» রেড ক্যাপসিকাম

প্রকাশিত: ০৭. এপ্রিল. ২০১৮ | শনিবার

জেসমিন মুন্ নি

ছোট গাছটির সাদা ফুল থেকে বেড়িয়ে আসে হালকা সবুজ রঙের একটি মরিচ, তার পর আস্তে আস্তে টকটকে লাল। কোন আঙ্গিনায় না, ঢাকা শহরে সেটা কল্পনা করাও অকল্পনীয়। গাছটি বেড়ে উঠেছে একটি মাঝারি মাটির টবে। আটতলা ফ্লাটের ২ফিট বাই ৫ফিট একটি বারান্দায়। বারান্দাটি দক্ষিণ- পশ্চিম কোন হওয়াতে সেখানে সারাক্ষণ রোদের কোন কমতি নেই। বাবা বলেছিল, এটির জন্ম স্থান আমেরিকার নিরক্ষীয় অঞ্চল। ব্রাজিলই এই মরিচের জন্মস্থান। ক্যাপসিকাম জন্মানো জন্য ৩০ ডিগ্রী তাপমাত্রা যথেষ্ট হলেও তাপমাত্রা ও আলো নিয়ন্ত্রণ করে বছর ব্যাপী এর চাষ করা যায়।’
ভিন দেশী এক গাছকে পলি হাউজ পদ্ধতিতে নিজের আয়ত্তে এনে ফুল থেকে ফল ফলানোর মধ্যে বিশাল কিছু অর্জনের মতো মনে হল। অনেক আকঙ্খার পর আসা গর্ভের সন্তানটির মতো সেও ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছিল।
ছোটবেলা থেকে শুনে আসছিলাম মরিচগাছ আমাদের বংশে সহ্য হয় না। আমার বড় ফুফু মরিচ গাছ লাগিয়ে সেদিন সন্ধ্যায় আকষ্মিত মারা যাওয়ার ঘটনাটা ছোট বেলা থেকে গল্পের মতো শুনে আসলেও কুসংস্কার ভেবে উড়িয়ে দিতাম, আবার শঙ্কিতও হতাম। দোটানা মন নিয়ে ভাবতাম, কারণ ছাড়া এই পৃথিবীতে কিছুই ঘটে না। ভুরুতে ভাঁজ ফেলে বলতাম, ওনার মৃত্যুর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিল, বাবার মতো তার রক্তেও কোলেস্টরল বেশী ছিল অথবা রক্তের ভেইন সাধারণের চেয়ে এক দেড় মিলিমিটার ন্যারো ছিল। তখন কে এতোসব পরীক্ষা করিয়েছিল!
সব কিছুর বুঝে-শুনেও মরিচের দিকে তাকিয়ে আমার বেলা যেত,বমি বমি ভাব কেটে যেত। এ জাতিয় মারচগাছ অতিরিক্ত খরা ও জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না বলে সেদিকে খেয়াল দিতাম। নিড়ানি দিয়ে গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতাম, মরিচের ভারে গাছ নুয়ে না যায় তাই খুটি দিয়ে বেঁেধ রাখলাম, জাবপোকার আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য পাতাগুলো পানি ¯েপ্র করে টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে দিতাম, একদিন পর একদিন পানি দিতাম,পর্যাপ্ত রোদ পায় কিনা সেই দিকে খেয়াল নিতাম। কাঁচি দিয়ে অপ্রয়োজনীয় পাতা কেটে দিতাম। এমন কি টবগুলোও ভিজা ন্যাকড়া দিয়ে প্রতিদিন মুছতাম। অফিস করে এসে বুয়ার হাতের রান্না নাকে-মুখে দিয়ে গাছের কাছে বসে পড়তাম। গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দিতাম। মরিচের বংশভূত হলেও ক্যাপসিকামকে বলতে গেলে এক প্রকার