শামসুদ্দীন আবুল কালামের এই গল্পটি প্রকাশিত হয় শিশু সওগাত নামের পত্রিকায়

প্রকাশিত: ১:৩১ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৩১, ২০১৯

শামসুদ্দীন আবুল কালামের এই গল্পটি প্রকাশিত হয় শিশু সওগাত নামের পত্রিকায়

শিশুদের জন্য লেখা শামসুদ্দীন আবুল কালামের এই গল্পটি প্রকাশিত হয় শিশু সওগাত নামের পত্রিকায়।( লেখালিখির প্রথম পর্যায়ে তিনি আবুল কালাম শামসুদ্দীন নামে লিখতেন । পরবর্তী সময়ে আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিনের নামের সাথে তার নামের একটা মিল থাকায় তিনি নিজের নামটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন।) গল্পটি ১৯৪৬ যখন প্রকাশিত হয়, তখন তার বয়স প্রায় কুড়ি বছর । গল্পটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে শুধুমাত্র শিশুদের জন্য লেখা গল্প বলে নয়, শিশুদের পাঠোপযোগী করে লেখা হলেই যে সেটা শুধুমাত্র শিশুদের জন্য লেখা তা ঠিক না, বরঞ্চ দেশভাগের পূর্ববর্তী সময়ের হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গা হাঙ্গামাকে কেন্দ্র করে লেখা গল্পটি অত্যন্ত চমৎকার । সাতচল্লিশ পূর্ববর্তী সময়ে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে এ দেশের মানুষকে বোকা বানানোর যে ষড়যন্ত্র ব্রিটিশরা চালিয়েছে তারই প্রেক্ষিতে গল্পটি রচনা করা হয়েছে।

ড. জাহিদা মেহেরুননেসা

সহযোগী অধ্যাপক (বাংলা)

ইডেন মহিলা কলেজ

আবু-বাবুর গল্প

শামসুদ্দীন আবুল কালাম

বাবু আর আবু পাশাপাশি দুটি বাড়ির দুই ছেলে। দুজনেই দেখতে শুনতে বেশ একই রকম , পড়েও একই স্কুলে, একই ক্লাসে। বাবু আবুর চেয়ে বয়সে মাস খানেকের বড়, হয়তো তারই জন্য তার যত বুদ্ধি আবুর তা নেই আবার আবুর যেখানে বুদ্ধি বাবু সেখানে অজ্ঞ। তা ছাড়া বাবু বড়লোকের ছেলে , আবু গরীবের। এর যা আছে ওর তা নেই। তবু হাবে ভাবে চালচলনে দুজনে আশ্চর্য মিল । নিবিড় খাতির। ক্লাসের দুষ্টু ছেলেরা ঠাট্টা করে বলত- দুই জমজ ভাই।

একদিন কোনো অশুভক্ষণে সামনের বাড়ি তাতে এক সাহেব ভাড়াটে এল। তার ছেলে ডিক তাদের বয়সী এবং ভর্তিও হল ঠিক তাদেরই স্কুলে, তাদেরই ক্লাসে। বাবুর সঙ্গে ডিকের ভারি বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তার বাবা বিলেত ফেরত ভাল ইংরেজি জানা মানুষ এবং তাকেও খুব ভাল করে ইংরেজি শিখিয়েছিলেন বলে ভাষার ব্যবধান ছিল না। আবু বিশেষ জানতো না বলে তার সঙ্গে ডিকের ভাল খাতির জমল না। তারপর একদিন সামান্য ঘটনা উপলক্ষ্য করে ডিকেরই কারসাজিতে আবু-বাবুর এতদিনকার ভাব ভেঙ্গে গেল।

তখন থেকে বাবু আর ডিকের প্রগাঢ় বন্ধুতা। আর আবু এতকালের বন্ধুর ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়ে বাবুর নিকট থেকে দূরে সরে গেল।

ইতিমধ্যে সারাদেশ জুড়ে স্বাধীনতার জয়ধ্বনি। সকলেরই মুখে দেশকে স্বাধীন করার, নিজে স্বাধীন হওয়ার দাবী। বিদেশির অন্যায় দাবীকে দেশ আর কিছুতেই স্বীকার করবে না । নিপীড়িত জাতির অন্তরে ছোট বড়, ধনী মজুর নির্বিশেষে সকলেরই মনে এই আকাঙ্ক্ষা জোয়ারের মত কল্লোলিত হয়ে উঠল। বাবু-আবুর বাবাও এই চাঞ্চল্য থেকে বাদ পড়লেন না। এমন কি বাবুও না।

