» সম্পর্ক

প্রকাশিত: ০১. জুলাই. ২০২০ | বুধবার

জোহরা রুবী

মখমলি চাদরে বেড়ে ওঠা ইতির জীবন।
ভালবেসে বিয়ে করেছে তার প্রিয় মানুষটিকে।
বাবা মার অমতে হলেও মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ধুমধাম করে।
কোন কিছুর কমতি রাখেননি।
মনের কষ্ট মনে রেখেই, সামাজিক সৌন্দর্য বজায় রেখে বিয়ে দিয়েছেন ইতির।
কাউকে কিছু বুঝতেও দেননি।
বাবা-মার ভেতরের কষ্টটা ইতি ছাড়া কেউ অনুধাবন করতে পারবে না।
শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যে বিয়ে করতে হয়নি এই ঢে…র।
কারণ ইতিরও জেদ কম নয়। কত রকম যুদ্ধ যে করতে হয়েছে তা একমাত্র আল্লাহ ই জানেন।
যাক শেষপর্যন্ত প্রাণের মানুষটিকে পেয়েছে, তাই ইতির মনে তেমন কোন দুঃখ নেই।
বাবা মার ইচ্ছে ছিল আরেকটু যোগ্য, আরও ধনবান ছেলের কাছে সোপর্দ করবে।
তা সম্ভবও ছিল। ইতি দেখতেও বেশ!
গর্জিয়াস একটা চেহারা। হাসিটা ভীষণ সুন্দর। সরলতার কমতি নেই।
একটু জেদ বেশী। জেদ হবেই না বা কেন! প্রচন্ড আহ্লাদে বেড়ে উঠেছে। যখন যা চেয়েছে তার চেয়ে বেশীই পেয়েছে।
তিন মাস হল ইতির বিয়ে হয়েছে।
স্বামী একটি প্রাইভেট কোম্পানি তে জব করে। ইতিমধ্যে ইতিও একটা স্কুলে জয়েন করেছে।
না করে উপায়ও নেই।
শখের বশে করেনি। প্রয়োজনে করেছে।
দুজনকেই ইনকাম করতে হবে। তা না হলে স্বামির এই বেতনে ঢাকা শহরে টিকে থাকা অসম্ভব। অন্ততপক্ষে বাড়ী ভাড়াটা একজন কাভার করলে বাকীটা মোটামুটি চালিয়ে নেয়া যায়।
দুরুমের একটা বাসা। বিশ হাজার টাকা ভাড়া। দিনকাল খুব ভাল যাচ্ছে বললে ঠিক হবে না,কোনরকম যাচ্ছে। বাস্তবতা জীবনকে কঠোরভাবে পরিচালিত করছে।
কল্পনার মূলে কুঠারাঘাত করছে।
কোন ভাবেই তাল মেলানো যাচ্ছে না। জীবনে যেটা ভাবেনি সেটাই তার ভাগ্যে জুটছে এখন।
ইতির শ্বশুরকূলও তাকে মেনে নেয়নি।
বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করানোর পক্ষে ছিল না তারা।
তাই তাদেরও অমতে হয়েছে বিয়েটা।
এগুলো নিয়ে তখন ইতির এতটা ভাববার সময়ও ছিলনা সাধও ছিল না।
তবে ইতির স্বামী ভেবেছিল বিয়ের পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু ব্যাপারটা আরও জটিল হয়ে গেল। বিয়ের পর ইতির বাবা মাও খুব একটা যোগাযোগ রাখছে না।
ইতিও জেদ করে নিজের মত করে দিন কাটাচ্ছে।
ইতির স্বামী এ নিয়ে বেশী ভাবেন না ঠিকই,ভেতরে একটা অস্বস্তি, একটা তীব্র অস্হিরতা যে কাজ করছে না তা নয়।
তারপরও সে চেষ্টা করে ইতি যেন কিছু বুঝতে না পারে।
মাঝে মাঝে রেগে গেলে বেশ বুঝা যায় তার কষ্ট গুলি। ভেতরে পুষে রাখা অসামান্য জেদ। অজান্তেই বেরিয়ে আসে কিছু কথা। ইতি অনেক কিছুই বুঝতে পারে। না বোঝার ভান করে।

ইতির মা মাঝে মাঝে ফোন করে।
খোঁজ খবর নেয়ার চেষ্টা করে। মেয়ের জন্য ভীষণ কষ্ট হয় তার।
সৌখিন ও আহ্লাদী মেয়েটির দিনকাল যে ভাল কাটছে না মা তা ভালোই টের পাচ্ছেন।
কিন্তু ইতির বাবা এ ব্যাপারে একদম কঠিন। তাই তার মায়েরও সাধ্যের বাইরে কিছু করা।
অভিমানী ইতিও জেদ করে মায়ের সাথে বেশি কথা বিনিময় করে না।

