শিরোনামঃ-


» শিশুর জীবন হোক স্বপ্নময়, আর নয় শিশুশ্রম

প্রকাশিত: ১৪. জুন. ২০২০ | রবিবার


উম্মে ফারুয়া
শিশুশ্রম দেশব্যাপী একটা বড়ো সমস্যা। শিশুরা শ্রমের হাতিয়ার নয়, জাতির ভবিষ্যৎ; শিশুদের হাতে ভিক্ষার থলে নয়, চাই বই ও কলম। তারা বিভিন্ন কাজে শ্রম বিক্রি করেও প্রকৃত মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুদের কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে আসছে। শিশু শুধু মাতা-পিতা নয় জাতির আশা, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের অপর নাম। সাধারণভাবে জন্ম থেকে আঠারো বছরের কম বয়সি মানুষের পরিচয় হলো শিশু। সে আগামী দিনের একজন প্রত্যাশিত কর্মক্ষম মানবসম্পদ। সঠিক পরিচর্যায় প্রাপ্য সকল মৌলিক অধিকার আর মর্যাদা নিয়ে তার বেড়ে ওঠার কথা। কিন্ত আর্থসামাজিক টানাপোড়েন আর জীবনের বাস্তবতায় কোনো কোনো শিশুকে শৈশব আর কৈশোরের সব চাওয়া-পাওয়া, আনন্দকে বিসর্জন দিতে হয়। পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হতে হয় অনেক সময়।

শিশুশ্রম শিশুর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে, শিশুর শৈশব কেড়ে নেয় এবং শিশুকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও শিশুশ্রম বলতে বুঝিয়েছে এমন শ্রম যা শিশুকে শৈশব থেকে বঞ্চিত করে তাদের সকল সম্ভাবনা ও মর্যাদা নষ্ট করে। তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

যে বয়সে একজন শিশুর বই, খাতা, পেন্সিল নিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া এবং আনন্দিত চিত্তে সহপাঠীদের সাথে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই শিশুকে নেমে পড়তে হয় জীবিকার সন্ধানে। অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে অনেক মাতাপিতা ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেন না। স্বল্পশিক্ষিত মাতাপিতা দারিদ্র্যের কষাঘাতে যখন পরিবারের ভরণপোষণে ব্যর্থ হন তখন তারা সন্তানকে স্কুলে পাঠানো এবং লেখাপড়ার খরচ জোগাতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তারা মনে করেন, সে যদি কাজে নিয়োজিত থাকে তাহলে সংসারের আয় সংকুলানে সহায়ক হয়।

১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। শিশু অধিকার সুরক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম প্রতিরোধের লক্ষ্যে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন ২০০২ সালে বিশ্ব জুড়ে শিশুদের জন্য এই দিবসটি ঘোষণা করেছিল- আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম বিরোধী দিবস হিসেবে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে লাখ লাখ শিশু কল-কারখানা, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ঘর-বাড়িতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। শৈশবের আনন্দ, মাতা-পিতা, পরিবার পরিজন থেকে স্নেহবঞ্চিত শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণ করার ঘটনা ঘটছে অহরহ। আন্তর্জাতিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দেশে দেশে শিশুশ্রম বন্ধ করার আইনের ফাঁক দিয়ে এক শ্রেণির মানুষ অবাধে শিশুদের দিয়ে কম মজুরিতে কাজ হাসিল করছে।

শিশু শ্রমিকেরা দিন শেষে ১৫ থেকে ৫০/৬০ টাকা কিংবা মাস শেষে ৫০০/৬০০ টাকা পেয়ে থাকে। যা তাদের শ্রম এবং প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য।

সোহেলের বয়স বারো। আট বছর বয়স থেকেই কাজ করছে চিমনি কারখানায়। ভোর থেকে আগুনের কুণ্ডলীতে কাজ শুরু হয়, সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। বিনিময়ে মাসে মাত্র ৬০০ টাকা পায়। এক সময় সোহেল স্কুলে যেতো কিন্তু পেটের দায়ে কাজ নেয়। অমানুষিক পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠে, সপ্তাহে কোনো ছুটিও নেই।

আমেনার বয়স তেরো হবে। থাকে বস্তিতে, পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আমেনা দ্বিতীয়। ভোর না হতেই ছুটে যায় মানুষের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করতে। কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা, থালা-বাসন মাজা, গৃহস্থালী অন্য কাজসহ খাটে নানা ফুট-ফরমাশ। সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হয় আমেনাকে। এর মধ্যে বকাঝকাতো রয়েছেই। ভুল করলেই মারধর। অথচ কথা ছিল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করানো হবে। বেতন ধরা হলো দেড় হাজার টাকা। কিন্তু এতো কাজ করার পর বেতন বাড়ানোর কথা থাকলেও তিন বছরেও তা হয়নি।

শুধু আমেনা কিংবা সোহেলের গল্প নয়। ওদের মতো বহু শিশুশ্রমিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে রাজধানীসহ সারাদেশে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত শিশু শ্রমিকরা। কেউবা অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। দেশে এ বিষয়ে কঠোর আইন আছে তবে অশিক্ষা তথা পরিবারের অসচেতনতা এবং ঘটনা গোপন থাকায় অনেক সময়ই বিচারে বিঘ্ন ঘটেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা আইএলও’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এদের মধ্যে প্রায় সাড়ে আট কোটি শিশু নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। 

শিশুশ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম বন্ধের অঙ্গিকার করেছে। বাংলাদেশে শিশুশ্রমের প্রথম ও প্রধান কারণ হচ্ছে অর্থনীতি। তাছাড়া নদীভাঙন, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস- এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক শিশু মাতাপিতার সাথে ছিন্নমূল মানুষ হিসেবে শহরে আসে কাজের সন্ধানে। এমন বাস্তবতায় কিছু মুনাফালোভী লোক স্বল্প মজুরির বিনিময়ে শিশুদের কাজে লাগায়। আবার সুযোগ পেয়ে অধিক সময় কাজে নিয়োজিত রাখে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৮১ বার

Share Button