লেখালেখির খেলাঘরে

প্রকাশিত: ৫:৪৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০১৯

লেখালেখির খেলাঘরে


আবু হাসান শাহরিয়ার

আমার লেখালেখির শুরু স্কুলে থাকতে; ছড়া দিয়ে। কিন্তু, প্রথম বই ছোটোগল্পের। নয়টি গল্প ছিল ‘আসমানী সাবান’ নামের বইটিতে, যার বেশিভাগই আমাদের তারুণ্যের কিংবদন্তিতুল্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীব সম্পাদিত অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক বাংলা’র রবিবাসরীয় সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত। কবিতা ছাপালেও হাবীব ভাই আমাকে গল্প লেখার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। সালেহ চৌধুরীও। পরেরজন পত্রিকাটির বিশেষ সংখ্যাগুলো সম্পাদনা করতেন। পত্রিকাটিতে কবি শামসুর রাহমানও কাজ করতেন এবং একসময় সম্পাদকও হয়েছিলেন। সে যা-ই হোক, ‘আসমানী সাবান’ প্রকাশিত হওয়ার পর অগ্রজ ছোটোগল্পকারদের কেউ বইটি নিয়ে কোনও কথাই বললেন না। তবে, বই উপহার পেয়ে তাদের দু-একজন উচ্ছ্বসিত হয়ে আমার ছড়ার প্রশংসা করেছেন; বলেছেন, “তোমার ছড়া বেশ লাগে; ছড়ার বই বের না করে আগে গল্পের বই করলে যে!” ওদিকে লব্ধপ্রতিষ্ঠ ছড়াকবিরা বললেন, “তোমার গল্পের হাত বেশ ভালো। আগেও পড়েছি।”

প্রথম বইপ্রকাশের পর অগ্রজ ভাষাচিত্রীদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পেলেও অগ্রজ ছড়াকবিরা দিয়েছেন গল্পকারস্বীকৃতি। অগ্রজ ভাষাচিত্রীরাও ছড়াকবির স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য দেখাননি। তবে, নিজ নিজ ভুখণ্ডে কাঁটাতারের বেড়া তুলে রেখেছিলেন উভয় সম্প্রদায়ের অগ্রজই। ব্যত্যয় যে ছিল না, তা নয়। হাতেগোনা।

এরমধ্যে গ্লোব লাইব্রেরি থেকে আমার দ্বিতীয় বইটি প্রকাশিত হলো। ছড়ার। ‘পায়ে নূপুর’। এ বই সংক্রান্ত আখ্যান আরও মজার। শিল্পী আফজাল হোসেন অপূর্ব প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছিলেন বইটির। ছাপাখানায় তখন অফসেট যুগ সবে আসি-আসি করছে। জিঙ্কের ব্লকেই বাইকালারে অফসেটের মতো ছাপা সেই অলঙ্করণ। প্রচ্ছদ অফসেটে। খুবই দরদ দিয়ে কাজ করায় প্রছদে গ্রন্থকারের সমান মর্যাদা দিয়ে ছাপা হয়েছিল আফজাল হোসেনের নাম। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র তখন বইয়ের মুদ্রণ পারিপাট্যের জন্য শিল্পীদের পুরস্কৃত করত। আফজাল হোসেন পুরস্কৃত হলেন ‘পায়ে নূপুর’-এর জন্য। এর দু-এক বছর আগ থেকে ‘অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার’ দেওয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিও। ছড়াকবি লুৎফর রহমান সরকার তখন অগ্রণী ব্যাংকের উচ্চকর্তা। আমাকে স্নেহ করতেন তিনি। পরামর্শ দিলেন বইটি শিশু একাডেমিতে জমা দিতে। দিলাম। না, পুরস্কার পেল না ‘পায়ে নূপুর’। একদিন শিশু একাডেমির পরিচালক জোবেদা খানমের সঙ্গে দেখা হলে তিনি কাছে ডেকে মাতৃস্নেহে বললেন, “আমরা সবাই ভেবেছিলাম, তোমার ছড়ার বইটাই পুরস্কার পাবে এবছর; কিন্তু জুরিদের একজন আপত্তি তুললেন, ‘বইটা তো শুধু শাহরিয়ারের নয়; আফজাল হোসেনেরও’। তাই, দেওয়া গেল না পুরস্কার।’ শুনে বলতে চেয়েও বলতে পারলাম না, “আফজাল হোসেনকে ইলাস্ট্রেশনের জন্য পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘বইটি তো শাহরিয়ারেরও’ এই প্রশ্ন ওঠেনি গ্রন্থকেন্দ্রে।” ফজলে রাব্বী তখন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক এবং শিশু একাডেমিতে আমাকে পুরস্কার দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিলেন শিশুসাহিত্যিক সরদার জয়েন উদ্দীন। দ্বিতীয়জন ছড়াও লিখতেন।

