» শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে ‘নীতিগতভাবে’ একমত প্রকাশ করেছেন বুয়েটের উপাচার্য

প্রকাশিত: ০৮. অক্টোবর. ২০১৯ | মঙ্গলবার

শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে ‘নীতিগতভাবে’ একমত প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম।
আবরার ফাহাদ হত্যার দুদিন পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে এসে এ কথা জানান তিনি ।

কিন্তু ৭ দফা দাবি সুনির্দিষ্টভাবে মেনে না নেয়ায় উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

দাবি পূরণ করা না হলে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষাসহ সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়াও ঘোষণা রয়েছে তাদের।

রোববার গভীর রাতে শেরে বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধারের পর সোমবার সারাদিন সিসিটিভি ফুটেজের দাবিতে আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা।

আর মঙ্গলবার সকাল থেকে বুয়েট শহীদ মিনার এলাকায় সাত দফা দাবিতে তাদের আন্দোলন শুরু হয়, যার একটি হল- উপাচার্য কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি, তা তাকে ক্যাম্পাসে এসে মঙ্গলবার বিকাল ৫টার মধ্যে ব্যাখ্যা করতে হবে।

উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বিকাল সোয়া ৪টার পর ক্যাম্পাসে এলেও শহীদ মিনারে বিক্ষোভস্থলে না গিয়ে নিজের কার্যালয়ে চলে যান। দিনভর শহীদ মিনার চত্বরে বিক্ষোভের পর শিক্ষার্থীরা বিকাল ৫টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা দিয়ে ভিসির অফিসের নিচে অবস্থান নেন।

শ তিনেক শিক্ষার্থীর ওই অবস্থান থেকে স্লোগান ওঠে- ‘ভিসি স্যর নীরব কেন, জবাব চাই দিতে হবে’, ‘আমার ভাই কবরে, ভিসি কেন ভেতরে’, ‘প্রশাসন নীরব কেন, জবাব চাই দিতে হবে’।

সন্ধ্যা সোয়া ৬টার পর উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম দোতলা থেকে নেমে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সামনে এলে শুরু হয় হট্টগোল।

এ সময় উপাচার্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা যা দাবি দিয়েছ আমরা নীতিগতভাবে সব দাবি মেনে নিচ্ছি।

আন্দোলনকারীরা এসময় উপার্চকে দাবিগুলো পড়ে শুনিয়ে ঠিক কোন দাবিগুলো মানা হল- তা জানতে চান। কিন্তু উপাচার্য তা না বলে ‘মডালিটি’ ঠিক করার জন্য আলোচনার কথা বলেন।

হট্টগোলের মধ্যে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করেন, এই দীর্ঘ সময় উপাচার্য কোথায় ছিলেন, তিনি কেন আবরার হত্যার খবর শুনে ঘটনাস্থলে যাননি।

হাজারো প্রশ্নবাণের মধ্যে অধ্যাপক সাইফুল মাইকে কথা বলতে চান। কিন্তু শুরুতেই তিনি আবরারের ‘মৃত্যু হয়েছে’ বললে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। তারা চিৎকার করে বলতে থাকেন- মৃত্যু নয়, খুন হয়েছে।

পরে উপাচার্য বলেন, তিনি শেরেবাংলা হলে ঘটনাস্থলে যাননি ঠিক, কিন্তু নিজের কার্যালয়ে থেকেই ‘অক্লান্ত পরিশ্রম’ করে যাচ্ছেন। বৈঠক করেছেন, ব্যবস্থা নিয়েছেন। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সেসব আছে।

“সব তো আমার হাতে নেই, যেগুলো আমার হাতে আছে সেগুলো আমি করছি। নীতিগতভাবে তোমাদের পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছি। মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তোমরা অধৈর্য হয়ো না।”

কিন্তু তার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে শিক্ষার্থীরা দাবি তোলেন, ৭ দফার বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা না দিয়ে উপাচার্য যেন ক্যাম্পাস ছেড়ে না যান।

তিনি শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে বসার প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকে আন্দোলনকারীরা।

আধা ঘণ্টার বেশি সময় এ অবস্থা চলার পর আলোচনা অমীমাংসিত রেখেই উপাচার্য উপরে তার কার্যালয়ে চলে যান। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নিচে হাতে তালি আর স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে থাকেন।

শিক্ষার্থীদের ৭ দফা

১,খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

২, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের শনাক্ত করে তাদের আজীবন বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

৩, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্বল্পতম সময়ে আবরার হত্যা মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে

৪, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি, তা তাকে ক্যাম্পাসে এসে মঙ্গলবার বিকাল ৫টার মধ্যে ব্যাখ্যা করতে হবে। ছাত্রকল্যাণ শিক্ষককেও (ডিএসডব্লিউ) বিকাল ৫ টার মধ্যে সবার সামনে জবাবদিহি করতে হবে।

৬, আবাসিক হলগুলোতে র্যাগের নামে ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। আহসানউল্লা হল ও সোহরাওয়ার্দী হলে ঘটা আগের ঘটনাগুলোতে জড়িত সবার ছাত্রত্ব ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে বাতিল করতে হবে।
রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হওয়ায় শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে।

৭। মামলার খরচ এবং আবরারের পরিবারের ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে।

এছাড়া আন্দোলনকারীদের একজন প্রতিনিধি ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান, যদিও তা লিখিত দাবির মধ্যে ছিল না।

বেলা সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা বুয়েট শহীদ মিনার এলাকায় সমবেত হন। একদল সাবেক শিক্ষার্থীও তাদের সঙ্গে যোগ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি দল মিছিল করে এসে বেলা পৌনে ১২টার দিকে বুয়েট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয়।

পরে বুয়েট শিক্ষক সমিতির প্রতিনিধিরা সমাবেশস্থলে এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। আবরার ফাহাদের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ।

তিনি বলেন, “আমরা অভিভাবক হিসেবে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা- শিক্ষকরা বলি, প্রশাসন বলি, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি।”

বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বুয়েট শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনার থেকে পলাশী হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যায়। সেখান থেকে বুয়েটের পূর্ব প্রান্তে খেলার মাঠ হয়ে তারা আবার বুয়েট শহীদ মিনারে ফিরে আসে।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবরারের জন্য গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল হয়।

গায়েবানা জানাজার পর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, “ভারতের সঙ্গে দেশবিরোধী চুক্তির বিরোধিতা করায় আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। আবরারের রক্তস্নাত দেশবিরোধী চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।”

ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক কয়েকটি চুক্তি নিয়ে ফেইসবুকে মন্তব্যের সূত্র ধরে শিবির সন্দেহে আবরারকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে বলে হলের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।

ওই ঘটনায় বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ গ্রেপ্তার দশজনকে মঙ্গলবার পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। আর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সাংগঠনিক তদন্তের ভিত্তিতে আগের রাতেই বুয়েট ছাত্রলীগের ১১ জনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার কথা জানিয়েছে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৮০ বার

Share Button

Calendar

June 2020
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930