ক্যাবেজ কিংবা ব্রকলির মতো বিদেশী স্ববজি মনে হত। প্রবল বাগান করার ইচ্ছা শক্তি থেকেই এই গাছকে এ্যাডাপ্ট করা। এর আগে একই টবে ছিল বেশ পুরোনো একটা ক্যাকটাস। ক্যাকটাসটি টেক্রাস থেকে আসা আমার বড় চাচার কাছ থেকে এনেছিলাম। এর ওর কাছ থেকে, বিভিন্ন নার্সারি ঘুরে প্রায় অর্ধশত ক্যাকটাস কালেকশনে ছিল। সেগুলো আমার ফ্লাটের বারান্দা, করিডোর, বসারঘর, শোবারঘরে সৌন্দর্য বর্ধন করছিল। গাছগুলো ঘরের একটি অংশের মতো হয়েগিয়েছিল। মনে হতো গাছগুলো আর কোথাও না আমার ঐসব জায়গাগুলোয় বেড়ে উঠতে পেরে নিজেদের জীবন আনন্দিত ও সার্থক মনে করতো। রেহানেরও কোনো অভিযোগ ছিল না। হঠাৎ সেদিন কাইফ-এর বার্থডে পার্টিতে তোরাবের মা শায়লাভাবী ক্যাকটাসগুলো দেখে আৎকে ওঠে! গলার স্বর প্রায় সপ্তস্বরে উঠিয়ে সবাইকে ডেকে বলে, তাইতো বলি, ভাবীর সংসারে কেন এতো বিপদ লেগে থাকে! দ্যাখেন দ্যাখেন, এতো ক্যাকটাস! ওমা আপনি তো ধ্বংশ হয়ে যাবেন? জানেন ক্যাকটাস হচ্ছে দোজখের গাছ। ফল নাই, ফুল নাই, সারা শরীরে কী রকম বিচ্ছিরি কাঁটা!!যে সব জিনিস পৃথিবীতে দোজখের নিদর্শন আছে,তার মধ্যে ক্যাকটাস একটা। হায়দ্রাবাদে আমার দাদুর প বাড়ির পাশে মালেক সাহেবের পরিবার চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে গেছে একমাত্র এই ক্যাটাসের জন্য!
ভয় ও আতঙ্ক মিশ্রিত আমার অসহায় দৃষ্টিকে আরো অসহায় করার জন্য বলে, বিশ্বাস না হয় আপনি এক্ষুণি দাদুকে ফোন করে জিজ্ঞেস করতে পারেন। আমার ফ্যাকাসে মুখ দিয়ে অস্ফুটিত ভাবে ‘না’ বের হতেই সে আরো একধাপ গলা চড়িয়ে বলে, আজই ছাই-পাশ ফেলে দিন, তারপর দেখবেন-ভাইয়ার প্রমোশন, আপনার পোস্টিং, আপনার সঙ্গে আন্টির সম্পর্ক সব ঠিক হয়ে গেছে ।
নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না, কেননা এসবই যা আমি নিজে উগড়ে ছিলাম মুঠোফোনের মাধ্যমে তার কাছে, আজ জনসম্মুখে সে সুদ সমেত ফেরত দিল। সব গেস্টদের সামনে একদম বোকা বনে গেলাম। পরিস্থিতি সাভাবিক করার জন্য মনে শক্তি সঞ্চার করে ভ্রু কুঞ্চিত করে বললাম,না, মানে.. ক্যাকটাসে তো ফুল হয়.. তাছাড়া এযুগে কুসংস্কার বিশ্বাস করা!!’
মুরুব্বিদের মতো ধমকের সুরে শায়লাভাবী আমাকে থামিয়ে চোখ মুখ উল্টিয়ে বলে, ফুল না ছাই! ওনার দৃষ্টি দেখে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। মাও এসব ক্ষেত্রে আমাদের চোখ দিয়ে শাষন করতো। ভাবী এবার শিক্ষকের রূপ নিলেন, বললেন, কথায় আছে না বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর। আপনার ভাল চাই বলে সাবধান করে দিলাম। বিশ্বাস অবিশ্বাস আপনার ব্যাপার!’
