» শিক্ষাদর্শন ও বাঙ্গালী মানসের কিছু পরিচয়

প্রকাশিত: ০৫. নভেম্বর. ২০১৯ | মঙ্গলবার

কাজি নুসরাত সুলতানা

ভূমিকা
প্লেটো বলেছেন, ভাল রাষ্ট্র গড়তে হলে ভাল নাগরিক চাই। ভাল নাগরিক পাওয়ার ব্যাপারটা ভবিতব্যের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। ভাল শিক্ষা দিয়ে ভাল নাগরিক তৈরি করতে হবে এবং সে দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে জন্যই তিনি তাঁর রাষ্ট্র বিষয়ক গ্রন্থ ‘রিপাবলিক’-এর একটা বড়সড় অংশ নিয়োজিত করেছেন শিক্ষা বিষয়ক আলোচনায়, যেখানে তিনি সুশিক্ষিত নাগরিক তৈরীর এক অনুপম পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন। প্রায় আড়াই হাজার বছরের বেশী আগে প্লেটো যেসব বিষয় এবং যেভাবে উপস্থাপন আবশ্যক বলে বিবেচনা করেছেন তার সবকিছুই যে আজও এবং সবাই, সমান গুরুত্বের সঙ্গে মেনে নেবেন এমন আশা করা হয়ত যাবে না। কিন্তু পরবর্তীকালের শিক্ষা দার্শনিকদের মতামত গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে প্লেটোর বক্তব্যের সঙ্গে তাঁদের বক্তব্যে মোটাদাগের অমিলের চাইতে মিলই বেশী। প্লেটো ভাববাদী দার্শনিক এবং এরিস্টটল বাস্তববাদী। কিন্তু শিক্ষা দর্শনের ক্ষেত্রে উভয়েই যুক্তিবাদী এবং বলা যায়, এরিস্টটলের শিক্ষাদর্শন প্লেটোর শিক্ষাদর্শনেরই একটি উন্নত সংস্করণ। ফলে পরবর্তীকালের ভাববাদী ও বাস্তববাদী শিক্ষাদর্শনের বক্তব্যে প্রচুর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে শিক্ষার মূল লক্ষ্য নির্ধারণে। শিক্ষাদর্শনের ক্ষেত্রে প্লেটোর অবদান সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আঠারো শতকের দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাকস রুশো যা বলেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলছেন, ‘তুমি যদি জানতে চাও নাগরিক শিক্ষা কাকে বলে তাহলে প্লেটোর রিপাবলিক পড়’। সুতরাং দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাদার্শনিক মতবাদগুলো প্লেটোর দর্শনদ্বারা বহুলাংশে প্রভাবিত। প্রয়োগবাদী দর্শনের নবরূপায়ণ, প্রয়োগ ও প্রসার বিংশ শতাব্দীর ঘটনা। ঐ ধারার দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা জন ডিউই-এর কাজের উল্লেখযোগ্য অংশই শিক্ষা নিয়ে। ভাববাদের সঙ্গে প্রয়োগবাদের পার্থক্য সহজেই দৃশ্যমান। তবু শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয়ে প্লেটো এবং ডিউইর মতামতের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।

এসব বিষয় বিচার করে আমরা বোধ হয় একথা বলতে পারি, শিক্ষাদর্শনের ক্ষেত্রে প্লেটোর কালের অবস্থান থেকে আমরা খুব একটা অন্য রকম কোন অবস্থানে এসে পৌঁছুইনি। এবারে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে গত আড়াই হাজার বছর ধরে এত দার্শনিকের শিক্ষা নিয়ে এত কথা বলার কি দরকার ছিল?
মানুষ হিসাবে কতকগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্যের জন্য এক মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের মিল আছে। ঐসব বৈশিষ্ট্যের জন্যই সে প্রাণীজগতের অন্যান্য সদস্যের থেকে ভিন্নতর। কিন্তু আবার প্রত্যেকটি মানুষই অন্য আরেকজন মানুষ থেকে আলাদা। আপন ভাই বোনের মধ্যেও চরিত্রগত ও আকারগত প্রচুর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের জন্যই জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে বিভিন্নতা দেখা যায়। জীবনের লক্ষ্যের সঙ্গে শিক্ষার লক্ষ্য অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সেই জন্যই স্থান-কাল-পাত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় শিক্ষার দর্শন, সেই জন্যই আড়াই হাজার বছর আগে বিনির্মিত প্লেটোর শিক্ষাদর্শন অনুপম হলেও পরবর্তী কোন কালেই তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন স্থানের মনীষীরা তাঁদের নিজেদের পরিমন্ডলের প্রয়োজন অনুযায়ী, নিজেদের মন-মানসের সংগঠন অনুযায়ী শিক্ষাদর্শন বিনির্মাণে সচেষ্ট থেকেছেন। এ প্রচেষ্টায় তাঁরা অবশ্যই পূর্বসূরীদের চিন্তাচেতনার সাহায্য গ্রহণ করেছেন। প্লেটোও তা করেছিলেন।
আমাদের দেশে আমরা সাধারণত: যে সব মতবাদ নিয়ে আলোচনা করি এবং যেসব মতবাদ দ্বারা অনুপ্রাণিত হই তার প্রায় সবই পাশ্চাত্যের দর্শন। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে জীবনযাত্রার প্রণালী ও আদর্শের দিক দিয়ে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মাঝে বেশ কিছু অমিল রয়েছে। তাই প্রাচ্যের একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রতীচ্যের শিক্ষাদর্শনকে পুরোপুরি খাপ খাওয়ানো সম্ভব নয়, সমীচীনও নয়। এ কথা আমাদের পূর্বসূরী চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ ভালই বুঝেছিলেন। তাঁরা তাঁদের চিন্তার স্বাক্ষরও রেখেছেন নানান কর্মে, নানা বক্তব্যে। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের চলাকে স্বচ্ছন্দ করতে প্রাচ্যের সেই সব মননের স্বরূপ উদঘাটন করা একান্ত প্রয়োজন। বর্তমান গ্রন্থে ঐ রকম কয়েকজন ব্যক্তিত্বের শিক্ষাদর্শন আলোচনা করার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য সাধারণ, এঁরা সবাই সাহিত্যিক এবং এঁরা সবাই শিক্ষকতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে তঁাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। এই গ্রন্থে শিক্ষার স্বরূপ ও লক্ষ্য সম্বন্ধেও একটি আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো ইতোপূর্বে বাংলা একাডেমীর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। রবীন্দ্র শিক্ষাদর্শনের উপর লেখা প্রবন্ধটি শরীফ হারুন সম্পাদিত এবং বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থ বাংলাদেশে দর্শন, ঐতিহ্য ও প্রকৃতি অনুসন্ধান (তৃতীয় খন্ড)-এ পুনঃমুদ্রিত হয়েছে। এটি আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এড কোর্সের গবেষণা বিষয়ের জন্য রচিত গবেষণাপত্রের প্রবন্ধরূপ।
প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘শিক্ষা নৈতিকতা ও মানবজীবন’। এই অধ্যায়ে শিক্ষার লক্ষ্য, শিক্ষার স্বরূপ, নৈতিকতার স্বরূপ এবং শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবজীবনের সম্পর্ক বিষয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা দর্শন নিয়ে আলোচনা। রবীন্দ্রনাথকে বলা হয় ভাববাদী দার্শনিক। কিন্তু শিক্ষাদর্শনের ক্ষেত্রে তাঁকে যে কেবল আকাশচারী ভাবালুতার উপস্থাপক বলা যায় না বরং বলা যায় আধুনিক সমন্বয়বাদের পৃষ্ঠপোষক তা সাধ্যমত জোরালোভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে ‘রবীন্দ্রশিক্ষাদর্শন: একটি ত্রিমাত্রিক সমীক্ষা’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধ্যায়ের এই প্রবন্ধে।
তৃতীয় অধ্যায়ে যাঁর শিক্ষাদর্শনের প্রকৃতি উদঘাটন করার চেষ্টা করা হয়েছে তাঁর নাম কাজী ইমদাদুল হক। বিশ শতকের গোড়ার দিকের বাংলা সাহিত্য-অঙ্গনে কাজী ইমদাদুল হক ছিল একটি পরিচিত নাম। তাঁর রচিত আবদুল্লাহ উপন্যাসটি তৎকালীন মুসলমান সমাজের একটি অনন্য চালচিত্র বলেই বিবেচিত হয়ে আসছে আজ পর্যন্ত। বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে শিক্ষা সম্বন্ধে তাঁর যে মতামত প্রকাশ পেয়েছে তারই পর্যালোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে এই অধ্যায়ে।
চতুর্থ অধ্যায়ের বিষয়বস্তু বেগম রোকেয়ার শিক্ষাদর্শন। বেগম রোকেয়ার কর্মকাণ্ডের মূল ক্ষেত্র ছিল নারীর উন্নয়ন এবং তার মাধ্যমে সমাজের সংস্কার। সে জন্য যে সুশিক্ষার প্রয়োজন তার সম্যক উপলব্ধি তাঁর ছিল। এ উপলব্ধির লিখিত প্রকাশ রয়েছে তাঁর নানান রচনায়। সেগুলো পর্যালোচনা করে তার সাথে বিভিন্ন পাশ্চাত্য শিক্ষা দার্শনিকের মতামতের তুলনা করে রোকেয়ার শিক্ষাদর্শনের গুরুত্ব নিরূপণ করার প্রচেষ্টাই চতুর্থ অধ্যায়ের উপজীব্য।

এ গ্রন্থে আলোচিত বিষয়গুলো যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণরত বি.এড ও এম.এড প্রশিক্ষণার্থীদের ও শিক্ষকদের কাজে লাগবে। তাছাড়াও, যিনিই শিক্ষা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন, আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার বা করার আকাক্সক্ষা পোষণ করেন, নিজ দেশীয় ঐতিহ্য ও মনীষা সম্পর্কে আগ্রহবোধ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, সেসব ঐতিহ্য ও মণীষাপ্রসূত জ্ঞানসম্পদ কাজে লাগানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে চান, তাঁরও উপকারে আসবে বলে আশা করি।

প্রবন্ধগুলো রচনায় ও গ্রন্থাকারে প্রকাশের প্রচেষ্টায় সবিশেষ উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রদান করেছেন আমার সতীর্থ অধ্যাপক ড. কাজী নূরুল ইসলাম। তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

কৃতি প্রকাশনা সংস্থা ‘নান্দনিক’-এর কর্তৃপক্ষকেও কৃতজ্ঞতা জানাই প্রবন্ধগুলোকে গ্রন্থাকারে প্রকাশের যোগ্য বলে বিবেচনা করার জন্য।

ধন্যবাদ জানাই আমার দুই ছেলে, শামস ও সা’দকে, যারা কেবলই চাপ দিয়ে আসছিল সরকারি কলেজের শিক্ষকতার চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর অন্য কাজ না করে লেখালেখি এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবন্ধগুলো বই আকারে প্রকাশের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হতে। ধন্যবাদ আমার মাকে, যিনি আজও আমার সংসারের হাল ধরে রেখে আমাকে লেখাপড়া করার সুযোগ দিয়ে চলেছেন। সর্বোপরি কৃতজ্ঞতা জানাই মহান আল্লাহতায়ার প্রতি যিনি আমাকে কিছুটা চিন্তা করার ও তা লিখিত ভাষায় প্রকাশ করার যোগ্যতা দান করেছেন।