একদিন তার মুখে স্বাধীনতার দাবী শুনে ডিকের উপহাসের ফলে বাবু ভাবলো কালা আদমীর স্বাধীনতার প্রতি তোমার যখন এতই অবজ্ঞা, তোমার সঙ্গে বন্ধুতারও আজ এইখানেই ইতি।

আবুর প্রতি পূর্বব্যবহারের স্মরণ করে তার অনুতাপ হল সত্যি; কিন্তু দেখে সে জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেও আবুর সঙ্গে পূর্বভাব ফিরিয়ে আনবার আর কোনো উপায় নেই। কোন কারণে কে জানে অকস্মাৎ দুই পরিবারের মেলামেশা বন্ধ হয়ে গেছে। কর্তায় কর্তায় খাতির নেই, গিন্নিতে গিন্নিতে ভাব নেই। ডিক তার বাড়ির লনে এখন আবুকে নিয়ে মার্বেল খেলে। তাদের বাড়ির ত্রিসীমানাও মারায় না। আরো দেখে আবুর বাড়িতে আগে যেখানে কংগ্রেস পতাকা উড়ত এখন সেখানে আর এক নতুন পতাকা। আবুর বাবা কংগ্রেস ছেড়ে লীগে যোগ দিয়েছেন। বাবুর বাবা বলেন আবুর বাবার দোষে দেশ স্বাধীন হচ্ছে না । আবুর বাবা দোষেন তাকে । আবু-বাবুর দুজনারই মনে পুরোনো বন্ধুত্ব ফিরিয়ে আনার ইচ্ছে থাকলেও চারদিকের রকম সকম দেখে ধারণা করল তাদের মধ্যে যখন এত বিভিন্নতা , সুতরাং মিল হওয়া আর কোনকালেই সম্ভব নয়। তাছাড়া বাবু হিন্দু আর আবু মুসলমান। ক্লাসের ছেলেদের কাছে দুজনেই শুনল এদের এদের মঝে কোনোকালে মিল ছিল না আর হবেও না । আবু শুনলঃ হিন্দু আর মুসলমান তেল আর জল!

ডিক এবং তার অনুচর ক্লাসের অন্যান্য দুষ্টু ছেলেরা তাদের এতদিনকার খাতির ভেঙ্গেছে দেখে খুব খুশি হয়ে ঊঠল এবং দুজনেরই কানে এর বিরুদ্ধে ওর কথা বলে দুজনের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশই বাড়িয়ে তুলতে লাগল । ডিক বিশেষ করে আবুর মনে বাবুর প্রতি বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি করল।

এরপর থেকে কিছুদিনের মধ্যেই মহা উদ্যমে ওদের রেষারেষি শুরু; দুজনেরই মনে দুজনের প্রতি ঈর্ষা । বিশেষ করে আবুর। ডিকের চক্রান্তে সে বাবুর সঙ্গে বন্ধুতার সব স্মৃতি ভুলে গেল। কথা তো আগে থেকেই বন্ধ। জানালার ফাঁকে যখন চোখাচুখি হয় এ-বা ও দড়াম করে যারা যার তা বন্ধ করে দেয়। বাবু অগত্যা ছোট ভাই বোনদের নিয়ে চিৎকার করেঃ ‘জয়হিন্দ’! দিল্লি চল । আবু ওধার থেকে তাড়াতাড়ি তার ভাই বোনদের নিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে ‘লড়কে লেগে পাকিস্তান। পাকিস্তান জিন্দাবাদ‘ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ক্লান্ত হলেও কারু জিদ কমে না। কোন এক পক্ষ নীরব না হওয়া পর্যন্ত ছোট ভাইবোনদের নানা ঘুষ দিয়ে সরব রাখতে হয়।

ক্লাসেও দুজন সর্বদা ফারাক। এক বেঞ্চিতে বসে না , একই জায়গায় যায় না, এর সঙ্গে যার খাতির ওর সংগে তার নেই। কয়েকটি ভাল ছেলে তাদের আবার মিল ঘটানোর চেষ্টা করেও বিফল হল। শেষে সাধারণ ছেলেরা এমন কি শিক্ষক মশাইরা পর্যন্ত চেষ্টা করে হার মানলেন। বিরক্ত হল । শেষে সাধারণ ছেলেরা এমন কি শিক্ষক মশাইয়েরা পর্যন্ত চেষ্টা করে হার মানলেন , বিরক্ত হলেন। দুজনেই স্কুলের দুই সেরা ছেলে। পড়ায় না হলেও বুদ্ধিতে বিতর্কে, অভিনয়ে, আবৃত্তিতে, সঙ্গীতে, ছবি আঁকায়, কবিতা লেখায়, খেলাধুলায় প্রভৃতি সব রকমে তারাই স্কুলের যাবতীয় অনুষ্ঠানের যোগ্য নেতা। তারা হাত না দিলে কোনো কাজই সুসম্পন্ন হয় না । শিক্ষকরাও তাদের উপর ভার দিয়ে খুশি হন, নিশ্চিন্তে থাকেন। কিন্তু তারা পরস্পর মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ করার ফলে স্কুলের কোনো অনুষ্ঠানই আর জমে না। সাধারণ ছেলেদের আক্ষেপের আর অন্ত রইল না।

