» সমুদ্র-দর্শন

প্রকাশিত: ১২. আগস্ট. ২০১৮ | রবিবার

শেলী সেনগুপ্তা
ফুলওয়ালী মেয়েটা দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেলো। যতবার রহিম সাহেব এ পথ দিয়ে গাড়ি করে যান ততবার মেয়েটাকে তারিয়ে তারিয়ে দেখেন। বেশ ভালো লাগে। মেয়েটার চোখমুখে একটা সরল সৌন্দর্য। খুব টানে তাঁকে। শুরু থেকেই মেয়েটার কাছ থেকে ফুল কেনেন তিনি। সে তখন বেশ ছোট ছিলো। ফুল দেয়া আর টাকা নেয়া , এই সময়ের মধ্যে কত কথা যে সে বলতো। আগে কখনো কখনো সাথে থাকতো রাদিবা।
রাদিবা যখন থেকে ছেলেদের কাছে আমেরিকা চলে গেছে তখন থেকে সে একাই এ পথ দিয়ে চলাফেরার সময় মেয়েটাকে দেখে। দরকার না থাকলেও ফুল কেনে। সবসময় বেশি টাকা দিয়েই ফুল কেনে। ওর গাড়ি দেখলেই মেয়েটা ছুটে আসে। কিছু না বলে একগাল হাসি দেয়, তারপর জানালা দিয়ে ফুল বাড়িয়ে দেয়। রহিম সাহেবও কিছু না বলে ফুলগুলো নেন, পার্স খুলে বেশ বড় একটা নোট এগিয়ে দেন। একগাল হাসি দিয়ে মেয়েটা চলে যায়। ওর নাম দিয়া। সুন্দর নাম। মেয়েটা বলেও খুব সুন্দর।
আগে রাদিবার সাথে দিয়ার গল্প হতো। শেরাটন হোটেলের সামনে গাড়িটা ট্রাফিকে দাঁড়ালেই মেয়েটা হরবর করে অনেক কথা বলে ফেলতো। একবার বলে,
ঃ জানেন আন্টি, আমি আফজালভাইকে চিনি।
ঃ কোন আফজাল ভাই রে?
ঃ ওমা , আপনি চেনেন না? ওই যে নাটক করে সেই আফজাল ভাই।
ঃ ও, আচ্ছা, তাই নাকি? তুমি কি করে চেনো তাঁকে?
ঃ আমি তো আফজাল ভাইএর সাথে অভিনয় করেছি।
ঃ তাই নাকি?
ঃ হুম, আমি একটা বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেছি।
ঃ তা তো বুঝলাম, টাকা পেয়েছো?
ঃ জি, এইযে আমার গলার হারটা দেখেন, এটা আমি অভিনয়ের টাকা দিয়ে কিনেছি।
বলেই মেয়েটা গলার কাছ থেকে ওড়না সরিয়ে একটা চিকন চেইন বের করে দেখায়। রাদিবা মুগ্ধ হবার ভান করে দেখে। মেয়েটার চোখমুখে একটা অহংকারের হাসি ছড়িয়ে পড়ে। তখন সব গাড়ি চলতে শুরু করলে রহিম সাহেবও চলতে থাকেন। রাদিবা আপন মনে বলে ওঠে,
ঃ কী সারল্যে ভরা মন!
রহিম সাহেব এর ঠোঁটএর কোনে একটুকরো হাসি ঝুলে থাকে।
দেখতে দেখতে অনেকটা সময় চলে গেছে। রাদিবা অনেকটা রাগ করে আমেরিকা চলে গেছে। অনেকদিন থেকেই বলছিলো ছেলেদের কাছে যাবে, রহিম সাহেব সময় বের করতে পারছিলেন না। একাজ সেকাজ দেখিয়ে দিন পার করছিলেন। শেষপর্যন্ত রাদিবা ছেলেদের দিয়ে প্লেনের টিকেট কেটে চলে গেছে। ওদের বারোশ’ পঞ্চাশ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে রহিম সাহেব একাই থাকেন। সকালে নিজে ব্র্যাকফাষ্ট করে খেয়ে নেন, দুপুরে আর রাতে বাইরে খান। এখনকাজছাড়াওনিজেরমতোঘুরেবেড়ান।আজকালবুকেরমধ্যেকেমনযেনএকটাসুখসুখগুঞ্জনশুনতেপান।ভালোইলাগে।একাকীত্বেরসাথেএকটাস্বাধীনবোধতাঁকেআনন্দিতকরেতোলে।
আজকাল রহিন সাহেব বার বার এই পথ দিয়ে চলাচল করেন , কাজ না থাকলেও চলে আসেন। চোখ খুঁজে ফেরে ফুলওয়ালী মেয়েটিকে। ফুল কিনতে কিনতে মেয়েটা এখন রহিম সাহেবের সাথে গল্পে মেতে ওঠে। একদিন হঠাত জিজ্ঞেস করে ফেললো,
ঃ আংকেল, আপনি কি সমুদ্র দেখেছেন?
ঃ দেখেছি।
ঃ আমি দেখি নি। খুব ইচ্ছে করে দেখতে।
ঃ বেশ তো , দেখবে একদিন।
ঃ বা রে, কিভাবে দেখবো? কে নিয়ে যাবে আমাকে?
ঃ বেশ তো তুমি যদি যেতে চাও আমিই নিয়ে যাবো।
ঃ সত্যি নেবেন?
ঃ সত্যি নেবো।
বলতে বলতে ট্রাফিক ছুটে গেলো। রহিম সাহেব চলে গেলেন। মেয়েটার চোখে তখন একরাশ স্বপ্ন খেলা করছে। পরদিন ফিরে আসার ইচ্ছে নিয়ে রহিম সাহেব এগিয়ে গেলেন।
পথ চলতে সেই মোড়েই মেয়েটার সাথে দেখে, খুব সচেতন প্রচেষ্টায় তিনি মেয়েটার ভেতর সমুদ্র দেখার ইচ্ছেটা জাগিয়ে দিলেন। আজ মেয়েটা রহিম সাহেবের গাড়িতে উঠলো। কখনো সে এমন ঠান্ডা হাওয়া দেয়া আর সুন্দর গানবাজা গাড়িতে ওঠে নি। খুব ভাল লাগছে। রহিমসাহেব বেশ খানিকটা ঘুরিয়ে ওকে একটা ডাবল স্যান্ডউইচ কিনে দিয়ে আবার শেরাটন হোটেলের সামনে নামিয়ে দিলেন। মেয়েটার চোখের মধ্যে সমুদ্রের বেলাভূমির রোদ্দুর চিক চিক করছে যেন।
আরো দু’দিন পর, প্রচন্ড বৃষ্টি। একটা ফুলও বিক্রি হয়নি, সবফুলসহ মেয়েটা রহিম সাহেবের সাজানো বেডরুমে। বিশাল বিছানার একপাশে এলোমেলো ঢেউ এর মতো পরে আছে। ওর চোখ এখন মরা শামুকের ম্লান বিকেল ধরে আছে। সস্তা নখ পালিশে সাজানো হাতের মুঠোই বেশ কিছু নোট ধরা। মেয়েটার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে মৃত সমুদ্রের খন্ডিত অংশের মতো লবনাক্ত জলের ধারা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩০১ বার

Share Button

Calendar

October 2018
S M T W T F S
« Sep    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031