» শ্রমিক ছাটাই নিয়ে সরকারের নিরবতা রহস‍্যময় ঃফজলে হোসেন বাদশা

প্রকাশিত: ১১. জুন. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

আবদুল্লাহ শাহরিয়ার

গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের উদ‍্যোগে ‘জন-বাজেট সংসদ’ অনুষ্ঠিত হয় আজ । কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ বিস্তারের কারণে অন‍্যান‍্য বারের মত এবার ব‍্যাপক জন সমাগম এড়াতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ‍্যমে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো।

সভায় মূখ‍্য আলোচক ছিলেন ফজলে হোসেন বাদশা এমপি, বাংলাদেশ ব‍্যাংক’ এর সাবেক গভর্নর অধ‍্যাপক ড. আতিউর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ‍্যাপক শারমিন্দ নিলোর্মীএবং গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার মোস্তফা। সম্মেলনের সুচনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন একশন এইড বাংলাদেশের পরিচালক আসগর আলী সাবরী। সঞ্চালনায় ছিলেন গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আমান রহমান। সহ-সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে ডিবিএম এর যুগ্ম সম্পাদক সেকেন্দার আলী মিনা এবং তথ‍্য ও যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক মাসুদুল আলম।

মূখ‍্য আলোচনায় ফজলে হোসেন বাদশা এমপি বলেন, সংবিধানে শিল্পের উন্নয়ন ও শ্রমিকের স্বার্থরক্ষার বিষয় উল্লেখ থাকলেও শ্রমিক ছাটাই নিয়ে সরকারের নিরবতা রহস‍্যময়। তিনি বলেন, কেবলমাত্র গার্মেন্টসের উপর নির্ভর করলে চলবেনা। শিল্পের বহুমুখী বিকাশ ও সম্ভাবনা নিয়ে সরকারকে কাজ করতে হবে। নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করে সহযোগিতা দিতে হবে। তিনি এই বাজেটে স্বাস্থ‍্যখাতকে সবচাইতে বেশী গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে যাতে দেশের সকল প্রান্তে জনগণ স্বাস্থ‍্যসেবা পায়। তিনি বলেন, কিউবা এক সপ্তাহ আগে থেকে কোভিড সংক্রমণ ও মৃত‍্যূ বন্ধ করতে পারলো। ওদের পাশেতো ওয়ার্ল্ড ব‍্যাংক নাই। পাশের দেশ ভারতের কেরালায় স্থানীয় সরকার ব‍্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী যে রোগী সনাক্তকরা এবং তার চিকিৎসা স্থানীয় পর্যায়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে। এমনকি মানসিক স্বাস্থ‍্যের বিষয়টিও তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ‍্যকেন্দ্রের মাধ‍্যমে দেয়া সম্ভব হয়েছে। তদারকিতে আছে স্থানীয় সরকার। এই বাজেটে স্বাস্থ‍্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ এটা হতে হবে ‘জীবন বাঁচানোর বাজেট।’ প্রয়োজনে মেগা প্রকল্পগুলো বাতিল করে অথবা এসবের উন্নয়ন গতি শ্লথ করে দরিদ্র বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ‍্যরক্ষার স্বার্থ দেখতে হবে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে জেলা বাজেটের ধারণাকে গ্রহন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষি বিষয়ে বাজেট জেলা পর্যায়ে প্রনয়ণ যথেষ্ট কার্যকর ভুমিকা রাখতে পারে। ঋণের ক্ষেত্রে ক্রেডিট হিস্ট্রি বলে একটা কথা আছে। সে হিস্ট্রি বিবেচনা করলে আমাদের দেশের শিল্পপতিদের চেয়ে কৃষকের ক্রেডিট হিস্ট্রি অনেক ভালো। তাই কৃষিকে শক্তিশালী করতে হলে কৃষককে ঋণ দিতে হবে। কৃষিকে আগ্রাধিকার দিয়ে বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে। সাথে সাথে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সূরক্ষার বিষয় বাজেটে প্রতিফলিত হতে হবে। তিনি বলেন, অনেকে বলেন দেশ এখন আমেরিকার মত উন্নত হতে চলেছে। কোভিড দেখিয়ে দিয়েছে দুবর্লতা। ঠিক করতে হবে উন্নয়ন দর্শন। কেমন উন্নয়ন চাই। আমেরিকার মত নাকি মুক্তিযুদ্ধের সময় লালিত যে স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ যুদ্ধ করেছিলো তেমন বাংলাদেশ।

