শিরোনামঃ-


» শ্রীমঙ্গলে কলেজ ছাত্র সাক্ষরের মৃত্যুঘীরে গুঞ্জন!

প্রকাশিত: ০৮. সেপ্টেম্বর. ২০২০ | মঙ্গলবার


স্টাফ রিপোর্টার:
শিক্ষক পিতা কল্যাণ দেবের বড় ছেলে ও শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেনীর শিক্ষার্থী সাক্ষর এর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে নানা গুঞ্জন। যে সন্তানকে নিয়ে বাবা-মায়ের সপ্নের শেষ নেই সেই আদরের মানিকের হটাৎ করে নিখোঁজের পর মৃতদেহ পাওয়ার খবরে পুরো পরিবার জুড়ে চলছে শোকের মাতম। এমন মৃত্যু পরিবারের কেউই মেনে নিতে পারছেন না। ঘটনার পর সোস্যাল মিডিয়ায় অনেকেই ক্ষোভ দেখিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। সাক্ষর হত্যার বিচার সম্বলিত পোষ্টারে ছেয়ে গেছে শ্রীমঙ্গল শহরের অলিগলিসহ রাস্তার বিভিন্ন দেয়াল। শ্রীমঙ্গলবাসী নামে রাস্তার বিভিন্ন দেয়ালে লাগানো সাক্ষর হত্যার বিচার চাই সম্বলিত এমন পোষ্টার দেখে যে কারো মনেই প্রশ্ন তৈরী হবে আলোচিত এই ঘটনাটি হত্যা না আত্মহত্যা ? কি কারনে এমন মৃত্যু?


গত ৩০ আগষ্ট শ্রীমঙ্গলে নিখোঁজের একদিন পর শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেনীর শিক্ষার্থী ও ভাড়াউড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কল্যাণ দেব’র ছেলে সাক্ষরের (১৭)নিথর মৃতদেহ পাওয়া যায় শ্রীমঙ্গলের কালিঘাট ইউনিয়নের ফিনলে কোম্পানীর মালিকানাধীন লাখাইছড়া চা বাগানের ১নং সেকশনের পদ্মফুলের ঝিলের পাশে।


আলোচিত এঘটনার রহস্য উদঘাটনের শুরুতেই সিলেট থেকে ঘটনাস্থলে আসে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট এর একটি দল। এসময় তারা ঘটনাস্থলে মরদেহের পাশে পাওয়া বিভিন্ন আলামতও সংগ্রহ করেন। এর পাশাপাশি নির্মম এ ঘটনার রহস্য উন্মোচনে মাঠে নামে পুলিশ বুর্যো অব ইনভেস্টিগেশন (পিভিআই) শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশসহ পুলিশের একাধিক ইউনিট।


ঘটনার পরদিন ৩১ আগষ্ঠ সাক্ষরের পরিবারের পক্ষ থেকে বাবা কল্যাণদেব অজ্ঞাতদের আসামী করে শ্রীমঙ্গল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ সাক্ষর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে গণমাধ্যমকে এমন তথ্য নিশ্চিত করলেও তার পরিবারের সন্ধেহ লোহমর্ষক এঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচন নিয়ে। পরিবারের পক্ষ থেকে সাক্ষর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি দেখবাল করছেন বাবা কল্যাণ দেবের নিকটাত্মীয় শিক্ষক নেতা অঞ্জন দেব চৌধুরী।


মামলার এজাহারে কল্যান দেব অভিযোগ করেন, গত শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেল ৪ টার দিকে সাক্ষরের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একটি কল আসে। এরপর মোটর বাইক নিয়ে বাসা থেকে দ্রæত বের হয়ে পড়েন সাক্ষর। ঘন্টা দু’য়েকের মধ্যে ফিরে না আসলে সাক্ষরের মা সাক্ষরের বাবা কল্যান দেবকে বিষয়টি জানান। এর পর তার ফোনে কল করলে ওপর প্রান্ত থেকে সাক্ষর ফোন রিসিভ করেনি। এক পর্যায়ে অনেক খোঁজাখোঁজি করে না পেয়ে ওই রাতেই শ্রীমঙ্গল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন বাবা কল্যাণ দেব।


কল্যান দেব এজাহারে আরও উল্লেখ করেন, ঐ রাতে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একজন অজ্ঞাতনামা নারী ফোন করেন, তবে তিনি নিজের ব্যস্ততার কারনে ঐ নারীর সাথে কথা বলতে পারেননি। পরদিন সকালে পুলিশ মারফত জানতে পারেন, তার ছেলের লাশ উপজেলার লাখাই চা বাগানের ১নং সেকশনের ভেতরের রাস্তায় শোয়া অবস্থায় পাওয়া গেছে। লাশের পাশে সাক্ষরের ব্যবহৃত মোটর বাইকটি ও আশেপাশে বিভিন্ন ওষুধের স্ট্রিপ ছড়ানো ছিলো। থানা পুলিশ ও সিআইডি সুরতহাল ও ঘটনার আলামত সংগ্রহ করে। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি তার আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে জানতে পারেন যে শ্রীমঙ্গল শহরের এক মেয়ের সাথে সাক্ষরের গভীর প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে।