পর্ব — দুই

ধীরে ধীরে ইতি টের পেতে লাগলো, তার স্বামী ভীষণ লোভী প্রকৃতির।
সরাসরি সে আঁচ করেছে বিয়ের পর শ্বশুরের সাহায্যে তার আড়ম্বরপূর্ণ দিনকাল চলবে।
রেগে গেলে তার এলেমলো কথায় ইতি বুঝতে পারে সব।
তোমার বাবার এত পাষাণ হৃদয়! মেয়ের জন্যও এতটা মায়া মমতা নেই!
ইতির সাথে মিথ্যেও বলেছে তার স্যালারি নিয়ে।
প্রায় প্রতিদিন কারণে অকারণে ক্ষেপে যায় তার স্বামী।
ইদানীং ইতিও এসব বিষয় টলারেট করতে পারে না।
মাঝে মাঝে কথা কাটাকাটি সীমার বাইরে চলে যায়। এতদিন ধরে ধার করে নাকি সংসার চালাচ্ছে। একথা শুনে ইতি ভীষণ মুষড়ে পড়ে।
মিথ্যে বলার কি দরকার ছিল?

ইতির মা ইতির বাবাকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন।
ইতির খোঁজ খবর নিতে বলেন।
মুহূর্তেই গগনবিদারী চীৎকার দিয়ে থামিয়ে দেন তাকে।
ভয়ে তিনি থরথর করে কাঁপতে থাকেন। আর কোন কথা বলার চেষ্টাও করেন না।

ইতির মা খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে।
টানাটানি সংসারে বেড়ে উঠেছেন। দশ ভাই বোনের সংসার।
সুন্দরী হওয়াটাই ছিল তার পরম ভাগ্য।
বড়লোকের (ইতির বাবা) সাথে বিয়ে হয়েছে। নান্দনিক জীবনের স্বাদও আহরণ করেছেন। ইতির বাবা বদমেজাজি হলেও তার মায়ের ব্যাপারে অনেকটাই সহনীয়। মূল্যায়ন করেন।

ইতির স্বামী একদিন বলেই ফেলল,
তার বন্ধুরা, কলিগরা নাকি তাকে প্রশ্ন করে!জিজ্ঞেস করে! শ্বশুর তোমাকে কি দিয়েছে? লজ্জায় সে কোন উত্তর দিতে পারেনা?
মনে মনে সে বলে, মেয়ের খোঁজ খবর নেয়না যে বাবা! তার আবার দেওয়া!
এসব কথা ইতি একদম সহ্য করতে পারে না।
তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় তার বান্ধবীর কাছে কদিনের জন্য চলে যাবে।
এছাড়া আর কোন উপায়ও খুঁজে পাচ্ছে না। বান্ধবীকে আগে এ বিষয়ে কিছু বলেনি। লজ্জাও লাগছে তার। বান্ধবীর মা আবার ভীষণ কনজার্ভেটিভ।
বিয়ের আগেও একবার গিয়েছিলাম মার সাথে অভিমান করে।
আন্টি কেমন রাগ রাগ ছিলেন। আমার সাথে ভাল ব্যবহারও করেননি। বান্ধবীও কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে ছিল।
সে কথা বারবার মনে পড়ছিল ইতির।

রাত যত বাড়তে থাকে ভাবনার বিশালতা ততই বাড়ে। দিশাহীন ভাবনায় তার মাথা ঘুরতে থাকে। পুঁইলতার মত নেতিয়ে পড়ে তার শরীর। কল্পনাও করতে পারেনি মুখোমুখি হতে হবে এরকম কঠিন দিনের।
একবার ভাবে স্বামীর সাথে সব মিটিয়ে নিবে! আরেকবার ভাবে তা কখনোই সম্ভব নয়! অসহনীয়।
গভীর রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনের অর্থ খোঁজে।
রাতের তারাদের সাথে জেগে থাকে। তার মত আরও কত মেয়ে এভাবে রাত জেগে জীবনের হিসেবনিকেশ করছে কে জানে! কত তারা ঝরে পড়ছে! কত সম্পর্ক অকালে ঝরে যাচ্ছে! কে জানে! কে জানে!
এক সমুদ্র কষ্ট যেন বুকের ভেতরটাকে মাড়িয়ে ফেলছে। কাঁপছে মন, কপাল জুড়ে চিকন ঘাম।ভীষণ মনে পড়ছে বাবা মার কথা।
একমাত্র মেয়ের যাবতীয় সব সুখ। জীবনের ভুলগুলি।
গানের ক্লাস। বান্ধবীদের নিয়ে শপিং।
জমানো আড্ডা। জন্মদিনের উৎসব। গাড়ি নিয়ে লংড্রাইভে যাওয়া।
খুব ভোরে ফোনটা বেজে উঠল।
ইতির মা করেছে। ঘুম জড়ানো চোখে ইতি ফোনটা ধরল।
কান্না জড়ানো কন্ঠে তার মা একনাগাড়ে বলে গেল। কদিন ধরেই তোর বাবার শরীরটা ভাল নেই।
রাতে ঘুম হয়না।
প্রেসারটা আপ-ডাউন করছে।
ডাক্তার রেস্টে থাকতে বলেছেন।
ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। আমার মনে হয় তুই একবার এসে দেখে গেলে ভাল হত।
আমি আসতে বলেছি একথা বলার দরকার নেই।

