» শিক্ষাদর্শন ও বাঙ্গালী মানসের কিছু পরিচয়

প্রকাশিত: ১২. সেপ্টেম্বর. ২০১৯ | বৃহস্পতিবার


নুসরাত সুলতানা

প্লেটো বলেছেন, ভাল রাষ্ট্র গড়তে হলে ভাল নাগরিক চাই। ভাল নাগরিক পাওয়ার ব্যাপারটা ভবিতব্যের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। ভাল শিক্ষা দিয়ে ভাল নাগরিক তৈরি করতে হবে এবং সে দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে জন্যই তিনি তাঁর রাষ্ট্র বিষয়ক গ্রন্থ ‘রিপাবলিক’-এর একটা বড়সড় অংশ নিয়োজিত করেছেন শিক্ষা বিষয়ক আলোচনায়, যেখানে তিনি সুশিক্ষিত নাগরিক তৈরীর এক অনুপম পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন। প্রায় আড়াই হাজার বছরের বেশী আগে প্লেটো যেসব বিষয় এবং যেভাবে উপস্থাপন আবশ্যক বলে বিবেচনা করেছেন তার সবকিছুই যে আজও এবং সবাই, সমান গুরুত্বের সঙ্গে মেনে নেবেন এমন আশা করা হয়ত যাবে না। কিন্তু পরবর্তীকালের শিক্ষা দার্শনিকদের মতামত গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে প্লেটোর বক্তব্যের সঙ্গে তাঁদের বক্তব্যে মোটাদাগের অমিলের চাইতে মিলই বেশী। প্লেটো ভাববাদী দার্শনিক এবং এরিস্টটল বাস্তববাদী। কিন্তু শিক্ষা দর্শনের ক্ষেত্রে উভয়েই যুক্তিবাদী এবং বলা যায়, এরিস্টটলের শিক্ষাদর্শন প্লেটোর শিক্ষাদর্শনেরই একটি উন্নত সংস্করণ। ফলে পরবর্তীকালের ভাববাদী ও বাস্তববাদী শিক্ষাদর্শনের বক্তব্যে প্রচুর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে শিক্ষার মূল লক্ষ্য নির্ধারণে। শিক্ষাদর্শনের ক্ষেত্রে প্লেটোর অবদান সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আঠারো শতকের দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাকস রুশো যা বলেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলছেন, ‘তুমি যদি জানতে চাও নাগরিক শিক্ষা কাকে বলে তাহলে প্লেটোর রিপাবলিক পড়’। সুতরাং দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাদার্শনিক মতবাদগুলো প্লেটোর দর্শনদ্বারা বহুলাংশে প্রভাবিত। প্রয়োগবাদী দর্শনের নবরূপায়ণ, প্রয়োগ ও প্রসার বিংশ শতাব্দীর ঘটনা। ঐ ধারার দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা জন ডিউই-এর কাজের উল্লেখযোগ্য অংশই শিক্ষা নিয়ে। ভাববাদের সঙ্গে প্রয়োগবাদের পার্থক্য সহজেই দৃশ্যমান। তবু শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয়ে প্লেটো এবং ডিউইর মতামতের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।