ছোট বেলা থেকে বিভিন্নগাছের ব্যাপারে শুনতাম, যেমন মানিপ্লান গাছ ঘরে থাকলে নাকি টাকা আসে, বকুল গাছে রাতের বেলায় পরীরা নাচে, হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণে সাপ আসে..। বকুল ও হাসনাহেনা গাছ আমার নানা বাড়িতে ছিল, জীবনে কেউ পরী কিংবা সাপ দেখেছে বলে শুনি নি। আমার মামার বাড়ির পুরোণো কাজের মহিলা যাকে জন্মের পর থেকে দেখে আসছি, যাকে আমরা সবাই খালা বলে সম্মোধন করতাম তার বাড়িতে প্রথম আমি কুলার মতো বিশাল সাইজের মানিপ্লানটসের পাতা দেখেছিলাম। কই তার তো কোনো টাকা ছিল না, ভিটেটা ছাড়া! অবশ্য খালার মৃত্যুর পর তার ছেলে টিটুভাই আমেরিকার ডিবি পাওয়ার সুবাদে ভিটেটাও বিক্রি করে এখন আমেরিকান।
এ সব কারণে মায়ের কাছে শোনা মরিচগাছ লাগানোর পরের দিন ফুপুর মৃত্যুর ঘটনাটা একটা দুর্ঘটনাই মনে হতো। উল্টো গাছের উপকারিতা সম্পর্কে নিজেকে পন্ডিতাম্মন্য মনে করে সবাইকে জ্ঞান দিতাম। বলতাম, তোমরা ওসব বাজে কথা না ভেবে বরং পরিবেশ সংরক্ষণে এর অবদান ও ঔষধিগুণ সম্পর্কে ভাব! গ্রীন হাউজের ব্যাপারে বোঝাতাম। আরো বলতাম,এতো বড় বড় ব্যাপার বাদই দিলাম। একটি মরিচগাছ কোনো বাড়িতে থাকলে তাদের সারা বছর মরিচ কিনে খেতে হয় না। অনেকে যখন বলতো, মরিচ গাছের কথা বাদ দাও; ক্যাকটাস আমাদের কী উপকারে আসে তাই বল? নিজেকে সামলে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতাম, বড় চাচার কাছে শুনেছি, আমাদের দেশে এটা মানুষের শখের জিনিস হলেও বিভিন্ন দেশে এই ক্যাকটাস অনেক উপকারি গাছ। এরা শিকড়ের মধ্যে পানি সংগ্রহ করে পরিবেশের ভারসম্য বজায় রাখে। টেক্্রাসে হাজার বছরের ক্যাকটাস আছে..তাছাড়া ভারতের রাজস্থানে তো একে মরুভূমির গোলাপ বলা হয়!…যাই হোক যতই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় পাশ দিয়ে আসুক না কেন ক্যাকটাস সম্পর্কে শায়লাভাবীর কথাগুলো ছিল আমার মায়ের মতামতের মতোই। কথাগুলো শোনার পর আমারও মনের সব যুক্তি তর্কগুলো মাথার মধ্যে টগবগ করতে থাকে। আমার কুসংস্কারে বিশ্বাস না থাকলেও টগবগিয়ে ওঠা বিশ্বাসগুলো ক্রমশ উপচে পরে। মনকে ভাবায়িত করে, সন্ধিহান করে.. ব্যাপারগুলো একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। শাশুড়ি রেহানা বেগমের বিশাল বাড়িতে এককোণে পোর্চের উপর ঝুলন্ত উদ্যানে আমার লাগানো ক্যাকটাসগুলো মানিয়ে গেলেও তাঁর হৃদয় ক্যাকটাসের কাঁটার খোঁচায় ক্ষত বিক্ষত হচ্ছিল। যেটা আমি টের পাই নি। একদিন ইচ্ছাকৃতভাবে আমার শাশুড়ি তার বোগেনভেলিয়ার গাছ ছাঁটতে গিয়ে কয়েকটি ক্যাকটাস কেটে ফেলে।
অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে এরকম দৃশ্য দেখে হিতাহিত জ্ঞান শূণ্য হয়ে নিজের রাগকে সংযত করতে পারিনি। উল্টাসিদা কিছু বললে শাশুড়িও ছেড়ে কথা বলেনি। এক সময় তো বলেই ফেলে, ভালো না লাগলে বাড়ি থেকে বেড় হয়ে যাও।’
