» শেখ হাসিনা কি বদলে গেছেন?

প্রকাশিত: ২১. নভেম্বর. ২০২০ | শনিবার

-লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা গণভবনের লেক থেকে আজ শনিবার একটি বড় আকারের তেলাপিয়া মাছ ধরেছেন। মাছ ধরা পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষের একটি প্রথম সারির শখ। আর রাষ্ট্রনায়করা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই জাতীয় শখ পূরন করে থাকেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এর জন্য বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে অবকাশ যাপনের রীতিনীতি অনেক পূরোনো। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই নয়, উন্নত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রেই রাষ্ট্র প্রধানরা অবকাশ যাপনের জন্য পৃথিবীর বিখ্যাত স্হানগুলোতে ভ্রমনে যান। বাংলাদেশেও মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ এই সুযোগটি পেয়ে থাকেন। কিন্ত আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে এই সুযোগটি নেই। বিষয়টি কখনোই এদেশে বিগত ৫০ বছরে কেউ ভাবেননি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে অবকাশ যাপনের সুযোগ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা যেতো। এখনো যায়। সেটা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত মানবিক একটি প্রস্তাবনা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই একজন মানুষ।
আজকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাছ ধরা নিয়ে মূল প্রসঙ্গে প্রবেশ করতে চাই এখন। কয়েক মাস পূর্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেছিলেন তিনি মাঝে মাঝে মাছ ধরেন। গণমাধ্যমে অনেকেই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সরলতা আখ্যা দিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন এর পরপর। বিষয়টির মধ্যে সরলতার কোনো কিছু নেই। মাছ ধরা সরলতার অংশ হতে পারে না। আজও অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর মাছ সহ ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত করে লিখেছেন তিনি অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ। এক্ষেত্রে আমি তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের ফেইসবুক পেইজের পোস্টের উদাহরন টানতে চাইছি। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্যই একজন সাধারন মানুষ নন। তিনি অসাধারন একজন রাজনীতিবিদ। শেখ হাসিনা শখের বশে মাছ ধরেছেন বলে মনে হয়নি। বিষয়টির ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। পৃথিবীর এই করোনা মহামারী কালে বাংলাদেশের একজন মানুষও না খেয়ে মারা যাননি। একজন মানুষও চিকিৎসা বঞ্চিত হননি। অর্থনৈতিক অবস্হাও স্থিতিশীল। মহামারীর সূচনালগ্নেই শেখ হাসিনা প্রনোদনা প্রদানের মধ্য দিয়েই যুগোপযোগি ভূমিকা পালন করেছেন। দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশের ভাগ্যের বহুমাত্রিক পরিবর্তন সংগঠিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র। এত কিছু সংগঠিত হবার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্যই বিশ্বের একজন শীর্ষ নেতায় পরিণত হয়েছেন। অসাধারণ প্রজ্ঞা নিয়ে তিনি বাংলাদেশ শাসন করছেন। কৃষি-শিক্ষা-স্বাস্হ্য-যোগাযোগ উন্নয়নে তার ভূমিকা প্রশংসনীয়। কর্মব্যাস্ততায় ও বয়সের ভারে তিনি যতটা ক্লান্ত সেখান থেকে নিজেকে কিছু সময়ের জন্য মুক্ত করার কারনেই কখনো কখনো মাছ ধরতে উৎসাহ দেখিয়েছেন। শেখ হাসিনা জানেন বাংলাদেশকে অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আজ তার হাতে। মানসিক শক্তি অর্জনের পথ যেহেতু বাংলাদেশে খুব সংকীর্ণ সুতরাং তিনি কখনো কখনো সেলাই করা, শিশুদের সাথে খেলা করা, রান্না করা, মাছ ধরার মতো কাজগুলো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবং তার ধারাবাহিক ঘটনা আজ মাছ ধরা। আজ শনিবার অন্যদিকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিলো। আজ সশস্ত্র বাহিনী দিবস। জাতির উদ্দেশ্যে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষন দিয়েছেন কিছুক্ষণ পূর্বে। এরই মাঝে বিকেলে কিছুটা সময় গনভবনের লেকে মাছ ধরেছেন। একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন রাষ্ট্র প্রধানের পক্ষেই সম্ভব এতো সামান্য একটি শখ পূরণের মধ্য দিয়েই নিজেকে মানসিক ভাবে উজ্জীবিত রাখার। তিনি সেই কাজটিই করেছেন।