সভায় বিশিষ্ট‍ অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব‍্যাংকের সাবেক গভর্নর অধ‍্যাপক ড. আতিউর রহমান তাঁর আলোচনায় বলেন, বাজেট অংকের মারপ‍্যাঁচ নয়। এর মাধ‍্যমে নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনা ও তাদের মনস্তত্ত্বকে বুঝা যায়। তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ” টাকার অভাব আসল অভাব নয়, আসল অভাব ভরসার।” এই বাজেট সে ভরসা দিচ্ছে কিনা সেটা দেখতে হবে। তিনি বলেন, বিগত বাজেটে কি পরিকল্পনা ছিলো, কতদুর অর্জিত হয়েছে তার জবাব থাকা দরকার। কেন জেলা বাজেট হচ্ছে না। তার জবাবও থাকা দরকার। কেরালার স্থানীয় সরকার শক্তিশালী বলে স্থানীয় স্বাস্থ‍্যসেবা দায়িত্ব নিয়ে কোভিড মোকাবেলা করছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি ও অপব‍্যবহারের কথা আমরা জানি। তাই বাজেটে কোন খাতে, কি কি কাজে, কিভাবে, কত টাকা খরচ হবে তার নির্দেশনা থাকা দরকার। এতে কি অর্জিত হবে তাও উল্লেখ থাকতে হবে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র গার্মেন্টসের উপর নির্ভর করে নয়। বিকল্প ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে হবে। বাঁচার বাজেট চাই। তাই আগ্রাধিকার দিতে হবে স্বাস্থ‍্য, কৃষি, সেফটি নেট, শিল্প এবং শিক্ষাখাতকে। সকলের জন‍্য স্বাস্থ‍্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি একটি উদাহরণ টেনে বলেন, কোভিড মোকাবেলায় কালিহাতির ইউএনও একটি গাড়ীর ব‍্যবস্থা করেন। ওতে এম্বুলেন্স ফ‍্যাসিলিটি তৈরী করেন। এমনকি টেষ্টিং এর জন‍্য নমুনা সংগ্রহের ব‍্যবস্থা করেন। এতে খবর পাওয়ামাত্র এম্বুলেন্স নির্দিষ্ট স্থানে চলে যাচ্ছে। সেখানে রোগীর স‍্যাম্পল সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে এম্বুলেন্সে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে। এমন ভরসার স্থল তৈরী করা দরকার। এই বাজেটে আমরা কিভাবে এই ভাইরাসকে মোকাবেলা করবো, জেলা উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ‍্যসেবা কেমন হবে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। স্বাস্থ‍্যখাতে বরাদ্দ অন্তত গতবারের দ্বিগুণ হতে হবে। সরকারের কৃষি প্রণোদনা ও বিভিন্ন সহায়তা কৃষিক্ষেত্রে বিস্তৃত করতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব‍্যাংকের নেতৃত্বে রি ফাইনান্সিং এবং শুধু ব‍্যাংক নয়, মাইক্রো ফাইনান্স ইনিষ্টিটিউট- এমএফআই’য়ের মাধ‍্যমে গ্রামীন এন্টারপ্রিনিওর, নারী ও কৃষি উদ‍্যোক্তাদের ঋণ দিতে হবে। সকল প্রণোদনা ও ভর্তূকি কৃষককে নগদ প্রদানের ব‍্যবস্থা করতে হবে। দূঃস্থ মাতাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসুচীর আওতায় একশ টাকা মাসে প্রদান করা হয়। এটা বাড়িয়ে ৫00 টাকা করা উচিৎ। আমেরিকায় প্রতি নাগরিককে ১২00 ডলার করে প্রদান করা হয়েছে। আমি মনেকরি সকল কৃষককে একহাজার টাকা করে দেয়া হোক। যেটাকে বলা যেতে পারে ‘উদ্দিপনা তহবিল ‘। এতে গ্রামীন অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার হবে। তৃণমূলে লেনদেন বাড়বে। এবারের বাজেট হতে হবে ‘প্রকৃতির বাজেট’। সুন্দরবন, হাওর বাওর, জলাভুমি, বনাঞ্চল রক্ষার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। কারণ এটা আমাদের প্রাণ বৈচিত্র্য ও জীবনকে দূর্যোগ থেকে রক্ষা করে। প্রকৃতির ভারসাম্য ঠিক রাখে। এগুলো ধ্বংস হলে মরণঘাতি ভাইরাস অন‍্যান‍্য প্রাণী থেকে মানুষের মাঝে চলে আসে। মানুষের জীবনকে করে বিপন্ন। তাই এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোভিডের কারণে যে বেকারত্ব তৈরী হবে একে মোকাবেলার জন‍্য কর্মক্ষম মানুষের প্রযুক্তিগত দক্ষতা তৈরী করতে হবে। এটা হতে পারে স্বাস্থ‍্যখাত, বিপনন, ই-কমার্সের উপর। এসব খাতগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তিনি বলেন, এই বাজেট হতে হবে ‘বেঁচে থাকার বাজেট, টিকে থাকার বাজেট।’