এভাবে শুরু এবং শেষ; তারপর আলাদা হওয়া। এই ক্যাকটাসই কী পরোক্ষভাবে দায়ী না ঢাকা শহরে এই যুগে বউ-শাশুড়ি একই ছাদের নিচে দীর্ঘ ৫বছর একসঙ্গে বসবাস করা সংসার বিভক্ত করার জন্য! যেখানে পশ্চিমা ধাঁচে বেড়ে ওঠা চাকরীজীবি মেয়েদের কাছে পরিবারের সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়ে গেছে অনেক আগে। যারা মনে করত পরিবার মানে হাসব্যান্ড-ওয়াইফ ও বাচ্চা। এবং সেখানে পেট এ্যানিমেলের জন্য একটি রুম বরাদ্দ থাকলেও বাবা ও মার জন্য কোনো রুম থাকে না। আমি অবশ্য সে বাতাসে পাল উড়াই নি আমার মাকে দেখে। আমার মা সারাজীবন নিঃস্বার্থভাবে যৌথ পরিবারের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে গেছেন। আমাকে অনেক বোঝাবার পরেও শুধুমাত্র শাশুড়িকে শিক্ষা দেবার জন্য সেদিন বেড়িয়ে এসেছিলাম। এর জন্য অবশ্য এক তরফাভাবে ক্যাকটাসকে দায়ী করা ঠিক হবে না। কারণ দেখালে হাজারটা দেখান যাবে।.. তবুও আলাদা হয়ে আমার ভালই লাগছিল। ফ্লাটে ওঠার পর মনের মতো করে ক্যাকটাস কালেকশন করেছি। শুধু ক্যাকটাস না ঘরের প্রতিটি কোণা মনের মাধুরি মিশিয়ে সাজিয়েছি। জীবনকে মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়াল দিতে দিয়েছি নিজের আকাশে। উপভোগ করেছি প্রতিটি মুহূর্ত। সব কিছু ঠিক ভাবেই চলছিল শুধুমাত্র চাকরীতে রেহানের প্রোমশন এবং আমার বনানী থেকে উত্তরায় পোস্টিং হলে কাইফকে অনেক বেশী সময় দিতে পারবো এইসব সুবিধার কথা ভেবে উচ্চপদস্থ কয়েকজনকে তোশামদে ব্যাস্ত ছিলাম। বিষয়টা নিয়ে বোকার মত মাত্রাতিরিক্ত ভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম বলে কয়েকজনের কানে চলে গিয়েছিল। এবং সুযোগ মতো শায়লাভাবী আমার কাঁটা ঘায়ে লবনের ছিটা দিয়ে গেল। ক্যাকটাসের কথা বাদ দিলাম, তারও প্রায় কয়েক বছর আগে মায়ের কারণে ১০বছরের বনসাইটি নিজ হাতে ধ্বংস করতে হয়েছিল পেটে সন্তান আসায়। দীর্ঘ কয়েক বছরের পরিচর্চায় গাছটি বিকশিত হয়েছিল আমার মতো করে, তার নিজের মতো করে না। পুরাণ চীন-জাপানের সাধকদের ধৈর্যের পরিচায়ক বনসাই চর্চায় অনূপ্রাণিত হয়েছিলাম এমএ পরীক্ষার পর। বাবা যখন তার সময় আঙ্গুর ফুলে কলা গাছ হওয়া বন্ধুদের কাছে আমার চাকরীর জন্য ঘুরে ঘুরে জুতার তলা ক্ষয় করছিল। অন্যদিকে মা ম্যাচ ম্যাকিং প্রতিষ্ঠানে বিয়ের ব্যাপারে ছবি জমা দিচ্ছিল। মধ্যখানে আমি অলস সময় পার করার জন্য বনসাই ট্রেনিং শেষে একটি জির বট গাছকে বাড়ির কার্নিশ থেকে তুলে এনে পরিচর্চা শুরু করলাম। বনসাই চর্চার ১বছরের মাথায় চাকরী ও ৪ বছর পর বিয়ে হলে, তারও ৫ বছরের মাথায় অনেক চেষ্টার পর সন্তান পেটে আসলে, ৫+৫=১০ বছরের সাধনার সম্পদ বনসাইটিকে হত্যা করেছিলাম নিজের স্বার্থের কারণে। এমনটা না করলে আমার পেটের সন্তান নাকি বনসাইয়ের মতো হতো! হত্যা বলছি কারণ, আমি গাছটিকে উপরে ফেলেছিলাম। সেদিনের পর নিজের বিবেকের তাড়নায় পরপর কয়েক রাত ঘুমাতে পারতাম না। স্বপ্নে দেখতাম, আমার পেটে একটি বনসাই বেড়ে উঠছে। যার হাত, পাগুলো ছোট