» শেষ সময়গুলোতে এরশাদ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গিয়েছিলেন : মোঃ আবুল কাশেম

প্রকাশিত: ২৯. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | শনিবার


লেঃ জেনারেল হোসাইন মোঃ এরশাদ ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি বাংলাদেশে রেখে গিয়েছেন ৩৪ বছরের জাতীয় পার্টি। ১৯৮৩ সালে ১১ ডিসেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ পাঠ করেন। নয় বছর পর ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে গণ আন্দোলনের মধ্য দিযে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনই ছিলো তাঁর জীবনের শেষ নির্বাচন। জাতীয় পার্টি সমর্থিত মহাজোট সরকার বর্তমানে রাষ্ট্র শাসকগোষ্ঠি। এরশদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টির অবস্থানের কতটা পরিবর্তন ঘটেছে তার উপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতির অনেক হিসেব-নিকেষ। এরশাদ ব্যক্তি জীবনে ছিরেন একজন আবেগপ্রবণ মানুষ। কয়েক বছর আগে তার কিছুটা প্রমাণ আমি পেয়েছিলাম যখন তাঁর সান্নিধ্য পেলাম ঢাকার গুলশানে তাঁর ‘প্রেসিডেন্ট পার্কে’। তিনি তাঁর বায়োগ্রাফি লেখার কাজ আমাকে দিয়েছিলেন সেদিন। পরবর্তীতে কাজটি করা হয়নি আমার। অনেকটা উদার প্রকৃতির মানুষ এরশাদ যথেষ্ট আবেগপ্রবণ ভিলেন তার প্রমাণ পেলাম প্রায় এগার বছর আগে আরেকটি জাতীয় সংসদে। সংসদ সেদিন উত্তপ্ত। খালেদা জিয়া বিরোধী দলের নেতা সেসময়। মাগরিবের নামাজের আগেও তখনও আমরা বুঝতে পারছিলাম না সংসদে কি ঘটতে যাচ্ছে। স্পিকার আব্দুল হামিদ যখন মাগরিবের বিরতির ঘোষণা দিতে প্রস্তুত ঠিক তখনই সংসদের হাউজে উত্তেজনা-হট্টগোল। অবশেষে বুঝতে বাকী রইলো না সবকিছু। খালেদা জিয়া সংসদ বয়কট করেছেন। আমি যথাসাধ্য দৃষ্টি রাখছিলাম পরবর্তী মুহুর্তগুলোর অপেক্ষায়। লুই কানের নকমা মূলত এতটাই জটিল সংসদে পথ হারাতে হয়েছে আমাকে অনেক। তারপরও ভেবেছিলাম টপ সিক্রেট ঘটনার কাছাকাছি পৌঁছাতে হবে যে করেই হোক। ঠিক মনে নেই পুরোপুরি সেদিনের সবকিছু। তবে যতটুকু মনে পড়েছে জাতীয় পার্টির গুরুত্বপূর্ণ একজন পার্লামেন্টারিয়ান টেলিফোনে আমাকে বললেন এখনই সংসদে জাতীয় পার্টির কক্ষে জরুরী বৈঠক কল করেছেন জেনারেল এরশাদ। সিদ্ধান্ত নিলাম সেখানে যেতে হবে। শীর্ষ নেতৃবৃন্দে ঠাসা কক্ষ। আমার পৌঁছাতে দেরী হলো। সেসময় এরশাদ সাহেব বৈঠক শুরু করবেন। বিশাল টেবিলে সকল নেতা বসে রয়েছেন। আমি প্রকৃত অর্থে অযাচিত মানুষ সেখানে এটাই স্বাভাবিক। সেখানে প্রবেশের কোন কথাই থাকতে পারে না কারো। আশ্চর্য আমি সেখানে উপস্থিত হলাম। সোজা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জেনারেল এরশাদের চেয়ারের কাছে পৌঁছে গেলাম। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছেন স্যার? তিনি শুধুই বললেন ‘এখানে কি করছো’। একবার তাকালেন। ভাবলাম কথাতো বলাই যাবে। ফিরে এলাম সেদিন। নবম সংসদে বিএনপি আর যায়নি। বয়কট চলতে থাকলো নির্বাচন পর্যন্ত। এরশাদ সাহেব সময় আমার টেলিফোন ধরতেন। কখনো জিজ্ঞেস করতেন তুমি কোন রাসেল। কি আর বলা যায়। কখনো বলতাম, স্যার রংপুর ক্যাডেট কলেজের ক্যাডেট আমি। আবার কোনদিন তিনি চিনতে পারতেন তবে খুব ব্যস্ততার কথা বলে দিতেন। একদিন দুপুরে দেখা হবার কথা ছিলো। ইত্তেফাক অফিস থেকে সেদিন ফোন করি আমি। উনি তখন ফোন ধরে বললেন তিনি পীরের ওখানে আছেন। আমি যখন ক্যাডেট কলেজে তখন একবার গলায় টনসিল হলো। আমাকে