শিরোনামঃ-


» তিনি ,সৈয়দ মহসিন আলী

প্রকাশিত: ২৪. নভেম্বর. ২০১৭ | শুক্রবার

সৌমিত্র দেব

প্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। মৃত্যু তাকে সশরীরে দূরে সরিয়ে দিলেও এখনো তার স্মৃতি তার কর্ম তাকে আমার নিকটবর্তী করেই রেখেছে। এবং আমি এও জানি, শুধু আমি নই আমার মতো লক্ষ লক্ষ মানুষ তাকে তাদের কাছের মানুষ বলেই মনে করত। এখনো করে। আর এটা সম্ভব হয়েছে তাঁর দুর্লভ কিছু গুণাবলীর জন্য।
মহসিন আলীর নাম আমি প্রথম শুনি আমার হাফপ্যান্ট পরা শৈশবে। আমার বাবা সরকারি চাকরিজীবী হলেও খুব রাজনীতি সচেতন ছিলেন। তাঁর অনুজপ্রতীম বন্ধু ছিলেন প্রতিবেশী ডা. সত্যরঞ্জন দাশ। তারা দুজনে সব সময় শলাপরামর্শ করতেন, ‘পৌরসভা নির্বাচনে এবার যেভাবেই হোক মহসিনকে জিতিয়ে আনতে হবে।’ তার পরেই দেয়ালে দেয়ালে দেখলাম আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী সৈয়দ মহসিন আলীর ছবি। মার্কা ঘড়ি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সাজ্জাদুর রহমান পুতুল। সেই ছোট বয়সেই টের পেতাম, পুতুল মিয়া বাবাকে পটানোর জন্য ঘন ঘন আমাদের বাসায় আসতেন। আমাকে আদর করতেন। কিন্তু বাবা মহসিন বলতে অজ্ঞান। সেবারের নির্বাচনে মহসিন আলী বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এর আগের বার নাকি পুতুল মিয়ার কাছেই হেরে গিয়েছিলেন। পরপর তিনবার পৌর নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন মহসিন আলী। জীবন সায়াহ্নে এসে মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে আমার পাতে খাবার তুলে দিতে দিতে শ্রদ্ধার সঙ্গে বাবার অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি। মিন্টু রোডে সেই দুপুরে খাবার টেবিলে তখন ছিলাম আমরা তিনজন। আমাদের দুজনের সঙ্গে ছিলেন তাঁর বন্ধু কলকাতা থেকে আসা সমশের সাহেব। আমার স্মৃতি তখন চলে গেছে ১৯৮৬ সালের ১২ মার্চ রাত তিনটায়। আমার বাবা মারা গেছেন। নিকট আত্মীয়দের কেউ কেউ চলে এসেছেন। দেব ভবনের উঠোনে তুলশী তলায় শোয়ানো হয়েছে বাবার মৃতদেহ। সেই গভীর রাতেই  লুঙ্গি  পরে ছুটে এসেছেন সেই সময়ের এমপি আজিজুর রহমান ও পৌরসভার চেয়ারম্যান সৈয়দ মহসিন আলী। পিতৃশোক ভুলে গিয়ে আমি তখন চিন্তা করেছিলাম, রাজনীতিবিদরা কি রাতে ঘুমান না! সুকান্তের কবিতায় সেই রানারের মতো জীবনের সব রাত্রিকে অল্পদামে কিনে নিতে পেরেছিলেন বলেই আজিজুর রহমান, মহসিন আলীরা জননেতা হতে পেরেছেন। সেই রাতেই আমি প্রথম মহসিন চাচার সঙ্গে কথা বলার সাহস সঞ্চয় করি। আমার নিজের কাকাদের চেয়েও আপন মনে হয় তাকে।