এখানে প্রসঙ্গত একটি স্মৃতিচারণ করা যেতে পারে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন কালজয়ী নেতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি জীবনে সব ধরনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তিন যুগের স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরন করেছিলেন। তার পরের বছর পাকিস্তানের মিয়াওয়ালী কারাগার থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে দ্রুতই বাংলাদেশের পূনঃগঠনের কাজে হাত দিয়েছিলেন। কিন্ত একদিন হঠাৎই বঙ্গবন্ধুর মন বদলে গেলো। তিনি সত্যিই বললেন, ‘আজ আমাকে আপনারা ছুটি দেন। আমি আমার বাড়ির পাশে বাগাইর নদীতে গিয়ে অবসর সময়ে মাছ ধরবো’। তিনি তখন রাষ্ট্র শাসক। পৃথিবীর কোনো কালেই কোন রাষ্ট্র শাসক শাসনভার ছেড়ে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চেয়েছেন বলে আমার ধারনা নেই। শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন। তিনি সব ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি এমনকি রাজনীতিও ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের দ্বারা এই স্বাধীন বাংলাদেশ শাসিত হোক। কিন্ত সেদিন কেউ তাতে রাজি হননি। বঙ্গবন্ধু ছাড়া কি বাংলাদেশ চলবে। বঙ্গবন্ধু ছাড়া কি এই দেশ পরিচালিত হতে পারে। বঙ্গবন্ধু কিন্ত মন থেকেই সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাড়ির পাশে বাগাইর নদীতে বসে বসে মাছ ধরার আশা পূরন হতে দেননি সেদিনের বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা। এরপরের ঘটনাতো সকলেরই জানা। স্বপরিবারে তাকে জিয়াউর রহমান হত্যার পরিকল্পনা করলেন। কেউ ভাবতেও পারেননি জিয়াউর রহমানের এতো কুৎসিত মনের কথা। তিনিতো এই হত্যাকাণ্ডের বিচার রহিত করেছিলেন সংসদে ইনডেমনিটি বিল পাস করিয়ে। আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ তিনি রাষ্ট্র শাসনভার হাতে রেখেই এদেশের মানুষের মুক্তির জন্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দিনরাত কাজ করে চলেছেন। পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করছেন। পিতার মাছ ধরার স্বপ্নের কথা নিশ্চয়ই তার মনে আছে। আজ তিনি গনভবনের লেকে মাছ ধরেছেন। এর নানাবিধ দিক রয়েছে। মাছ ধরতে অনেক ধৈর্য্য প্রয়োজন। যিনি ধৈর্য্য ধরে পিতার হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছেন, যিনি ধৈর্য্য ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মসূচী পরিচালিত করছেন আজ তিনিই ধৈর্য্য ধরে গনভবনের লেকে একটি তেলাপিয়া মাছও ধরেছেন। এক মহান রাজনৈতিক পরিবারের একজন মহান রাজনৈতিক নেতা শেখ হাসিনার কোনো কাজকেই খুব সাধারন মনে করা যায় না। এদেশে যারা শেখ হাসিনাকে আজও চিনতে পারেননি, তাদের বুঝতে হবে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় সংকল্প নিয়ে খুনিদের দেশে ১৯৮১ সালের ১৭ মে ফিরে এসেছিলেন। এসেছিলেন এই মাতৃভূমির কাছে একটি প্রশ্ন নিয়ে, ‘কেনো তোমরা আমার পিতা-মাতা-ভাই-সকলকে হত্যা করলে, একজন মানুষও কি এদেশে ছিলোনা যে, এই হত্যা ঠেকাতে পারতে।’ আজ আমার মনে প্রশ্ন জাগে, শেখ হাসিনা কি বদলে যাচ্ছেন। দ্বায়িত পালনে বিগত এক যুগ আমি যতবার মহান সংসদ ভবনে প্রবেশ করেছি ততবার লক্ষ্য করেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক গভীর লক্ষ্য নিয়ে আত্মমগ্ন। সেই লক্ষ্যের দরোজা আজ উন্মোচিত। বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে এক মহাকালের যাত্রায় আত্মমহিমায়, আত্মঅহংকারে। আজ পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তের সংযোগ সম্পন্ন হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে, মহামারীর জন্য ও সাম্প্রদায়িক শক্তির কিছু সংকট বাংলাদেশের জন্য সত্যিই দূর্ভাবনার বিষয়। আমার আত্মবিশ্বাস বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই সংকট অচিরেই দূর করবেন। যার পিতা মানুষের মুক্তির লড়াই করেছেন, তিনিতো মানুষের মুক্তির বিষয়টি একবার চিন্তা করবেন। শেখ হাসিনা বদলে যাননি। তিনি বদলাতে পারেন না। তিনিই পিতার মতো একজন নেতা, যিনি প্রকৃত মুক্তির অর্থ সম্পর্কে অবহিত এবং সে বিষয়ে সম্যক ধারনা রাখেন।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১০৯ বার

Share Button

Calendar

November 2020
S M T W T F S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930