শিরোনামঃ-


» শীত নামার আগেই জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি জনমুখী করুন

প্রকাশিত: ৩১. আগস্ট. ২০২০ | সোমবার


খছরু চৌধুরী

২০২০ সালটা বাংলাদেশী জাতীয় জীবনে মুজিববর্ষ হিসেবে পালিত হচ্ছে (১৭ মার্চ ২০ – ১৭ মার্চ ২১)। জাতির জনকের জন্ম শতবর্ষ এই মুজিববর্ষ ঘিরে সত্যিকার অর্থে মুজিবপ্রেম, দেশপ্রেম, মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নবজাগরণ সৃষ্টির একটা প্রয়াস ছিল ছোট-বড় পেশাজীবি সংগঠনের পরিকল্পনায়। দেশকে মুক্তিযুদ্ধের মূলধারায় এগিয়ে নিতে সকল নাগরিকবৃন্দের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনাদর্শ, দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত জাতির সামনে তুলে ধরে জাতিকে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত করার সুযোগ এসেছিল। এই চিন্তার কার্যক্রমে হঠাৎ ছেদ ঘটায় বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস। ভাইরাস সংক্রমণের বহুল বিস্তার রোধ করতে মুজিববর্ষে গৃহিত সরকারী ও বেসরকারি অনেক কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। এই দুর্যোগ কবে যে থেমে যাবে তারও কোন নির্দিষ্ট সময় বলা যাচ্ছে না। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ মোকাবেলা করার কৌশল নিয়েই যে পথ চলতে হবে – এটাই সত্য।

উপনিবেশের সৃষ্ট আমলাতন্ত্রের আইন-বিধির ফাঁকফোকর মাড়িয়ে স্বাধীন দেশে শিক্ষিত-উচ্চ শিক্ষিত শ্রেণির লোকেরাই যে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন ইহা বঙ্গবন্ধুর জবানীতে উঠে এসেছিল। এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার লাগাম টেনে ধরার দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে গোঠা রাস্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তনের সদিচ্ছা থেকেই যে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করেছিলেন – এটা আজ আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। ভিন্ন পথপদ্ধতি ও কৌশলে ২০২০ সালে এসে তাঁরই সুযোগ্য তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকেও এই দুর্নীতি বিরোধী সংগ্রামটা করতে হচ্ছে। এদেশে এখন রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে বালিশ, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের পর্দাক্রয়, জুয়ার আসর ও চাঁদাবাজির মতো দুর্বোধ্য দুর্নীতির দুর্বৃত্তদের থামানোর জন্য জিরোটলারেন্স নীতি ঘোষনা করেও সরকার স্বাস্থ্যবিভাগ ও রাস্ট্রের অন্যান্য দপ্তরের দুর্নীতি থামাতে পারছেন না। দুর্নীতির লাগামহীন অমানবিক চিত্রগুলো জনসমক্ষে একের পর এক প্রকাশিত হচ্ছে এবং এর একটি হলো প্রাণী সম্পদের ৬০ টাকা থেকে ৮ হাজার টাকার ল্যক্টোমিটার যন্ত্র ক্রয়ে ৩৬২ হাজার টাকার ক্রয় প্রস্তাব। যা দেখে মানুষ এখন হতাশ! রাষ্ট্র যন্ত্রের ভেতরে-বাইরে থাকা এসব দুর্বৃত্তরা যে বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারেকাছেও নেই তা’আজ দিবালোকের আলোয় স্পষ্ট। কোথায় হারিয়ে গেছে বিবেকবোধ ও দেশ প্রেম – এই প্রশ্নটাই এখন মূখ্য। এই অসম্ভব ধরণের দুর্নীতির দুর্বৃত্তরা কি আদৌ শাস্তির আওতাধীন হবে? যদি না হয় তাহলে এই রাষ্ট্র যে ব্যর্থ রাস্ট্রে পরণিত হতে যাচ্ছে – তা একটি শিশু অথবা পাগলও নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারে।

এসব দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের যে বা যারা ধরা পড়ছে, তাদেরকে আমরা দেখছি এবং কে কেমন দুর্নীতি করলো এই হিসেবটা টাকার অংকে মিলিয়ে নিয়ে যে যার মতে হা-হুতাশ অথবা ছিঃ ছিঃ করছি। সরকার জনগণের সেন্টিমেন্ট প্রশমিত করতে একে সরিয়ে ওকে বসানোর নীতি গ্রহণ করছেন। এতে জনসেন্টিমেন্ট থামানো গেলেও বিদ্যমান পরিস্থিতির কোন উন্নতি আশা করা যায় না। জনগণের প্রত্যাশা পুরণ করতে হলে প্রয়োজনে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সংস্কার এবং পদ্ধতিটাকে ব্যক্তি ও স্বার্থপরগোষ্ঠীর ইচ্ছায় পরিচালনা না-করে আইন-বিধির আলোকে পরিচালিত করা গেলে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ দুর্নীতি অমনিতেই বন্ধ করা সম্ভব। এর জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