অথচ মজা এইঃ কেন যে দুজনে এত মনান্তর হল তা কিন্তু দুজনের কেউ ভাল করে জানে না। বাবু দুঃখ পেয়ে শেষ পর্যন্ত রেগে গেছে । ঠাণ্ডা মনে ভাবতে গেলে দেখেছে ভাবনা অনেক ছড়িয়ে পড়ে । কোথাও যেন কোন যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে তার কী দোষ , কেন আবু সর্বদা তার কাজের উল্টোটি করবার জন্য ব্যস্ত? ক্ষমা চাইবার পরে আবুর কেন এই ব্যবহার? কেন আবুর বাবা তার বাবার উপর ক্রুদ্ধ?

আবার আবু ভাবেঃ তার কী দোষ! বাবা বারণ না করলে সে বাবুর বাড়ি যাওয়া বন্ধ করত নাকি? কেন বাবুর বাবা তার বাবাকে উপহাস করে ? কেন বাবু সর্বদা তার কাজের বিপরীতটি করবে? সে যদি বলে পাকিস্তান চাই বাবু কেন ওধার দিয়ে টিটকারি দিয়ে বলবে—নেহি মিলেগা? পাকিস্তান কী কে জানে! বাবা বলেন মুসলমানদের স্বাধীনতা । তাই যদি হয় বাবুর তা দিতে আপত্তি কেন ? সে হিন্দুর জয়ধ্বনি করবে অথচ তাকে মুসলমানের জয়ধ্বনি করতে দেবে না কেন? সবাই বলে , মুসলমানরা খুব ভাল, বাবুরা তবু হিন্দু থাকল কেন?

অন্যদিকে বাবু ভাবেঃ আবুরা কেন হিন্দু হল না ? কেন আবুর বাবা তার বাবার কথা মানবে না ? কেন আজ আরেক নিশান উড়োবে? স্বাধীনতা চাই –না বলে কেন বলবে ‘পাকিস্তান চাই’ ! পাকিস্তান মানে কী? বাবা চাইছেন অখণ্ড হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা। হিন্দুস্তান মানে তো শুধু হিন্দুর দেশ নয়। তার বাবার মুখেই শুনেছে সাহেবেরা ভারতবর্ষের মুসলমানকেও বলে হিন্দু। Indus শব্দ থেকে এই দেশের নাম হয়েছে হিন্দুস্তান। কত সম্প্রদায়ের দেশ এই ভারতবর্ষ। তাদের সকলেরই স্বাধীনতা চাই । তার বাবা তো কখনই বলেননি যে, মুসলমানদের স্বাধীনতা হবে না। তবু আবুর বাবা কেন তার উপরে বীতরাগ? আবুই বা কেন বুঝবে না? পাকিস্তান মানে নাকি দেশকে ভাগ করা; হিন্দু মুসলমান আলাদা আলাদা এলাকায় ভাগ হয়ে যাওয়া , তা কেন হবে মিলে মিশে থাকতে দোষ কী? বেশ তো তারা ছিল আবুর মনে তো কোনোদিন এমন সংকীর্ণতা দেখা যায়নি। এ নিশ্চয়ই ঐ ডিকের চক্রান্ত ভেবে বাবুর মনে একটা আক্রোশ জমে ওঠে ।

এইভাবে দুজনের কেউ নিজের দোষ দেখে না যদিও বা দেখে শোধরানোর পথ পায় না। সুতরাং রেষারেষি করেই তাদের দিন কাটতে লাগল। আবার ভাব হবার কোথাও কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

কিছুদিন কেটে যায়।

তারপর এল সে বছর সরস্বতি পূজোর একটি দিন।

সরস্বতি পূজোর পরের দিন এই শহরের ছেলেরা খুব ধুমধাম করে ঘুড়ি ওড়ায়। আকাশ ঘুড়িতে ঘুড়িতে ভরে ওঠে; উড়ছে , প্যাঁচ খেলছে , লোট খাচ্ছে কত রকম দৃশ্য তখন দেখা যায়। আর নিচে থেকে শহরের নিষ্কর্মা ছেলের দল , এমন কী বুড়োরাও তাই দেখে আমোদ পায়। শহর জুড়ে হৈ হল্লা করে ।