‘পায়ে নূপুর’ প্রকাশিত হওয়ার পর আমার মহার্ঘ প্রাপ্তি— এ বইটির উপর একটি অসামান্য রিভিউ লিখেছিলেন কবি আল মাহমুদ। সেখানে তিনি আমাকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন ‘দস্যু দুপুর’সহ কয়েকটি ছড়ার জন্য। রিভিউটি কবি রফিক আজাদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক সাহিত্যের আয়োজনে ছাপা হয়েছিল। ছড়ার বই বের করেই কবিস্বীকৃতি! তা-ও কিনা আল মাহমুদের মতো কবির কাছ থেকে! আমি খুশিতে আটখানা। ওই বইয়ের ‘ঘড়ি’ শিরোনামের ছড়াটিও স্মৃতিবহ। বাংলাদেশ স্কুল টেকস্ট বুক বোর্ডের তৎকালীন সচিব ছড়াকবি আবদার রশিদ স্কুলপাঠ্য বইয়ে ছড়াটি অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, আমার বাবা তখন ওই বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং তিনি আপত্তি করেছিলেন, ‘আমি যতক্ষণ এখানে আছি, আমার ছেলের লেখা বোর্ডের কোনও বইয়ে যাবে না। ওর যদি যোগ্যতা থাকে, যখন আমি এখানে থাকব না, তখন ওর লেখা পাঠ্যপুস্তকে ছাপা হবে।” ক্ষমতাগুণে বন্ধুূূদের কারও কারও হলেও সেই যোগ্যতা আমার এখনও হয়নি। না, এজন্য কোনও আক্ষেপ নেই। তবে, বাবার সেদিনের সিদ্ধান্তের জন্য আজও আমি গর্ববোধ করি।

এরপর নসাস থেকে আমার প্রথম কবিতার বই ‘অন্তহীন মায়াবী ভ্রমণ’ প্রকাশিত হয়। তখন থেকে কবিতার সঙ্গেই আমার টানা সহবাস। সেই সময় কবিমহলে একটি কথা চালু ছিল— ‘কবিতা সতিন সহ্য করে না’। কবিতার প্রতি একাগ্রতায় ছড়া ও ছোটোগল্পের সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হলো। পড়লেও লিখি না। প্রথম কবিতার বইয়েরও একাধিক কবিতা আহসান হাবীবের হাত দিয়ে প্রকাশিত। বইটি আমার তিন কীর্তিমান অগ্রজ শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ও সৈয়দ শামসুল হককে উৎসর্গ করেছিলাম। অগ্রজ ভাষাচিত্রীরা বইটির প্রশংসা করলেও অগ্রজ কবিরা ছিলেন চুুপ। তো, ছোটোগল্প ও কবিতা দুইই লিখলেও, এইসময় বন্ধুকবিরা আমার ছোটোগল্পের এবং বন্ধু ভাষাচিত্রীরা কবিতার প্রশংসা করতেন। সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র সম্পাদক তখন শাহাদাত চৌধুরী। পত্রিকাটির এক ঈদসংখ্যায় তিনি আমার ‘দফারফা’ নামের একটি ছোটোগল্প ছাপালে আমি লেখক সৌজন্য কপি আনতে পত্রিকাটির অফিসে গিয়ে বেশ মজার এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমি বসে ছিলাম শাহরিয়ার কবিরের টেবিলে। গল্পটি তার হাতেই দিয়েছিলাম। সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী সেদিন পর্যন্ত আমাকে চেহারায় চিনতেন না। দরজায় দাঁড়িয়েই লক্ষ করেছিলাম, একজন বয়সি লেখকের সঙ্গে তার কিছু নিয়ে উচ্চস্বরে বাক্যবিনিময় হচ্ছে। চলে যাওয়ার পর তার নাম জেনেছি— আব্দুস শাকুর। কিছুক্ষণ পর সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী তার ঘর থেকে বেরিয়ে শাহরিয়ার কবিরের টেবিলে এসে যা বললেন, তার সারমর্ম এই যে— ঈদসংখ্যায় নিজের গল্প না দেখে আব্দুস শাকুর খুব ক্ষেপেছেন। তার চেয়েও বেশি ক্ষুব্ধ কোথাকার কোন তরুণ আবু হাসান শাহরিয়ারের গল্প ছাপা হওয়ায়। শাহরিয়ার কবিরকে শাহাদাত চৌধুরী এ-ও বলেছিলেন, “শাকুর সাহেবকে আমি বলেছি, ‘আপনারা জায়গা না দিলে তরুণরা সামনে আসবে কী করে? বলতে তো পারি না, শাহরিয়ারের গল্পটা আমার তার গল্পের চেয়ে ভালো লেগেছে।” শাহাদাত চৌধুরীর কথা শেষ হতেই শাহরিয়ার কবির কুণ্ঠিত আমাকে দেখিয়ে জানিয়েছিলেন, “এই তরুণের গল্পই আপনি ছাপিয়েছেন। ওর নামই আবু হাসান শাহরিয়ার।” উল্লেখ্য, বড়ো আমলা বলে আব্দুস শাকুরের তখন অনেক নামডাক। অন্যদিকে আমি এক চালচুলোহীন বেকার তরুণ। সেদিনের ঘটনা থেকে আমি যে-পাঠ নিয়েছিলাম, ‘খোলা জানালা’ সম্পাদনাকালে তা কাজে লাগিয়েছি— প্রতিভাবান তরুণদের লেখা প্রতিষ্ঠিত লেখকদের সমান মর্যাদায় প্রকাশ করেছি সাময়িকীটিতে। তাদের অনেকেই আজ লব্ধপ্রতিষ্ঠ।