প্রথম অধ্যায়

শিক্ষা নৈতিকতা ও মানবজীবন
মানব সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে আহার নিদ্রার মত আরেকটি কর্মপ্রক্রিয়া দিনের পর দিন ধরে অবিরাম গতিতে চলে আসছে, তার নাম শিক্ষা। আদি মানব আদম (আঃ)কে আল্লাহ শেখালেন তৎকালীন পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কলাকৌশল। তারপর থেকে প্রতি যুগের সন্তানেরা তাদের পিতামাতা ও সমাজের অন্যান্য বয়ঃপ্রাপ্তদেও মাধ্যমে আয়ত্ব করেছে জীবন যাপনের বিভিন্ন পন্থা। অবশ্য মানুষ যে শুধু বয়:প্রাপ্তদের কাছ থেকেই শেখে তা নয়; সে সবার কাছ থেকেই শেখে, নানান কিছুর মাধ্যমে শেখে। যদিও সেই সুপ্রাচীনকালেই শিক্ষার জন্ম তবু যেন এর স্বরূপকে এখনও পর্যন্ত সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। অতি পরিচিত এবং বহুল ব্যবহৃত শব্দ হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার স্বরূপ সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে না পারার প্রধান কারণ বোধ হয় শিক্ষা স্রোতন্বিনীর অশান্তধারার জীবনের বহু বিচিত্র ক্ষেত্রে প্রবাহিত কারণ বোধহয় শিক্ষা স্রোতম্বিনীর অশান্তধারার জীবনের বহু বিচিত্র ক্ষেত্রে প্রবাহিত হয়ে আসা। ‘শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানব জীবন’ শীর্ষক এ আলোচনাকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমে উদঘাটন করার চেষ্টা করেছি শিক্ষার স্বরূপ, তারপর বর্ণনা করেছি বিভিন্ন যুগের ও ব্যক্তির শিক্ষার লক্ষ্য সংক্রান্ত বক্তব্য। তৃতীয় অংশে বলার চেষ্টা করেছি যুগে যুগে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নৈতিকতার আদর্শ যেভাবে প্রতিফলিত হয়েছে সে সম্পর্কে কিছু কথা। আর সব শেষে কিছু বক্তব্য রেখেছি আমাদের করণীয় সম্বন্ধে।
শিক্ষার স্বরূপ
বাংলা ‘শিক্ষা’ শব্দটি সংস্কৃত ‘শাস্’ ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে যার অর্থ হল শাসন করা, শঙ্খলিত করা, নিয়ন্ত্রিত করা বা নির্দেশনা দেওয়া। সুতরাং বলা যায় যে, ‘শাস্’ ধাতু থেকে উৎপন্ন এই শব্দটি বিশেষভাবে শিক্ষা কৌশলকে বোঝাচ্ছে। শিক্ষা শব্দটির সমার্থক শব্দ হিসেবে আমরা বিদ্যা শব্দটি ব্যবহার করি। এই শব্দটি এসেছে, সংস্কৃত ‘বিদ’ ধাতু থেকে যার অর্থ ‘জানা’ বা জ্ঞান আহরণ করা’। এই শব্দটিতে জ্ঞান-আহরণের ক্রিয়া’র বা কৌশলের গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে। সুতরাং বাংলা শব্দগত অর্থ বিচারে শিক্ষার স্বরূপ সংকর্ণ হয়ে পড়ে। অভিধানে শিক্ষা শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে অভ্যাস, শেখা, বিদ্যাভ্যাস, অধ্যয়ন, চরিত্রান্নতি। এই শব্দগুলোও শিক্ষার স্বরূপকে পরিস্কারভাবে ও পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। শিক্ষার ইংরেজী প্রতিশব্দ ঊফঁপধঃরড়হ শব্দটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভাষাবিদরা তিনটি মত প্রকাশ করেছেন। এক দলের মতে, ঊফঁপধঃরড়হ শব্দটি এসেছে ল্যাতিন শব্দ ঊফঁপধৎব থেকে। যার অর্থ প্রতিপালন করা বা পরিচর্যা করা। এই অর্থে বিচার করলে শিক্ষা হল শিশু বা শিক্ষার্থীকে যথাযথ যতেœর মাধ্যমে জীবনপথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পন্থা। দ্বিতীয় দলের মতে ঊফঁপধঃরড়হ শব্দটি এসেছে অন্য একটি ল্যাতিন শব্দ, ঊফঁপবৎব থেকে যার অর্থ হল নিষ্কাশন করা বা টেনে বের করে আনা অথবা নির্দেশনার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই অর্থে শিক্ষা হল শিশুর বা শিক্ষার্থীর সুপ্ত বা অবিকাশিত সম্ভাবনার নিষ্কাশন এবং নির্দেশনা দিয়ে সেই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন। তৃতীয় দলের মতে এটি তৈরি হয়েছে অন্য আরেকটি ল্যাতিন শব্দ ঊফঁপধঃঁহ থেকে যার অর্থ শিক্ষাদান কর্ম বা ঞবধপযরহম. এই তিন অর্থের মধ্যে দ্বিতীয় অর্থটা কিছুটা ব্যাপকধর্মী ও আধুনিক সংব্যাখ্যানের কাছাকাছি।
অক্সফোর্ডের অফাধহপবফ খবধৎহবৎং উরপঃরড়হধৎু ড়ভ ঈঁৎৎবহঃ ঊহমষরংয এ ঊফঁপধঃরড়হ শব্দের অর্থ বলা হয়েছে ঝুংঃবসধঃরপ ঃৎধরহরহম ধহফ রহংঃৎঁপঃরড়হ (বংঢ়ববরধষষু ড়ভ ুড়ঁহম রহ ঝপযড়ড়ষ). দ্বিতীয় অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে কহড়ষিবফমব ধহফ ধনরষরঃরবং, ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ পযধৎধপঃবৎ ধহফ সড়ৎধষ ঢ়ড়বিৎং ৎবংঁষঃরহম ভৎড়স ংঁপয ঃৎধরহরহম. প্রথম অর্থটি, অর্থাৎ শিক্ষা হচ্ছে নিয়মিত শিক্ষণ ও নির্দেশ দেওয়া বেশি প্রচলিত ও জনপ্রিয়। গত প্রায় একশ’ বছর ধরে আরেকটি অর্থ বেশ পরিচিত হয়ে উ।েছে’ তাহলো শিক্ষা হচ্ছে এই শিক্ষা বা নির্দেশদানের কলা বা বিজ্ঞান অথবা কলা ও বিজ্ঞান দুইই। শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগের কর্মকাণ্ড এই অর্থের ভিত্তিতেই পরিচালিত হয। শিক্ষার এই সংজ্ঞা দুইটি মোটামুটিভাবে দ্বিধামুক্ত মনে মেনে নেয়া গেলেও দ্বন্দ্ব জাগে যখন শিক্ষা শব্দটা এই শিক্ষা ও নির্দেশদানের ফলফল বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। আমরা বলে থাকি অমুক ব্যক্তি ভাল শিক্ষা লাভ করেছেন অথবা অমুক ব্যক্তি ভাল শিক্ষা লাভ করার সুযোগ পাননি। এ ক্ষেত্রে প্রথম ব্যক্তির বেলায় আমরা বোঝাতে চাই যে, তিনি স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। আর দ্বিতীয় ব্যক্তির বেলায় বোঝাতে চাই, হয় তিনি স্কুলে যাবার সুযোগই পাননি অথবা তিনি উচ্চতর অর্থাৎ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাননি। আমরা আবার এমন ধরনের মন্তব্য করে থাকি যে, অমুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপ্রাপ্ত হলেও সুশিক্ষা পায়নি অথবা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা না পেরোলেও অমুকের জ্ঞান ও সংস্কৃতিমনষ্কতার তুলনা হয় না। এসব উদাহরণের অবতারণার উদ্দেশ্য একটাই; শিক্ষা শব্দটির ব্যবহার বৈচিত্র্যের কিছু নমুনা তুলে ধরা।
শিক্ষার প্রকৃত অর্থ যদি বিচার করতে চাই তাহলে নিশ্চয়ই-এমন কোনো প্রক্রিয়াকের অন্তর্ভুক্ত করতে পারব না যা মানুষের সচেতন প্রয়াস দ্বারা প্রভাবিত নয় অথবা এমন প্রক্রিয়া যা মানুষের পরিবর্তন সাধন ক্ষমতার বাইরে। শিক্ষার মাধ্যমে আমরা কোন মানুষের শরীরে একটি অতিরিক্ত হাত সংযোজন করতে পারব না অথবা স্নায়ুতন্ত্রের কর্মধারায় কোন পরিবর্তনও আনতে পারব না। শত চেষ্টা করলেও আমরা ঘূর্ণিঝড়কে বা ঋতুচক্রকে শিক্ষিত করে তুলতে পারব না। বরং আমরা আমাদের নিজেদেরকে এমনভাবে শিক্ষিত করে তুলতে চাই যার মাধ্যমে এসব প্রাকৃতিক নিয়ম বা ঘটনাবলীকে নিয়ন্ত্রণ করতে বা এগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারি। সুতরাং আমরা এমন কোন পরিবর্তনকে শিক্ষা শব্দের অন্তর্ভুক্ত করতে পারব না যা পরিনামের ফলে বা প্রাকৃতিক ঘটনার কারণে ঘটে থাকে।
তাহলে আমরা বলতে পারি যে শিক্ষা বলতে আচরনের এমন পরিবর্তনকে বোঝায় যা ঘটে শিখনের (ষবধৎহরহম) ফলে। এ পরিবর্তন যান্ত্রিক প্রকৃতির নয় অর্থাৎ একটি পাথরকে একটি হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করলে পাথরটিতে যে পরিবর্তন আসবে এ পরিবর্তন সে রকম নয়। এ পরিবর্তন আসে পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গৃহীত নতুন অভিজ্ঞতার সংযোজনের প্রভাবে। যার মধ্যে পূর্ব অভিজ্ঞতা ধরে রাখার ক্ষমতা নেই তার পক্ষে শিখন সম্ভব নয়। ‘শিখন সেখানেই ঘটে যেখানে জীবন্ত কোষ তার নিজস্ব ইতিহাস ধরে রাখতে পারে পরবর্তী অবস্থায় ব্যবহারের জন্য। ১
শিখনের ফলে শিক্ষা হয় বটে। কিন্তু শিখন এবং শিক্ষা সমার্থক নয়। মানুষের শিক্ষা তার সমস্ত শিখনের যোগফল। কিন্তু যে শিখন মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় তা শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত নয়। এই নিয়ন্ত্রণের মাত্রা আছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী তাতে পার্থক্যও হয়। ফলে আমরা বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা পাই।
প্রতিবেশি শিক্ষা: এক ধরনের শিখন আছে যা প্রায় আপনা আপনিই ঘটে থাকে। আমরা তাই কারো কাছ থেকে পরিকল্পনা মাফিক নির্দেশনা ছাড়াই হাঁটতে শিখেছি রাস্তার ধার দিয়ে, খেতে শিখেছি অথবা বাদ দিতে শিখেছি বিশেষ কোন খাবার, উঠে দাঁড়াতে শিখেছি গুরুজনদের দেখে, থাকতে শিখেছি ঘর বানিয়ে অথবা পরতে শিখেছি জামাকাপড়। যে কোন সমাজই চাইবে তার তুন প্রজন্ম প্রচলিত রীতি প্রথা অনুসরণ করে চলুক। সুতরাং এটা শিক্ষা। কিন্তু যেহেতু ঐ সব রীতিপ্রথা কোন বিধিবদ্ধ পাঠ্যক্রম তৈরি করে অথবা সচেতন নির্দেশনার মাধ্যমে শেখানো হয় না; বরং সাধারণ জীবন যাপনের মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থী শেখে, তাই একে বলা যায় প্রতিবেশি শিক্ষা।
অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাঃ আরেক ধরনের শিখন আছে যা ঘটানো হয় সচেতন উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে। কিন্তু যাঁরা শেখান, শেখাানোটা তাঁদের প্রাথমিক কাজ নয়। তাঁরা হয়তো জ্ঞান বা তথ্য সরবরাহ করেন অথবা শিক্ষার্থীর অভ্যাস গঠনের চেষ্টা করেন, কিন্তু সেটা তাঁদের পেশা নয়। এ রকম শিক্ষাকে বলা হয় অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা। মা-বাবা এ রকম শিক্ষা দিয়ে থাকেন যথেষ্টই; নিয়োগ কর্তা তাঁর শিক্ষানবশীশ কর্মচারীকে, সিনেমার পরিচালক তাঁর প্রযোজককে অথবা আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে এ রকম শিক্ষা দিয়ে থাকি। সে জন্যই বলা হয় প্রতিষ্ঠানে পাঠগ্রহণ শেষ হলেই শিক্ষা গ্রহণ শেষ হয় না। এও বলা হয়ে থাকে যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হচ্ছে শিক্ষার সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা: এ ধরনের শিক্ষাকে বলা যায় কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে সংগঠিত নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। সাধারণতঃ কোন বিশেষ বা তাৎক্ষণিক চাহিদা বা প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এ ধরনের প্রশিক্ষণ কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও দেয়া যায় আবার রেডিও টেলিভিশন, প্রামাণ্যচিত্র, প্রদর্শনী ইত্যাদির মাধ্যমেও দেয়া যায়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বয়স বা শিক্ষাগতযোগ্যতা সাধারণত নির্দিষ্ট করা থাকে না। কোন কোন ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু পাঠ্যসূচী থাকে, সময়সীমা নির্ধারণ করা থাকে এবং সনদপত্র দেয়া হয়। যেমন কথ্য ইংরেজী ভাষা শিক্ষা, টাইপিং শিক্ষা, সেলাই শিক্ষা ইত্যাদি। আবার কোন ক্ষেত্রে এসব থাকে না; যেমন রেডিও বা টেলিভিশনের মাধ্যমে কৃষি বা মৎস্যচাষ অথবা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত শিক্ষা।
আনুষ্ঠানিক শিক্ষাঃ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এমন একটি শিক্ষাধারা যেখানে শিক্ষা বা প্রশিক্ষণদানের উদ্দেশ্য স্পষ্ট এবং যা স্তরভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। শিশু শিক্ষালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অন্তর্গত। এ শিক্ষা ধারায় নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচী থাকে। এই পাঠ্যক্রম শিক্ষার্থীর বয়স অনুযায়ী বিন্যস্ত করা হয়।
ঊহপুপষড়ঢ়ধবফরধ ইৎরঃধহহরপধতে শিক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এই ভাবে : ঊফঁপধঃরড়হ পধহ নব ারববিফ ধং ঃযব ঃৎধহংসরংংরড়হ ড়ভ ঃযব াধষঁবং ধহফ ধপপসঁষধঃফ শহড়ষিবফমব ড়ভ ধ ংড়পরবঃু.২
ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঊহপুপষড়ঢ়ধবফরধ ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ-এ বলা হয়েছেঃ
ঊফঁপধঃরড়হ ংরমহরভরবং ঃযব ংঁস ঃড়ঃধষ ড়ভ ঢ়ৎড়পবংংবং নু সবধহং ড়ভ যিরপয ধ পড়সসঁহরঃু ড়ৎ ংড়পরধষ মৎড়ঁঢ়, যিবঃযবৎ ংসধষষ ধৎ ষধৎমব, ঃৎধহংসরঃং রঃং ধপয়ঁরৎবফ ঢ়ড়বিৎ ধহফ ধরসং রিঃয ধ ারবি ঃড় ংবপঁৎরহম রঃং ড়হি পড়হঃরহঁড়ঁং বীরংঃবহপব ধহফ মৎড়ঃিয.৩
দুটো সংজ্ঞাতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু শিক্ষাকে কেবলই সমাজের অস্তিত্ব বজায় রাখার ও তার অগ্রগতি নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করে শিক্ষার সামাজিক প্রেক্ষিতকে গুরুত্ব দেয়া হলেও শিক্ষার ব্যক্তি-প্রেক্ষিতকে উপেক্ষা করা হল। ব্যক্তিই শিক্ষা লাভ করে। তাই ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষার কোন বিশেষ অর্থ থাকতে পারে এবং তাও বিবেচনা করা দরকার।
উরপঃরড়হধহু ড়ভ ঢ়ংুপযড়ষড়মু-তে শিক্ষাকে বলা হয়েছে ঞযব ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ ধনরষরঃরবং, ধঃঃরঃঁফবং, ভড়ৎসং ড়ভ নবযধারড়ঁৎ ধহফ ঃযব ধপয়ঁরংরঃরড়হ ড়ভ শহড়ষিবফমব ধং ধ ৎবংঁষঃ ড়ভ ঃবধপযরহম ড়ৎ ঃৎধরহরহম . এই সংজ্ঞাটিতে আবার শুধুই শিক্ষার্থীর প্রেক্ষিত বিবেচনা করা হয়েছে। শিক্ষার সঙ্গে সমাজের যে সম্পর্ক তা বিবেচনা করা হয়নি। অথচ সমাজের প্রয়োজনটিও যথেষ্ট গুরুত্বের দাবিদার। কারণ সমাজ ছাড়া ব্যক্তি স্বার্থক হতে পারে না। পার্সি নান শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘ঊফঁপধঃরড়হ রং ঃযব পড়সঢ়ষবঃব ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ রহফরারফঁধষরঃু ড়ভ ঃযব পযরষফ ংড় ঃযধঃ যব পধহ সধশব ধহ ড়ৎরমরহধষ পড়হঃৎরনঁঃরড়হ ঃড় যঁসধহ ষরভব ধপপড়ৎফরহম ঃড় ঃযব নবংঃ ড়ভ যরং পধঢ়ধপরঃু.৪
এই সংজ্ঞাটিতে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিসত্ত্বার পরিপূর্ণ বিকাশের ওপর জোর দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানব জাতির জন্য তার অবদান রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। বিশ শতকের আরেকজন দার্শনিক এ.এন. হোয়াইটহেড-এর সংজ্ঞাটিও প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন ঊফঁপধঃরড়হ রং ঃযব ধপয়ঁরংঃরড়হ ড়ভ ঃযব ধৎঃ ড়ভ ঃযব ঁঃরষরুধঃরড়হ ড়ভ শহড়ষিবফমব. অর্থাৎ শুধু জ্ঞান অর্জন করাটাই শিক্ষা নয়। সেই জ্ঞানকে বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যবহার করার নৈপুণ্য অর্জন করাটাই শিক্ষা।
এই সমস্ত সংজ্ঞা ও আলোচনার ভেতর থেকে শিক্ষার কতকগুলো বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো শিক্ষার স্বরূপ অনুধাবনে যথেষ্ট সহায়ক বলে মনে হয়। ৫
১। শিক্ষা একটি প্রক্রিয়াঃ শিক্ষা এমন কোন বস্তু নয় যা একজন আরেকজনের হাতে তুলে দিতে পারে বা তুলে দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায়। বরং এটি একটি প্রক্রিয়া যা শিক্ষার্থীর ভেতর চলমান।
২। শিক্ষা জীবনব্যাপী প্রক্রিয়াঃ চলমান এই প্রক্রিয়াটি কোন নির্দিষ্ট সময়ের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণার সূত্র ধরে বলা যায় এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয় জন্মমুহূর্তে আর শেষ হয় মৃত্যুতে। এ প্রসঙ্গে আমরা হযরত মুহম্মদ (দঃ) এর বাণী স্মরণ করতে পারি। তিনি বলেছিলেন, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণের সময়।
৩। শিক্ষা অভিজ্ঞতা অর্জন: ব্যাপক অর্থে অভিজ্ঞতা অর্জনই শিক্ষা। জীবিত মানুষের একটি মুহূর্তও অভিজ্ঞতাবিহীন নয়, প্রতিটি মুহূর্তেই সে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে চলেছে; বৃদ্ধি পাচ্ছে তার সঞ্চয়, নবতর অভিজ্ঞতার আলোকে হচ্ছে পূর্ব অভিজ্ঞতার পুনর্গঠন ও পুনঃসৃজন।
৪। শিক্ষা সামাজিক প্রক্রিয়াঃ এই অভিজ্ঞতা লাভ হয় সমাজের বিভিন্ন সদস্য, প্রতিষ্ঠান সংস্থা, সংগঠন ইত্যাদির সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থাৎ সামাজিক পরিমন্ডলে। তাই শিক্ষা অবশ্যই একটি সামাজিক প্রক্রিয়া।