আবু বাবুরও ঘুড়ি ওড়াবার বাতিক। এ খেলা যে পূজো উপলক্ষে হয় তা তো না , কাজেঈ সেও বাবুর মত তার প্রকাণ্ড লা্টাইয়ের কয়েক হাজার গজ সুতো বেশ মাজা দিয়ে তৈরি করে । দুজনেই অর্ডার দিয়ে সেরা দুখানা ঘুড়ি তৈরি করায়।

ক্লাসে রটালোঃ আমার ঘুড়ির নাম হবে পাকিস্তান, আর ও বললে, হিন্দুস্তান । দুই ছাদ থেকে দুই ঘুড়ি উড়বে, দুজনের মধ্যে যখন এত রেষারেষি, সুতরাং দুটোতে প্যাঁচ খেলা যে হবেই সে সম্পর্কে তারা কিছু না বললেও ছেলেরা আনাজ করে মহা উৎসাহিত হয়ে উঠলো। কে একটি ভাল ছেলে মন্তব্য করলঃ যার কাটবে তারই হার। দেখা যাক হিন্দুস্তান পাকিস্তানের এইবার মীমাংসা হয় কী না।

নির্দিষ্ট দিনে দুই ছাদ থেকে দুই ঘুড়ি সোঁ সোঁ করে আকাশে উঠে গেল । প্রকাণ্ড দুই ঘুড়ি। একটা তিনরঙা আর একটা সবুজ। একটার গায়ে লেখাঃ অখণ্ড হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ ! অন্যটার গায়ে লেখা পাকিস্তান জিন্দাবাদ । দেখতে দেখতে কসরত করতে করতে দুটো ঘুড়িই আকাশের অনেক উপরে উঠে গেল।

শহরের অন্য সব ছেলেরা নিজেদের খেলা বন্ধ রেখে ডিকের বাড়ির পাশে প্রকাণ্ড মাঠে এসে জমায়েত হল এবং দুদল দুপাশে থেকে চিৎকার করে আবু আর বাবুকে উৎসাহিত করতে লাগল । এমন কী ডিকও তাদের বাড়ির ছাদে উঠে এল মজা দেখবার জন্য।

প্যাঁচ খেলবার ইচ্ছা প্রথমটা কারুরই মনে ছিল না । ঘণ্টা খানেক নানা রকম কসরৎ চলল। প্যাঁচ লাগাতে কাউকেই যেন খুব উৎসাহিত দেখা যায় না । ছেলেরা চিৎকার করে। এরা বলেঃ লাগাও না প্যাঁচ যদি হিন্দুস্তান কাটে তাহলে দেখে নেবো না ওকে?

ওরা বলেঃ লাগাও না প্যাঁচ যদি পাকিস্তান কাটে তাহলে ওর হিন্দুস্তানকে ফারাকফাই করে ফেলবো না? ডিকের উৎসাহে তারা আরো উৎসাহিত হয়। বাবু- আবুও উত্তেজিত হয়ে ওঠে । তারপর বাবু যদিবা এগোয় তখন আবু দূরে সরে – নিচের ছেলেরা ‘দুও’ ‘দুও’ বলে উপহাস করে । আবু লাল হয়ে তার ঘুড়িকে এক ঘোঁৎ খাইয়ে বাবুর কাছে নিয়ে আসে।

লাগে প্যাঁচ । দুজনেরই ঘুড়ি ঘুরপাক খায়, লাটাই বনবন করে সুতো যায়। দুই ছেলের দল তাদের উৎসাহ দেয়।