রাস্ট্রের সব সেক্টরের কথা না বলে প্রায়োরিটি ও উদাহরণ হিসেবে স্বাস্থ্য সেক্টরের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে কিছু আলোচনা করি। এখানে দেশের জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিমিত্তে জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি-২০১১ ও ৬৫ টি টির অধিক আইন-বিধি রয়েছে মূল ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিকে পরিচালনা করার জন্য। দেশে ইতিমধ্যে গড়ে ওঠেছে ১৫ হাজারের বেশী বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান। সংখ্যার দিক দিয়ে জাতিসংঘের সদস্য দেশ গুলোর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন। এর একটিও জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির নির্ধারিত ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করে পরিচালিত হয় না। মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে এগুলোকে যথানিয়মে তদারকি করবে – এই সদিচ্ছা ও সক্ষমতা কোনটাই নেই। যে কারণে আমরা যেগুলোকে সাধারণভাবে উন্নত ও আধুনিক মনে করি সেই এভেরকেয়ার, ইউনাইটেড ও স্কয়ার হাসপাতালেও ত্রুটি-বিচ্যুতির উর্ধ্বে নয়। এগুলোর অনেক প্রতিষ্ঠানই চিকিৎসার চেয়ে অপচিকিৎসার দিকে নজর দিয়ে টাকা কামানোর নীতি গ্রহণ করেছে। এখন শুধু সিটি বা মেগাসিটিতেই নয় গ্রামের হাট-বাজারেও দু’চারটে ডায়াগনস্টিক সেন্টার দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে বিভাগ তাঁর নিজস্ব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই প্রয়োজনের নিরিখে দেখভাল করার সক্ষমতা রাখে না, তাঁরা এতগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দিয়েছেন কোন যুক্তিতে? জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি লঙ্ঘন করে ভারসাম্যহীন স্বাস্থ্য জনবল নিয়ে সরকারি স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম পরিচালনাতেও আমরা পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন দেশের তালিকায় রয়েছি। কোভিড-১৯ এসে এত বড় ধাক্কা দেবার পরও ব্যবস্থাপক ও নীতি নির্ধারকদের সম্বিত ফিরছে বলে মনে হয় না। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির ১ঃ৩ঃ৫ অনুপাতের স্বাস্থ্য-জনবল অর্থাৎ ১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স ও রোগপ্রতিরোধ কর্মের স্যানিটারী ইন্সপেক্টর-সহ অন্যান্য ধরণের ৫ জন মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নিয়োগ দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্য-জনবলের ভিত্তিতে সরকারি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর করার কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। মন্ত্রণালয়ের যেখানে উচিত ছিল জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য-পেশাজীবি ছোট-বড় সকল সংগঠনের মতামত গ্রহণ করে স্বাস্থ্য সেবার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শতভাগ সচল করার উদ্যোগ গ্রহণ করা, কার্যক্রমে জনগণের অংশ গ্রহণ ও আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা এবং ভুলগুলো চিহ্নিত করে সংশোধন করা। এর কোনটাই হচ্ছে না। উপরন্তু মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের চারপাশে এখনো সাহেদ-মার্কা বেসরকারি চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যের সুবিধাভোগীদের ভীড় প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। তাদের প্রতিপত্তি ও সরকারের সাথে পরামর্শের ঘনিষ্টতা বহাল তবিয়ত রেখে স্বাস্থ্যের সচিব, ডিজি আর কয়েকজন কর্মকর্তার চেয়ার বদল করে ব্যবস্থাপনা-পরিকল্পনা ও পদ্ধতিকে জনমুখী করা কিভাবে সম্ভব? স্ববিরোধের সূত্রটা অনেকটা এরকম। অর্থাৎ সরকার চাইবে জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির আলোকে রোগপ্রতিরোধের জনবল বাড়াতে এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিয়ে সরকারি সেবাপ্রতিষ্ঠানে অকেজো পড়ে থাকা দামী-দামী যন্ত্রপাতি সচল করে জনগণের সেবাপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে। আর বেসরকারিরা তাদের চিকিৎসা বাণিজ্যের দোকানগুলো চাঙ্গা রাখার স্বার্থে (অপ)কৌশলে এগুলো বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি করবে। কার্যকর ব্যবস্থাপনার বিপরীতে অব্যবস্থাপনার বুদ্ধি-পরামর্শ সরকারকে দিবে। অব্যবস্থাপনার হাজারো অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগটা হলো, সরকারের টাকায় জনগণের ক্ষতি করে রোগপ্রতিরোধের ২২’শ দক্ষ-জনবল তৈরি করে এই কোভিড-১৯ এর সময়েও এদেরকে রোগপ্রতিরোধের কাজে না-লাগানো। জনমনের বদ্ধমূল ধারণা হলো, এর পেছনেও চিকিৎসা বাণিজ্যের বাজার চাঙ্গা রাখার হীন-স্বার্থ কাজ করছে।

মূল প্রশ্নটা কিন্তু জাতির জনকের জীবনাদর্শের ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। স্বাধীনতার চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের সাথে চিকিৎসা বাণিজ্য যায় না – এই বোধটুকু নীতি নির্ধারকরা যত আগে বুঝবেন তত আগেই এ-জাতির মঙ্গল। গ্রামের বাড়ি-বাড়িতে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবার বিতরণকারী সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের সফলতায় এমডিজি গোল অর্জনে বাংলাদেশ সফল হয়েছিল, মা ও শিশু মৃত্যুর হার কাংখিত মাত্রায় হ্রাস পেয়েছিল এবং ল্যানসেট এর মতো বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞান সাময়িকী বাংলাদেশের প্রশংসা করেছিল – সেই ল্যানসেট সাময়িকীতেই এখন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সমালোচনা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন শীতে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে। সুতরাং শীত নামার আগেই রোগপ্রতিরোধের ২২’শ জনবল মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করুন। অন্যুন ৩০ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নিয়োগ দিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে অকেজো পড়ে থাকা চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সচল করুন এবং সরকারী সেবাদানে স্বাস্থ্যজনবলের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিটাকে জনমুখী করুন।

লেখকঃ স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫৯২ বার

Share Button