৫। শিক্ষা আচরণের পরিবর্তনঃ পূর্ব অভিজ্ঞতা নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে নবরূপে সৃজিত হয়ে তা আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে এবং তাতে পরিবর্তন আনে। নতুন আচরণের মাধ্যমেই মানুষ তার অস্তিত্ব সংরক্ষণ ও অগ্রগমনকে নিশ্চিত করে। তাই শিক্ষার অর্থই হচ্ছে আচরণের পরিবর্তন।
৬। শিক্ষা বাস্তব সমস্যার সমাধানঃ শিক্ষা ঘটে বাস্তব ক্ষেত্রে কোন সমস্যা সমধানে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত না ব্যক্তি বাস্তব জীবনে নিজে সমস্যার সমাধান করে ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষা লাভ ঘটে না। কেবল নিষ্ক্রিয় পঠন ও লিখনকে তাই প্রকৃত শিক্ষা বলা হয় না।
৭। শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনকঃ যে সব অভিজ্ঞতা ব্যক্তির জীবনে পরিবর্তন আনতে সক্ষম তার সবগুলোকেই আবার শিক্ষা বলা হয় না। শিক্ষা হবে আচরণের এমন পরিবর্তন যা শুধু ব্যক্তির নয় বরং ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক হবে।
৮। শিক্ষা ক্রমবিকাশঃ শিক্ষার আধুনিকতম ও ব্যাপক সংব্যাখ্যান অনুযায়ী শিক্ষাকে বলা হয়েছে ব্যক্তির ক্রমবিকাশ বা বৃদ্ধি প্রক্রিয়ার সমার্থক। অর্থাৎ পরিবেশের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির আভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাগুলোর পূর্ণ বিকাশ ঘটার যে স্বত:প্রণোদিত, স্বাভাবিক ও উদ্দেশ্যাভিমুখী প্রক্রিয়া তাই শিক্ষা।
সুতরাং আমরা বোধহয় শিক্ষাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি যে, শিক্ষার্থীর সহজাত সম্ভাবনা ও পরিবেশের মধ্যে সংঘটিত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সঞ্জাত অভিজ্ঞতাকে বাঞ্ছিত আকারে রূপায়িত করার জন্য তার নিজের বা অন্য কারো সচেতন প্রয়াসের অবিরাম প্রক্রিয়া ও সেই প্রক্রিয়াজাত ফসল হল শিক্ষা।
এই হলো শিক্ষার স্বরূপ বা প্রকৃত রূপ। এখন প্রশ্ন হল শিক্ষা দানের বা গ্রহণের উদ্দেশ্য কি? অর্থাৎ এই প্রক্রিয়াকে কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নিয়োজিত করব বা এই ফসল আমাদের কি কাজে লাগবে?
শিক্ষার লক্ষ্য
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘লক্ষ্য ও শিক্ষা’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘যাহার বিশেষ কোন একটা বন্দর নাই তাহার অতীতই বা কী আর ভবিষ্যতই বা কী? সে কিসের জন্য প্রতীক্ষা করিবে, কিসের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করিবে? তাহার আশা তাপমান যন্ত্রে দুরাশার উচ্চতম রেখা অন্য দেশের নৈরাশ্য রেখার কাছাকাছি।’
সুতরাং শিক্ষারও একটা বন্দর চাই, একটা লক্ষ্য চাই। লক্ষ্য চাই, তাই লক্ষ্য কি হওয়া উচিত তা নিয়ে চিন্তারও অন্ত নাই যুগে যুগে দেশে দেশে মনীষীদের মধ্যে। তাঁরা পরিবেশ পরিস্থিতি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করেছেন, করে চলেছেন শিক্ষার বিভিন্ন লক্ষ্য। ফলে শিক্ষার লক্ষ্য সম্বন্ধে আজও শেষ কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাই এ সম্বন্ধে কিছু জানতে হলে এর বিবর্তনের ইতিহাসের শরণাপন্ন হতেই হয়। আমাদের দেশের শিক্ষার, বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে পাশ্চাত্য শিক্ষাদর্শনের প্রভাবই পড়েছে বেশি। তাই বর্তমান আলোচনায় প্রধানত: পাশ্চাত্যের শিক্ষার লক্ষ্যের বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করা হল।
অতীতকালের অনানুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষার লক্ষ্য সম্বন্ধে আলাদা করে কোন সতেনতা ছিল বলে মনে হয় না। থাকলেও তা হয়তো ছিল জীবনের লক্ষ্যের সঙ্গে অভিন্ন। পূর্ণ বয়স্ক হয়ে যা যা করতে হবে সেসব শেখাই ছিল নবীণদের লক্ষ্য। তাদের কাছে সমাজের প্রত্যাশাও থাকত ওইটুকুই। অর্থাৎ বর্তমান প্রজন্ম যে রকম জীবনাচরণ করছেন পরবর্তী প্রজন্মকে ঠিক সেই রকমই করতে হবে। সুতরাং শিক্ষার লক্ষ্য ছিল সংরক্ষণবাদী; সামাজিক অভিজ্ঞতায় সঞ্চিত সম্পদেও সংরক্ষণ ও স্থায়ীকরণই ছিল শিক্ষার লক্ষ্য। প্রকৃতপক্ষে সামাজিক অস্তিত্ব এরই ওপর নির্ভর করতো। গোষ্ঠীকে, গোষ্ঠীর ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা যে শিক্ষার গোষ্ঠীগত লক্ষ্য ছিল তাই নয়, ব্যক্তিগত লক্ষ্যও ছিল। কারণ আদিম পরিবেশে সংঘবদ্ধতা ছাড়া ব্যক্তির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভবই ছিল। তাই গোষ্ঠীর লক্ষ্য থেকে আলাদা করে শিক্ষার কোন ব্যক্তিগত লক্ষ্য ছিল বলে মনে হয় না। গোষ্ঠীগত লোকাচার বা অপরিহার্য রীতিনীতির অনমনীয় অনুসরণই ছিল তাই শিক্ষার লক্ষ্য।
শুধু আদিম সমাজের কথাই বা বলি কেন? প্রাচীন কালের যেসব সভ্যতা আদিম স্তরকে ছাড়িয়ে যথেষ্ট উন্নত হয়েছিল তাদের শিক্ষার লক্ষ্যের সংরক্ষণশীলতাও বেশ স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে। এ প্রসঙ্গে চীনা সভ্যতার কথা উল্লেখ করা যায়। যে সময় সর্বত্র আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ চলছে, সে সময়ও চীনে সরকারি কর্মকর্তাদের পরীক্ষার বিষয়সূচীতে ধনুর্বিদ্যা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। চীনের আদর্শ ছিল, ‘জ্ঞানার্জনের জন্যই জ্ঞানার্জন।’ তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পণ্ডিত ব্যক্তিই ছিলেন আদর্শ শিক্ষিত মানুষ। এই পণ্ডিত ব্যক্তিরাই সরকারের উচ্চপদে বহাল হতেন। অথচ পণ্ডিত হবার জন্য তাঁদেরকে যে সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হতো, প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই তাঁদের পেশাজীবনের প্রয়োজনের সঙ্গে সেগুলোর কোন সম্পর্ক থাকত না।
প্রাচীন ভারতের শিক্ষার লক্ষ্যও ছিল রক্ষণশীল। মোক্ষ বা নির্বাণ লাভের উপযোগী করে গড়ে তোলাই ছিল শিক্ষার চরম লক্ষ্য। মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ তখনই সম্ভব যখন ব্রহ্ম, অর্থাৎ একমাত্র শাশ্বত সত্তা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ হয়, ঈশ্বরে বিলীন হবার মত যোগ্যতা অর্জিত হয়। এই যেখানে জীবনের আদর্শ, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে শিক্ষার আদর্শ হতো সহনশীলতা, বাধ্যতা ও আত্মসমর্পণের চর্চা করা। পাশ্চাত্য সভ্যতার সুতিকাগার হিসেবে পরিচিত প্রাচীন গ্রিসের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও রক্ষণশীলতার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। স্পার্টার শিক্ষার লক্ষ্যও ছিল লোকাচার ও রীতিপ্রথার কঠোর সংরক্ষণ। স্পার্টায় সামাজিক অস্তিত্ব বজায় রাখা নির্ভর করত প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহকে দাবিয়ে রাখার উপযোগী সামরিক দক্ষতা অর্জনের উপর। তাই দেশপ্রেম, সাহসিকতা, কষ্ট সহিষ্ণুতা, ঊর্ধ্বতন পদস্থের প্রতি শ্রদ্ধা ও বাধ্যতা, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি গুণাবলী অর্জন করাই ছিল স্পার্টার শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
আরেকটি স্বনামধন্য গ্রিক নগর রাষ্ট্র এথেন্স। এথেন্সের শিক্ষার লক্ষ্য কিন্তু কেবল রক্ষণশীল ছিল না, প্রগতিশীলও ছিল। পারস্যের সঙ্গে যুদ্ধের সাফল্যজনক সমাপ্তির পর এথন্সে গোষ্ঠী বা সমাজজীবনকে গুরুত্ব দেয়ার সাথে সাথে ব্যক্তিজীবনকেও গুরুত্ব দেয়া শুরু হয়েছিল। এথেন্সেই প্রথম প্রাচীন সর্বজনীন ও সামাজিক লক্ষ্যের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও ব্যক্তিগত লক্ষ্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছিল। তাই ব্যক্তিসত্তার অবাধ ও সুষম বিকাশকে নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। এথেন্সবাসীরা নন্দনতাত্ত্বিক পরিমিতিবোধের অধিকারী ছিলেন। তাই তাঁরা যেমন চাইতেন ব্যক্তির সুষম বিকাশ, তেমনি প্রতিহত করতেন সংকীর্ণ বিশেষিকরণ। নগররাষ্ট্রের নাগরিক সৃষ্টি করাই ছিল সামগ্রিকভাবে গ্রিক শিক্ষার আদর্শ। এথেন্সের আদর্শও ছিল তাই। এথেন্সে সুনাগরিক বলা যেত তাঁকেই যিনি তাঁর মধ্যস্থিত সব ধরনের ক্ষমতার সুষম উন্নয়ন সম্ভব করেছেন। তাছাড়া সুনাগরিকের লক্ষ্য হতো সুনাগরিকতার জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলী অর্জন করা। সুনাগরিকতার জন্য প্রয়োজনীয় গুণগুলো ছিল মিতব্যায়িতা, সাহসিকতা, মহানুভবতা ও ন্যায়পরায়ণতা। আত্মসংযম চর্চা করার ওপর খুবই গুরুত্ব দেয়া হতো। রোমের সংস্কৃতির প্রাথমিক পর্যায়েও শিক্ষার লক্ষ্য ছিল আদর্শ নাগরিক তৈরি করা। নবীন চিত্তে দৃঢ়তা, সাহসিকতা, দেবতাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আত্মসংযম, মর্যাদাবোধ, দূরদর্শিতা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রোথিত করে দেয়াই ছিল শিক্ষার লক্ষ্য। তবে গ্রিকরা যেখানে এসব গুণাবলীর অর্জন করতে চাইতেন শিক্ষার বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে নান্দনিক ভারসাম্য বজায় রাখার মানসে, রোমকরা চাইতেন সফল সরকারি কর্মচারি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করার জন্য। উভয় সংস্কৃতির শিক্ষার লক্ষ্যেই ইহজাগতিকতার লক্ষণ।৭
তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সুনাগরিকতার জন্য দৃঢ় নৈতিক চরিত্রের মানুষ তৈরি করা।
খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতক থেকে পাশ্চাত্যের শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে খ্রিস্টিয় ধর্মমতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। এ সময় থেকেই পাশ্চাত্য শিক্ষায় ধর্মীয় ও অতিপ্রাকৃত লক্ষ্য গুরুত্ব পেতে থাকে। ইহজগতের জীবনের জন্য প্রস্তুতির বদলে পারলৌকিক অনন্ত জীবনের জন্য প্রস্তুত করাই হয়ে ওঠে শিক্ষার লক্ষ্য। খ্রিস্টানরা যেহেতু মনে করতেন যে, এই জগতের সমাপ্তি আসন্ন তাই ইহজীবনের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যে শিক্ষা তাকে তাঁরা দারুণভাবে অবহেলা করতেন। শিক্ষার পারলৌকিক আদর্শ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায় মধ্যযুগের আশ্রম-আশ্রিত জীবনে। খ্রিস্টীয় ধর্মযাজকদের কাছে আত্মার মুক্তিই ছিল প্রকৃত লক্ষ্য। যেহেতু মনে করা হতো যে আত্মার মুক্তি নির্ভর করে জাগতিক কামনা বাসনা ত্যাগ করার ওপর তাই শিক্ষার লক্ষ্য ছিল আত্মনিরোধী। মধ্যযুদের শেষের দিকে সামাজিক ও ব্যক্তিক নৈতিকতার উন্নতি সাধন হয়ে দাঁড়ায় ধর্মযাজকদের লক্ষ্য। সেন্ট থমাস একুইনাস (১২২৫-১২৭৪) ঘোষণা করেন যে, ‘শিক্ষার তথা জীবনের লক্ষ্যই হচ্ছে নৈতিকত ও বৌদ্ধিক গুণাবলীর চর্চার মাধ্যমে সুখ লাভ করা।৮
পাশ্চাত্যের পারলৌকিক আদর্শগত লক্ষ্য থেকে কিছুটা পরাবর্তন (ৎবপবংংরড়হ) লক্ষ্য করা যায় ঐ সময়েরই বীরধর্মের আদর্শগত লক্ষ্যে। ধর্ম অনুসৃত শিক্ষার অনুকরণীয় আদর্শ ছিলেন ধর্মযাজক আর ইহলৌকিক শিক্ষায় আদর্শ ছিলেন ‘নাইট’ বা বীর। নাইটদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে, শুধু শারীরিক সাহস বা শক্তি ও সামরিক শৌর্যের উৎকর্ষ সাধন ছিল না, ছিল ব্যক্তির অমার্জিত যুদ্ধ প্রবতণতাকে শিভালারির বা বীরধর্মের ভদ্রজনোচিত বিধিতে সুশৃঙ্খল করাও। এই বিধি অবশ্যই খ্রিস্টীয় নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করেই রচিত হতো। অপরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করাই ছিল তরুণদের চূড়ান্ত আদর্শ। সাহস, মর্যাদা, সৌজন্য, আনুগত্য, দুর্বল ও অসহায়ের প্রতি সহানুভভূতি, নারীর প্রতি সেবার মনোভাব এগুলোই ছিল নাইটসুলভ গুণাবলী।
দশম শতকের পর থেকে ব্যবসা বাণিজ্যের পুনর্জাগরণের ফলে পাশ্চাত্যে সমান্ততান্ত্রিক ও মঠাশ্রয়ী কর্তৃত্ব ক্ষীয়মান হতে থাকে। রেনেসাঁর পর থেকে পাশ্চাত্যের জীবন নগর কেন্দ্রীক হতে থাকে এবং লক্ষ্যও বেশি মাত্রায় ঐহ্যিক হতে থাকে। এই নতুন ধারার নাম দেয়া হয় মানবতাবাদ। ডেসিিিডয়াস ইরামাসকে (১৪৬৬-১৫৩৬) বোধহয় মানবতাবাদীদের অন্যতম বলা যায়। তাঁর বক্তব্যে মানবতাবাদী শিক্ষার লক্ষ্য সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষার প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে শিশুমনকে ভক্তিরস পান করানো, তারপর সে উদার বিষয়গুলো দর্শন, সাহিত্য ভালবাসবে এবং ভাল করে শিখবে, তৃতীয়তঃ তাকে জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জানতে হবে, চতুর্থতঃ একেবারে শিশু বয়স থেকেই তাকে ভদ্রজনোচিত আচরনে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।৯ এই নতুন লক্ষ্যকে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান আদর্শের পুনর্জাগরণ বলা যায়। রেনেসাঁর শিক্ষার এই মানবতাবাদী আদর্শের বাস্তব প্রতিমূর্তি হচ্ছে ঈড়ঁৎঃরবৎ বা অমাত্য। অমাত্য ছিল প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক আভিজাত্য ও নব্য সওদাগরতন্ত্রের মিলিত ফসল। একজন অমাত্য বা প্রশাসক বা সওদাগরের সুশিক্ষার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল বহু বিচিত্র গুণাবলী অর্জন এবং সেগুলোর সুসমন্বিত বিকাশ, অনেকটা গ্রিক আদর্শের ধরনে। তাকে যেমন লেখ্য ও কথ্য ভাষা ব্যবহারে দক্ষ হতে হতো, তেমনি আইন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি উপলব্ধি করার ও তাতে অবদান রাখার যোগ্যতাও থাকতে হতো; সেই সঙ্গে পারদর্শী হতে হতো সাঁতার, কুস্তি, অসি চালনা ও ঘোড়ায় চড়ায়। এই আদর্শের কথা বলতে গিয়ে ড্যানিয়েল ডেফো বলেছিলেন, ‘আমাদের উচিত পরিশীলিত শিক্ষিত ব্যক্তি ও নিছক পণ্ডিত ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য করা’। তাঁর মতে, ‘অমাত্য এমন হবেন না যাঁর আছে শুধুই বিদ্যা। কিন্তু ভব্যতা নেই’।১০ মোটামুটি এই সময়ই মানবতাবাদী শিক্ষার আরেকটি ধারা লক্ষ্য করা যায় যেখানে নৈতিকতার উপর গুরুত্ব দেয়ার প্রবণতা বেশ স্পষ্ট। মার্টিন লুথার (১৪৮৩-১৫৪৬) বলেছিলেন, ‘যদি আত্মা নাও থাকে’ এবং ‘খ্রিস্টধর্মের জন্য’ শিক্ষার দরকার নাও থাকে, তবুও ‘সমাজের শৃঙ্খলা ও সংসারের নিয়মনীতির জন্য গুণবান ও সুপ্রশিক্ষিত নারী ও পুরুষের প্রয়োজন। ১১ এই ধারার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় ১৭৮৭ সালে কৃত আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের অরডিন্যান্সে। সেখানে বলা হয়, ধর্ম, নৈতিকতা এবং জ্ঞান যখন প্রয়োজন ভাল সরকার ও মানবজাতির সুখের জন্য বিদ্যালয় ও শিক্ষার মাধ্যমসমূহকে চিরকালই উৎসাহিত করা হবে। এই মানবতাবাদী শিক্ষার দর্শন যথেষ্ট সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে তার গ্রিক ও রোমক ভাষা ও সাহিত্যের ওপর নির্ভরতার জন্যে। এই সমালোচকদের মধ্যে ছিলেন স্পেনীয় মনীষী জুয়ান লইস ডিভেস (১৪৯২-১৫৪০), ফরাসী মনীষী ফ্রানকইস রাবেলাইস (১৪৯০-১৫৫৩) এবং ইংরেজ লেখক জন মিল্টন। এঁরা মানবতাবাদী লক্ষ্যকে মেনে নিলেও একে আরো বাস্তবানুগ করার পক্ষপাতী ছিলেন।
ইংরেজ মনীষী ফ্রানসিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬) এবং মোরাভীয় মনীষী জোহান এমোস কমেনিয়াস (১৫৯২-১৬৭০) শিক্ষার লক্ষ্যের আওতায় আনতে চেয়েছিলেন সমগ্র জ্ঞানরাজ্যকে। তাঁদের এ ধরনের উচ্চাশা পোষণ করার একটা কারণ ছিল। ঐ সময় আধুনিক বিজ্ঞানের উন্মেষের দরুণ ধারণা করা হয়েছিল যে, বিজ্ঞান যে শুধু জ্ঞানের একটা সহজ এবং সঠিক ছক উপহার দেবে তাই নয়, এমন একটা মনোবিজ্ঞানও উপহার দেবে যা সব ধরনের জ্ঞানের শিখন সব মানুষের জন্য সহজ করে দেবে। কিন্তু বিজ্ঞান তার চেয়েও বেশি কাজ করেছে। বিজ্ঞান মানুষের জ্ঞানরাজ্যের পরিধিকে বিপুলভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে একজন মানুষের পক্ষে সমস্তটুকু জ্ঞান আয়ত্ব করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সমগ্রজ্ঞান অর্জন শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে কখনওই যুক্তিযুক্তি হবে না বুঝতে পেরে জন লক (১৬৩২-১৭০৪) সিদ্ধান্ত পৌঁছেছিলেন যে, ‘শিক্ষার কাজ নবীন শিক্ষার্থীকে কোন একটা বিজ্ঞানে পারদর্শী করে তোলা নয়; বরং প্রয়োজনে যাতে সে যে কোন বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন করতে পারে তার উপযোগী করে তার মনকে তৈরি করে। ১২ পরবর্তীতে রুশোও (১৭১২-১৭৭৮) ওই রকম কথাই বলেছিলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য তার (এমিলের) মনকে জ্ঞান দিয়ে সাজানো নয় বরং যখন প্রয়োজন হবে তখন যাতে সে জ্ঞান অর্জন করতে পারে তারই পদ্ধতি শেখানো। ১৩