সিএমএইচ’সে অফিসার্স কোয়ার্টার এর ভর্তি করা হলো। আমার সারাদিন বসে বসে সময় কাটে না। আমি নিচতলায় থাকি। পাকিস্তান আর্মির একজন বাংলাদেশী মেজরের সাথে কখনো কখনো গল্প করা ছাড়া আর কাজ নেই। একদিন সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গেরাম। এখানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশদের মাতা চোখের অপারেশন করিয়ে ভর্তি রয়েছেন। ওখানে আঙুর ফল খেয়ে আর ওনার কাছে কিছুক্ষণ বসে নিজের কক্ষে ফিরে এলাম। এরশাদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর গুলশানের বাড়ীতেও আমি গিয়েছিলাম। মিজানুর রহমান চৌধুরীর শেষ দিনগুলিতে তিনি হাঁটতে পারতেন না খুব একটা। ব্যক্তিগত কক্ষে প্রধানমন্ত্রী আমাকে ¯েœহ করে কথা বলেছেন। জেনারেল এরশাদের আরেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কাজী জাফর। একদিন তিনি আমাকে তাঁর গুলশানের বাড়ীতে দাওয়াত দিলেন। সেটাও তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে। খুব বৃষ্টি সেদিন। ঝমঝম বৃষ্টি। সেসময় জাতীয় পার্টিতে অন্তকলই চরমে। সিলেটের নেতা নওয়াব আলী আব্বাসকে নিয়ে জাতীয় পার্টি থেকে বের হবার কিছুদিন আগের ঘটনা। জাতীয় পার্টির চূড়ান্ত ভাঙ্গনের সুর আমি সেদিনের ঝমঝম বৃষ্টির পতনের মধ্য দিয়ে দেখেছিলাম। প্রায় দুই ঘন্টা কথা হলো কাজী জাফরের বাসভবনে। এরশাদ সাহেবকে সবদিক বিবেচনায় আমার আবেগপ্রবণ ও প্রকৃত উদার মানুষ মনে হয়েছে। সংসদে কি টেলিফোনে। বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে তিনি ছিলেন কিনা সেটা তাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি তবে তিনি ছাত্র সমাজকে কোনদিনই রাজনীতির মধ্য দিয়ে কলুষিত করতে চাননি। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বারবার ভেবেছিলাম জেনারেল এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। মনিরুল ইসলাম মিলন বর্তমান চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা। তিনি একদিন টেলিফোনে বললেন, দেখা করো স্যারের সাথ্ েশেষ মুহুর্তে দেখা হয়নি। যার মধ্যে দিয়ে অজানা রয়ে গেলো অনেক প্রশ্নের জবাবের।
তবে তাঁর মৃত্যুর পর বারবার একটি কথা মনে হয়েছিরো আমার ৩৪ বছরে জেনারেল এরশাদ জাতীয় পার্টিকে কোথায় পৌঁছাতে পেরেছেন। রংপুরের লাঙ্গল-ভবন থেকে গুলশানের প্রেসিডেন্ট পার্ক, সংসদ থেকে দেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে এরশাদের বিচরণ ভূমি ছিলো। প্রত্যক্ষ করা গেছে তার অসীম মানসিক শক্তির। ছুটে চলার শক্তি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এরশাদবিহীন জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে কি ভাবছে আজ। সেই প্রশ্নের উত্তরের হয়তো শেষ নেই তবুও বাংলাদেশে জাতীয় পার্টির ভূমিকা প্রসঙ্গে গণমানুষের মনে আগ্রহ থাকবেই। জাতীয় পার্টির জোয়ারের সম্ভাবনা জিএম কাদেরের হাত ধরে কি সম্ভব। সাম্প্রতিক ভাবনাগুলো নিয়ে সাংবাদিক লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীর সাথে একান্ত বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইঙ্গিত করেছেন জাতীয় পার্টির শীর্ষ প্রেসিডিয়াম মেম্বার, টাঙ্গাইলের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট শিল্পপতি মোঃ আবুল কাশেম।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ পল্লীবন্ধু এরশাদবিহীন জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?
