» সত্যি এ এক অন্যরকম ঈদ

প্রকাশিত: ৩১. জুলাই. ২০২০ | শুক্রবার

কাজী আনারকলি

সত্যি এ এক অন্য রকম ঈদ ! নেই আনন্দ মিছিল।নেই করমর্দন।নেই কোলাকুলি।নেই কদমবুচি।

একবিংশ শতাব্দীর দুহাজার কুড়ি সন ‘করোনা ভাইরাস’ এর থাবার সামনে নতজানু। দুর্বার গতিতে চলতে চলতে হঠাৎ পৃথিবী যেন ২০২০ এ এসে থমকে গেছে।সীমাহীন নীলাকাশ, রবি-শশী, নক্ষত্রপুঞ্জ সবই ঠিকঠাক।শুধু গাছগাছালী নব যৌবনে দীপ্তিমান।আর জীববৈচিত্র্য গায় জীবনের জয়গান।

সীমিত আকারে চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি হলেও আমরা অনেকেই এখনও স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইনে দিন যাপন করছি। আবার অনেকেই ‘করোনা ভাইরাস’ এর কোনো রকম তোয়াক্কা না করে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে অবাধ চলাচল করছি। কেউ কেউ সবোর্চ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে মাস্ক ব্যবহার করছি। তবে আমার মতে, অনেক অনেক কম। সত্যি বলতে কী আমরা এখনও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় সচেতনেতা বিষয়ে অনেক বেশি পিছিয়ে আছি।

একদিকে আমরা সচেতন থাকার কথা বলা হলেও সচেতন থাকছি না। আবার অন্যদিকে ‘করোনা’ আতঙ্কে কিছু অমানবিক আচরণের ভিন্ন চিত্রও অঙ্কন করছি ।

মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব। মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সর্বোচ্চ জ্ঞান-প্রজ্ঞা এবং বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। বহির্বিশ্বের দিকে তাকিয়ে একুশ শতকের ঊষা লগ্নে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি ! আর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি যেনো বিশ্বকে আরও পেছনে ঠেলে দিচ্ছে !

চারিদিকে মৃত্যুর বিভীষিকা !
প্রাণী মাত্রই মৃত্যুকে ভয় পায়।এই ক্ষণস্থায়ী জগৎ সংসার ছেড়ে কিছুতেই কেউ যেতে চায় না অনন্ত জগতের অধিবাসী হতে।

মৃত্যুর মতো এই কঠিনেরে মেনে নিয়ে
যে চলে যায় তাকে আমরা যার যার ধর্মীয় রীতি মেনে দাফন বা সৎকার করে থাকি।
এই মানবিক বোধের কি আজ বিপর্যয় ঘটছে ?

মৃত্যুকে এতো ভয় ? আমরা যদি আস্তিক হই, মহান সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করি তবে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে কার কখন এবং কিভাবে মৃত্যু হবে সেটা যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনি পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। আর সেজন্যই মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে মৃত্যুকে জয় করতে হবে।

করোনা ভাইরাস পৃথিবীর জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। একদিকে দেখছি কিছু মানবতা বোধ সম্পন্ন মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনাত্মীয় , অচেনা করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সেবা যত্ন করে নিজেদের জীবন হাসিমুখে বিপন্ন করে তুলছে। করোনা ভাইরাসের কারণে মৃত ব্যক্তিদের দাফন ও সৎকার করে বিশ্ব মানবতার পরিচয় দিচ্ছে। আর অন্য দিকে দেখতে পাচ্ছি, করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের নিজ সন্তান বা অত্যন্ত কাছের মানুষ দ্বারা প্রতারিত হচ্ছেন‌। এ কেমন মানুষ আমরা ? যে মা দশ মাস দশ দিন নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে তার জঠরে ধারণ করেছেন । তার ঘুম ,আরাম আয়েশ ত্যাগ করে, বিনোদন বিসর্জন দিয়ে তাকে আস্তে আস্তে বড়ো করে তুলেছেন । তিনি করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হবার ফলে তার স্থান হয় গভীর জঙ্গলে ! যে মানুষটির অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে একটি পরিবার সুন্দর ও সুখি হয়ে উঠেছিলো এতো দিন ,যেই মানুষটি ছিলো একটা পরিবারের মধ্যমণি সেই মানুষটি হঠাৎ করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ায় মুহূর্তেই অন্তত কালের জন্য তাকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে ? তাকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখতে হবে ? তাকে এক গ্লাস পানি দিতেও স্বজনেরা কুণ্ঠাবোধ করবে ? তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করতে এতোই বেপরোয়া হয়ে উঠছে স্বজনের মন ? এটা কি একজন মানুষকে স্বেচ্ছায় হত্যা করার সামিল নয় ? যারা এই কাজটি করছে তাদের খুনী বলা যায় কী ? বিচারের ভার পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম । এরচেয়ে বেশি কিছু আমি এই মুহূর্তে ভাবতে পারছি না ।