জ্ঞানের বিষয়বস্তুর পরিবর্তে জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতিকে শিক্ষার লক্ষ্য নির্বাচিত করার ফলে শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মানসিক শৃঙ্খলা বিধান। সতের ও আঠারো শতকে ইউরোপে, গ্রীক ও ল্যাটিন ক্লাসিক্স পড়ানো হতো। ঐ বিষয়গুলোর ব্যবহারিক উপযোগিতা বিশেষ কিছু না থাকলেও পড়ানো হতো এই যুক্তিতে যে, ঐ কঠিন বিষয়গুলোর চর্চা বুদ্ধিকে ধারালো করবে। তখনকার দিনে তথ্য দিয়ে মনকে পূর্ণ করার বদলে মনের ক্ষমতাগুলোর, অর্থাৎ যুক্তি, স্মৃতি ইত্যাদির উৎকর্ষ সাধন করা ছিল শিক্ষার লক্ষ্য। জন লক জোর দিয়েছিলেন চরিত্র গঠনের উপর। তিনি বলেছিলেন, ‘সুতরাং সদগুণ হচ্ছে সেই কঠিন এবং মূল্যবান অংশ যার প্রতি শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া দরকার।১৪ চরিত্র বলতে লক বুঝেছেন, মানুষের সেই ক্ষমতাকে যার বলে মানুষ নিজেই নিজের কামনা বাসনাকে অগ্রাহ্য করে কাজ করতে পারে।১৫ শিক্ষার খুব কম লক্ষ্যই এই লক্ষ্যর মত প্রাধান্য পেয়েছে।
আঠারো শতকের ফরাসি অভিজাততন্ত্রের প্রভাবে পাশ্চাত্যে আরেক ধরনের শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। এটা অনেকটা আগের দিনের অমাত্য তৈরির লক্ষ্যের মত। তবে এ সময় গ্রীক বা লাতিন সাহিত্য নয় ফরাসি ভদ্রজনের লক্ষ্য ছিল মাতৃভাষার সাহিত্যে দক্ষতা অর্জন এবং অনর্গল ও মার্জিত ভাবে বলতে পারার ক্ষমতা অর্জন। প্রাচীন অমাত্যদের সঙ্গে এঁদের একটা বিষয়ে অমিল ছিল। সেটা হল এই যে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক ইতিহাস পাঠ করার ফলে এরা ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার প্রতি কিছুা বীতশ্রদ্ধ মনোভাব পোষণ করতেন। ফলে এঁদের জন্য শিক্ষার লক্ষ্য ছিল বৈঠকখানার জন্য রুচিশীল মার্জিত মনোভাবাপন্ন এবং সামরিক বা বেসামরিক কর্মক্ষেত্রের জন্য সাহসী ও বিশিষ্টতার অধিকারী করে শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলা।
এতক্ষণ শিক্ষার যে সমস্ত লক্ষ্য সম্পর্কে আলোচনা হল সে সবই কিন্তু উঁচুতলার মানুষদের জন্য। এতে অবাক হবার কিছু নেই। কারণ স্বাক্ষরতানির্ভর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য যে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকা তখনকার দিনে দরকার ছিল তার ব্যবস্থা করা শুধু ঐ শ্রেণীর মানুষদের পক্ষেই সম্ভব ছিল। সমাজের নিম্নস্তরের অনানুষ্ঠানিক ও স্বাক্ষরতাবিহীন শিক্ষার যে কোন লক্ষ্য ছিল না তা নয় তবে সেগুলো কখনই আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়নি বা অভিজাত লক্ষ্যের ধারে কাছেও আসতে পারেনি। কারণ সবাই বিশ্বাস করতেন যে, যেহেতু স্বাক্ষরতাভিত্তিক শিক্ষা সঞ্চিত সমাজিক অভিজ্ঞতা অনেক বেশি পরিমাণে সরবরাহ করতে সক্ষম তাই ঐ ধরনের শিক্ষাই বেশি মর্যাদাপূর্ণ।
আঠারো শতকের শেষের দিকে প্রভুত সামাজিক পরিবর্তন যখন দোরগোড়ায় উপস্থিত, তখন ঐ অবস্থারও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। প্রয়োজন পড়ল ব্যাপক জনসংখ্যার শিক্ষার সেই লক্ষ্যে অংশগ্রহণের যে লক্ষ্যে এতদিন সুযোগ ছিল শুধু সুবিধাভোগী শ্রেণীর। এই সময় আমেরিকা এবং ফ্রান্সের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সাধারণ মানুষের জন্য নির্দেশ করেছিল নতুন মর্যাদা আর ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব তার সমস্ত ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য জাগিয়ে তুলেছিল গণতান্ত্রিক পরিবেশে শিক্ষা লাভের উপযোগী জীবনমানের প্রতিশ্র“তির আকাক্সক্ষা। ফরাসি বিপ্লবের সময়কালীন লেখকরাই দক্ষতার সঙ্গে এই বৃহৎ আকারের সামাজিক আন্দোলনের আদর্শকে শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে রূপদান করেন। এঁদের মধ্যে কনডোরকেটকেই (ঈড়হফড়ৎপবঃ, ১৭৪৩-১৭৯৪) সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুখপাত্র বলা যায়। তাঁর কাছে শিক্ষার হচ্ছে মানবজাতির সব সদস্যের চাহিদা পূরণ করার, মঙ্গল নিশ্চিত করার, অধিকার সম্পর্কে জ্ঞাত করার ও তার প্রয়োগ করার, দায়িত্ব অনুধাবন করার ও তা সম্পাদন করার উপায়ের সংস্থান করা। তাঁর শিক্ষার দ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে ব্যক্তিতান্ত্রিক; প্রত্যেকের জন্য তার দক্ষতার উৎকর্ষ সাধনের, যোগ্যতা ও সামর্থ অনুযায়ী সামাজিক কাজকর্মে নিজেকে উপস্থাপনের, প্রকৃতি দত্ত প্রতিভা পুরোপুরি বিকাশ ঘটানোর এবং এসবের মাধ্যমে সব নাগরিকদের মধ্যে সমানাধিকারে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার, অর্থাৎ এইভাবে আইন কর্তৃক স্বীকৃত রাজনৈতিক অধিকার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা। তাঁর তৃতীয় লক্ষ্য অর্থাৎ সামাজিক লক্ষ্য তিনি বর্ণনা করেছেন এই ভাবে, ‘শিক্ষা এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে শিল্পকারখানার উৎকর্ষ সাধারণ নাগরিকদের আনন্দ বর্ধন করে এবং শিল্পে বা কারখানায় যারা নিয়োজিত তাদের মঙ্গল সাধন করে, যাতে বেশি সংখ্যায় মানুষ সমাজের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করার যোগ্য হয় এবং সংস্কৃতির সতত বর্ধনশীল উন্নতি আমাদের প্রয়োজনে অফুরন্ত সাহায্যের উৎসের সংস্থান করে, আমাদের অনর্থের প্রতিকার দেয়, ব্যক্তিগত আনন্দের ও সার্বিক উন্নতির উপায় করে দেয়। শেষে কনডোরকেট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, প্রত্যেক সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মত শিক্ষা নামক প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্যও হল, প্রত্যেক প্রজন্মে শারীরিক, বৌদ্ধিক ও নৈতিক শক্তির চর্চা করা এবং এর মাধ্যমে মানবজাতির সাধারণ ও ক্রমিক উৎকর্ষ সাধনে অবদান রাখা।১৬
উল্লেখিত লক্ষ্যগুলো এতই উদ্দীপক ও প্রেরণাদায়ক যে মনে হয় এতে আর কোন রকম উৎকর্ষ সাধন সম্ভব নয়। কিন্তু তারপরেও প্রচেষ্টা চলেছে। জাঁ জ্যাকস রুশো তৎকালীন শিক্ষার লক্ষ্যের সমাজ নির্ভরতার প্রতিবাদ করেছেন এবং বলেছেন যে, শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যক্তিতান্ত্রিক। তাঁর মতে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত ব্যক্তি শিশুর সহজাত গুণ ও প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করা, শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠানের আদর্শ অনুযায়ী গঠন করা নয়। রুশো বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃতি মূলতঃ মঙ্গলজনক, তাই শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হবে অবাধ ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। আরো একটি বিষয়ের প্রতি রুশো গুরুত্ব দিয়েছেন। সেটি হল এই যে, শিক্ষার লক্ষ্য হবে বর্তমান থেকে আনন্দ পাওয়ার চর্চা করা। শিশুকে শিশু হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। বড়দের ক্ষুদ্র, সংস্করণ নয়। শিশুর নিজস্ব লক্ষ্যকে শ্রদ্ধা করতে হবে। কোন সুদূর ভবিষ্যতের জন্য শিশুর বর্তমানকে যে শিক্ষা দুর্বিসহ করে তোলে, সে শিক্ষাকে তিনি আসুরিক শিক্ষা বলেছেন।
পরবর্তীকালের শিক্ষা সম্বন্ধীয় মতবাদ তৈরির ক্ষেত্রে রুশোর বক্তব্য সমূহের যে প্রভাব পড়েছিল, এক কথায় তা বিপুল। সুইজারল্যান্ডের শিক্ষা সংস্কারক পেস্তালৎসী (১৭৪৬-১৮২৭) এবং জার্মানির মরমী শিক্ষক ফ্রয়েবল (১৭৮২-১৮৫২) শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে অনেকাংশেই রুশোর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন; বিশেষ করে শিশুর চাহিদা ও ক্ষমতার উপর গুরুত্ব আরোপ করার বিষয়টিতে। অবশ্য যৌক্তিকতা নির্ধারণের ব্যাপারে এবং পদ্ধতি ব্যবহারের ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষাকে ব্যবহার করতে হলে যে ব্যক্তি শিশুর বিশেষ সম্ভাবনার সফল বিকাশ প্রয়োজন এ ব্যাপারে তাঁদের মতের মিল লক্ষ্যণীয়। পেস্তালৎসী বলেছিলেন, শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য বিদ্যালয় সমাপ্তির উৎকর্ষ সাধন নয়, বরং জীবনের জন্য যোগ্য করা; অন্ধ আনুগত্যের ও নির্দেশিত অধ্যাবসায়ের অভ্যাস গঠন নয় বরং স্বাধীন কর্মের প্রস্তুতিকরণ।১৭ তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের কোন অধিকার নেই কারো সামর্থের সম্ভাবনার বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করার।১৮ শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় প্রত্যেককে তাঁর সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ করে দেয়া তাহলে সামাজিক সুযোগ্য সুবিধা অর্জনের পথের প্রতিবন্ধকতা অচিরেই দূর হতে পারে সন্দেহ নেই। নানারকম সরকারি চাপ সত্ত্বেও ফ্রয়েবল আকাক্সক্ষা করেছিলেন মুক্ত চিন্তাশীল ও স্বনির্ভর মানুষ গড়ে তোলার। রুশোর মত তিনিও চেয়েছিলেন শিশুর অন্তরসত্ত্বার বিকাশের মাধ্যমে এই লক্ষ্যে পৌঁছতে। ফ্রয়েবল মনে করতেন এই অন্তরসত্তা পরমাত্মার অংশ ও তাঁর সাথেই মিলিত হতে চায় এবং এটি স্বয়ংক্রিয়। সুতরাং শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হল এই কর্মতৎপরতার অন্তরনীতির আত্মপ্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা।
রুশো, পেস্তালৎসী, ফ্রয়েবল শিশুর অন্তর প্রকৃতির অবাধ বিকাশে উপর গুরুত্ব দিলেও কিছু কিছু দার্শনিক এই লক্ষ্যকে খুব একটা সুনজরে দেখেননি। জার্মানির দার্শনিক হেগেল (১৭৭০-১৮৩১) এবং শিক্ষা দার্শনিক হার্বাট (১৭৭৬-১৮৪১) এই লক্ষ্যকে বাতিলই করে দিয়েছেন। হেগেলের মতে শিক্ষা ব্যক্তিতান্ত্রিকতার জন্য নয়, হওয়া উচিত বিশ্বজনীনতার জন্য। হার্বাট বিশ্বাস করতেন যে আত্মবিকাশের লক্ষ্য মানব প্রকৃতির একটি ভুল বিশ্লেষণের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর মতে মানব প্রকৃতি একটি বর্ণহীন উপাত্ত যার একমাত্র ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য হল পরিবেশের প্রতিকুলতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা। সুতরাং শিক্ষার লক্ষ্য পরিবেশের সঙ্গে আহরিত, চাপিয়ে দেয়া বিষয় নয়। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও হেগেল ও হার্বাট দুজনেই নব্য মানবতাবাদের সহায়তা নিয়ে শিক্ষার আদর্শ সংজ্ঞায়িত করেছেন। হেগেলের দৃষ্টিতে আদর্শ মানুষ তৈরি হয় গ্রিক ও রোমক জগতের স্বাধীন বৌদ্ধিক সত্তার মধ্যে যা বিশ্বজনীন তা অর্জন করার মাধ্যমে। হার্বাটের মতে আদর্শ মানুষ গঠিত হয় বহুমুখী আগ্রহের মধ্য থেকে নৈতিক উদ্দেশ্য অর্জন ও উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমে।
ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডের সমাজতান্ত্রিক দার্শনিক হার্বাট স্পেন্সার (১৮২০-১৯০৩) শিক্ষার লক্ষ্য নির্বাচন করার একটা ভিন্নতর পথ প্রদর্শন করেন। তাঁর সময়ে শিক্ষার যে লক্ষ্যগুলো ছিল সেগুলো তাঁর কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। তাই তিনি সেগুলোর আপেক্ষিক মুল্য নির্দারণ করার জন্য একটা মানদন্ড পেতে চাইলেন। এই মানদন্ড তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বিজ্ঞান ও উপযোগবাদের মধ্যে। কিছুটা হয়তো বিবর্তনমূলক চিন্তাধারার মধ্যেও। কি করে সম্পূর্ণ জীবন যাপন করা যায় এ প্রশ্নে উত্তর পেতে গিয়ে তিনি শিক্ষার লক্ষ্যগুলোকে ব্যক্তি ও সমাজের অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনের দিক থেকে গুরুত্ব বিচার করে বিন্যস্ত করেছেন। তাঁর মতে শিক্ষার লক্ষ্য হবে প্রথমতঃ আত্মসংরক্ষণের কৌশল শেখানো, দ্বিতীয়তঃ জীবিকা অর্জনের উপায় শেখানো, তৃতীয়ত অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সন্তান জন্মদান ও প্রতিপালন সম্পর্কে জ্ঞানদান, চতুর্থতঃ সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের যোগ্য করা এবং পঞ্চমত মার্জিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- যেমন চারু ও কারু কলা, সাহিত্য ইত্যাদি থেকে আনন্দ লাভের যোগ্য করা।১৯
এই লক্ষ্যগুলো পূর্ববর্তী লক্ষ্যগুলোর চেয়ে প্রাসঙ্গিক ও বাস্তবানুগ হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই এগুলোকে অত্যন্ত অপরিকল্পিত ও সাধারণ অভিজ্ঞতা নির্ভর বলে মনে করলেন। তাঁরা আরো নির্ভরযোগ্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতার জন্য বিজ্ঞানমুখী হতে চাইলেন। বিজ্ঞানের কাছ থেকে তাঁরা কয়েকটি কৌশল সংগ্রহ করলেন। একটা হল, শিক্ষার লক্ষ্য কি হওয়া উচিত তা বিচার করার যাঁরা যোগ্য তাঁদের মতামতের মধ্য থেকে একটা ঐকমত্য খুঁজে বের করা। দ্বিতীয়টি হল, জীবনে যে সব বিষয় বার বার দেখা দেয় বা প্রয়োজন পড়ে সেগুলোর একটা পরিসংখ্যান নিয়ে সেগুলোর থেকে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করা। তৃতীয় জনপ্রিয় কৌশলটি হল, বর্তমান জীবন কার্যক্রমের মধ্যে যেসব চাকরি বা কাজ পাওয়া সম্ভব তার বিশ্লেষণ করা এবং সেগুলোর চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষ্য গঠন করা। এ পর্যন্ত শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রধানতঃ সমাজতত্ত্বনির্ভর। পরে কিছু মনীষী, বিশেষতঃ ই, এল থর্নডাইক, (১৮৭৪) দৃষ্টি নিবন্ধ করলেন মনোবিজ্ঞানের উপর। থর্নডাইক মনে করতেন শিক্ষার লক্ষ্যগুলো হল মানব চাহিদার অভিক্ষেপ বা প্রতিফলন। চাহিদা মেটানোর শক্তির গুণেই লক্ষ্যগুলো মানুষের কাছে মূল্যবান হয়, মূল্যবান বলে যাচিত নয়। তাই তিনি বলছেন, ‘তাহলে শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে সঠিক জিনিস চাইবার মতো করে তৈরি করা; তাকে আরো ভালভাবে যোগ্য করে তোলা যাতে সে প্রকৃতির শক্তিকে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে যার মাধ্যমে সে তার চাহিদাগুলোর পরিতৃপ্তি ঘটাতে পারে।২০
বিংশ শতাব্দীতে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে যে দার্শনিক সবচেয়ে বেশি প্রভাব সৃষ্টিকারী ও ইতিবাচক অবদান রেখেছেন তিনি হলেন আমেরিকার প্রয়োগবাদী দার্শনিক জন ডিউই (১৮৫৯-১৯৫২)। ডিউইর মতে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ভর করে শিক্ষার্থীর তাৎক্ষণিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির উপর। ফলে জীবনের পরিস্থিতি যেমন বহু এবং বিভিন্ন, শিক্ষার লক্ষ্যও তেমনি বহু এবং বিভিন্ন। ডিউইর মতে শিক্ষা একটি প্রক্রিয়া এবং এই প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীর বুদ্ধি প্রক্রিয়ার সমার্থক। তাই তিনি বলেন, ‘বৃদ্ধি যেমন আরো বৃদ্ধি ছাড়া অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়, তেমনি শিক্ষা আরো শিক্ষা ছাড়া অন্য কোন কিছুর অধীন নয়। … বিদ্যালয়ের শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃদ্ধি নিশ্চিতকারী শক্তিগুলো সংগঠিত করে শিক্ষাকে নিরবচ্ছিন্ন রাখা; জীবন থেকে শেখার প্রবণতা এবং জীবনের পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করা যাতে সবাই জীবন যাপন প্রক্রিয়ার মধ্যেই শেখে, এগুলোই হচ্ছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার বিশুদ্ধ সৃষ্টি।২১