মোঃ আবুল কাশেমঃ বিষয়টি ব্যাপক। হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের ব্যক্তিত্বের সাথে এদেশের কোন রাজনীতিবিদের মিল নেই। পল্লিবন্ধুর সাথে কাউকেই তুলনা করা যাবে ন্ াতিনি ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ পাঠ করেছিলেন। ১৯৮৬ সালের ১লা জানুয়ারি জাতীয় পার্টি গঠন করেছিলেন। জাতীয় পার্টি দীর্ঘ ৩৪ বছর অতিবাহিত করেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন উত্থান-পতনের রাজনীতিতে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয় বছর আর পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে ৩৩ বছর তিনি এদেশের রাজনীতিতে যুগপৎ বিচরণ করেছিলেন। প্রতিটি মানুষেরই দোষ ও গুণ থেকে থাকে। জেনারেল এরশাদ কারেসমেটিক মানুষ হলেও তার কিছু দোষের জন্য জাতীয় পার্টির যেখানে পৌঁছে যাবার কথা ছিলো সেখানে জাতীয় পার্টি পৌঁছাতে পারেনি। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই পল্লিবন্ধু এরশদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তিত হয়েছে। জাতীয় পার্টিতে এই পরিবর্তন ধরে রাখার দায়িত্ব কিন্তু সম্পূর্ণ বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের। বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের এরশাদ সাহেবের ¯েœহভাজন ভ্রাতা। তিনি যদি সঠিক নেতৃত্ব দিতে সফল হন তাহলে জাতীয় পার্টির অবস্থান পূর্বের থেকে আরো বেশী সুদৃঢ় হবে। পাশাপাশি আরেকটি বিষয় উপলব্ধি করছি যে গোটা বাঙালী জাতি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় পার্টির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সেটা অবচেতন বা চেতন মনে যেভবেই ভাবা হোক না কেনো। বাংলাদেশের দুটো বৃহৎ রাজনৈতিক দল বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ও জিয়ার বিএনপি। দুটো রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক ব্যর্থতাগুলোর জন্য জনগণের আস্থা অনেক ক্ষেত্রেই কমে গিয়েছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে। সেটাও বিভিন্ন ভাবে সামাজিক জীবনে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে তার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় চরমভাবে। নির্বাচনে ২৭ শতাংশ ভোট রাজনীতিতে জনগণের আস্থার অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক অন্তত ৩৬ শতাংশ থাকার কথা ঢাকাতে। বিএনপির অবস্থান প্রায় এরকমই। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে ভোটারদের মনোস্তাত্ত্বিক বোধের প্রসঙ্গ নিয়ে এই প্রেক্ষাপটে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই এরশাদের নেতৃত্বের সাথে কি বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের দৃষ্টিভঙ্গির কোন পার্থক্য লক্ষ্য করছেন?
মোঃ আবুল কাশেমঃ পার্থক্য এতটুকুই এরশাদ সাহেব অবস্থার প্রেক্ষিতে মহাজোটের রাজনীতিতে বেশ মোহাচ্ছন্ন ছিলেন। কিন্তু জিএম কাদেরের অন্তত সেরকমের রাজনৈতিক মোহ নেই। তিনি আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির সাথে অন্তত লেজুড়বৃত্তির আগ্রহ দেখাতে চাচ্ছেন না। আমরা আশা করি যে তিনি জাতীয় পার্টিকে তার পরম লক্ষ্যে পৌঁছাতে সমর্থ হবেন যদি যোগ্য নেতৃত্ব নিয়ে সঠিক পথে অগ্রসর হন।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ আমার যতটুকু মনে পরছে স্বয়ং জিএম কাদের কিছু মাস পূর্বে জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি পার্টির দায়িত্ব নেয়ার পর দেখা গেলো জাতীয় পার্টিতে শীর্ষ পদে ব্যাপক পরিবর্তন। প্রায় ২৪ জন ইতিমধ্যেই প্রেসিডিয়াম মেম্বার হলেন। অপেক্ষা করছেন অনেক শীর্ষ নেতা। নেতৃত্বের এই পর্যায়কে কিভাবে বিশ্লেষণ করা যায়?