বাবার মৃত্যুর এক বছর পর আমি ম্যাট্রিক পাস করি। কলেজে জড়িয়ে পড়ি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে। তিনি আওয়ামী লীগের নেতা। রাজনৈতিক সম্পর্ক ভিন্ন মেরুতে হলেও পারিবারিক সম্পর্কে কোনো চিড় ধরেনি। বরং সহযোগিতাই পেয়েছি সব সময়। কিন্তু মুখচোরা স্বভাবের কারণে খুব একটা যাওয়া হতো না তার কাছে। তবে আমার লেখালেখির খবর তিনি রাখতেন। আমাকে কবি বলে সম্বোধন করতেন। ২০০৩ সালে সংস্কৃতি সংসদ নামে একটি আবৃত্তি সংগঠন গঠন করি। পুরাতন হাসপাতাল রোডে ব্যবসায়ী কুতুব চাচার বাসায় আমাদের মহড়া হতো। কুতুব চাচার মেজো মেয়ে তহুরা ছিল আমার সহপাঠী বন্ধু। ওর ছোট দুই বোন সাকো, লিমা ও একমাত্র ভাই নাসির ছিল সংস্কৃতি সংসদের সদস্য। সাকোর বন্ধু নিপা ছিল খুব উদ্যোগী। আমরা নিয়মিত অনুষ্ঠান করতাম পৌরসভা মিলনায়তনে। বিনা ভাড়ায় অনুষ্টান করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন মহসিন চাচা। আমার এখনো মনে আছে আমাদের প্রথম অনুষ্ঠানে মহসিন চাচা ছিলেন প্রধান অতিথি। আর আমি ছিলাম সভাপতি। তার পাশে বসতে গিয়ে নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে কথা বলে স্বাভাবিক করেন। আমাকে মাঝখানের চেয়ারে বসান। বলেন, সভাপতিকে অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হতে হয়। তিনিই প্রথম আমাকে একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরেন। পৌরসভার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমার নাম তালিকাভুক্ত করে নেন। অন্যদিকে আমি তখন দেখেছি ব্যক্তিত্বে তিনি মহীরূহ হয়ে উঠেছেন।

 

সৈয়দ মহসিন আলী  নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শে ছিলেন নিষ্ঠাবান, দলীয় কর্তব্যে ছিলেন অবিচল। রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিরুদ্ধ শক্তি থাকার পরেও কখনো কোনো প্রলোভন বা ভয়-ভীতি তাকে বিচ্যুত করতে পারেনি। কিন্তু দলের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও ভিন্ন মতাবলম্বীর প্রতি শ্রদ্ধা বা স্নেহ প্রদর্শনেও কখনো তিনি পিছপা ছিলেন না। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান মৌলভীবাজারের দুটি আসনে প্রার্থী হয়ে দুটিতেই জামানত হারিয়েছিলেন। সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী করেন। দূরদর্শী সৈয়দ মহসিন আলী সাইফুর রহমানকে মৌলভীবাজারের কৃতিসন্তান বিবেচনা করে পৌরসভার পক্ষ থেকে এক বেনজির সংবর্ধনা দিয়েছেন। দলীয় বিবেচনাকে বড় করে না দেখে গুণী মানুষকে সম্মান করে নিজেই বড় হয়েছেন তিনি।
২০০৩ সালে জীবিকার প্রয়োজনে আমি ঢাকা চলে যাই। কাজ শুরু করি দৈনিক প্রথম আলোয়। ২০০৪ সালে যোগ দেই মানবজমিনে। সে সময় পৌরসভা নির্বাচনের নিউজ কাভার করতে মৌলভীবাজারে যাই। মহসিন চাচা সেই নির্বাচনেও প্রার্থী ছিলেন। তখনো তিনি আমাকে নানা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। ওই নির্বাচনকে সেই সময়কার শাসক দল বিএনপির নেতৃবৃন্দ বিতর্কিত করে তুলেছিলেন। মহসিন চাচাসহ অন্য প্রার্থীরা দুপুরের মধ্যে নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করলে অনায়াসে জয়ী হন বিএনপি প্রার্থী ফয়জুল করিম ময়ূন।
২০০৫ সালে একটি সাহিত্য সম্মেলনে আমেরিকা ঘুরে আসি। তারপর নেপাল ও চীন। মৌলভীবাজারে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে এই সংবাদ জানালে তিনি বলেন, আমার সব খবরই তার কাছে আছে। তিনি গর্ববোধ করেন আমাকে নিয়ে।