অল্প কথায় বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষা প্রক্রিয়ার কোনো অন্য গন্তব্য বা উদ্দেশ্য নেই, এটি নিজেই নিজের গন্তব্য। ২২ অর্থাৎ ডিউইর মতে অবিরাম বিকাশ বা উন্নয়নই হচ্ছে শিক্ষার লক্ষ্য। এই উন্নয়ন ঘটে যখন শিক্ষার্থী সমস্যামূলক পরিস্থিতির সমাধান খুঁজে পায়। সুতরাং শিক্ষার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক, আপেক্ষিক ও পরিবর্তনশীল। ডিউইর এই দর্শন বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের দিকে প্রগতিশীল শিক্ষায় শিশু কেন্দ্রিকতাকে লক্ষ্য হিসেবে গুরুত্ব প্রদান নিশ্চিত করেছিল। তবে প্রগতিশীল শিক্ষার ব্যক্তিকেন্দ্রকি লক্ষ্য রচনায় যে কেবল ডিউইর প্রয়োগবাদী দর্শনই অবদান রেখেছে তা নয়। এতে ফ্রয়েডের মনোবিজ্ঞানেরও যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।
১৯২০ সালের শেষের দিকেই এই লক্ষ্যের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিক্রিয়া শুরু হয। হারমান এইচ, হরনে এবং অন্যান্যরা শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে অবিরাম বৃদ্ধির ধারনার সমালোচনা করেন। এই বৃদ্ধি ভালও হতে পারে আবার মন্দও হতে পারে। তাই এই অবিরাম বৃদ্ধি প্রক্রিয়া আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে সে সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত হতে চাইলেন। ইতোমধ্যে এরিস্টটেলীয় এবং থমাসীয় শিক্ষাদর্শনের পুনরুত্থান ঘটে এবং যে দিকনির্দেশনার অভাব ছিল প্রগতিশীল দর্শনে তা তারা সরবরাহ করে। এরিস্টটেলীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে মর্টিমার জে. এডলার (১৯০২-) দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন যে শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে নৈতিক ও বৌদ্ধিক সদগুণের মাধ্যমে সুখ সন্ধান করা।২৩ শুধু তাই নয়, তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ‘শিক্ষার লক্ষ্য সবার জন্য একই হবে (অর্থাৎ সর্বত্র, সর্বদা, সমাজের প্রতি ধারায়, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে)।২৪ এসব বক্তব্যের প্রভাবে ডিউই প্রগতিশীল দর্শনের মত, অর্থাৎ অনির্দেশিত ও অপ্রতিহত আত্মবিকাশের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন এবং শিশুর বিকাশমান সম্ভাবনায় পরিণত বয়স্কদের সহায়তাদানের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটি তুলে ধরেন। প্রকৃত পক্ষে তিনি চেয়েছিলেন যে, ব্যক্তির লক্ষ্য, শিল্প ও রাজনীতিতে সামাজিক দক্ষতার চাহিদা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। এভাবেই ডিউইর শিক্ষাদর্শন ব্যক্তির চাহিদা ও সমাজের চাহিদা দুটোকেই সমান গুরুত্ব দেয়। বিশ শতকের প্রায় পুরোটা জুড়েই শিক্ষাঙ্গনের কর্মকাণ্ডে ডিউইর প্রভাব উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দেখা যায়। ডিউইকেই বোধহয় কালজয়ী প্রকৃতির শিক্ষা দার্শনিকদের মধ্যে শেষ ব্যক্তিত্ব বলা চলে।২৫
বিশ শতকের আরেকজন প্রভাবশালী দার্শনিক হলেন আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেড (১৮৬১-১৯৪৭) তাঁর মতে শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন মানুষ তৈরি করা যাঁরা হবেন সংস্কৃতিবান এবং যাঁদের থাকবে কোন না কোন ক্ষেত্রে বিশেষ জ্ঞান। এই বিশেষ জ্ঞান তাঁদেরকে দেবে চলা শুরু করার ভিত্তি এবং সংস্কৃতি তাদেরকে নিয়ে যাবে দর্শনের মত গভীরে ও কলার মত উচ্চমার্গে। সংস্কৃতি বলতে তিনি বুঝিয়েছেন চিন্তার সক্রিয়তাকে এবং সৌন্দর্য ও মানবীয় অনুভূতির গ্রাহিতাকে।২৬ তিনি বলেছেন, সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে প্রতি যুগে যে মূল শিক্ষাদর্শ আমাদের মাঝে বিরাজমান ছিল, আমরা তার কমে সন্তুষ্ট হতে পারি না। শিক্ষার সেই সারটি হল ধর্মীয় হওয়া। ধর্মীয় শিক্ষা বলতে তিনি বুঝিয়েছেন সেই শিক্ষাকে যে শিক্ষা কর্তব্যবোধ ও গভীর শ্রদ্ধাবোধ (ৎবাবৎবহপব) শিক্ষার্থীর হৃদয়ে প্রোথিত (রহপঁষবধঃব) করে। সুতরাং তাঁর মতে শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর মধ্যে চিন্তার সক্রিয়তা, সৌন্দর্য ও মানবীয় অনুভূতির গ্রাহিতা, কর্তব্যবোধ ও শ্রদ্ধাবোধকে জাগ্রত করা ও সেই সাথে জ্ঞানের বিশেষ ক্ষেত্রে পারদর্শী করে তোলা।
সাম্প্রতিক কালের স্বনামধন্য দার্শনিক হলেন ব্রার্ট্রাণ্ড রাসেল (১৮৭২-১৯৭০)। তাঁর মতে ছাত্রদের কল্যাণই শিক্ষার চরম লক্ষ্য হওয়া উচিত, ছাত্রকে অন্য কোন উদ্দেশ্য সাধনের উপায়রূপে ব্যবহার শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়।২৭ তিনি বলেছেন, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে কতকগুলো গুণের সমাবেশ ঘটলে তারা আদর্শ চরিত্রের অধিকারী হয়ে উঠতে পারে। মোটামুটি ভাবে সেগুলো হল উদ্যম, সাহস, অনুভূতিশীলতা এবং বুদ্ধি। ভারতীয় শিক্ষা দার্শনিকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বিশিষ্টতার দাবিদার। তাঁর মতে ‘সর্বাঙ্গীন মনুষ্যত্বের ভিত্তিস্থাপন’ ২৮ হচ্ছে শিক্ষার লক্ষ্য। তিনি বলেছেন, ‘আমরা মানুষ বলতে যা বুঝি আমাদের শিক্ষাও অনুরূপ আদর্শ সম্পন্ন হবে। কারণ ‘মানুষ করে তোলাই শিক্ষা।’ ২৯ এই মনুষ্যত্বের শিক্ষার দুটি অংশ আছে। এক কৃতিত্ব শিক্ষা; দুই. সংস্কৃতি শিক্ষা। এই শিক্ষা শিক্ষার্থীর চরিত্রকে বলিষ্ঠ ও কর্মিষ্ঠ করে, সব অবস্থার জন্য তাকে নিপুণভাবে প্রস্তুত করে, নিরলস আত্মশক্তির উপর নির্ভর করে কর্মানুষ্ঠানের দায়িত্ব সাধনের যোগ্য করে।৩০
শিক্ষা ও নৈতিকতা যুগে যুগে
বিভিন্ন কালের বিভিন্ন মনীষী বর্ণিত এইসব লক্ষ্যগুলো পর্যালোচনা করলে একটা মূলসুর খুঁজে পাওয়া যায়। তাহলো শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন করা, তাকে ভাল মানুষ করে গড়ে তোলা, ভাল জীবনের অধিকারী হতে সহায়তা করা। এ ক্ষেত্রে সফল হতে হলে আমাদের প্রথমেই সম্যকভাবে জানা দরকার ভালমন্দের পার্থক্য, ভাল জীবনের বৈশিষ্ট্য। এখানেই আসে নৈতিকতার প্রশ্ন, নৈতিকশাস্ত্র থেকে সাহায্য নেয়ার প্রশ্ন। সুতরাং আমরা দেখতে পাই শিক্ষা নৈতিকতা ও মানবজীবন একটা অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। আর তাই দেখা যায় সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত প্রত্যেক যুগেই নৈতিকতার ধারণা শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে, পাঠক্রম নির্বাচনে, পদ্ধতি অনুসরণে কার্যকর প্রভাব রেখেছে।
দর্শন চর্চার অন্যতম, প্রধান লক্ষ্য হল জগত ও জীবনের ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন। মূল্যায়ন করার ও মূল্যবোধ আবিষ্কার করার যোগ্যতা শুধু মানুষেরই রয়েছে, মানবেতর প্রাণীর নেই। শুভ বা কল্যাণ সম্পর্কিত মূল্যবোধ থেকেই তৈরি হয় নৈতিকতার ধারণা। তাই নৈতিকতাকে বলা যায় প্রজ্ঞাসম্মত, ফলপ্রসু ও মূল্যবান জাতীয় শুভ মানব জীবন গঠনের বিধিমালা বা মান।
প্রাচীন কালের প্রায় সব জনগোষ্ঠীতেই নৈতিক শিক্ষা ছিল সামাজিক প্রথা বা রীতিভিত্তিক। প্রাচীন গ্রীসের এই প্রথাভিত্তিক নৈতিকতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় হোমারের কাব্যে। ইলিয়াড ও অডিসীর কাহিনী থেকে গ্রিকরা অনুপ্রাণিত হতেন ভক্তি, আতিথেয়তা, সাহসিকতা, মিতাচার, আত্মনিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি গুণগুলোর চর্চায়। বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং সামাজিক অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, এই দুই মাধ্যম সম্মিলিতভাবে ঐ নৈতিক মূল্যবোধগুলো নবীন শিক্ষার্থীর মনে প্রোথিত করতে সচেষ্ট থাকত। ধর্মও এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখতো। রোমে বা ভারতেও ঐ নীতিই অনুসৃত হতো। এই ধারা অবশ্যই কর্তৃত্ববাদী ছিল। গ্রীসেরই সোফিস্ট সম্প্রদায় আবার এই ধারায় অন্যথা ঘটান। রীতি প্রথার স্বাভাবিক বিশ্বাসকে তারা সমালোচনার দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেন। বলেন, ব্যক্তি মানুষই হচ্ছে সমস্ত কিছুর মাপকাঠি। ফলে মানুষের মূল্যবোধ হয়ে পড়ে পরিবর্তনশীল ও আপেক্ষিক। সোফিস্টদের সমালোচনা করে সক্রেটিস নৈতিক শিক্ষাকে যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে বললেন যে, মনের ক্ষমতা রয়েছে সার্বিক যুক্তি প্রয়োগের এবং এরই মাধ্যমে লাভ করা যাবে শাশ্বত মূল্যবোধ। তিনি আরো বললেন যে, সার্বিক মূল্যবোধগুলো সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করলেই মানুষ সদাচরণ করবে। অন্যায় ঘটে অজ্ঞানতা থেকে।৩১ প্রথাভিত্তিক নৈতিক শিক্ষা মানুষের নৈতিক বিচারকে মোটেই আমল দেয়নি। কিন্তু সক্রেটিস যুক্তি ব্যবহারকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। অনেকে অবশ্য মনে করেন যে তিনি একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছেন। এরিস্টটল তাঁদের মধ্যে একজন। তাঁর মতে নৈতিকতা সম্বন্ধে শুধু জ্ঞান থাকাটাই যথেষ্ট নয়। অনুশীলনের মাধ্যমে নৈতিক আচরণ রপ্ত করতে হয়।৩২ যদিও তিনি প্লেটোর মত নৈতিকতা বা সদগুণাবলীকে দেবতাদের রহস্যজনক দান হিসেবে বিশ্বাস করতেন না তবু এ ক্ষেত্রে দেবত্বের কিছুটা অবদান যে রয়েছে তাও অস্বীকার করেননি।
গ্রিসে প্রথাগত নৈতিক শিক্ষা থেকে বিচারমূলক যৌক্তিক নৈতিক শিক্ষার ধারণা গ্রহণের পথে ধর্ম বিশেষ কোন বাধার সৃষ্টি করেনি। প্রকৃতপক্ষে তৎকালীন গ্রিসের ধর্মশাস্ত্র শিশুদের উপর বিশেষ কোন বাঁধাবাঁধি আরোপ করতো না। প্লেটো বরং এমন সব পৌরাণিক কাহিনী বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতীই ছিলেন, সেগুলো নৈতিকতা সমুন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে গ্রিকমানস সব সময় ইহজাগতিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। রাষ্ট্রও ছিল ধর্ম নিরপেক্ষ।
পাশ্চাত্যে নৈতিকতার শিক্ষার আদর্শে পরিবর্তন আসে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের পর। প্রাচীন গ্রিক রাষ্ট্রে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হতো নাগরিকতার ভিত্তিতে। সেখানে নারী, দাস ও বিদেশীদের নাগরিকতার অধিকার ছিল না। আর যেহেতু গ্রিকরা ইহজাগতিকতাকে বেশি পছন্দ করতো তাই তাদের কাছে বর্তমান জীবনই ছিল বেশি মূল্যবান। অন্যদিকে খ্রিস্টিয় আদর্শ অনুযায়ী ইহজাগতিক জীবন ক্ষণস্থায়ী, পারলৌকিক অনন্ত জীবনের জন্য প্রস্তুতিমূলক। মানুষের মূল্য ঈশ্বরের সন্তান হিসেবে এবং ঈশ্বরের সন্তান হিসেবে সব মানুষই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ; স্বাধীন বা পরাধীন, স্ত্রী বা পুরুষ, সাদা বা কালো কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। এই বৈপ্লবিক সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির একটা নতুন নৈতিকতা ছিল তাহলো ভালবাসার বা সৌহার্দ্যরে নৈতিকতা। এই নৈতিকতা মনষ্যসৃষ্ট নয় বরং প্রত্যাদিষ্ট। শিক্ষাক্ষেত্রে এই নৈতিকতা কতগুলো বৈশিষ্ট্যের জন্ম দিয়েছিল। এগুলোর মধ্যে একটি হল এই যে, মানুষ তার আদি পাপের বোঝা বহন করে চলেছে। এই পাপের প্রভাবেই তার চরিত্রে কু-ভাব জাগ্রত হয়। এই কু-ভাবকে দমনকরতে শুধু সু-ভাব সম্বন্ধে জ্ঞান দান করলেই চলবে না। তাকে শাসন পীড়নের মাধ্যমে সুনীতিতে অভ্যস্ত করতে হবে। আরেকটি হল এই যে মানুষ ঈশ্বরের আদলে তৈরি হলেও তার সে চরিত্র নষ্ট হয়েছে আদি পাপের ফলে। তাই তার কর্তব্য হচ্ছে নিজেকে সেই শুভ চরিত্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। সে জন্য প্রথমে তাকে পাপের জন্য অনুশোচনা করতে হবে। তারপর তার বিক্ষিপ্ত প্রবণতাগুলোকে সৃশঙ্খল করে সেবা এবং ক্ষমার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খ্রিস্টধর্মের আদর্শের প্রভাবে রাষ্ট্রের চেয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষার আদর্শ নিয়ন্ত্রণের কর্তৃত্ব চার্চের হাতেই চলে আসে। যাজকতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রভাব শিশুদের জীবনে খুব একটা সুবিধাজনক হয়নি। খ্রিস্টধর্মের প্রাথমিক যুগে শিশুরা নৈতিক শিক্ষা পেতো দৈনন্দিন জীবনাচরণের মাধ্যমে। এই জীবনে তত্ত্বকথার চেয়ে স্বাভাবিক শুদ্ধতাই বেশি পরিচিত ছিল। যাজকতন্ত্রের প্রভাবে নৈতিক শিক্ষা শিশুদের কাছে পৌঁছতো তত্ত্বকথা রূপে; কর্তৃত্বধর্মী প্রশ্নোত্তরে শিক্ষাদান পদ্ধতির মাধ্যমে। এর ফলে উপলব্ধির চেয়ে মুখস্ত করার উপর জোর পড়ে। বাক্য এবং প্রতীক বড় হয়ে ওঠে মূর্ত ধর্মীয় ও নৈতিক অভিজ্ঞতার চেয়ে। মধ্যযুগেও এই অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে মধ্যযুগের শেষে এবং রেনেসাঁর স্বর্ণযুগের আগে খ্রিস্টধর্ম ও প্রাচীন গ্রিক দর্শনের একটা সমঝোতা গড়ে তোলেন সেন্ট থমাস একুইনাস (১২২৫-১২৭৪) তাঁর সুম্মা থিওলজিকা বইয়ের মাধ্যমে।৩৩ এর প্রভাবে মধ্যযুগীয় বিষন্ন দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে একটা জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ইতালিতে। এ সময় পারলৌকিকতার বদলে আবার আগ্রহ দেখা দেয় ইহজাগতিকতার প্রতি, জাগরণ ঘটে মানবতাবাদের। খ্রিস্টান রক্ষণশীলতার প্রভাব কাটিয়ে পাশ্চাত্যের মানুষ নৈতিকতার আদর্শ খুঁজে নেয় গ্রিস ও রোমের প্রাচীন সাহিত্যের ভেতর থেকে।
ষোল শতকের দিকে মার্টিন লুথার (১৪৮৩-১৫৪৬)-এর নেতৃত্বে রক্ষণশীল খ্রিস্টীয় চার্চের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে। বিদ্রোহী দলের দাবি ছিল চার্চের মধ্যস্থতায় নয়, ব্যক্তির তার নিজের বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী ধর্মগ্রন্থে বিধৃত ঈশ্বরের বাণী বোঝার অধিকার থাকা চাই।৩৪ এই নীতি নৈতিক শিক্ষার পদ্ধতিতে বিরাট পরিবর্তন এনেছিল। ব্যক্তিগত বিচার বুদ্ধিকে উদ্দীপ্ত করার প্রচলন হল, বাইবেলকে পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হল এবং শুধু ধর্ম যাজকদের জন্য নয়, সবার জন্য স্বাধীন প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ধর্মকে জানার ব্যবস্থা গৃহীত হল। তবে যুক্তির উপর গুরুত্ব দিলেও তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে বিশ্বাস ও প্রত্যাদেশ থেকে যে জ্ঞান পাওয়া যায় তা উচ্চস্তরের। ভাল কাজ করা এবং ভাল অভ্যাস গঠন করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আত্মিক উৎকর্ষ অর্জনের চূড়ান্ত মাপকাঠি হল বিশ্বাস স্থাপনে এবং ধর্মীয় মতবাদ অনুসরণে আন্তরিকতা। মোট কথা পাশ্চাত্যে, মধ্যযুগে ধর্মীয় আদর্শ দ্বারাই নৈতিকতা নির্ধারিত হতো এবং সেই নৈতিকতা শিক্ষার্থীর জন্য ছিল বিষণœতা ও কঠোরতায় ভরা।