এসব বিষয় বিচার করে আমরা বোধ হয় একথা বলতে পারি, শিক্ষাদর্শনের ক্ষেত্রে প্লেটোর কালের অবস্থান থেকে আমরা খুব একটা অন্য রকম কোন অবস্থানে এসে পৌঁছুইনি। এবারে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে গত আড়াই হাজার বছর ধরে এত দার্শনিকের শিক্ষা নিয়ে এত কথা বলার কি দরকার ছিল?
মানুষ হিসাবে কতকগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্যের জন্য এক মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের মিল আছে। ঐসব বৈশিষ্ট্যের জন্যই সে প্রাণীজগতের অন্যান্য সদস্যের থেকে ভিন্নতর। কিন্তু আবার প্রত্যেকটি মানুষই অন্য আরেকজন মানুষ থেকে আলাদা। আপন ভাই বোনের মধ্যেও চরিত্রগত ও আকারগত প্রচুর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের জন্যই জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে বিভিন্নতা দেখা যায়। জীবনের লক্ষ্যের সঙ্গে শিক্ষার লক্ষ্য অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সেই জন্যই স্থান-কাল-পাত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় শিক্ষার দর্শন, সেই জন্যই আড়াই হাজার বছর আগে বিনির্মিত প্লেটোর শিক্ষাদর্শন অনুপম হলেও পরবর্তী কোন কালেই তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন স্থানের মনীষীরা তাঁদের নিজেদের পরিমন্ডলের প্রয়োজন অনুযায়ী, নিজেদের মন-মানসের সংগঠন অনুযায়ী শিক্ষাদর্শন বিনির্মাণে সচেষ্ট থেকেছেন। এ প্রচেষ্টায় তাঁরা অবশ্যই পূর্বসূরীদের চিন্তাচেতনার সাহায্য গ্রহণ করেছেন। প্লেটোও তা করেছিলেন।
আমাদের দেশে আমরা সাধারণত: যে সব মতবাদ নিয়ে আলোচনা করি এবং যেসব মতবাদ দ্বারা অনুপ্রাণিত হই তার প্রায় সবই পাশ্চাত্যের দর্শন। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে জীবনযাত্রার প্রণালী ও আদর্শের দিক দিয়ে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মাঝে বেশ কিছু অমিল রয়েছে। তাই প্রাচ্যের একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রতীচ্যের শিক্ষাদর্শনকে পুরোপুরি খাপ খাওয়ানো সম্ভব নয়, সমীচীনও নয়। এ কথা আমাদের পূর্বসূরী চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ ভালই বুঝেছিলেন। তাঁরা তাঁদের চিন্তার স্বাক্ষরও রেখেছেন নানান কর্মে, নানা বক্তব্যে। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের চলাকে স্বচ্ছন্দ করতে প্রাচ্যের সেই সব মননের স্বরূপ উদঘাটন করা একান্ত প্রয়োজন। বর্তমান গ্রন্থে ঐ রকম কয়েকজন ব্যক্তিত্বের শিক্ষাদর্শন আলোচনা করার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য সাধারণ, এঁরা সবাই সাহিত্যিক এবং এঁরা সবাই শিক্ষকতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে তঁাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। এই গ্রন্থে শিক্ষার স্বরূপ ও লক্ষ্য সম্বন্ধেও একটি আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো ইতোপূর্বে বাংলা একাডেমীর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। রবীন্দ্র শিক্ষাদর্শনের উপর লেখা প্রবন্ধটি শরীফ হারুন সম্পাদিত এবং বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থ বাংলাদেশে দর্শন, ঐতিহ্য ও প্রকৃতি অনুসন্ধান (তৃতীয় খন্ড)-এ পুনঃমুদ্রিত হয়েছে। এটি আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এড কোর্সের গবেষণা বিষয়ের জন্য রচিত গবেষণাপত্রের প্রবন্ধরূপ।
প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘শিক্ষা নৈতিকতা ও মানবজীবন’। এই অধ্যায়ে শিক্ষার লক্ষ্য, শিক্ষার স্বরূপ, নৈতিকতার স্বরূপ এবং শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবজীবনের সম্পর্ক বিষয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা দর্শন নিয়ে আলোচনা। রবীন্দ্রনাথকে বলা হয় ভাববাদী দার্শনিক। কিন্তু শিক্ষাদর্শনের ক্ষেত্রে তাঁকে যে কেবল আকাশচারী ভাবালুতার উপস্থাপক বলা যায় না বরং বলা যায় আধুনিক সমন্বয়বাদের পৃষ্ঠপোষক তা সাধ্যমত জোরালোভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে ‘রবীন্দ্রশিক্ষাদর্শন: একটি ত্রিমাত্রিক সমীক্ষা’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধ্যায়ের এই প্রবন্ধে।
তৃতীয় অধ্যায়ে যাঁর শিক্ষাদর্শনের প্রকৃতি উদঘাটন করার চেষ্টা করা হয়েছে তাঁর নাম কাজী ইমদাদুল হক। বিশ শতকের গোড়ার দিকের বাংলা সাহিত্য-অঙ্গনে কাজী ইমদাদুল হক ছিল একটি পরিচিত নাম। তাঁর রচিত আবদুল্লাহ উপন্যাসটি তৎকালীন মুসলমান সমাজের একটি অনন্য চালচিত্র বলেই বিবেচিত হয়ে আসছে আজ পর্যন্ত। বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে শিক্ষা সম্বন্ধে তাঁর যে মতামত প্রকাশ পেয়েছে তারই পর্যালোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে এই অধ্যায়ে।
চতুর্থ অধ্যায়ের বিষয়বস্তু বেগম রোকেয়ার শিক্ষাদর্শন। বেগম রোকেয়ার কর্মকাণ্ডের মূল ক্ষেত্র ছিল নারীর উন্নয়ন এবং তার মাধ্যমে সমাজের সংস্কার। সে জন্য যে সুশিক্ষার প্রয়োজন তার সম্যক উপলব্ধি তাঁর ছিল। এ উপলব্ধির লিখিত প্রকাশ রয়েছে তাঁর নানান রচনায়। সেগুলো পর্যালোচনা করে তার সাথে বিভিন্ন পাশ্চাত্য শিক্ষা দার্শনিকের মতামতের তুলনা করে রোকেয়ার শিক্ষাদর্শনের গুরুত্ব নিরূপণ করার প্রচেষ্টাই চতুর্থ অধ্যায়ের উপজীব্য।