২০০৮ সালে হঠাৎ করে খবর পাই মহসিন চাচা গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন ঢাকায়। ছুটে যাই তাকে দেখতে। তিনি অভিমানের সঙ্গে বলেন মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক তার বন্ধু মতিউর রহমান চৌধুরী একবারও তাকে হাসপাতালে দেখতে আসেননি। আমি খবরটি মতিউর রহমানকে জানালে তিনি লজ্জিত হন। হাসান শাহরিয়ার, জগলুল আহমদ চৌধুরীসহ দেশের অনেক বড় সাংবাদিক ব্যক্তিগতভাবে তার বন্ধু ছিলেন। শ্যামল দত্ত, পীর হাবিবুর রহমান, মুন্নী সাহা প্রমুখ সাংবাদিকরাও তাঁর স্নেহধন্য ছিলেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে মহসিন চাচা বিজয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন দোর্দন্ড প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। সেই নির্বাচনে আমি তাকে ভোট দিতে মৌলভীবাজারে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার বিজয়ের পেছনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারিনি। তিনি অবশ্য ডাকেনওনি আমাকে। বরং নির্বাচনের আগে একাধিকবার বিভিন্ন কৌশলী জনসভায় বক্তৃতা করতে আমাকে কালিহাতী নিয়ে গিয়েছিলেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। তাই সঙ্গত কারণেই লতিফ সিদ্দিকী সাহেবের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল বেশি। আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতি না করলেও লতিফ সিদ্দিকীর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবার পর প্রেসক্লাবে আমার অনুষ্ঠানেই প্রথমবারের মতো প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন। ২০০৯ সালের ২রা এপ্রিল অনলাইন গণমাধ্যম রেডটাইমস বিডি ডটকমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় সেদিন। এ সময় খবর পাই এমপি হবার পরেও এলাকায় কোণঠাসা হয়ে আছেন মহসিন চাচা। সেই সময়ের চিফ হুইফ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ তাকে কোনো কাজ করতে দিচ্ছেন না। প্রশাসন তাকে উপেক্ষা প্রদর্শন করছে। এমনকি মৌলভীবাজারে কোনো অনুষ্ঠানে তাকে অতিথি হিসেবেও রাখা হয়না। এসব খবর শুনে আমি সিদ্ধান্ত নেই চাচাকে নিয়ে মৌলভীবাজারে অনুষ্ঠান করব। ডিসেম্বর মাসে আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের একটি অনুষ্ঠানে মৌলভীবাজার পাবলিক লাইব্রেরিতে তাকে প্রধান অতিথি করা হয়। বিশেষ অতিথি ছিলাম আমি। সভাপতি ছিলেন এডভোকেট ডাডলি ডেরিক প্রেন্টিস। আমার এই উদ্যোগে চাচা খুব খুশী হন।
এই ঘটনার মাসখানেক পরে চাচার অনুসারীরা মৌলভীবাজারে একটি পাট বস্ত্র মেলার আয়োজন করে। তাদের অনুরোধে সেই মেলায় প্রধান অতিথির ভূমিকা পালনের জন্য তখনকার পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর সম্মতি আদায় করি। সভাপতিত্ব করবেন সৈয়দ মহসিন আলী এমপি। কিন্তু প্রতিপক্ষের হস্তক্ষেপে জেলা প্রশাসক সেই মেলার আয়োজনে বাগড়া দেন। ক্ষেপে যান সিদ্দিকী। শেষ পর্যন্ত তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে। জেলা প্রশাসক ক্ষমা চাইলেও তিনি আর ফিরে আসেননি। অপমানিত বোধ করেন মহসিন আলী। তিনি আমার সঙ্গে লতিফ সিদ্দিকীর হেয়ার রোডের বাসায় যান। আবদুস শহীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিদ্দিকী। সে সময় চাচার সঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। তিনি মহসিন চাচাকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে সব সময়ই আমরা মহসিন ভাইয়ের সহযোগিতা পেয়েছি। কিন্তু আমার কাছে অতীতের সেই চেয়ারম্যান মহসিন আলীর চেয়ে অনেক বেশি অসহায় মনে হয় জাতীয় সংসদ সদস্য মহসিন আলীকে।

