» শরৎচন্দ্র ও বাঙালি

প্রকাশিত: ১৬. সেপ্টেম্বর. ২০২০ | বুধবার

সালেহা চৌধুরী

শরৎচন্দ্র খুব বেশি প্রবন্ধ লেখেননি। মানুষের হৃদয় জয় করেছেন উপন্যাসে, গল্পে, নাটকে। যে দু একটা প্রবন্ধ চোখে পড়ে সেটা দায়ে পরে বা পত্রপত্রিকার অনুরোধে। তিনি বড় বড় প্রবন্ধ লিখে সময় ব্যয় করেননি। তিনি হৃদয়ে কলম ডুবিয়ে যে সব শব্দ দিয়ে আমাদের জন্য উপন্যাস বা গল্প লিখেছেন সেই আমাদের পরম পাওয়া। আমাদের জন্য এক সাগর ভালোবাসা। পাঠক মোহাবিষ্ট থেকেছে, অপেক্ষা করেছে তাঁর উপন্যাসের পাতায় পাতায় পানকৌড়ির মত ডুব দিয়ে তুলে আনবে অনির্বাণ সব ঘটনা ও হৃদয়াবেদ্য সারাৎসারের সুনিপুন পাঠ। তিনি কেমন করে আমাদের সজল করেন, বেদনাবিধূর করেন সে এক অলৌকিক কারিগরি। তিনি বেঁচে থাকবেন হাজারও চরিত্র ও ঘটনাতে। একদিন বঙ্কিমচন্দ্র ছাত্রছাত্রীদের টেবিলে শোভা পাবেন কেবল কিন্তু অগনিত পাঠকের সংগ্রহে থাকবেন না। কিন্তু শরৎচন্দ্র হৃদয় পদ্মাসানে আরো দীর্ঘকাল রয়ে যাবেন সে ব্যাপারে অন্তত আমার সন্দেহ নাই। যতদিন বাংলাভাষা আছে তিনি থাকবেন।
এবার দেখা যাক সেই বিষয় যাকে আমরা প্রবন্ধ বলে থাকি। একটি গ্রন্থের কথা আমরা শুনেছি যার নাম ‘নারীর মূল্য’। এই প্রবন্ধ সমুহ তিনি ‘যমুনা’ পত্রিকায় তার দিদি অনিলা দেবীর ছদ্মনামে লিখেছিলেন। ‘গৃহপালিত’ হিন্দু রমনীর গুণাগুন ও উপকারিতার কথা সেইসব প্রবন্ধের বিষয়। এক জায়গায় লিখেছিলেন ‘সতীত্বের চাইতে মনুষ্যত্ব বড়’। সে কথাকেও সকলে ঠিক মত মেনে নিতে পারেনি। কিছু সমালোচক হৈ চৈ করেছিলেন। তাই পরে তিনি আবার লিখেছিলেন ‘রমণীর সতীত্ব অবহেলার বস্তু নয়।’ পরস্পর বিরোধিতা সব লেখকের ভেতর অল্পবিস্তর থাকে। তিনি তার ব্যতিক্রম নন। অনিলা দেবীর ছদ্মনামে তিনি লিখেছিলেন নারীর সুখ, দুঃখ, বিষাদ। এবং সেখানে নারীর উপকারিতার কথাই বার বার বলার চেষ্টা করেছেন। তবে এমন কিছু নয় সমালোচক Ñগেল গেল সমাজ গেল বলে চিৎকার করতে পারে। এ ব্যাপারে তিনি সাবধানি।
তিনি হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে ছোট খাটো প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আমরা দেখি সেখানে তিনি নিরাশাগ্রস্ত একজন। এই দুই জাতির ভবিষ্যত নিয়ে শংকিত। তিনি মুসলমান ও বাঙালি এই সম্প্রদায়কে সর্ম্পূন্য আলাদা করে দেখেছেন। বাঙালি মুসলমান কখনো বলেন নি। বাঙালি তো অবশ্যই নয়। তাঁর কথা বহিরাগত মুসলমান লুটাপাট করবার জন্য এদেশে এসেছিলেন। তারা বাইরের লোক। এবং তাদের শাসন করবার ক্ষমতাকেও ভালো চোখে দেখেননি। আজ আমি তাকিয়ে দেখি কত মানুষ আজ দেশের বাইরে থাকেন। জীবনযাপন করেন। অন্য দেশে চলে যান। সম্পদ বানান। কিছু মুসলমান যে শাসক হয়েছিলেন সে নিয়ে এত বেশি তর্ক কেন? সে কালে ‘মাইট ইজ রাইট’ বলে একটি ব্যাপার সকলেই মানতেন। আর ভারতবর্ষতো চিরকালই সকলকে