এরপর আবার আসে ইজাগতিকতার যুগ। এ ক্ষেত্রে জন লককে (১৬৩২-১৭০৪) পুরোধা বলা যায়। লক তাঁর সাম থটস কনসারনিং এডুকেশন বইতে নৈতিক চরিত্র গঠনের ব্যাপারে অনেক কথাই বলছেন তবে তার সবই ছিল ধর্মীয় প্রশিক্ষণের অভিসম্বন্ধ (জবভবৎবহপব) ছাড়া। তিনি চেয়েছিলেন শৃঙ্খলার মাধ্যমে চরিত্র গঠন করতে। তাঁর মতে, যখন মানুষ নিজেকে, নিজের কামনাকে নিরোধ করতে পারে এবং প্রবৃত্তি অন্যরকম চাইলেও যুক্তির নির্দেশ পুরোপুরি অনুসরণ করতে পারে তখন তার মধ্যে শৃঙ্খলা স্থাপিত হয়। ৩৫ চরিত্র গঠনে যুক্তির ভূমিকার উপর লক যে জোর দিয়েছিলেন তা ছিল সেই নতুন যুগেরই প্রতিফল যে যুগের সঙ্গে জগতের পরিচয় ঘটাচ্ছিল বিজ্ঞান। পরবর্তীতে এই যুগকে ধমব ড়ভ ৎবধংড়হ বলা হয়েছে। বিশ্বজগতের পেছনে যে প্রাকৃতিক নীতি ও শৃঙ্খলা আবিষ্কার করেছিলেন কোপারনিকাস, কেপলার ও নিউটনের মত বিজ্ঞানীরা তা মানুষের মনে বিপুলভাবে রেখাপাত করেছিল। যে পূর্বস্থিত সুমিল বিশ্বে রাজত্ব করছে বলে জানতে পারা গিয়েছিল তা সৃষ্টিকর্তার প্রকৃতি ও তাঁর কাজের ক্ষেত্রে এক নতুন পরিজ্ঞান (ওহংরমযঃ) দিয়েছিল। এরই প্রভাবে জ্যাঁ জ্যাকস রুশো (১৭১২-১৭৭৮) ব্যক্ত করেছিলেন কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। তিনি তাঁর এমিল বইয়ের প্রথম ছত্রেই বলেছেন, ‘সমস্ত কিছুই শুভ থাকে যেভাবে তা প্রকৃতির সৃষ্টি কর্তার হাত থেকে আসে।৩৬ ঐ বইয়েরই অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘আসুন আমরা এটাকে তর্কাতীত নীতি বলে মেনে নেই যে, প্রকৃতির প্রথম অনুপ্রেরণা সব সময়ই সঠিক। মানবের আত্মায় কোন আদি পাপ নেই।৩৭ এই বক্তব্যের মাধ্যমে রুশো খ্রিস্টধর্মের একটা মূলনীতিকে একেবারে বাতিল করে দিলেন যে নীতি অনুযায়ী মানুষের মূল প্রকৃতিকে দুর্ধর্ষ ধরনের অসৎ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যান্য শিক্ষার মত শিশুর নৈতিক শিক্ষাকেও রুশো প্রকৃতির ওপর ছেড়ে রাখতে চেয়েছেন পনের বছর বয়:ক্রম পর্যন্ত। এরপর শিক্ষার্থী যুক্তি ব্যবহার করে নিজেই নির্ধারণ করবে কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয়। নৈতিকতার শিক্ষাকে অতিপ্রাকৃতিকতার বদলে প্রাকৃতিক নীতি ও যুক্তি নির্ভর করার এই ধারা অবশ্যই ধর্মনিরপেক্ষ ধারার দিকে অনেকখানি অগ্রসরতার পরিচায়ক। এই ধারা ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে ঊনিশ শতকের মাঝামাঝির দিকে একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। ১৮২৭ সালে আমেরিকার ম্যাসুচুসেটস আইন সভায় একটা আইন পাস করা হয় যাতে বলা হয় যে, স্কুলের কমিটি, ‘তাদের আওতাধীন কোন স্কুলকে এমন বই কেনার বা ব্যবহার করার নির্দেশ দেবেন না যেগুলো কোন বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায় বা মতবাদের পক্ষপাতিত্ব করে বলে বোঝা যায়।’৩৮ এইভাবে ঐ সময় সেখানকার বিদ্যালয়ের নৈতিক শিক্ষাকে ধর্মনিরপেক্ষ করা হয়।
এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ শুরু হয় রবিবাসরীয় বিদ্যালয় আন্দোলন। এইসব বিদ্যালয়ে ধর্মীয় নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া হতো। এ ধরনের বিদ্যালয় খ্রিস্টানদেরও ছিল এবং ইহুদীদেরও ছিল। ফলে বিদ্যালয়কে ধর্মনিরপেক্ষ করা হলেও জনগণকে ধর্মনিরপেক্ষ করা যায়নি। এই বিদ্যালয়গুলো তাদের কাযক্রম যথেষ্ট কার্যকর ভাবেই চালিয়ে যাচ্ছিল পুরোটা ঊনিশ শতক ধরে। অবশ্য এই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল বাইবেল পড়া এবং প্রশ্নোত্তরের সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে। ফলে এগুলো অনেকটাই হয়ে গিয়েছিল গৎবাঁধা ধরনের। অন্যদিকে ঐ সময় থেকেই যোহান হেনরিক পেস্তলৎসী (১৭৪৭-১৮২৭), যোহান ফ্রেডারিক হাবার্ট (১৭৭৬-১৮৪১) ফ্রেডারিক ফ্রোয়েবল (১৭৮২-১৮৫২), এদের মত বিখ্যাত শিক্ষা সংস্কারকদের মনে জন্ম নিচ্ছিল নতুন ধ্যান ধারণা। তার প্রেক্ষিতে তাঁরা বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষাকে ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত করে যুক্তিনির্ভর চরিত্রে শিক্ষার বিধান দিলেন। এইভাবেই পাশ্চাত্যের নৈতিক শিক্ষা কখনও চলেছে সরাসরি ধর্মীয় আদর্শের ভিত্তিতে কখনও চলেছে ধর্মনিরপেক্ষ ধারায়।
প্রাচ্যের নৈতিক শিক্ষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে তা বেশির ভাগ সময়ই ছিল ধর্মীয় আদর্শনির্ভর। তবে প্রাচ্যের বৈদিক ধর্ম মানুষকে অমৃতের পুত্র বলেই বর্ণনা করেছে, ইসলাম ধর্ম জেনেছে সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধি হিসেবে, আদিপাপের বোঝা বহনকারী বলে নয়। তাই তার নৈতিক শিক্ষায় শৃঙ্খলা ও কৃচ্ছসাধনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্নেহপূর্ণ লালনের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বিশ শতকে এসে ভারতীয় সমাজকে ধর্মান্ধতার হাত থেকে রক্ষা করতে প্রচলন ঘটে ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক শিক্ষার। অবশ্য বর্তমান প্রেক্ষিত বিবেচনা করলে তাদের সেই আশা খুব একটা ফলবতী হয়েছে বলে মনে হয় না।
ইতিহাস পর্যালোচনার প্রেক্ষিতে একথা বলা যায়, যে রঙেই হোক সব দেশের সবকালের শিক্ষায় নৈতিকতার একটা বড় ভূমিকা ছিল। ধর্মীয় রঙে রঞ্জিত নৈতিক শিক্ষার সুবিধা ছিল এই যে, এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে একটা ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে প্রত্যাদিষ্ট বিধানগুলো মানানো যেত। কিন্তু যুক্তিনির্ভর ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সার্বজনীন বিধি তৈরি করা যেমন কষ্টকর ছিল, তেমনি সবাইকে সেগুলো মানতে বাধ্য করাও কষ্টকর ছিল।
যাই হোক এবার একটু বাস্তব প্রেক্ষিতে আসি।
আমাদের করণীয়
হ্যারল্ড এইচ, টাইটাস তাঁর লিভিং ইসুজ ইন ফিলসফি গ্রন্থে শিক্ষিত ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন,‘শিক্ষিত হওয়ার মানে হচ্ছে অন্যের সঙ্গে মানিয়ে চলার যোগ্যতা অর্জন করা। … আমাদেরকে শিখতে হবে অপরের প্রতি আগ্রহী হতে, অপরকে সাদরে গ্রহণ করতে এবং শান্তিপূর্ণভাবে সহঅবস্থান করতে। … কেউ যদি অন্যের জীবনের অপরিহার্য অধিকারগুলো সম্বন্ধে সচেতন না হয় এবং রক্ষা করতে তৈরি না থাকে তাহলে সে অচিরেই দেখবে তার নিজের স্বার্থ ও অধিকার বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। যদি একটি সমাজ মাত্র একটি আইন বিবর্জিত সহিংসতার বলিকেও অথবা অবিচারকেও সংঘবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে তৈরি না হয়, তা হলে সেখানে না থাকবে আইন, না ন্যায়বিচার, না স্বাধীনতা।’৩৯
আজকের বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বার বার ঐ কথাগুলো মনে পড়ছে। কিন্তু শুধু মনে পড়লেই কি চলবে? আমাদের কি কিছু করণীয় নেই? এই পৃথিবীকে নবজাত শিশুর বাসযোগ্য করে যাবার সুকান্তের অঙ্গীকার কি আমাদের অঙ্গীকার হতে পারে না? আমাদের শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার নবীন শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষার সনদপ্রাপ্ত হয়ে বেরিয়ে আসছে অথচ টাইটাস প্রস্তাবিত এবং যথেষ্ট যুক্তিপূর্ণভাবে উপস্থাপিত বৈশিষ্ট্যগুলো, (বিশেষ করে একটু আগে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যটি) অর্জন করছে না কেন? যদি করতই তাহলে আমাদের সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংঘটিত মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ হচ্ছে না কেন? আমরা সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারছি না কেন মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করার জন্য? প্রবীণতর প্রজন্ম হিসেবে আমাদের আজ কিছু প্রয়াস অন্ততঃ গ্রহণ করা প্রয়োজন যাতে নবীন প্রজন্ম সত্যিকার শিক্ষিত ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে; অন্ততঃ সনদপ্রাপ্ত সবার আচরণ আদর্শ হয়, প্রকৃত শিক্ষিত ব্যক্তির মত হয়।
বলা হয়ে থাকে অপরীক্ষিত জীবন কোন জীবনই নয়। অর্থাৎ মানুষকে মানুষের জীবন যাপন করতে হলে জীবন বিচার করে, জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে কাজে অগ্রসর হতে হবে। আর আমরা সবাই জানি যে, কোন কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজন সুশৃঙ্খল প্রয়াস। প্রয়াসে শৃঙ্খলা আনার জন্য জন্য আবার চাই কিছু মূলনীতি, যা সরবরাহ করবে দিকনির্দেশনা, নির্ধারণ করবে প্রাধিকার, তৈরি করবে পারস্পর্য। তাই আচরণের আদর্শ হওয়া উচিত নীতিসম্মত হওয়া, মূল্যবান হওয়া, ভালত্বের মানসম্পন্ন হওয়া। আর সেই জন্যই দেখা গেছে যুগে যুগে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে গিয়ে নৈতিকতাকে একটা বিশেষ স্থান দেয়া হয়েছে। সেই নৈতিকতা কখনও ছিল ধর্মভিত্তিক কখনও ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। স্বাভাবিকভাবেই ধর্মভিত্তিক আদর্শগুলো হতো নির্দিষ্ট প্রকৃতির, ধর্মগ্রন্থ অনুসারে। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শগুলো তৈরি করা হতো বুদ্ধিবৃত্তির ব্যবহার করে। ফলে অবশ্য ব্যক্তিভেদে ও সময়ভেদে বিভিন্নতা আসত। আর এর প্রভাবেই অনেকে বলে থাকেন যে ভালমন্দ আপেক্ষিক ব্যাপার। আজ যা ভাল নয় কালই হয়তো তাকে ভাল বলে স্বীকার করে নেবো। আবার একই কালের প্রেক্ষিতে এক সমাজে যাকে ভাল নয় বলা হচ্ছে, অন্য সমাজে তাই সমাদৃত হচ্ছে পুরো দস্তুর। অথচ মূল্যবোধগুলোকে আপেক্ষিক বলে মেনে নিলে যে সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে সে আশঙ্কাকেও তো উড়িয়ে দেয়া যায় না। যায় না বলেই তো সোফিস্টদের, ‘ব্যক্তি মানুষই সমস্ত কিছুর মাপকাঠি’ জাতীয় বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন সক্রেটিস, শাশ্বত মূল্যবোধের সন্ধান দিতে চেয়েছেন, ন্যায় অন্যায় ভালমন্দ ইত্যাদির স্বরূপ উদঘাটন করতে চেয়েছেন। কিন্তু আমরা দেখেছি মানুষ কোন মতবাদ যত যুিক্তপূর্ণ ভাবেই উপস্থাপন করুক না কেন, তার বিরুদ্ধ মতবাদ সৃষ্টি হবেই। এটা দোষের কিছু নয়। দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির এটাই রীতি; আর নতুন জ্ঞান অর্জিত হয় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির সফল প্রয়োগের মাধ্যমেই। কথা সেখানে নয়। কথা হল আচরণের ঠিকবেঠিক যাচাইয়ের জন্য মানদন্ড চাই, শাশ্বতঃ মানদন্ড; যে মানদন্ডে সবকালের সব মানুষের আস্থা থাকতে পারবে। কারণ আচরণ তো লক্ষ্য নয়, আচরণ লক্ষ্য অর্জনের উপায়। আর মানসম্মত আচরণ করতে না পারলে তো জীবনের লক্ষ্য অর্জিত হবেই না। তাই চাই আচরণের নৈতিকতা যাচাইয়ের শাশ্বতঃ মানদণ্ড, সার্বিক মানদন্ড। কিন্তু মানুষ তো এই মানদন্ড সরবরাহ করতে পারছে না। কারণ একজনের মানদন্ড অন্যজন স্বীকার করছেন না; এককালের নন্দিত মানদন্ড অন্যকালে হচ্ছে নিন্দিত, উপহাসের বস্তু। অথচ দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে মানদন্ড তৈরি করার মত সময়ও আমাদের হাতে আর আছে বলে মনে হয় না। এ সমস্যার সমাধান হতে পারে যদি আমরা ধর্মীয় নীতিবিদ্যার মানদন্ড অনুসরণ করি যা বিধৃত রয়েছে ধর্মগ্রন্থসমূহে।
আমরা যদি পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের মৌলিক গ্রন্থগুলোকে উদার ও বিশ্লেষণী মনোভাব নিয়ে অধ্যায়ন করি তাহলে দেখব যে এগুলোর মধ্যে অধিবিদ্যা (গবঃধঢ়যুংরবং) ও আচার অনুষ্ঠানের দিক দিয়ে অনেক বিভেদ রয়েছে। যেমন ইসলাম ও ইহুদী ধর্ম সম্পূর্ণভাবে একেশ্বরবাদী, জরথুস্ট্রীয় ধর্ম একদিক দিয়ে একেশ্বরবাদী অন্য দৃষ্টিতে দিশ্বরবাদী, খ্রিস্টধর্ম একেশ্বরবাদী হয়েও ত্রিতত্বে বিশ্বাসী, হিন্দুধর্মে একেশ্বরবাদ, বহু ঈশ্বরবাদ, সর্বেশ্বরবাদ, সর্ব ধরেশ্বরবাদ এবং নিরীশ্বরবাদ শান্তিপূর্ণভাবে সহঅবস্থান করছে, জৈনধর্ম ঈশ্বরে আদৌ বিশ্বাস করছে না, বৌদ্ধধর্ম ঈশ্বরে বিশ্বাসও করছে না অবিশ্বাসও করছে না, কনফুসিয়াসবাদ ও তাওবাদে ঈশ্বরের গুরুত্ব একেবারেই নামমাত্র। কিন্তু এই সমস্ত ধর্মসমূহের নৈতিক শিক্ষার মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। প্রত্যেকটি ধর্মই ব্যক্তি মানুষকে আদর্শ ও চরিত্রবান মানুষে পরিণত হবার তাগিদ দিচ্ছে, দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। এরিস্টটল তাঁর নিকোমেকিয়ান ইথিকস গ্রন্থে নৈতিক গুণাবলীর যে বর্ণনা দিয়েছেন তার প্রত্যেকটি গুণ গীতা, উপনিষদ, ধর্মপদ, বিশুদ্ধিমার্গ, জৈন নীতিবিদ্যা, কনফুসিয়াস ও লাউজুর নীতিবিদ্যা, বাইবেল, কোরআন-এর প্রত্যেকটিতে রয়েছে। সুতরাং ধর্মীয়নীতিবিদ্যা যে মানদন্ড দিয়েছে সেইটে গ্রহণ করে মানদন্ড খোঁজারূপ সমস্যাটার সমাধান মনে হয় আমরা করতে পারি। অর্থাৎ কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয়, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যেতে পারি। আর এ সমস্যার সমাধান করা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জরুরি। কারণ এ সমস্যার সমাধান করতে পারলে অন্য সমস্যাগুলো সমাধান করার প্রেক্ষিত রচিত হবে নিঃসন্দেহে। তাই বলতে চাই ধর্মগ্রন্থে খুঁজলে শাশ্বত মূল্যবোধের সন্ধান আমরা অবশ্যই পাবো যা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণকে সুশৃঙ্খল ও কল্যাণপ্রসু করবে। তারপরেও কথা থেকে যায়। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশের ধর্মের ব্যাপারে দারুণ অনীহা এবং অশ্রদ্ধা। মধ্যযুগের কিছু খ্রিস্টান পুরোহিতদের কার্যকলাপের ফলে তৎকালীন সচেতন সম্প্রদায় ধর্মকে আফিমসদৃশ বলেই অনুভব করেছিলেন এবং জীবন থেকে ছেঁটে বাদ দিতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করছিলেন। সে প্রভাব আজও রয়েছে। অথচ দোষটা যে ধর্মের নয় ধর্ম যাজকদের সে কথা আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত করা গেল না। সেই জন্যই বোধহয় জনাব আবুল হাশেম বলেছিলেন, ‘সঠিক এবং সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি হবে মোল্লা, পুরুত ও যাজকদের মত ধর্মের স্বঘোষিত অভিভাবকদের বিনা আনুষ্ঠানিকতায় ও অবজ্ঞাভরে বাতিল করে ধর্মকে অনুধাবন করার দায়িত্ব পৃথিবীর প্রতিভাবানদের ওপর অর্পণ করা।৪০ অবশ্য মনে হয় অর্পণ করার জন্য অপেক্ষা করে থাকা নয়, প্রতিভাবানদের নিজেদেরই এগিয়ে এসে এ দায়িত্ব তুলে নেয়া উচিত, মানুষকে প্রকৃত ধার্মিক করার লক্ষ্যে, ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে হানাহানি বন্ধ করে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। মাথায় ব্যথা হলে যেমন মাথা কেটে ফেলাটা কোন সমাধান নয় বরং কারণ বের করে চিকিৎসা করাটাই সমাধান, তেমনি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকেরা হানাহানি করে বলে ধর্মকে জীবন থেকে ছেঁটে বাদ দেয়াটাও কোন সমাধান হবে না। এই জন্যই প্রয়োজন ধর্মের বৌদ্ধিক চর্চা। কারণ ধর্মে ব্যক্তির সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার সম্বন্ধের ব্যাপারটা আবেগিক হলেও নৈতিকতার ব্যাপারটা, যা হানাহানি রোধের রক্ষা কবচ বলে মনে হয়, তা সম্পূর্ণভাবে বৌদ্ধিক। তাছাড়া বৌদ্ধিক চর্চার মাধ্যমেই বেরিয়ে আসে যে ধর্মের উদ্দেশ্য সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন যতটা নয় তার চেয়ে অনেক বেশি সুশৃঙ্খল সমাজ বিনির্মাণ। অবশ্য এটা আমার মনে হয়েছে আল-কোরআনে আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভের পদ্ধতির বর্ণনার পরিবর্তে সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালার বর্ণনার প্রাধান্য লক্ষ্য করে। যাইহোক বৌদ্ধিক চর্চার ব্যাপারে সব ধর্মেই সম্প্রতি যথেষ্ট প্রয়াস গৃহীত হয়েছে এবং হচ্ছে। তা সত্ত্বেও আজও একদিকে যেমন দেখা যায় ঐ ধরণের ধর্মগুরুদের প্রকট প্রভাব তেমনি দেখা যায় ধর্মকে অস্বীকারকারী বা অবজ্ঞাকারীদের প্রবল দল। অথচ এই অবস্থা থেকে ধর্মকে উদ্ধার করে তার সঠিক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি দরকার।
এখানে একটি ব্যাপার স্ববিরোধী মনে হলেও উল্লেখ না করে পারছি না। আমি ধর্মের কাছ থেকে শাশ্বতঃ নীতিমালা আহরণ করার কথা বলছি। অথচ আমাদের দেশে শিশু শ্রেণী থেকে ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও সুনীতিপরায়ন হওয়ার বদলে দুর্নীতির ঘূর্ণাবর্তে তলিয়েই যাচ্ছি আমরা। এতে আশঙ্কা করা হয়তো অসঙ্গত হবে না যে আমরা ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মনে নীতিবোধ দৃঢ়মূল করতে পারছি না। আমার মনে হয় এ ব্যর্থতার দায় বেশ কিছুটা শিক্ষাদানকারী ও শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর বর্তায়। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। নরওয়ে প্রবাসী এক বাঙালি ভদ্রলোক তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়–য়া ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে এক চৌরাস্তার ট্রাফিক সিগন্যালের লালবাতি জ্বুলে উঠল। ভদ্রলোক গাড়ি থামালেন না, চালিয়ে চলে গেলেন। নরওয়ের হাইওয়েতে গাড়ির সংখ্যা সাধারণতঃ কমই থাকে। তখনও অন্যদিকের রাস্তায় গাড়ি ছিল না। ভদ্রলোক তাই থামেননি। কিন্তু ছেলে প্রতিবাদ জানালো। কারণ বাবা আইন ভঙ্গ করেছেন এবং আইনভঙ্গ করা গর্হিত অপরাধ। এই দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যমেই সে পেয়েছে। আমরা কি চেষ্টা করতে পারি না এমন অবস্থার সৃষ্টি করতে? আমরা কেন পারি না এমন অবস্থার সৃষ্টি করতে? ’৪৭ থেকে ’৭০, ৭১ থেকে বর্তমান, সারাটা সময় জুড়েই তো আমাদের দেশের বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক রয়েছে, হাজারে হাজারে মসজিদ, মাদ্রাসা, অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তাবলীগ জামাতের প্রচার ও প্রসার হয়েছে। কিন্তু তবু মিথ্যাবাদী প্রতারক, গুন্ডাবদমাশ, দুর্নীতিবাজ অর্থাৎ উচ্ছৃঙ্খল মানুষদের প্রতাপই তো বৃদ্ধি পেয়েছে দিন দিন। সুনীতি সম্পন্ন মানুষ তো তেমন তৈরি করতে পারছি না। এ ব্যাপারে অবশ্যই কিছু করা দরকার।