ছোট। যে দেখতে একেবারে আমার বনসাইটির মতো। আমি বিস্ময় দৃষ্টিতে উপুর হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকি, দেখি কী সুন্দর চোখ দিয়ে সে আমাকে দেখছে! আমার চোখের কোন ভিঁজে ওঠে.. এক সময় মা কেঁদ না বলে, তার হাতের মতো ডাল দিয়ে জড়িয়ে ধরলে আবেশে আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে যায়। এক সময় তার মুখ থেকে স্পস্ট কথা বের হয়। বলে, চল মা গাছ হয়ে যাই… মানুষ হয়ে জন্মাতে আমার ভাল লাগে না। কোনো কিছু বোঝার আগেই অনূভব করি আমার পা থেকে শিকড় বেড়িয়ে মাটি আকড়ে ধরছে। চোখের সামনে সব ঘটছে অথচ শত চেষ্টা করেও এক চুল পরিমান নড়তে পারছিলাম না । মা.. মা.. বলে জোড়ে জোড়ে চিৎকার করলে সেও মা..মা.. করছিল। সবাই আমার পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ কেউ আমার কথা শুনছে না। বনসাই সন্তানটি মা..মা.. বলে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেই যাচ্ছে, মা ভয় পেও না, দেখবে গাছের জীবন কত পরম আনন্দের, কত চরম নিঃস্বার্থের! ..আমি নিরবে শরীরের সব শক্তি দিয়ে মাটি থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য প্রেসার দিলে দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হল্াে..। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে দেখি বিছানা ঘামে জবুথবু.. চিৎকার করে সবাইকে জরো করলে দেখে, রক্তের চাপ বিপদ সীমা অতিক্রম করেছে । বিষয়টা নিয়ে সবাই বলা বলি করছিল, হিতে বিপরীত হলো না তো! বনসাইটা থাকলে কী এমন অসুবিধা হত! এখন তো দেখি দু’জনের প্রাণ নিয়ে টানাটানি!’ যাই হোক সেই যাত্রায় কোনো রকমের রক্ষা পেয়েছিলাম আর্লি অপরেশন করিয়ে। জন্মের পরে কাইফকে দেখার জন্য উদগ্রীব হলে সবাই বলে, দেখ কী সুন্দর বাচ্চা! তবে নাকটা একেবারে পিনাকিউর মতো লম্বা তাই না! আমার বুকটা ধক করে ওঠে। দ্রুত কোলে নিয়ে খুঁটে খুটেঁ দেখি কোথাও স্বপ্নেরটার সঙ্গে মিল আছে কিনা। নাহ! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।
কাইফ-এর ৫ম জন্মদিনে শায়লাভাবীর বলা কথাগুলোর শুনে কাজের মেয়েটাকে দিয়ে ক্যাকটাসের টবগুলোকে ছাদে পাঠিয়ে দিলাম। ভাবলাম ফ্লাটের ছাদে অযতেœ, অনাদরে গাছগুলো এক সময় মরে যাবে। যদিও ক্যাকটাসে বেশী পানি না লাগলেও অতিরিক্ত পানিতে এক সময় মরে যাবে ভাবতেই মনটা কেঁপে ওঠে। এক জীবনে গাছ নিয়ে আমাকে অনেক বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে- শুধু বনসাই আর ক্যাকটাস না জায়গার অভাবে আম্প্রপালি ও ভাসুরের হজ্ব থেকে নিয়ে আসা খেঁজুরের বীচি থেকে জন্ম নেয়া সৌদি আরবের খেঁজুরের গাছকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখেছি। আম্প্রপালি আমগাছের শখ ছিল বাবার, তাই আমটি খেয়ে আটিটি আলগোছে একটি টবে রেখেছিলাম চারা করে বাবাকে দেব বলে। কিছুদিন পর আটি ফেটে চারা বের হলে আমার সন্তান জন্ম দেবার চাইতে বেশী আনন্দ হতে থাকে। দেখতে দেখতে চোখের সামনে গাছটি ডাঙ্গর হতে থাকেলে ব্যস্ত হয়ে পরি গাছটি ভাবষ্যত নিয়ে। তার জন্য একখন্ড মাটি। কোথায় মাটি! ঢাকা শহরে সেটা আদোও সম্ভব! বাবাকে বলি, এই নাও তোমার আম গাছ।’