এ গ্রন্থে আলোচিত বিষয়গুলো যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণরত বি.এড ও এম.এড প্রশিক্ষণার্থীদের ও শিক্ষকদের কাজে লাগবে। তাছাড়াও, যিনিই শিক্ষা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন, আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার বা করার আকাক্সক্ষা পোষণ করেন, নিজ দেশীয় ঐতিহ্য ও মনীষা সম্পর্কে আগ্রহবোধ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, সেসব ঐতিহ্য ও মণীষাপ্রসূত জ্ঞানসম্পদ কাজে লাগানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে চান, তাঁরও উপকারে আসবে বলে আশা করি।

প্রবন্ধগুলো রচনায় ও গ্রন্থাকারে প্রকাশের প্রচেষ্টায় সবিশেষ উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রদান করেছেন আমার সতীর্থ অধ্যাপক ড. কাজী নূরুল ইসলাম। তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

কৃতি প্রকাশনা সংস্থা ‘নান্দনিক’-এর কর্তৃপক্ষকেও কৃতজ্ঞতা জানাই প্রবন্ধগুলোকে গ্রন্থাকারে প্রকাশের যোগ্য বলে বিবেচনা করার জন্য।

ধন্যবাদ জানাই আমার দুই ছেলে, শামস ও সা’দকে, যারা কেবলই চাপ দিয়ে আসছিল সরকারি কলেজের শিক্ষকতার চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর অন্য কাজ না করে লেখালেখি এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবন্ধগুলো বই আকারে প্রকাশের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হতে। ধন্যবাদ আমার মাকে, যিনি আজও আমার সংসারের হাল ধরে রেখে আমাকে লেখাপড়া করার সুযোগ দিয়ে চলেছেন। সর্বোপরি কৃতজ্ঞতা জানাই মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি যিনি আমাকে কিছুটা চিন্তা করার ও তা লিখিত ভাষায় প্রকাশ করার যোগ্যতা দান করেছেন।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫৬ বার

Share Button

Calendar

September 2019
S M T W T F S
« Aug    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930