (মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়) যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের অশুভ বা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তির অবস্থান কিছুটা রয়ে গেছে এবং সেখান থেকেই এই ব্যাপারগুলো হচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে।

এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে তিনি বলেন, রাজশাহীকে ইনকাম ট্যাক্সের অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম, যার পরিবারের চার-পাঁচজন সদস্য শহীদ হয়েছেন; তিনি, মিয়া মহসীন এবং আমাকে রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কীভাবে রাজাকার আল বদরের তালিকায় তালিকাভুক্ত হল, উৎস কারা, তা খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে ।

বরিশালের ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী ও তার মা শহীদজায়া উষা রানী চক্রবর্তীর নাম স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় এসেছে, যা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছে।

বরগুনার পাথরঘাটা মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি, পাথরঘাটা থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত মজিবুল হকের নাম এই তালিকায় আসায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সাংগঠনিক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মজিবুল হক মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি এবং তৎকালীন থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকে তৎকালীন বরগুনা মহকুমার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ মাস্টার ধরে এনে বেশ কিছুদিন আটকে রেখেছিলেন। এমনকি পাকিস্তানি বাহিনীর পটুয়াখালী কমান্ডার মেজর নাদের পারভেজের কাছেও তাকে নেওয়া হয়েছিল।

বগুড়ার বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতার নাম তালিকায় থাকায় বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করে তালিকাটি সংশোধনের দাবি জানান মুক্তিযোদ্ধারা।

আদমদীঘি থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল হামিদ বক্তব্যে বলেন, তালিকায় ১৮ নম্বরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি কছিম উদ্দিন আহম্মেদের নাম। কছিম উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী এখনও ভাতা উত্তোলন করেন।

এছাড়া আওয়ামী লীগের সাবেক এমএলএ মজিবর রহমান (আক্কেলপুর), মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার মনছুর আলী, আওয়ামী লীগের সাবেক উপজেলা সভাপতি তাহের উদ্দীন সরদার, সাবেক রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা জাহান আলী, সান্তাহার কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম এবং আওয়ামী লীগ নেতা ফয়েজ উদ্দীন আহম্মেদের নামও রয়েছে বলে অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধারা জানান।

এ তালিকায় ঝালকাঠি জেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক জেলা কমান্ডার প্রয়াত শামসুল আলম ওরফে সামশুর নাম আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার পরিবারসহ স্থানীয়রা।

তালিকায় সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের দুই সংগঠক প্রয়াত আব্দুল লতিফ মির্জা ও সদ্য প্রয়াত অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলমের নাম থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তাদের স্বজন ও সহযোদ্ধারা।

মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের প্রথম দফায় প্রকাশিত এই তালিকা বাতিল এবং তালিকা প্রস্তুতকারীদের বিচার দাবি করেছেন তারা।

মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সন্তানদের ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে এদিন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেছেন, একাত্তরে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন না, এমন কারো নাম সরকারের প্রকাশিত স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় এসে থাকলে তা বাদ দেওয়া হবে।

তবে ভুলের অভিযোগ অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী বলেছেন, এই তালিকাটি ১৯৭১ সালে করা। আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংগ্রহ করেছি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এ বিষয়ে বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা সরবরাহ করার সময় যেসব ব্যক্তির নাম-মামলা প্রত্যাহার হয়েছিল, সে বিষয়ে ‘নোট’ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তালিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে ওই সব ‘নোট’ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ওই নোটগুলো বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী তালিকা আবার প্রকাশ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নতুন নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ডা. এম এ হাসানও।

তিনি মঙ্গলবার বলেন, সরকারের উদ্যোগটা ভালো। শান্তি কমিটির নামটি আগে আসা উচিত, যেহেতু তারাই রাজাকার তৈরি করেছে। এখন দ্রুত বিনয়ের সঙ্গে, নম্রতার সঙ্গে, অবনতভাবে ভুল স্বীকার করে সংশোধনের জন্য সময় চাওয়া উচিত। যাদের নামে আপত্তি এসেছে, তাদের বাদ দিয়ে বাকিদের নিয়ে [১১ হাজার যেটুকু করেছে সেটুকুর মধ্যে] দ্রুত ক্রসচেক করে নতুন করে পাবলিশ করা উচিত।

কী কারণে এই ভুল, যেসব কর্মকর্তা (মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের) কাজ করছেন, তাদের মধ্যে কেউ রাজাকার-আল বদরদের উত্তরসূরি কি না তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এম এ হাসান মনে করেন, দালালদের তালিকা অনুসরণ করলে ৩৭ হাজারের নাম-পরিচয় পাওয়া যেত, তা অনুসরণ করে গেজেট প্রকাশ করা হলে এমন বিভ্রান্তি হত না।

খুব দ্রুততার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভুলের অবসানের দাবি জানিয়ে একাত্তরের সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের মহাসচিব হারুন হাবীব বলেন, “আমরা মনে করি, এ ধরনের তালিকা অত্যন্ত জরুরি ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু এ তালিকায় অসঙ্গতি, ভুলের অভিযোগ এসেছে; এসব অভিযোগ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এবং সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। ভুলগুলোর ব্যাখ্যাও প্রদান করবে। এটা আমরা আশা করি ও দাবি করি।”

তিনি বলেন, “১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক-আধা সামরিক আমলে যে সরকারগুলো ছিল তারা মুক্তিযদ্ধের চেতনার, আদর্শের ধারক ছিল না; তার বিরোধী ছিল। সে সময়ে রাজাকার, আল বদর, আল শামস, মুজাহিদ বাহিনী, শান্তি কমিটির অনেক তালিকাও লোপাট করা হয়েছে, নষ্ট করা হয়েছে। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম থেকে আমরা মনে করি, যারা যারা এ কাজগুলো করেছে এবং কীভাবে করেছে; সরকার থেকে মুক্তিযুদ্ধের সরকার এটা। তাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া দরকার এবং অপরাধীদের শনাক্ত করা দরকার।”

সাংবাদিক হারুন হাবীবের মতে, রাজাকারদের প্রথম তালিকা বলায়ও এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।কারণ ১৯৭৩ সালে দালাল আইনের মাধ্যমে যে ৩৭ হাজারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে ২৬ হাজারকে কম অপরাধের কারণে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ৭৫২ জনের বিচার হয়েছিল এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছিল।

তারপরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর যে ১১ হাজার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে স্বাধীনতাবিরোধী, আলবদর, রাজাকাররা জেলে ছিল- সেই তালিকাটি যদি এরা পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করে তাহলে এ বিভ্রান্তির কারণ থাকে না। এ তালিকাগুলো গেজেটেড হয়েছিল সে সময়ে। সরকারের কোনো না কোনো মহলে রয়েছে।

রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংগঠনের সভাপতি শাহরিয়ার কবির জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমরা রাজাকারের তালিকা নিয়ে তদন্ত (খোঁজখবর) করছি। তালিকায় মুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে ঢুকল তা নিয়ে জেলায় জেলায় তদন্ত করছি। তদন্ত প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার পেশ করব।

শাহরিয়ার কবির বলেন, এক নামে দুই লোক থাকতে পারে। টেম্পারিং কীভাবে হয়েছে, তা স্পটে গিয়ে দেখতে হবে। বহু কিছু দেখার বিষয় রয়েছে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৯৬ বার

Share Button