আলোচিত এ ঘটনা নিয়ে সোস্যাল মিডিয়াসহ নানা মহলে বিভিন্ন গুঞ্জনের কথাও আলোচনা হচ্ছে। এর মধ্যে সাক্ষর আর তাঁর কথিত প্রেমিককে নিয়ে নানা গুঞ্জনের ডালপালাও মেলছে। প্রেম ঘটিত বিষয়টি বেশিরভাগ চাউর হচ্ছে। এ বিষয়টি তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন সাক্ষরের একাধিক সম্পর্ক নিয়ে। সাক্ষরের পরিবারের দাবি ওই প্রেমিকাই প্রথমে তাঁর ব্যবহৃত ফোনে ফোন দিয়ে ওই দিন বিকালে সাক্ষরকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়।


স্বাক্ষরের পরিবারের দাবী সাক্ষর যখন বাসা থেকে বেড়িয়ে যায় তখন তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে দুটি সিম লাগানো ছিল। এর একটিতে নিখোঁজের পর তার অপেক্ষায় থাকা মা যখন ফোন দেন, তখন অপর প্রান্থ থেকে অন্য একজন রিসিভ করে বলতে থাকেন এখানে স্বাক্ষর টাক্কর কেউ নেই। তবে পুলিশ স্বাক্ষরের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের একটি সিম উদ্ধার করলেও যে নাম্বারে নিখোঁজের পর স্বাক্ষরের মায়ের কথা হয় বলে দাবী করেন তার মা,সেই কথিত নাম্বারের কোন হদিস মিলছেনা।


সাক্ষরের মৃত্যুর বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য জানতে গিয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ইছবপুর গ্রামে সাক্ষরের বাড়িতে গিয়ে দেখা হয় তার বাবা কল্যাণ দেবসহ পরিবারের সদস্যদের সাথে। ঘরে গিয়ে দেখা যায় যে রুমে সাক্ষর থাকে সেরুমের বিছানার খুব কাছেই তাঁর পড়ার টেবিল। সেখানে সাক্ষর নেই, তবে পড়ে আছে তাঁর ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্রসহ অগোছালোভাবে বই,কলম-খাতা। সাক্ষর যে বিছানায় ঘুমায় সেখানেই বসে ছিলেন বাবা কল্যাণ দেব। ঘরে প্রবেশ করে প্রথমেই সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি বসতে বলেন।


প্রথমে সাক্ষরের মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বাবা কল্যাণ দেব জানান,ঘটনার পর যখন বিষয়টি পুলিশকে জানাই তখন তারা থানায় বসেই ট্রেকিং করছিলেন, রাতে তার সন্ধানে আমরা আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে লাউয়াছড়া,গ্র্যান্ড সুলতান, শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ী এলাকাসহ নানা জায়গা অস্থিরভাবে খোঁজাখোঁজি করছিলাম, তখনও পুলিশ থানায় বসা। সকাল ৬টার দিকে আমরা লাউয়াছড়া এলাকায় যখন সাক্ষরকে খোঁজছিলাম তখন আমরা পুলিশের মাধ্যমে প্রথমে জানতে পারি সাক্ষরের মৃতদেহ পাওয়ার তথ্য। আমরা খবর পাওয়া মাত্র ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পাই সাক্ষরের মরদেহ পড়ে আছে সেখানে। ঘটনাস্থলে সাইকেল পাওয়া গেলেও তার ব্যবহৃত মানিব্যাগটি পাওয়া যায়নি,যেটাতে মেমোরী কার্ড,বেশ কিছু ছবি এবং সাক্ষরের স্টোডেন্ট একাউন্ট এর কার্ড রয়েছে। ওই একাউন্টে জমা রয়েছে ১৭হাজার টাকার মত বলে জানান সাক্ষরের বাবা।


তিনি বলেন, আমার ভাগনির মাধ্যমে জানতে পারি সাক্ষরের এক মেয়ের সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, মাঝে ওর সাথে সাক্ষরের সম্পর্কের টানাপোড়ন চলছে। হয়তো ওই মেয়ে অন্যেকোন ছেলের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কারনে এই টানাপোড়ন, মনে করেন সাক্ষরের বাবা কল্যাণ দেব। কল্যাণ দাবী করেন, সাক্ষরের ব্যবহৃত দুটি সিমকার্ড এর মধ্যে গ্রামীণ ফোনের একটি নাম্বার পুলিশ উদ্ধার করলেও এয়ারটেলের যে নাম্বারে সাক্ষরে মায়ের কথোপকথন হয় এবং অপর প্রান্থ থেকে বলা হয় সাক্ষর টাক্কর কেউ নেই সেই কথিত নাম্বারের হদিস পাওয়া যাচ্ছেনা।