শরৎচন্দ্র তাঁর ‘পল্লী সমাজ উপন্যাসে বেনীমাধবের মুখে বলিয়েছেন, ‘বাঁশ নুইয়ে ফেলতে চাও তো এই সময়। পেকে উঠলে আর হবে না’। তেমনি পরিণত বয়সের আচরণকে বাঞ্ছিত গড়নে দেখতে চাইলে কাঁচা বয়সেই প্রচেষ্টা চালাতে হবে। অর্থাৎ শাশ্বত মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত জনগোষ্ঠী পেতে হলে প্রজন্মের বাল্যকালেই সযতœ প্রয়াসের মাধ্যমে যাচিত মূল্যবোধের বীজ মনে বপন করতে হবে। প্লেটো থেকে শুরু করে সমস্ত বিশিষ্ট দার্শনিকই কোন না কোনভাবে বলেছেন যে, নীতিজ্ঞান শিক্ষা দিতে হবে এবং তা শিশু বয়স থেকেই। যেমন এরিস্টটল বলেছেন যে, ‘নৈতিকগুণাবলী শেখা হয় অভ্যাস গঠনের ফলে। … স্বভাবগত ভাবেই আমরা নৈতিক গুণাবলী গ্রহণ করার উপযোগী এবং সেগুলোর উৎকর্ষ সাধিত হয় অভ্যাসের দ্বারা।” তিনি আরো বলেছেন, ‘আমরা খুব অল্প বয়স থেকে এটার বা সেটার অভ্যাস গঠন করি বা না করি তাতে সামান্য পার্থক্য ঘটনায় না, বিরাট পার্থক্য ঘটনায়, বলা যায় পুরোটাই ঘটায়।৪১ তেমনি বিখ্যাত শিক্ষা দার্শনিক যোহান ফ্রেডারিক হারবার্ট তাঁর ‘এসএথেটিক প্রেজেনটেশন প্রবন্ধটি শুরুই করেছেন এই কথা বলে যে, ‘শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য এবং সমগ্র উদ্দেশ্য একটি মাত্র কথায় ব্যক্ত করা যায়- সেটি হচ্ছে নীতিজ্ঞান।৪২ তিনি বলেছেন, ব্যক্তির মধ্যে এই নীতিবোধকে জীবন্ত স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করার কৌশলের নামই হচ্ছে শিক্ষা। তাঁর মতে শিশুর মধ্যে গড়ে তুলতে হবে- এমন সার্থক ও সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি যাতে স্বভাবতঃই সে সত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয় আর ঘৃণা করতে শেখে অসত্য ও অসুন্দরকে।৪৩ বাট্রান্ড রাসেল তো জীবনের প্রথম বছর থেকেই সুঅভ্যাস গঠনের কথা বলেছেন। বলেছেন, ‘আমরা যখন শৈশবের অভ্যাস গঠনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছি তখন দুটি বিষয় বিবেচনায় আসে। প্রথম এবং অন্যতম বিবেচনা হল স্বাস্থ্য; দ্বিতীয়টি হল চরিত্র। আমরা চাই শিশু এমন ধরনের ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠুক যাকে সবাই পছন্দ করবে এবং যে স্বার্থকভাবে জীবনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবে।৪৪ এ রকম আরো বহু উদাহরণ উপস্থাপন করা যায় সেগুলোর মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে মানুষকে সুনীতিসম্পন্ন মানুষ অথবা উত্তম নৈতিক চরিত্রের অধিকারী মানুষ করে গড়ে তুলতে হলে শিশুকাল থেকেই সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
একটা সময় ছিল যখন পরিবার ও সমাজের সদস্যদের সাথে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মধ্যদিয়ে শিশুরা শাশ্বত বা প্রচলিত মূল্যবোধগুলোকে আয়ত্ত করত। তাছাড়া বিদ্যালয়ের পাঠক্রমের মাধ্যমেও নানাভাবে সেগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতো; বাড়িতে শেখা মূল্যবোধগুলোর দৃঢ়ীকরণ হতো। বর্তমানে নানা কারণে শিশুর পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সে রকম স্বাভাবিক সম্পৃক্ততা বেশ কম। অনেক ক্ষেত্রে আবার পিতামাতা সচেতনভাবে এসব অনুশীলন করেন না এবং করান না বরং অসচেতনভাবে সেগুলোর বিরুদ্ধাচরণ করে থাকেন। পাঠ্যসূচীর ভেতরও শাশ্বত মূল্যবোধের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় ঘটাতে পারে তেমন বিষয়বস্তুর যথেষ্ট অভাব। তাই আমরা মনে করি পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ, শিশুকে শিক্ষিত করে তোলার এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার সচেতন হয়ে উঠতে হবে, কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যে একে অপরের পরিপূরক সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান, বিশেষ করে প্রয়োগবাদী শিক্ষাদর্শন বিদ্যালয় জীবন সমাজ জীবনের অনুসরণে গঠন করার নীতি প্রচার করেছেন। জন ডিউইর মতে বিদ্যালয় সমাজ জীবনেরই সুস্থ প্রতিচ্ছবি। তাই নীতিবোধ বিদ্যালয়ের দলবদ্ধ জীবনের মধ্যেই স্বাভাবিকভাবে গড়ে উঠবে। তাঁর মতে শিশুর নীতিবোধ বিকাশের সবচেয়ে ভাল পরিবেশ হচ্ছে তারই মত শিশুদের দিয়ে গঠিত পরিবেশ। তাই বিদ্যালয়ের পরিবেশেই সে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা, দ্বন্দ্ব ও বন্ধুত্বের মধ্যদিয়ে সত্য নীতিজ্ঞান লাভ করবে। এটা তার অভিজ্ঞতালব্ধ হবে বলেই জীবন্ত সত্য হবে।
এ ব্যাপারে শিক্ষকদের একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। অবশ্য নৈতিকতা শিক্ষাদানের ব্যাপারে সাধারণ শিক্ষকদের ভূমিকা থাকা উচিত কি উচিত নয় এ নিয়েও দ্বন্দ্ব রয়েছে। জেমস গ্রিবল বলেছেন যে, এ ব্যাপারে সাধারণত দু’টি আপত্তি তোলা হয়ে থাকে। (১) শিক্ষকেরা নিজেরা যে (নীতিবান হয়ে) নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার মত উপযুক্ত হবেন এমন নিশ্চয়তা দেয়া যায় না।
(২) শিক্ষকদেরকে কখনও কখনও কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়; হয় আচরণ সম্পর্কে যুক্তি উপস্থাপন করা পরিস্থিতির কারণে সম্ভবপর হয় না, সে জন্য অথবা শিক্ষার্থীরা যুক্তি অনুধাবন করার মতো যথেষ্ট পরিণত নয় সে জন্য অথবা ব্যবহারিক প্রয়োজনে যৌক্তিতা প্রদর্শনের চাইতে নিয়ম বেঁধে দেয়াটাই বেশি কার্যকর হয় সে জন্য। এই কর্তৃত্ববাদী ভূমিকা নৈতিক শিক্ষকের ভূমিকার সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।’৪৫
কারণ নৈতিক শিক্ষকের যুক্তিবাদী হওয়া উচিত কর্তৃত্ববাদী নয়। কিন্তু এই আপত্তিগুলো তিনি মেনে নিতে পারেননি। বলেছেন, ‘যদিও এই যুক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নির্দেশ করে তবু আমাদের মত হল এই যে, শিক্ষকের নৈতিক শিক্ষক হিসেবে একটা ভূমিকা অবশ্যই আছে। প্রকৃত পক্ষে প্রত্যেকটি কাজ, যদি তাকে সত্যিকার অর্থে শিক্ষামূলক বলতে হয় তবে তার একটা নৈতিক শিক্ষামূলক দিক অবশ্যই থাকবে।’৪৬ এরপর তিনি তাঁর মতের স্বপক্ষে বিস্তারিত এবং জ্ঞানগর্ভ যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। আমি সে দিকে না গিয়ে অন্যভাবে বিষয়টিকে দেখতে চাই। শিক্ষাবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে প্রত্যেক শিক্ষকই ভাষা শিক্ষক। অর্থাৎ যেহেতু ভাষার মাধ্যমেই ভাবের বা তথ্যের আদান প্রদান হয় তাই সব শিক্ষকের কাছ থেকেই শিক্ষার্থীরা ভাষা শেখে। সুতরাং ভাষা ব্যবহারে প্রত্যেক শিক্ষককেই দক্ষ হতে হবে। তেমনি আমি বিশ্বাস করি যে শিশু শিক্ষার্থী, তথা শিক্ষার্থীর জন্য প্রত্যেক শিক্ষকই নৈতিকতার শিক্ষক। শিশুর ওপর মা-বাবার কথা ও আচরণের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। কিন্তু স্কুলে যাবার পর থেকে তার ওপর শিক্ষকের আচরণ ও বক্তব্যের প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে দেখা যায়। সুতরাং যিনি শিক্ষক হবেন তাঁকে তাঁর আচরণ ও বক্তব্যে নৈতিকতার আদর্শ সমুন্নত রাখতে অবশ্যই সচেষ্ট থাকতে হবে। এ জন্য বলতে চাই শিক্ষকদের তথা বিদ্যালয়কে অবশ্যই কিছুটা দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষার্থীর মনে শাশ্বত মূল্যবোধ প্রথিত করার।
এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের অন্ততঃ ভাষা শিক্ষকদেরকে কিছুটা সহায়তা করার জন্য ভাষা ও সাহিত্যের অবশ্য পাঠ্য বইগুলোতে শাশ্বত মূল্যবোধে উদ্দীপ্তকারী বক্তব্য সম্বলিত বিষয়বস্তু সংযোজিত করা দরকার। তার চেয়েও বোধ হয় বেশি দরকার শাশ্বতঃ মূল্যবোধ বা সৎগুণাবলী সম্পর্কিত বক্তব্য সম্বলিত প্রচুর সুখপাঠ্য বই তৈরি করা এবং সেগুলো পাঠের সুযোগ সৃষ্টি করা। এসব বই পড়ে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হবে আর তাদের আচরণে বাঞ্ছিত গড়ন আনতে চেষ্টা করবে। বইগুলোকে সহপাঠ হিসেবে ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে সুখপাঠ্য বই প্রয়োজন, নীতিকথামালা নয়, তার কিছু কারণ আছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা সমস্যা প্রবন্ধে লিখেছেন ‘ব্রহ্মচর্য পালনের পরিবর্তে আজকাল নীতি পাঠের প্রাদুর্ভাব হইয়াছে। যে কোন উপলক্ষে ছাত্রদিগকে নীতি-উপদেশ দিতে হইবে, দেশের অভিভাবকদের এইরূপ অভিপ্রায়।
ইহাও ঐ কলের ব্যাপার। নিয়মিত প্রত্যহ খানিকটা করিয়া সালসা খাওয়ানোর মতো খানিকটা নীতি-উপদেশ ইহা একটা বরাদ্দ, শিশুকে ভাল করিয়া তুলিবার এই একটা বাঁধা উপায়।
নীতি-উপদেশ জিনিসটা একটা বিরোধ। ইহা কোন মতেই মনোরম হইতে পারে না। যাহাকে উপদেশ দেয়া হয় তাহাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। উপদেশ হয় তাহার মাথা ডিঙ্গাইয়া চলিয়া যায় নয় তাহাকে আঘাত করে। ইহাতে কেবল চেষ্টা ব্যর্থ হয় তাহা নয়, অনেক সময় অনিষ্ট করে। সৎ কথাকে বিরস ও বিফল করিয়া তোলা মনুষ্য সমাজের যেমন ক্ষতিকর এমন আর কিছুই নয়-অথচ অনেক ভাল লোক এই কাজে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন, ইহা দেখিয়া মনে আশঙ্কা হয়।’৪৭ ব্রহ্মচর্য পালনের দিনকে তো আর ফিরিয়ে আনার উপায় নেই। তাই বলে নীতি পাঠের প্রাদুর্ভাবকেও তো ঘটতে দেয়া যায় না। বিকল্প কোন পথ অবশ্যই খুঁজতে হবে। তাই সালসা খাওয়ানো নয়- পিরিয়েড বরাদ্দ করে নীতি উপদেশ বিতরণ করা নয়, আনন্দের অনুসঙ্গ করে, দৈনন্দিন জীবনাচরনের অঙ্গ করে সুস্থ, সুন্দর ও স্বার্থক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় আদর্শ ও রীতিনীতিগুলো শিশু কিশোরদের মনে দৃঢ়মূল করা দরকার। এ ক্ষেত্রে সুখপাঠ্য বই বেশ কিছুটা সাহায্য করতে পারে যদি বিদ্যালয়ে পাঠপ্রকল্প রীতিমতো চালু করা হয়। আমরা আশা করতে পারি যে সেই বইগুলোর মাধ্যমে গল্পের আস্বাদ নিতে নিতে, কবিতার আস্বাদ নিতে নিতে আমাদের নবীন প্রজন্ম শাশ্বত মূল্যবোধগুলোর সঙ্গে পরিচিত হবে, সেগুলোকে আত্মস্থ করবে।
অবশ্য এটা জানা কথা যে, শুধু বই পড়লে খুব একটা ফল লাভ হবে না। এরিস্টটল বলেছিলেন, ‘যে কাজ করতে পারার আগে আমাদেরকে শিখতে হয়, সে কাজ আমরা করতে শিখি করে করেই।’৪৮ অর্থাৎ সৎ কাজ করার অভ্যাসও আমাদেরকে গড়ে তুলতে হবে সৎ কাজ করে করে। সুতরাং নৈতিকতা বিকাশে সহায়তা করার জন্য বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে শিক্ষার্থীদেরকে শাশ্বত মূল্যবোধ অনুযায়ী আচরণ করতে অভ্যস্ত করতে হবে। এই কাজ করার জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরিবেশ পরিচিতি বা সমাজবিজ্ঞান বিষয়কে অবলম্বন করা যায়। এসব বিষয়ে বর্ণিত আদর্শগুলোকে বা ধারণাগুলোকে পুরোপুরি পুস্তক নির্ভর করে না রেখে ব্যবহারিক কাজ হিসেবে কিছু সেবামূলক প্রকল্প গ্রহণ করা যায়। এগুলোকে শুধু পরীক্ষা পাসের অংশ হিসেবে না দেখে অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী সবাই যদি ব্রত হিসেবে দেখতে পারেন তবেই সুফল আসবে। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কিছু কথা স্মরণ করা যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘বালকদিগের অধ্যয়নের কাল একটি ব্রত যাপনের কাল। মনুষ্যত্ব লাভ স্বার্থ নহে পরার্থ ইহা আমাদের পিতামহেরা জানিতেন। এই মনুষ্যত্ব লাভের ভিত্তি যে শিক্ষা তাহাকে তাঁহারা ব্রহ্মচর্যব্রত বলিতেন। এ কেবল পড়া মুখস্ত করা এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ন হওয়া নহে, সংযমের দ্বারা, ভক্তিশ্রদ্ধা দ্বারা, শুচিতা দ্বারা, একাগ্রনিষ্ঠার দ্বারা সংসারাশ্রমের জন্য এবং সংসারাশ্রমের অতীত ব্রহ্মের সহিত অনন্তযোগ সাধনের জন্য প্রস্তুত হইবার সাধনাই ব্রহ্মচর্যব্রত’। যত সামান্য সেবামূলক কাজ আমরা শিশুদের দিয়ে করাই না কেন, কিছুটা হলেও যদি ঐ মানসিকতা নিয়ে করতে পারি তবে তা স্বার্থক হয়।
সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলীর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও আমার সত্য, সুন্দর ও মঙ্গল আচরণে শিক্ষার্থীকে অভ্যস্ত করে তুলতে পারি। ইদানীং সহপাঠক্রমিক কার্যাবলীর ব্যবস্থা বিদ্যালয়গুলো খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে করে না। করলেও নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদি অর্থাৎ বিনোদনমূলক কার্যবলীর কিছু আয়োজন করে, আর করে কিছুটা শরীর চর্চামূলক। তাও শুধু আয়োজন, চর্চা নয়। কিন্তু সেবামূলক কোন কার্যক্রমের চর্চা দূরে থাক আয়োজনও হয় না। বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের মাধ্যমে দলগত ব্যক্তিগত সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। ছোট ছোট এই সব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের আদর্শের সঙ্গে পরিচিত হবে এবং চর্চা করবে বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়েও স্কুলগুলোতে কাব বা ব্লুবার্ড, স্কাউটিং বা গাইডিং, ব্রতচারী ইত্যাদি কার্যক্রমগুলো বেশ জোরেশোরে চলত এবং তাদের প্রভাব পড়ত শিশুকিশোরদের ওপর। বর্তমানে সেগুলো বা সে ধরণের অন্যান্য আন্দোলন তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। সমাজের উচিত বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিশুদের জন্য ঐ ধরণের কার্যক্রমের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
আরো একটি কথা। ভারতের প্রাচীন ঋষিরা বলেছেন, ‘আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও।’ হযরত মুহম্মদ(দ:) একটি ছোট ছেলেকে মিষ্টি খেতে নিষেধ করার আগে নিজে মিষ্টি খাওয়ার লোভ সম্বরণ করেছেন। সুতরাং আমরা যদি সত্যিই চাই শাশ্বত মূল্যবোধে উজ্জীবিত নতুন প্রজন্ম, তাহলে আমাদেরকে অর্থাৎ মা বাবাকে চর্চা করতে হবে শাশ্বত মূল্যবোধ, নির্বাসন দিলে চলবে না সুবচন, ঊর্দ্ধে উঠতে হবে লোভ লালসা, হিংসা, দ্বেষ, ক্রোধ, জিঘাংসার, সর্বোপরি মিথ্যাভাষণের। বেশী নয়, হযরত মুহম্মদ(দ:)কৃত তিনটি কর্ম যদি আমরা পালন করে চলতে পারি তাহলেই বোধহয় আমরা সমাজে শাশ্বত নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারব; কাজ তিনটি হল: এক, সত্যি কথা বলা, দুই, সবার সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলা, তিন, কারো অপকার না করে উপকার করার চেষ্টা করা। কারণ আমাদের আচরণ অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার আকারেই প্রভাবিত করে আমাদের সন্তানদেরকে। তাছাড়া আজকাল আমাদের দেশের অভিভাবকদের মানসিকতা সন্তান পালনের ক্ষেত্রে মনুষ্যত্বলাভ কেন্দ্রিক না থেকে হয়ে পড়েছে পরীক্ষায় বেশী নম্বর পাওয়া কেন্দ্রিক। এ অবস্থারও পরিবর্তন প্রয়োজন।
যাইহোক আমি বলতে চাই আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক উভয় ধরণের শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শাশ্বত নৈতিকতার আদর্শ সম্বন্ধে সছন্দ জ্ঞান দান করতে ও সেই অনুযায়ী আচরণে অভ্যস্ত করে তুলতে না পারলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জীবনধারাকে সত্যিকার মানবোচিত জীবনস্রোতে রূপায়িত করতে আমরা সম্পূর্ণ ভাবে ব্যর্থ হবো।