 

২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর মন্ত্রী পরিষদে চমক আসে। আমার চাচা সৈয়দ মহসিন আলী সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। খবর পেয়ে ছুটে যাই তার ন্যাম ফ্ল্যাটের বাস ভবনে। গিয়ে দেখি আমার কাকা শ্রীমঙ্গল উপজেলার চেয়ারম্যান রণধীর দেবসহ বহু লোক। আমাকে দেখে সবার সামনেই উল্লাস প্রকাশ করে চাচা বললেন, ভাতিজা তোমার কবিতার বই কই? বহুদিন তোমার কবিতা শুনি না। এই হলেন মহসিন আলী। অনেক উপেক্ষার পর যে মন্ত্রিত্ব তিনি লাভ করেছেন সেই আনন্দের চেয়েও বড় তার কাছে আমার কবিতা। কিন্তু কি বিচিত্র কারণে যেন প্রথম থেকেই মিডিয়া তাকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরল। তার অসতর্ক সরল কথাবার্তা নিয়ে শুরু হলো মশকরা। আমি চাইলাম মিডিয়ার সঙ্গে তার একটি সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলতে। কিন্তু সুযোগ পেলাম না। টের পেলাম একটা কৃষ্ণ বলয় তাকে ধীরে ধীরে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। যাদেরকে কোনো দিন আগে দেখিনি এমন সব লোক তার ডানেবামে। পরবর্তীতে সেখানে আরও যোগ হলো অযোগ্য, অপদার্থ আরও কিছু লোক। এদের কারণে ঘটতে লাগলো একের পর এক দুর্ঘটনা। প্রকাশ্যে ধূমপানের কারণে যখন মিডিয়ায় ঝড় উঠল তখন কলম না ধরে থাকতে পারলাম না। লিখলাম আমার অনলাইন মাধ্যমে। তারপর যখন পতিতাপল্লী উচ্ছেদকারীদের শিরশ্চেদের হুমকি দিয়ে আবার মিডিয়ার কাছে ভিলেন হলেন তখনো আমি তার ভূমিকাকে যীশু খ্রিষ্টের সঙ্গে তুলনা করলাম। সমগ্র মিডিয়া সাম্রাজ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চাচার পক্ষে কলম হাতে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। চাচার অনুসারীরা সেগুলো শেয়ার করে ছড়িয়ে দিল ফেসবুকে। আমি ভাবতাম এগুলো নিশ্চয়ই মন্ত্রী মহোদয়ের চোখে পড়েছে। অনেক পরে জেনেছি মহসিন আলী আদৌ অনাইন বান্ধব ছিলেন না। আমার লেখাগুলো কেউ তাকে দেখায়নি। আমার প্রতি তার স্নেহের কমতি ছিল না। কিন্তু সেটা এই লেখার জন্য নয়। পারিবারিক সম্পর্ক আর কবিতার জন্য। আমি খবর পেতাম চাচা অনেক অনুষ্ঠান করেন তার বাসায়। কিন্তু আমি খবর পাই পরে। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করি। আর তখনই বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। চাচা ভাবতেন, আমি দাওয়াত পেয়েও তাকে উপেক্ষা করি। আর আমি ভাবতাম তিনি দাওয়াত দেন না। মাঝখানে এক কুচক্রী মহল এই কারসাজি করছে। তখন থেকে তিনি তার মিন্টু রোডের বাসায় প্রায় সকল অনুষ্ঠানে আয়োজকের দায়িত্ব দেন আমাকে। অন্যদিকে চাচার মধ্যম কন্যা সৈয়দা সানজিদা শারমিন আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে চাচার জীবনী রচনার। তবে কাজটি সহজ ছিল না। কারণ সৈয়দ মহসিন আলী ভোর থেকে গভীর রাত্রি পর্যন্ত ছিলেন মানুষের জন্য নিবেদিত। নিজের জীবন কথা শোনানোর মতো সময় কোথায় তার।