তিনি আরো বলেন, আমার ধারনা যে মেয়ের সাথে সাক্ষরের সম্পর্ক সেই মেয়েই সব কিছু জানে, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই সব কিছু বের হয়ে আসবে যেটি আমরা আগেই পুলিশকে বলেছি। কারন ঘটনার দিন প্রথমে ফোন পেয়ে সাক্ষর যে পোষাক পড়ে ঘর থেকে বেড় হয় সেটা তাঁর খুব একটা পড়া হয়না।
এদিকে এই ঘটনা হত্যা না আত্মহত্যা তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে রহস্য। কারন সাক্ষরের বাসা থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার হবে অন্তত। সাক্ষর যদি আত্মহত্যা করেই থাকে তাহলে তার আশপাশেও রয়েছে নির্জণ এলাকা, সেখানে না গিয়ে এতদূরের লাখাই ছড়া চাবাগানের এত গভীরে গিয়ে কেন এমন ঘটনা ঘটাতে যাবে এমন প্রশ্নও সাক্ষরের পরিবারের।


সাক্ষরের পরিবার জানায় তার সপ্ন ছিল বিমান বাহিনীতে ভর্তি হওয়ার , সে লক্ষ্যে সে ফরম পূরন করে যথারীতি ঢাকা যাওয়ারও প্রস্তুতি নেয়, তবে সেটা আর সম্ভব হয়নি।
সাক্ষরের মৃত্যু নিয়ে কথা হয় ৮০ বছর বয়সী দাদা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কৃপেশ চন্দ্র দেব এর সাথে। এসময় কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, এতদূর গিয়ে সে কেন এমন ঘটনা ঘটাবে? এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন আমি মনে করি তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।


অপরদিকে ঘটনাস্থল ফিনলে কোম্পানীর মালিকানাধীন লাখাইছড়া চাবাগানে গিয়ে সেদিনে ঘটনার সরেজমিন তথ্য জানতে আশপাশে অনেক চা শ্রমিকদের সাথে কথা হলেও তারা এবিষয়ে কিছুই জানে না বলে জানায়। তবে পথেই দেখা হয় ওই চাবাগানের ব্যবস্থাপক জাকির হোসেনের সাথে। এসময় তিনি জানান, আমি ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানতাম না, সকাল বেলা বাগানের এক শ্রমিক এসে জানায় ১নং সেকশনে একটি মৃতদেহ পড়ে আছে। সেখানে গিয়ে দেখি একটি রক্তমাখা মোবাইল ফোন, বিভিন্ন ঔষধ এর স্ট্রিপ এবং মৃতদেহের মাথার নীচে একটি চা গাছের ডাল রয়েছে। মৃতদেহের খুব কাছেই পাওয়া যায় একটি মোটর সাইকেল। তিনি জানান, ঘটনার আলামত হিসেবে সেখানে যা কিছু পাওয়া যায় তা ঘটনাস্থলে সিলেট থেকে আসা সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট সংগ্রহ করেছেন।


শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) আব্দুস ছালেক বলেন, এঘটনায় আমাদের ইনভেস্টিগেশন চলছে পাশাপাশি সাক্ষরের একাধিক মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল সেটাও ঠিক আছে। ঘটনাস্থলে সে একা গেছে না তার সাথে আর কেউ ছিল সেটা জানতে কালিঘাট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে আমরা দেখতে পাই সেখানে সে একাই গিয়েছে। তিনি বলেন, তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন চেক করে একটি এসএমএস পাওয়া যায়, যেখানে চিত্রা নামে এক মেয়ের কাছে সাক্ষর কিছু নেশা জাতিয় ঔষধ সম্পর্কে জানতে চায় এগুলো খেলে কী হয়। তবে শ্রীমঙ্গলের এক তরুনীর সাথেও সাক্ষরের সম্পর্ক ছিল বলেও তিনি স্বীকার করেন।


বর্তমানে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত করছেন শ্রীমঙ্গল থানার উপ-পরিদর্শক এসআই মো. ফরিদ মিয়া ,এবিষয়ে জানতে ফোনে কথা হলে তিনি জানান, এটি হত্যা না আত্মহত্যা সেটি ময়না তদন্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত বলতে পারছিনা। মামলার তদন্ত কাজ চলছে আশা করি দ্রæত এর জানতে পারবেন আপনারা। তিনি বলেন এঘটনায় সাক্ষরের বাবা যে মেয়ের বিষয়ে অভিযোগ করেছেন তাঁকেও আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি, তবে এবিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তদন্তকারী এ কর্মকর্তা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯২ বার

Share Button