টেনেছে। সুজলা, সফলা ভারত। ভারতের কলোনি চলে গেলে চার্চিল মানতে পারেননি। রানী এলিজাবেথ বলেন , ভারত নিয়ে নানা গল্প আমাদের ‘ফেভারিট পাসটাইম’। আর এটা তো সত্যি এই বাইরের মুসলমান ধনসম্পদ লুট করে নিজের দেশে চলে যাননি। এখানেই জীবনপাত করেছেন বংশ পরম্পরায়। এখনও তাজমহল এবং আরো নানা পুরাকীর্তি যে টিকিট দিয়ে দেখা হয় সে ওই বহিরাগত মুসলমানদের ই দান। যার ভেতর থেকে দামী -হিরে- মানিক- সোনা ইংরেজ খুলে নিয়ে গেছে। কাচ বসিয়ে সকলকে ভোলাতে চেয়েছে। সাত জাহাজ ভর্তি করে ইংরেজ যখন মুরশিবাদ থেকে ব্রিটেনে চলে যান সে যাওয়া আর মুসলানদের শাসনের ভেতর ছিল কত পার্থক্য। এবং এই সেদিনও ভারতের লুট করা সম্পদের ‘আন্টিক’ গুলো বিক্রি করেন লর্ড ক্লাইভের বংশধর। তাঁদের একজন ছেলে অক্সফোর্ডে পড়ছেন। যার নাম আমি পেয়েছি। তবে লর্ড ক্লাইভকে কি ভাবে জানেন, কি মনে করেন সেটা আমার জানবার কথা নয়। এইসব লুটপাটের ফলে করুন হয়ে যায় সোনার বাংলা। মানুষ এবং যুদ্ধের ঘোড়া কারো পেটে খাবার ছিল না। ক্লাইভ কেবল ‘আরো দাও আরো দাও করতেন’। আর বিনিময়ে তিনি মিরজাফরকে দিয়েছিলেন পারিসের কুষ্টরোগাক্রান্ত বেশ্যার বহর। এর পরিনতি আমরা সকলে জানি। ছিয়াত্তরের ভয়ানক দূর্ভিক্ষ হয় এই লুটপাটের কারণে। যখন ব্রিটেনের বড় বড় দালান কোঠা ব্রিজ দেখি বলি এ গুলো কাদের টাকায় তৈরী? সিরাজের না টিপুর? সে যাক অনেকের মত সেইসব নিয়ে শরৎচন্দ্র তেমন ভাবেননি। তিনি মুসলমান সম্মন্ধে কি বলছেন এবার দেখা যাক , ‘হিন্দু মুসলমান মিলন একটি গালভরা শব্দ। যুগে যুগে এমন অনেক গালভরা ব্যাক্যই উচ্চারিত হইয়াছে, কিন্তু গাল ভরানোর অতিরিক্ত সে আর কোন কাজেই আসে নাই। এ মোহ আমাদের ত্যাগ করিতে হইবে। ‘তাঁর মতে ধর্ম পরিবর্তিত খ্রিস্টানের সঙ্গে হিন্দুর মিল আছে কিন্তু মুসলমানের সঙ্গে নয়। তিনি লিখেছেন, আমাদের এক পাচক ব্রাম্মন ছিল। সে মুসলমানীর প্রেমে মজিয়া ধর্ম ত্যাগ করে। এক বৎসর পর দেখা গেল সে নামও বদলাইয়াছে। পোশাক বদলাইয়াছে। ভগবানের দেওয়া আকৃতি পর্যন্ত বদলাইয়া গিয়াছে। তাহাকে আর চিনিবার জো নাই। ’ অর্থাৎ শরৎচন্দ্রের মতে বাঙালি ও মুসলমানে আকৃতি প্রকৃতি সবখানেই অনেক অমিল। এরপর তিনি আরো বলছেন ‘হিন্দুস্তান হিন্দুর দেশ। সুতরাং এ দেশকে অধীনতার শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করার দায়িত্ব হিন্দুর ই । মুসলমান মুখ ফিরাইয়া আছে তুরস্ক ও আরবের দিকে। এ দেশে তাহাদের চিত্ত নাই। মিলন হয় সমানে সমানে। শিক্ষিত করিয়া লইবার আশা আর যেই করুক আমি করি না। হাজার বৎসরে কুলায় নাই। আরো হাজার বৎসরে ও কুলাইবে না। যদি ইহাকে মুলধন করিয়া ইংরেজ তাড়াইতে হয় তা হলে সে এখন থাক। মানুষের অন্য কাজ আছে। খিলাফৎ করিয়া, প্যাক্ট করিয়া, ডান ও বাঁ দুই হাতে মুসলমানের পুচ্ছ চুলকাইয়া স্বরাজ যুদ্ধে নামাইতে পারিবে এই দুরাশা দুই একজনার হয়তো ছিল কিনতু মনে মনে অধিকাংশের ছিল না।’