এরই মধ্যে কাটাবনে আমার অফিস উদ্বোধন করতে যান। কনকর্ড এম্পোরিয়ামে বেসম্যান্টে অফিস। তার হাঁটুতে ব্যথা। এসব নিয়েই পরম স্নেহে আমার অফিস উদ্বোধন করেন। আলোচনা চলছে অফিসে। কিন্তু তিনি চেয়ারে বসে নেতিয়ে পড়েছেন। নিজেকে আমার অপরাধী মনে হচ্ছিল। অফিস উদ্বোধন করতে নিয়ে এসে এই অসুস্থ মানুষটিকে কষ্ট দিচ্ছি। হঠাৎ চাচা বলেন, চা আনো। দৌড়ে চা নিয়ে আসা হলো। পান করলেন। তারপর অনুমতি চাইলেন ধূমপানের। পরপর তিনটে সিগারেট ধরালেন। ততক্ষণে আমি তার কাছে ক্ষমা চেযে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানছি। কিন্তু তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে অসাধারণ এক আলোচনা শুরু করলেন। এরপর সবার অনুরেধে একের পর এক গান। সবাই অবাক। চোখ বন্ধ করে তিনি যে সবার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন সেটা বুঝতেও কারও বাকি থাকল না। কাটাবন কনকর্ড এম্পোরিয়ামের সেই মার্কেট নববর্ষের বই মেলাতেও তিনি এসেছিলেন আমার আমন্ত্রণে। আয়োজনে দীনতা ছিল, কিন্তু ভাতিজার আমন্ত্রণ গ্রহণে কখনোই কার্পণ্য ছিল না চাচার।
প্রেসক্লাব ও পাবলিক লাইব্রেরির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সৈয়দ মহসিন আলীর সঙ্গে বিশেষ অতিথির মর্যাদা লাভ করেছি। ঢাকা ক্লাবও বাদ যায়নি। কিন্তু দূরে কোথাও তার সফরসঙ্গী হবার সুযোগ হয়নি আমার। মন্ত্রী হবার কয়েক মাস পর শ্রীমঙ্গলে বালিশিরা ভ্যালিতে তার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে সঙ্গে গিয়েছিলাম আমি। সেখানে তিনি এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন গান গেয়ে আসর মাতিয়ে তুলেছিলেন। চাচার অনুরোধে সেখানেও কবিতা পাঠ করি আমি। পরে তার আমন্ত্রণে শ্রীমঙ্গলেই থার্টি ফার্স্ট নাইট ও বর্ষবরণের অনুষ্ঠান অংশ নেই।
একবার বাংলাদেশ রেলওয়ের বিশেষ সেলুনে তার সফরসঙ্গী হবার সুযোগও পেয়েছিলাম সেখানে আমার খাওয়া, ঘুম সবকিছু ঠিকমতো হচ্ছে কিনা সব ব্যাপারেই ছিল তার সজাগ দৃষ্টি। পিতার মমতা নিয়ে তিনি অনেক সময় আমার মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে তাকে নেপাল সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সে দেশের রাষ্ট্রদূত। সেখানে তিনি তার খরচে আমাকে সফরসঙ্গী করতে চেয়েছিলেন। জমা নিয়েছিলেন আমার পাসপোর্ট। তাকে ঘিরে থাকা অযোগ্য অদক্ষ, কুচক্রীকূলের মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল। পরে যখন বিশেষ কারণে সেই সফর বাতিল হলো তখন যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল তাদের। কারণ আমি সঙ্গে গেলে তাদের অনেক জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাবে। বিশেষ করে আমি পাশে থাকলেই মিডিয়ায় সৈয়দ মহসিন আলীর ইতিবাচক ইমেজ গড়ে উঠবে এটা বুঝতে তাদের অসুবিধা হচ্ছিল না। এটা একটা প্রমাণিত সত্য ছিল, যতগুলো জায়গায় তিনি প্রকাশ্যে ধূমপান করেছেন, অকথ্য গালাগাল করেছেন সাংবাদিকদের তার কোনটিতেই আমি পাশে ছিলাম না। শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত এই লোকটিকে ওই অপদার্থরা উত্তেজিত করত তাদের কীর্তিকলাপ দিয়ে। আর তার বিস্ফোরণে ঘটত নানা অঘটন।