তথ্য নির্দেশঃ
১। ঐধৎৎু ঝ. ইৎড়ঁফু, ইঁরষফরহম অ ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ ঊহমষবড়িড়ফ ঈষরভভং, ঘ. ঔ., চৎবহঃরপব ঐধষষ, ওহপ. ১৯৫৯, ঢ় ৫-৬
২। ঞযব ঘবি ঊহপুপষড়ঢ়বধফরধ ইৎরঃধহহরপধ, াড়ষ, ১৮, ১৯৮৯, ঢ়১১
৩। ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঊহপুপষড়ঢ়ধষফরধ ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ, বফ. চধঁষ গড়হৎড়ব. ওহফরধ, ঈড়ংংসড় চঁনষরপধঃরড়হং, ১৯৯০ ঢ়. ৩৯৮.
৪।ঞ.চ. ঘঁহহ, ঊফঁপধঃরড়হ : ওঃং ফধঃধ ধহফ ঋরৎংঃ চৎরহপরঢ়ষবং. খড়হফড়হ, ঊফধিৎফ অৎহড়ষফ, ১৯৪৫
৫। দ্রষ্টব্যঃ অরুণ ঘোষ, শিক্ষা বিজ্ঞানের মূলতত্ত্ব, কলিকাতা, এডুকেশনাল এন্টারপ্রাইজ, ১৯৮৬, পৃঃ ৪-১০
৬। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘লক্ষ্য ও শিক্ষা’, শিক্ষা, কলিকাতা, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ. ১৩৯৭, পৃঃ ১৩০
৭। ঔধযহ ঝ. ইৎড়ঁনধপযবৎ, অ ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ঃযব চৎড়নষবসং ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ, ঘবি ণড়ৎশ, গপএৎধ-িঐরষষ নড়ড়শ পড়সঢ়ধহু, ওহপ. ১৯৪৭, ঢ়.৫
৮। ঐ পৃঃ ৭
৯। ড. ঐ. ডড়ড়ফধিৎফ, ঊৎধংসঁং: ঈড়হপবৎহরম ঊফঁপধঃরড়হ খড়হফড়হ, ঈধসনৎরফমব টহরাবৎংরঃু ঢ়ৎবংং, ১৯০৪, ঢ়. ৭৩
১০। উ. উবভড়ব, ঞযব ঈড়সঢ়ষবধহঃ ঊহমষরংয এবহঃষবসধহ, খড়হফড়হ, উ. ঘঁঃঃ. ১৮৯০. ঢ়.২০৩.
১১। ঊ. ঊনু, ঊধৎষু চৎড়ঃবংঃধহঃ ঊফঁপধঃরড়হং, ঘবি ণড়ৎশ, গপ এৎধি ওঃরষষ নড়ড়শ পড়সঢ়ধহু, ওহপ. ১৯৩১, ঢ়. ৬৮
১২। ঔড়যহ খড়পশ, ঈড়হফঁপঃ ড়ভ ঃযব ঐঁসধহ টহফবংঃধহফরহম ঙীভড়ৎফ, ঈষধৎবহফবড়স চৎবংং, ১৮৯০, ঢ়. ৩৫.
১৩। জ.খ. অৎপযবৎ, জড়ঁংংবধঁ ড়হ ঊফঁপধঃরড়হ, খড়হফড়হ, ঊফঁপধৎফ অৎহড়ষফ ্ পড়. ১৯১২, ঢ়১৭৬.
১৪। ঔড়যহ খড়পশ, ঝড়সব ঞযড়হমযঃং ঈড়হপবৎহরহম ঊফঁপধঃরড়হ, খড়হফড়হ, ঈধসনৎরফমব টহরাবৎংরঃু চৎবংং, ১৮৮৯, ঢ়.৫০.
১৫। ঔড়যহ খড়পশ, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২১
১৬। ঋ. খধভড়হঃধরহবৎরব, ঋৎবহপয খরনধৎধষরংস ধহফ ঊফঁপধঃরড়হ রহ ঃযব ঊরমযঃববহঃয ঈবহঃঁৎু, ঘবি ণধৎশ, গপএৎধ-িঐরষষ নড়ড়শ পড়সঢ়ধহু ওহপ. ১৯৩২, ঢ়ঢ়. ৩২৩-৩২৪.
১৭। খ. ঋ. অহফবৎংড়হ, চবংঃধষড়ুুর, ঘবি ণধৎশ, গপএৎধ-িঐরষষ ইড়ড়শ ঈড়সঢ়ধহু, ওহপ, ১৯৩১, চ. ১৬৬.
১৮। ঐ
১৯। ইৎঁনধপযবৎ, প্রাগুক্ত, পৃঃ১৭
২০। ঊ. খ. ঞযড়ৎহফরশব, ঊফঁপধঃরড়হ, ঘবি ণড়ৎশ, ঞযব গধপসরষষধহ পড়সঢ়ধহু, ১৯২৩,চ. ১১
২১।ঔড়যহ উববিু, উবসড়পৎধপু ধহফ ঊফঁপধঃরড়হ, ঘবি ণড়ৎশ, ঞযব গধপসরষষধহ ঈড়সঢ়ধহু, ১৯১৬, ঢ়. ৬০.
২২। ঐ পৃঃ ৫৯
২৩। ইৎঁনধপযবৎ, প্রাগুক্ত, ২১
২৪। গ. ঔ. অফষবৎ, চযরষংংড়ঢ়যরবং ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ ঘধঃরড়হধষ ঝড়পবরঃু ভড়ৎ ঞযব ঝঃঁফু ড়ভ বফঁপধঃরড়হ ভড়ৎঃু ঋরৎংঃ ণবধৎ ইড়ড়শ, ঢ়ধৎঃ ১, ইষড়ড়সরহমঃরড়হ, চঁনষরপ ঝপযড়ড়ষ ঢ়ঁনষরংযরহম ঈড়সঢ়ধহু, ১৯৪২, ঢ়. ২৩৮ ্ ঢ়.২২১.
২৫। জ.জ. জঁংয, উড়পঃৎরহং ড়ভ ঃযব এৎবধঃ ঊফঁপধঃড়ৎং, খড়হফড়হ, গধপসরষষধহ ঊফঁপধঃরড়হ খঃফ, ১৯৭৯, ঢ়. ২৩৩ (৫ঃয বফরঃরড়হ).
২৬। অ. ঘ. ডযরঃবযবধফ, ঞযব অরসং ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ, খড়হফড়হ, ঊৎহবৎঃ ইধহহ, ১৯৬২, ঢ়ঢ়. ১-২.
২৭। ই. জঁংংবষষ, ঙহ ঊফঁপধঃরড়হ, খড়হফড়হ, এবড়ৎমব অষষবহ ্ টহরিহ খঃফ. ১৯৪৮, ঢ় ৪৫-৪৬
২৮। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিক্ষা, কলিকাতা, বিশ্বভারতী গ্রন্থণাবিভাগ, ১৩৯৭. পৃঃ ৫১
২৯। ঐ পৃঃ ১২৯
৩০। ঐ পৃঃ ২২৬
৩১।ইৎঁনধপযবৎ, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩২০
৩২। ঐ
৩৩। ঐ পৃঃ ৩২৫-৩২৬
৩৪। ঐ পৃঃ ৩২৬
৩৫। ঔড়যহ খড়পশব, ঝড়সব ঞযড়ঁমযঃং ঈড়হপবৎহরহম ঊফঁপধঃরড়হ, খড়হফড়হ, ঈধসনৎরফমব টহরাবৎংরঃু চৎবংং, ১৮৮৯, ঢ়. ২১.
৩৬। জ. খ. অৎপযবৎ, জড়ঁংংবধঁ ড়হ ঊফঁপধঃরড়হ, খড়হফড়হ, ঊফধিৎফ অৎহড়ষফ ্ ঈড়. ১৯১২, ঢ়. ৫৫
৩৭। ঐ, পৃঃ ৯৭
৩৮। খধংি ড়ভ গধংংধপযঁংবঃঃং, গধৎপয ১০, ১৯২৭, ঈযধঢ়, ১৪৩, ংবব. ৭
৩৯। ঐধৎড়ষফ ঐ. ঞরঃঁং, খরারহম ওংংঁবং রহ চযরষড়ংড়ঢ়যু, ঘবি উবষযর, ঋড়ৎঃয ঊফরঃরড়হ, ঊঁৎধংরধ চঁনষরংযরহম ঐড়ঁংব (চ) খঃফ. ১৯৬৮. ঢ়. ৫১২.
৪০। অনঁষ ঐধংযরস, ঞযব ঈৎববফ ড়ভ ওংষধস উযধশধ ওংষধসরপ অপধফবসু, ১৯৭০, চ. ১৫
৪১। অৎরংঃড়ঃষব, ঘরপযড়সবপযবধস ঊঃযরবং, ইড়ড়শ, ১১ পয. ১, ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ ঃড় ধৎরংঃড়ঃষব, ঊফ জরপযধৎফ গপকবড়হ, ঘবি ণড়ৎশ, ঞযব গড়ফবৎহ খরঃবৎধৎু, ১৯৪৭ ঢ়ঢ় ৩৩১-৩৩২
৪২।ঔড়যধহ ঋৎরবফবৎরপয ঐবৎনধৎঃ, অ ই ঈ ড়ভ ঝবহংব চবৎপবঢ়ঃরড়হ ধহফ গরহড়ৎ চবফধমড়মরপধষ ডধৎশং, ঞৎধহংষধঃবফ নু ড. ঞ. ঊপশড়ভভ. ঢ়ঢ়. ৯২-১২০.
৪৩। দ্রষ্টব্য, বিভূরঞ্জন গুহ, শিক্ষায় পথিকৃৎ, কলিকাতা, ইন্ডিয়ান আ্যসোসিয়েটেড পাবলিশিং কোং, ১৩৬৩, পৃঃ ৬৪।
৪৪।ইবৎঃৎধহফ জঁংংবষষ, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৭১
৪৫। ঔধসং এৎরননষব, ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ ঃড় চযষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ, ইড়ংঃড়হ, অষষুহ ধহফ ইধপড়হ, ওহপ ১৯৭০, ঢ়. ১৩৩
৪৬। ঐ পৃঃ ১৩৩
৪৭। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রাগুক্ত, পৃঃ৪৩
৪৮।অৎরংঃড়ঃষব, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৩২

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৫১ বার

Share Button

Calendar

November 2019
S M T W T F S
« Oct    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930