বাবা হা হয়ে বলে, এটা দিয়ে এখন কী করব!’ কেননা বাবার বাড়ি ততদিনে বিল্ডার্সদের দয়ায় বিশাল ৮ তলা ফ্লাট। অন্যদিকে সিটিকর্পোরেশ উন্নয়নের নামে ওপেন ড্রেন ও রাস্তা প্রশস্ত করার নিমিত্তে এলাকার পুরানো গাছ কেটে ফেলছিল। এক ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা নাই। গ্রামের বাড়িতেও একখন্ড মাটি নাই, সব বাপ-চাচাদের বংশধর আর কাঠগাছের দখলে। নিজের ফ্লাটের টবে পরে থাকতে থাকতে পাতা লাল হয়ে কুকড়ে মরে গেল। তেমনিভবে খেঁজুর গাছটিও। এদিকে ক্যাকটাসগুলো ঘর থেকে বের করে দেবার পর কাকতালীয় ভাবে আমার সংসারে ম্যালা উন্নতি হতে থাকে। স্বামীর প্রমোশন, আমার উত্তরা বাঞ্চে পোস্টিং, নতুন গাড়ি এমন কী আমার পুনরায় কন্সিপ করা। যার জন্য আমি অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম। ভাবছিলাম, এবার একটা মেয়ে হলে মন্দ হয় না। ছেলে হোক মেয়ে হোক একটি সন্তানই যথেষ্ট সরকারের এই শ্লোগান বদলে দেবার জন্য নতুন উদ্যোমে মাঠে নামলাম। সফলও হলাম, সাড়ে তিন মাস কোন রকম প্রবলেম ছাড়া কেরী করছিলাম.. এতোকিছুর পরেও মনটা তৃপ্তি পেত না যখন ঘরের ক্যাকটাস শূণ্য জায়গাগুলোতে দৃষ্টি যেত। মনটা বিষাদে ভরে যেত, মনে হতো সব আছে তবুও কী যেন নাই! তখনই বৃক্ষ মেলা থেকে লাল-সবুজ-হলুদ ক্যাপসিকামের চারাগুলো এনেছিলাম। গাছগুলোকে নতুনভাবে পেয়ে আমার উচ্ছাস দেখে রেহানও হাফ ছেড়ে বাচে।
সেদিন সকালে বারান্দায় প্রতিদিন রুটিন অনুযায়ী ক্যাপসিকাম গাছগুলোর পাশাপাশি মানিপ্লান গাছে পানি দিতে যেয়ে টাইলসে ডিসেম্বরের রাতে জমে থাকা শিশিরে পা পিছলে ধপ করে ফ্লোরে পড়ে যাই; কোমড় প্রচন্ড ঝাকুনিতে অজানা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। সারাদিন একটু একটু ব্যাথা থাকলেও বিকেলের রোদ রাতের গহ্বরে প্রবেশ করলে সেটা প্রচন্ড রূপ নেয়। পেট ব্যাথ্যা অসহনীয় ভাবে বেড়ে গেলে রাতে এ্যাম্বুলেন্সে হসপিটাল, রাতেই ডিএনসি। শ্বাশুড়ি- মা- স্বামী সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে কীভাবে তিন চারদিন কাটিয়ে দিলাম বুঝতে পারলাম না। পঞ্চমদিন শীতের সকালে বারান্দায় কুয়াশায় ঘোলা হয়ে যাওয়া স্লাইডিং ডোরটা খুলে আমার বুকটা চমকে উঠে..। মুহূর্তে মনে হল চিৎ হয়ে শুয়ে চাতক পাখির মতো গলা ফাটিয়ে আকাশটা নামিয়ে ফেলি। সমস্ত শরীর ঘামে জপজপ, রক্তশূন্য সাদা চোখের পাতা বন্ধ হওয়ার আগে দেখি টবটি কাত হয়ে পড়ে আছে, তার পাশে গোড়াসহ তুলে ফেলা শুকনো গাছ আকড়ে শুয়ে আছে লাল ক্যাপসিকামটি।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৮০ বার

Share Button

Calendar

November 2020
S M T W T F S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930