ব্যক্তিজীবনে লেখক, শিল্পী, সাংবাদিকদের খুবই শ্রদ্ধা করতেন সৈয়দ মহসিন আলী। তিনি গুণীর কদর করতে জানতেন। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় তিনি শিল্পীদের সাহচর্য নিতেন। বসাতেন কবিতা ও গানের আসর। মাহফিল শেষে ছোটবড় সবাইকে একসঙ্গে আপ্যায়ণ করতেন নৈশভোজে। রাত গভীর হলে তাদের যাতায়াতের ব্যবস্থাও করতেন। পরবর্তীকালে মিন্টু রোডের সেই বাড়িতেই গুণী শিল্পীদের জন্য গড়ে তুলেছিলেন অতিথিশালা।
গরিব মানুষরা খুব সহজেই এই ব্যতিক্রমধর্মী রাজনীতিবিদের কাছে যেতে পারত। তার দরজা ছিল সবার জন্য খোলা। আমি নিজের চোখে দেখেছি ময়লা পোশাকের অনেক নরনারী এসে মন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরছে। তাদের সুখ দুঃখের গল্প শোনাচ্ছে। তিনি তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করছেন। তার বাসায় প্রতিদিন কয়েক শ মানুষের রান্না হতো। গরিব রোগীদের জন্য তিনি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। এমনকি নিজের বাস ভবনেই গড়ে তুলেছিলেন গরিব রোগীদের জন্য মিনি হাসপাতাল। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত তিনি সাধারণ মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তাদের প্রতিকারের ব্যবস্থা করতেন। আমি একদিন ক্ষোভের সঙ্গে তাকে বলেছিলাম, আপনি এখন দেশের মন্ত্রী। তৃণমূলের জনপ্রতিনিধি নন। সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন কখন। জবাবে তিনি বলেছিলেন, এই সাধারণ মানুষেরাই সাইফুর রহমানের মতো জাঁদরেল রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আমাকে ভোট দিয়েছে। বিনিময়ে তাদের কথা আমাকে শুনতেই হবে। ভুপেন হাজারিকার ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্যে’ গানটি তিনি খুব ভালোবাসতেন। এর কথাগুলো মনে প্রাণে গ্রহণও করেছিলেন। তিনি সমাজতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। আমি বলতাম, আপনার কথাবার্তা তো বামপন্থীদের কাছাকাছি। তিনি বলতেন আওয়ামী লীগ একটা প্লাটফর্ম। এর মধ্যে ডানপন্থী আছে। বামপন্থীও আছে। তিনি অবশ্যই বামপন্থী আওয়ামী লীগার।
সৈয়দ মহসিন আলী কোনো খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অনেক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে আমরা বিপথগামী হতে দেখেছি। কিন্তু সৈয়দ মহসিন আলীকে আমরা দেখেছি মনে ও মননে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে। তিনি ছিলেন উদার, আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব।
সৈয়দ মহসিন আলী কট্টরপন্থী ধার্মিক ছিলেন না। তবে নাস্তিকও ছিলেন না। তিনি সুফীবাদী তরিকায় আস্থাশীল ছিলেন। পীর-ফকিরে তার আস্থা ছিল। মাজার সংস্কৃতির প্রভাব ছিল তার মধ্যে। তার অন্তিম শয্যাও হয়েছে হজরত শাহমোস্তফা (রঃ) এর দরগায়। তিনি জানতেন যুক্তিতে বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত, বিশ্বাসে ধর্ম। একজন যুক্তিবাদী বিশ্বাসী হতে পারেন। আবার একজন বিশ্বাসীও যুক্তিবাদী হতে পারেন। সৈয়দ মহসিন আলী ছিলেন সে রকমই একজন মানুষ। তিনি লোক দেখানো ধর্ম কর্মে আগ্রহী ছিলেন না। সঙ্গীত ছিল তার কাছে প্রার্থনার মতো।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৪২৯ বার

Share Button