এদিকে সুতো নিতে নিতে ঘুড়িকে আর দেখা যায় না ।বিন্দুর মত তারা যেন কোথায় মিলিয়ে গেল । নিচে ছেলের দলের মাঝে হঠাৎ কলরব উঠলঃ পাকিস্তান কেটে গেছে । তৎক্ষণাৎ হৈচৈ, এ পক্ষ থেকে ওপক্ষকে উপহাস আর বিদ্রুপ। অখণ্ড হিন্দুস্তানের সমর্থকেরা জয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠল। ওপক্ষের ছেলেদের কে বললঃ কেটে যায়নি , ওরাই বড় করে কোনো বাড়ির ছাদ থেকে টেনে নামিয়েছে। আর যায় কোথা ! তারাও, বিশ্বাসঘাতক~ এ শয়তানি , হিন্দুস্তান ধ্বংস হউক, কংগ্রেস ধ্বংস হউক , ইত্যাদি শুরু করে দিলে! এবং দেখতে দেখতে দুইদল ছেলের মধ্যে প্রচণ্ড লড়াই শুরু হয়ে গেল।এ ওকে ‘কণ্ঠ পাকড়ি ধরিল আঁকড়ি’ ।উড়লো ধুলো ছিটল ঢিলা । কতজন যে কতজনকে আঁচড়ালো, কামড়ালো, জামা ছিঁড়ে দিল। ন্যাংটো করল, কিল চড় চাপড়, চাটিতে নাস্তানাবুদ করে নিজেও কাবু হল , কে তার ইয়ত্তা করে । সে যেন দ্বিতীয় এক হলদিঘাট বা পানিপথ। ক্রমে যে যার ছেলেদের বাঁচাতে শহরশুদ্ধ লোক সেখানে ছুটে এল। এসেই কোনো কিছু ঠাহর করার আগেই দুমদুম কিল খেয়ে ক্ষেপে গিয়ে যাকে পায় তাকেই দমাদম মারে। কেউ কারো নাক ধরে হিঢ়িড় করে টানে কেউ কান টানে । কেউ বা কোঁচা- কাছা। কেউ উপড়ায় গোঁফ , কেউ কারো দাড়ি । কেউ বলে জয়হিন্দ! কেউ বলে আল্লাহু আকবর! মার যখন খায় তখন চুপ, তারপর একটু দম পেলেই আবার চিৎকার । কেউ কারো কম যায় না । দেখতে দেখতে আহতদের চিৎকারে সারামাঠ ভরে গেল। যে বেচারিরা ভাল মন্দের হিন্দুস্তান পাকিস্তানের ধার ধারে না তারাই মার খেল বেশি। পালাবার পথ না পেয়ে একবার করে দুদলেরই গাট্টা আর কিল খেয়ে তারা ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললে!

বাবু আর আবুর এদিকে চোখ পড়ল অনেক পরে । দেখেই তো চক্ষু স্থির।! সারা মাঠে আহতদের কাতরানি। মারামারির উন্মত্ততা । যে দুষ্টু ছেলেগুলো এতক্ষণ তাদের প্যাঁচ লাগাতে উৎসাহ দিচ্ছিল মারামারিতে তাদেরই উৎসাহ যেন বেশি এবং বুঝতে কষ্ট হয় না যে , গোলমাল বাঁধিয়ে তুলেছে তারাই । বাবু – আবু আরো লক্ষ্য করে , মারামারিটা যে কেবল হিন্দুস্তান পাকিস্তানের সমর্থকদের মধ্যেই তা নয়, যে যেভাবে পারে যার যার দুশমনকে এতোদিনকার শোধ নিচ্ছে। আহতের হাত থেকে , পকেট থেকে লাট্টু লাটাই , মার্বেল, যা-ই পায় লুটে নেবার জন্যই তাদের স্ফুর্তি বেড়ে গেছে ।

দুষ্টু ছেলেদের এই দাঙ্গা থানা পুলিশ , বাবারা অফিস থেকে ফিরে এলে তাদের মারের কথা ভেবে বাবু- আবুর মুখ শুকিয়ে গেল।

দুজনেরই হাতের লাটাই তখন শূন্য।

হঠাৎ বাবুর ছোট ভাই ডিকের ছাদের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলেঃ দাদা, ঐ দেখ। আবুর ভাই বলে দাদা ডিক-

দুজনেই তাকিয়ে দেখে ডিক আর তার বোন এলিস তাদেরই ঘুড়ি টেনে নামাচ্ছে। ছাদের উপর থেকে তারাই সুতো ধরে টেনে নামিয়েছে !

তাদের তাকাতে দেখে ডিক উল্লাস করে হেসে উঠলঃ you fool, now I am the owner of Hindustan and Pakistan dam your স্বাধীনতা ! (এই বোকারা ! তোদের পাকিস্তান হিন্দুস্তানের হর্তা- কর্তা তো এখন আমি, চুলোয় যাক তোদের স্বাধীনতা ।)

অনেকদিন পর বাবু তাকায় আবুর দিকে , আর আবু বাবুর দিকে। তারপর দুজনেই আলিসার কাছে এসে একই সঙ্গে বলে ওঠেঃ দেখলে ডিকের কাণ্ডটা-

নিচে মাঠে স্কুলের একটি ভাল ছেলে মার খেয়ে কাতরাচ্ছিল , হঠাৎ সেদিকে চোখ পড়তে সে তার ব্যথা ভুলে জয়ধ্বনি করে উঠল ।