মোঃ আবুল কাশেমঃ জাতীয় পার্টির প্রতি যতটুকু অবদান রাখা প্রয়োজন আমি সবসময় ততটুকুই করে থাকি। জাতীয় পার্টি’র সকল কাজেই আমি সম্পৃক্ত হই না। সেটা সময়ের অভাবও বলা যেতে পারে। সেই যোগ্যতা আমার নেই। যদিও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মাঝে আমি শীর্ষে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ একটু পিছনে ফিরে যেতে চাই। এরশাদ জাতীয় পার্টি গঠন করেছিলেন কেনো?
মোঃ আবুল কাশেমঃ মানুষের কল্যাণের জন্য। তবে একসময় তিনি ব্যক্তি কেন্দ্রিক হয়ে পরেছিলেন। মৃত্যুর আগে বেশ কিচু বছর তিনি ব্যক্তির বাইরে কিছুই ভাবতেন না। আমি লক্ষ্য করেছিলাম শেষের দিকে তিনি ব্যক্তি স্বার্থের দিকেই বেশী মনোযোগী হয়ে পরেছিলেন। দর্শনের ব্যাখ্যায় ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা দোষের না তবে তার প্রপার ডিস্ট্রিবিউমন থাকতে হবে। রাজনীতিতে সামাজিক স্বার্থের ভাগবাটোয়ারা গুরুত্বপূর্ণ। যাকে আরো স্পষ্টভাষায় বলা যায় দায়ভার। সামাজিক দায়ভার।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ জেনারেল এরশাদের বাংলাদেশের প্রতি অবদানগুলোকে কি অস্বীকার করা যাবে?
মোঃ আবুল কাশেমঃ বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের রূপরেখার প্রবর্তন ঘটেছিলো জেনারেল এরশদের শাসনামলে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিলো। তিনি সেটা করতে পেরেছিলেন। একটি দেশের উন্নয়নের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে অবকাঠামোর উন্নয়ন। এরশাদ সাহেব প্রায় প্রতিটি স্তরেই হাত দিয়েছিলেন। উন্ননয়নের মূল ভিত্তিটার সূচনা করেছিলেন তিনি। তিনি তিলোত্তমা ঢাকার স্বপ্নদ্রষ্টা। পরবর্তীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এরশদের পরিকল্পনার উপর দিয়ে পথ চলা শুরু করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ হ্যাঁ এটা ঠিক এরশাদ ক্ষমতায় এসেই গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। তিনি বলেছিলেন “বাংলাদেশে গ্রাম বাঁচলে, বাংলাদেশ বাঁচবে।” জিয়াকে হত্যার পর এরশাদ ক্ষমতায় এসেই বাংলাদেশকে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেন সেকানে কি কোন বিভ্রান্তি ছিলো?
মোঃ আবুল কাশেমঃ এরশাদ সাহেবের প্রতিটি চিন্তা ছিলো সমাজভিত্তিক ও মানব কল্যাণভিত্তিক। এজন্যই তার পরিকল্পনাগুলো পরবর্তীতে মূল্যায়িত হয়েছিল। আর্থিক খাতের সংস্কার এর মধ্য দিয়ে তিনি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পেরেছিলেন। এজন্য প্রথমেই তিনি প্রশাসনের সংস্কার করেছিলেন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এর দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি যেটা করেছিলেন সেটা বঙ্গবন্দু করতে পারেননি। জিয়াউর রহমানও পারেননি।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বপ্রথম সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনিই এমন একজন নেতা যিনি বাংলাদেশের প্রধান দুটো শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষে পরিণত হলেন এক সময়ে। এবং এক পর্যায়ে তাকে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হয়েছে। সেই সময়ের এরশাদকে আপনার কি মনে হয়?