বৈশ্বিক এমনি এক ক্রান্তিলগ্নে এসে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার পরিবর্তে
মনটা যেনো দিন দিন ছোট হয়ে আসছে।

এরই মধ্যে অত্যন্ত নিরানন্দে আমরা ‘ঈদুল ফিতর’ ২০২০- উদযাপন করেছি ।
‘ঈদুল আযহা’ ২০২০ -উৎসবও একইভাবে পালন করতে হবে।

ঈদ সামাজিক উৎসব। কোভিড-১৯ এর ভীতিকর পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের যতোটুকু সম্ভব সীমিত ভাবে এই উৎসব পালন করার অঙ্গীকার রাখতে হবে।

আমরা মুসলমানরা বছরে দুটো ঈদ উৎসব পালন করে থাকি। একটি ‘ঈদুল ফিতর’ ও আর একটি ‘ ঈদুল আযহা’ ।

‘ ঈদুল আযহা’ র অন্যতম ও আকর্ষণীয় দিক হলো কুরবানী করা। এই কুরবানী আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতার প্রতীক।
এদিনটিতে মুসলমানরা (পুরুষ)সকালে ঈদগাহে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় শেষে বাড়িতে ফিরে এসে যার যার আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী গরু,ছাগল,ভেড়া,মহিষ, উট ইত্যাদি আল্লাহর নামে কুরবানী করে থাকেন।
‘ঈদুল আযহা’ হলো ত্যাগোৎসব। অর্থাৎ পশু কুরবানীর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা। প্রতিবছর পশু কুরবানীর মাধ্যমে হযরত ইব্রাহীম (আ:)কে অনুকরণ ও অনুসরণ করে এবং সেই সাথে নিজেদের পশুবৃত্তিকে দূর করে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সন্তুষ্টির অর্জনের চেষ্টা করে।

‘ঈদুল আযহা’ উদযাপনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মাহেন্দ্রক্ষণ হলো নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই মিলে একত্রে ঘটা করে ভোজ উৎসব পালন করা।

জানি , এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি সময়ে এমন আয়োজনের চিন্তা করা কোভিড-১৯ কে উৎসাহিত করা। আর মৃত্যু মিছিলকে আরও দীর্ঘায়িত করা। এ নিশ্চয়ই আমাদের কারও কাম্য নয়।

ঈদ মানে খুশি। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও খুশির লেশ মাত্র নেই। ঈদের খুশি যেনো বেড়াতে গেছে মেঘের বাড়ি। বিপদ আসে, বিপদ যায়। সাহসের সাথে বিপদ মোকাবেলা করাই মনুষ্যত্বের লক্ষণ। আগামীতে ভালো থাকার জন্য আমরা এইটুকু ত্যাগ স্বীকার করতেই পারি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতেই পারি। সতর্কতা অবলম্বন করে কুরবানী করতে পারি। খাওয়ার আয়োজন করতে পারি।

মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যেনো আমরা কারও সর্বনাশ বা মানবিক বিপর্যয় ডেকে না আনি। লোভ, হিংসা-বিদ্বেষ, হীনমন্যতা , দূর্নীতি-অনিয়ম ইত্যাদি সর্বান্তকরণে পরিত্যাগ করার কৌশল হোক ‘ঈদুল আযহা’র শিক্ষা।

যারা করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন মহান আল্লাহ পাক যেনো তাদের দ্রুত সুস্থ করে দেন। আর যারা মৃত্যু বরণ করেছেন তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

ভালো থাকুক সবাই। ধনী- গরিব নির্বিশেষে

ঈদুল আযহা’ বয়ে আনুক সবার জন্য অনাবিল প্রশান্তি। আমীন।

৩০/০৭/২০২০, বৃহস্পতিবার।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৭৯ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031