। এই অধিকাংশের মধ্যে প্রিয় লেখক শরৎচন্দ্র নিজে। তিনি বিরক্তি আর ক্ষোভের সঙ্গে আরো জানান ‘জগৎশুদ্ধ সকলে মিলিয়া মুসলমানের শিক্ষার ব্যবস্থা না করিলে কোনদিন এদের চোখ খুলিবে না। জগতে অনেক বস্তু আছে ত্যাগ করিলেই তাকে পাওয়া যায়। হিন্দু-মুসলমানের মিলন সেই সেই জাতীয় বস্তু। মনে হয় এ আশা নির্বিশেষে ত্যাগ করিয়া কাজে নামিতে পারিলেই হয়ত একদিন এই একান্ত দুষ্প্রাপ্য নিধির সাক্ষাৎ মিলিবে। কারন মিলন তখন একার চেষ্টাতে ঘটিবে না।’ তাহলে তাঁর কথার সারবস্তু মুসলমান আর হিন্দু মিলন দুষ্প্রপ্য নিধি। কারণ মুসলমান বাঙালি নন। তাহারা আরব পারস্য তুির্কর দিকে তাকিয়ে আছে। আসল কথা তিনি মিল চান কিন্তু এ যে অসম্ভব সে কথা ভেবে কষ্ট পান।
এরপরের যে ঘটনার কথা বলব সেখানে অন্য এক শরৎচন্দ্রকে দেখতে পাই। দেশ বন্ধু চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে স্টিমার ভ্রমনে বরিশাল যেতে হয়েছিল তাঁকে। গভীররাতে এই দুই দিকপাল দেশের ভুত-ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠেন। দেশবন্ধু বলেন , আপনার মুসলমানপ্রীতি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। শরৎচন্দ্র লিখছেন ,‘ভাবিলাম মানুষের কোন সাধুইচ্ছা গোপন থাকিবার জো নাই। খ্যাতি এত বড় কানে আসিয়া পৌীঁছয়াছে। কিন্তু নিজের প্রশংসা শুনিলে চিরদিন আমার লজ্জা করে। তাই সবিনয়ে বদন নত করিলাম।’
চিত্তরঞ্জন দাশ বললেন , ‘ এ ছাড়া আর আর কি উপায় আছে? এর মধ্যে তারা সংখ্যায় পঞ্চাশ লক্ষ বেড়ে গেছে। আর দশ বছর পর কি হবে বলেন তো।’ অর্থাত মিল হওয়া সবদিক দিয়ে ভালো না অমিল হতে পারে ঠিক বোঝা যায় না। এখানে দেখা যাচ্ছে তাঁর মুসলমান প্রীতির কথা যা দেশবন্ধুও জানেন। কিন্তু সময় সময় তাঁর ‘অনলবর্ষন’ আর কিছু নয় এক ধরণের ক্ষোভ। যেমন অনেক সময় পিতা তাঁর সন্তানকে বকাবকি করেন। যদিও ‘মহেশ’ ছাড়া আর কোন গল্প আমরা পাই না যেখানে মুসলমানদের কথা বলা হয়েছে তবে এর ভেতরে গফুর একটি মনে রাখার মত চরিত্র।
এরপরের ইতিহাস আমরা সকলে জানি। বঙ্কিম চন্দ্রের মুসলিম বিদ্বেষ, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্লিডিং, হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা, মুসলমানের আরব তুরস্ক প্রীতি, মুসলমানের রাজ্য হারানোর সুপ্ত বেদনা, রাডক্লিফ রোয়েদাদের টেবিলের উপরে পাকিস্তান ও ভারতের ভাগাভাগি যে কারণেই হোক একদিন আমারা পেলাম পাকিস্তান। আর চব্বিশ বছর পর একজন অলৌকিক মানুষ করলেন অসাধ্য সাধন। তিনি মুসলামান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। যেমন বাঙালি শরৎচন্দ্র তাঁর ‘ওয়াল্ডডেস্ট ড্রিমেও’ ভাবতে পারেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবের জন্যই শরৎচন্দ্রের এইসব মুসলমান এমন বাঙালি হয়ে উঠলো যেমনটি কে কবে ভাবতে পেরেছিল? শরৎচন্দ্রের কাছে একুশের কর্মকান্ড এবং ভাষা আন্দোলনের এত কিছু অসম্ভব ব্যাপার ছিল। একটি উপন্যাসে শরৎচন্দ্র লিখেছিলেন ,‘ মাঠে বাঙালি ও মুসলমান ফুটবল খেলিতেছে’। এখন যদি কেউ লেখে মাঠে বাঙালি ও ভারতবর্ষীয় ফুটবল খেলিতেছে তাকে কে দোষ দেবে। জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।
মহেশের জন্য বেদনা, গফুর নামের প্রিয় চরিত্র এইসব ছাড়াও বুঝতে পারা যায় একদিন মিল হবে এমন আশা না করলেও এই তিনি চেয়েছিলেন।
ঢাকা ১৫ই শ্রাবন ১৩৪৩ সনে তিনি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের’ প্রধান অতিথির ভাষণের শেষে বলেন , বাংলা সাহিত্যের সেবা করে যারা মুসলমানদের মধ্যে চিরস্মরনীয় হয়ে আছেন তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অপরিসীম। তবু তাদের নাম উল্লেখ থেকে আমি বিরত রইলাম। পরিশেষে কৃতজ্ঞতা নিবেদনের একটি রীতি আছে, যেমন আছে আরম্ভ করার সময় বিনয় প্রকাশের প্রথা। প্রথমটা করিনি। কারণ সাহিত্যসভায় সভাপতির কাজ এত করতে হয়েছে এই ষাট বছর বয়সে নিজেকে অনুপযুক্ত, বেকুফ, ইত্যাদি যত প্রকারের বিনয় সূচক বিশেষণ আছে নিজের সঙ্গে সংযোগ করে দিলে ঠিক শোভন হবে কি জানি না। কিন্তু কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বেলায় তা নয়। সমস্ত মুসলিম সমাজের কাছে আজ আমি অপকটে কৃতজ্ঞতা নিবেদন করছি। আপনারা আমার সালাম গ্রহণ করুন। বলার দোষে যদি কাউকে বেদনা দিয়ে থাকি সে আমার ভাষার ত্রুটি, আমার অন্তরের অপরাধ নয়। ’
তিনি বলেছিলেন , ইচ্ছা থাকা সত্বেও কেন তিনি আরো অনেক মুসলমান জীবন ও চরিত্র আঁকতে পারেননি। ‘পাছে ভুল হয় পাছে আপনারা কষ্ট পান। কারণ আমি ওদের খুব বেশি কাছে থেকে দেখিনি।’ মহেশ গল্পটি কলকাতা য়ুনিভার্সিটি থেকে বাদ দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ কারণ সেখানে গো হত্যা আছে। যদিও এই গফুর, আমিনা এবং মহেশ সুনিপুন তুলির টানে অমর হয়ে আছে।
তিনি ছিলেন মিশনারী। তবে ভিশনারী নন। তাই ভারতবর্ষের মুসলমান বাঙালির স্বরূপ বুঝতে পারেননি। বুঝতে পারেননি তারা কতটা অসাধ্য সাধন করতে পারে। বিশেষত বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান!
আসুন, আরো অনেক কিছু আমাদের করতে হবে। সামনে দীর্ঘ পথ। শরৎচন্দ্র মারা যারা যান ১৯৩৮ সনের ষোলই জানুয়ারী। অকাল মৃত্যুই বটে। ঠিক সেই সময় বাংলাদেশের একজন আঠারোর কাছাকাছি তরুণ কি ভাবনা ভাবছেন সেইটি তিনি জেনে যেতে পারেন নি। জানতে পারলে পরম শান্তিতে মারা যেতেন।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৬৬ বার

Share Button

Calendar

September 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930