মোঃ আবুল কাশেমঃ সেসময় এরশাদ যে সব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সে সিদ্ধান্তগুলো ভুল ছিলো। তিনি অন্যের পরামর্শ শুনতেন এবং কোন কোন বিষয়ে সেই পরামর্শের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। সেই সময়ে এরশাদ যদি কঠোর হতেন তাহলে আরো বিশ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। গণতন্ত্রের উপরই তিনি সর্বশেষে আস্থা অর্জন করেছিলেন। গণতন্ত্রের মুক্তি তিনি চেয়েছিলেন। গণতন্ত্রের সাথে তিনি দরকষাকষি করতে চাননি।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ এরশাদ প্রেসিডেন্ট অফিসে গিয়ে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এদেশে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন যোগ্য নেতৃত্ব। বলা যায় জাতীয় পার্টির বর্তমান কো-চেয়ারম্যান ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশিদ, প্রেসিডিয়াম মেম্বার ফকরুল ইমাম, লিয়াকত হোসেন খোকা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধা, সাবেক মন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, পীর ফজলুর রহমান ছাড়াও সংসদে কিংবা রাজপথের তুখোড় তুখোড় নেতৃত্ব। জাতীয় পার্টিতে তো তাহলে নেতৃত্বের সংকট নেই। আপনার মতামত কি?
মোঃ আবুল কাশেমঃ জাতীয় পার্টিতে একসময় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ছিলো সেটা সত্যি। মিজানুর রহমান চৌধুরীর মতো প্রখ্যাত নেতাও জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। কাজী জাফর, সিলেটের নওয়াব আলী আব্বাস খান ছাড়াও অনেকেই জাতীয় পার্টিতে ছিলেন। পরে তারা দল ছেড়ে বের হয়ে গিয়েছেন। অনেকে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে চলে গিয়েছেন। অনেকে গিয়েছেন বিএনপিতে। ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমেদের মতো তুখোর পার্লামেন্টারিয়ান বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নিজের নামে ব্রেকেটের জাতীয় পার্টি গঠন করলেন। নাজিউর রহমান মঞ্জু পার্টি থেকে বের হলো। এখন তার ছেলে আন্দালিব পার্থ খালেদা জিয়ার জোটে রাজনীতির শরিক হয়েছেন। জাতীয় পার্টিতে যত ক্ষত আছে সেসব বলেতো শেষ করা যাবে না এই স্বল্প সময়ে। এদেশে ৩৪ বছরেতো রাজনীতির উত্থান-পতন কম হয়নি। তবে এরশাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কিন্তু জাতীয় পার্টির মৃত্যু ঘটেনি। বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের উপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে এখন। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির পজিটিভ টার্নিং এর সম্ভাবনা যথেষ্ট। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ধ্রুব সত্য হলো পার্টি যদি উদার গণতান্ত্রিক হয় তাহলে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাবার পথটিও তৈরী হয় সহজে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ নির্বাচনের প্রতি বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা কি কমে যাচ্ছে?
মোঃ আবুল কাশেমঃ এদেশেতো বিশুদ্ধ নির্বাচন হচ্ছে না। এখন নির্বাচন মানেই ভোট ডাকাতি না হয় ভোটচুরি। আস্থা হারাচ্ছি এভাবেই।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ জেনারেল এরশাদ সম্পর্কে শেষ প্রশ্ন দিয়ে শেষ করতে চাই। জেনারেল এরশাদ কি মৃত্যুর আগে হতাশাগ্রস্থ ছিলেন?
মোঃ আবুল কাশেমঃ ৩০ ডিসেম্বর এর নির্বাচনের আগে ও পরে তিনি ‘আউট অব সেন্স’ এ ছিলেন। এরশাদ বেডলি একটি মহলের পোষ্য নেতায় পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন শেষ সময়ে। মৃত্যুর আগেই তার রাজনীতির মৃত্যু ঘটে গিয়েছিলো। এরশাদ যতদিন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন ততদিন তিনি সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন ততদিন তিনি সফল মানুষ ছিলেন না। এরশাদ নিজের ইচ্ছায় এক সময় রাজনীতি করতে পারেননি। তিনি পরিচালিত হয়েছেন অন্যের ইচ্ছায়। তবে এর পেছনে এরশাদের দোষ ও ভ্রান্তিই বেশী। সামাজিক কারণেই তিনি পাল্টে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
মোঃ আবুল কাশেমঃ ধন্যবাদ আপনাকেও ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৯১ বার

Share Button

Calendar

April 2020
S M T W T F S
« Mar    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930