প‍্যানেল আলোচক অধ‍্যাপক শারমিন্দ নিলোর্মী বলেন, সরকারকে স্বাস্থ‍্যখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনে অন্তবর্তীকালীন বাজেট ঘোষণা করতে হবে। আমরা স্বাস্থ‍্যখাতে ব‍্যাপক অনিয়ম ও দূর্ণীতির কথা জানি। দরকার এসব ক্ষেত্রে সূশাসন। সরকারী হাসপাতালে বরাদ্দের মাধ‍্যমে উপজেলা, জেলা পর্যায়ে কি কি অর্জিত হবে সেসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এই মহামারী থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে এর কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, কোভিডকে কেন্দ্র করে দারিদ্রের হার বাড়েছে। দারিদ্রের কারণে সন্তান জন্মের হার বাড়বে। বাল‍্য বিবাহ এবং নারী নির্যাতনের মত ঘটনা বাড়বে। তাই এমন উদ্ভুত সমস‍্যায় অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনা দরকার। 2020 সাল অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বছর। অন্ততঃ তিন বছর স্বাস্থ‍্য, কৃষি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানেরমত খাতগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রনয়ণ করতে হবে।

মুক্ত আলোচনায় প্রতিবন্দ্বী মানুষের সংখ‍্যা নিরূপনে বিবিএস জরিপ এবং সমাজসেবার আওতাধীন সংগঠনগুলোকে অর্থায়ণের ব‍্যবস্থা করা উচিত।
বক্তারা উপকূলীয় এলাকায় সূপেয় পানি সরবরাহ ও টেকসই বাঁধ নির্মানের জন‍্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের দাবী জানান। সভায় হিজড়া, যৌনকর্মীদের জন‍্য বিশেষ বরাদ্দ, নারী ও প্রতিবন্দ্বীদের জন‍্য প্রতিটি মন্ত্রনালয়ে 5% বরাদ্দ রাখা, বিউটি পার্লারে নিয়োজিত কর্মীদের জন‍্য করোনাকালীন বিশেষ সহায়তা প্রদান এবং করোনাকালে নারী শ্রমিকদের সন্তানদের নিরাপদে রাখার জন‍্য ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ স্থাপনে বরাদ্দ রাখার দাবী জানান।

সভায় সংযুক্ত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, স্কপের অন‍্যতম নেতা ও জাতীয় শ্রমিক জোটের সাধারণ সম্পাদক নাইমুল এহসান জুয়েল, শ্রমিক নেতা জনাব শামীম ইমাম, শ্রমিকনেতা আবুল হোসেন, উন্নয়ন সংগঠক আশরাফুন্নাহার মুন্নী, নুর আলম শেখ, সাঈদুলক হক, নিউ এইজের গণমাধ্যম কর্মী রাশেদ, উন্নয়ন সংগঠক রাশেদ রিপন, এলবার্ট মোল্লা, সিঁথি ঘোষ, উম্মে সালমা ও খন্দকার সালাম প্রমুখ। এই কনফারেন্সে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় দেড়শজন যুক্ত হয়েছিলেন। দুপুর দুটায় কনফারেন্সের সমাপ্তি টানা হয়।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৭২ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031