কবিতায় সামগ্রিক অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া নিয়েও আমার অভিজ্ঞতা বেশ মজার। পুরস্কারটি পাওয়ার আগেও পদক-পুরস্কার বিষয়ে আমি যা বলতাম, পুরস্কারটি পাওয়ার পরও তা-ই বলি— ‘লাগে না পদক-খ্যাতি যদি থাকে লেখার শ্রাবণ’। শুনেছি, যে-বছর পুরস্কারটি আমাকে দেওয়া হয়, সে-বছর নাকি আমার পক্ষে সর্বাধিক ফেলোর সমর্থন থাকার পরও একজন বয়সে প্রবীণ ফেলো বলেছিলেন, “অগ্রজদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, আবু হাসান শাহরিয়ার সেটা জানে না; ওকে কি বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া উচিত হবে?” তিনি আমার চরিত্রচিত্রণ ভালোই করেছিলেন। ঠিক, শুধু বয়সের উচ্চতায় আমি কাউকে মান্যতা দিই না; গুণ থাকলে কমবয়সিদেরও শ্রদ্ধা করি। তো, অন্য একজন ফেলো পত্রপাঠ তার কথার উত্তরে বলেছিলেন, “আমার জানামতে, বাঙলা ভাষা-সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি এই পুরস্কার দিয়ে থাকে; আদব-কায়দার জন্য নয়।”—পুরস্কারটি পাওয়ায় এখন নিজেও আমি ওই একাডেমির একজন ফেলো। কিন্তু, একদা সম্মানজনক হলেও, এই পরিচয়টি এখন আর সারস্বত সমাজে বিশেষ গুরুত্ব রাখে না। কতিপয় অযোগ্য ফেলোই গুরুত্ব হারানোর কারণ, যারা প্রভাব খাটিয়ে ফেলোশিপটি নিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, কবি-লেখকের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার পাঠক। জীবনানন্দ দাশ জীবদ্দশায় একটিমাত্র তথাকথিত পুরস্কার পেলেও চিরকালের পাঠক তাকে বঞ্চিত করেনি।

শেষ করার আগে আর সামান্য কিছু কথা। ২০০২ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধসংগ্রহ বইটি কবি শামসুর রাহমান আমাকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গপত্রে লেখেন— ‘প্রকৃত কবি, সাহসী গদ্যকার ও বিরল সম্পাদক আবু হাসান শাহরিয়ারকে’। তার এই কথাগুলোকে আমি বাংলা একাডেমি পুরস্কারের চেয়ে বড়ো জানি। তবে, কোনও কিছুকেই অধিক গুরুত্ব না দিয়ে লেখালেখিকে আনন্দের সমার্থক ভাবি। এ কারণে একজন মাঠের কৃষকের চেয়ে আমার বেশি কিছু প্রত্যাশা থাকতে নেই। আর, আসল কথাটি আমার কবিতার পঙ্‌ক্তিতে বলে রেখেছি— ‘স্লেটে লেখা নাম আমি মুছে যেতে আসি।’ সবাই মুছে যেতেই আসে। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সব আনন্দ মুছে যায়। একজীবনের লেখালেখির আনন্দও। তখন কে কী বলল, তাতে কিছু যায় আসে না। অমরতা বলে কিছু নেই।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com