শেষ পর্ব

ইতি মায়ের সব কথা শুনলো।
কোনরকম উত্তর না দিয়ে চুপচাপ ফোনটা রেখে দিল।
কষ্টের সমুদ্রে যার বাস, তাকে আর, কোন কষ্ট অবাক করবে?
কেমন ব্যথা তুমুলভাবে ছুঁয়ে দিবে?
একটা ভুল সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে পারে জীবনের সব গল্প।
অযাচিত ভাবনার বেড়াজালে বন্দী ইতি। প্রচন্ডরকম মাথা ধরেছে।
তার স্বামী বিড়বিড় করে কি জানি জিজ্ঞেস করল। না শোনার ভান করে ইতি।
সাইকোলজি’তে পড়াশুনা করেও মানুষ চিনতে ভুল করল ইতি।
নিজের উপর নিজেরই ঘেন্না হচ্ছে।
আজ স্কুলে একটা মিটিং ছিল!
যাওয়াটা জরুরি হলেও শরীর মন কোনভাবেই সায় দিচ্ছে না।
একেতো রাতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি। তার উপর মায়ের ফোনটা! উফ! সব কিছু লেজে গোবরে!
মনে হচ্ছে রাতটা আরও দীর্ঘ হলে ভালো হত।

ইতির স্বামী প্রায়ই বাইরে নাস্তা করে।
সবসময় ঘরে নাস্তা তৈরী করা সম্ভবও হয়ে উঠে না।ইতিকে সকাল সাতটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে হয়। ন ‘টায় বের হয় ইতির স্বামী।
সংসারের কোন কাজে মনও বসছে না।
কিছুক্ষণ ঘুমানোর চেষ্টা করল।
কি করবে ভাবতে লাগল। ঢাকা শহরে আত্মীয় স্বজনের অভাব নেই।
কিন্তু এ পরিস্হিতিতে কারো কাছে যাওয়া মানেই অবজ্ঞার পাত্রী হওয়া।
বাবার জন্য খারাপ লাগছে কি, লাগছে না! তা ইতি বুঝতেও পারছেনা।
হঠাৎ তার মনে হল বাসায়ই যাবে।
মার ফোনের কথাগুলোও বারবার মনে পড়ছিল। একেবারে চলে গেলেই ভাল হয়।
অতিরিক্ত মানসিক চাপে কোন রকম গোছগাছ ছাড়াই বেরিয়ে পড়ল ইতি।
ফোনে স্বামীকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানাল। ওপাশ থেকে তার স্বামী রেগে গিয়ে, তার জন্য অপেক্ষা করতে বলল।
ইতি জানাল, তার বাবার শরীর ভাল নেই।
শতমুখী চিন্তায় মাথাটা বারবার নুয়ে পড়ছিল। ভেঙে চুরমার হচ্ছিল ভেতরটা।
এভাবে যেতে চায়নি সে।
বাবা তাকে একবারও ফোন করেনি?
সেও করেনি?
দুজনেই জেদ বহাল রেখেছে।
আজ মনে হচ্ছে, আমার জন্য কি বাবা অসুস্থ?
খুব মায়া হচ্ছে তার বাবার জন্য।
মনে হল চারিদিকে শূন্যতা। কোথাও যেন কেউ নেই।খাঁখাঁ করছে প্রাণটা।
বাইরের কোন কোলাহল তাকে স্পর্শ করছে না।
কদিন ধরে ঘুমের ঘাটতি হওয়ায় বারবার মাথা চক্কর দিচ্ছে।
মনে হচ্ছে আশেপাশের সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। আগে এমনটা মনে হতনা।
সুন্দরী হওয়ায় তাকে একটুও অগোছালো লাগছে না।
বরং জামার গোলাপী রঙটা স্নিগ্ধতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এদেশে রাস্তাঘাটে মেয়েদের দিকে লোকজন তাকিয়ে থাকবে না, এটা অস্বাভাবিক।
আর ইয়াং সুন্দরী মেয়ে হলেতো কোন কথাই নেই।

মাকে একটা ফোন দিবে কিনা চিন্তা করল।
বুঝতে পারছে না।
তবে বাড়িতে কোন উল্টাপাল্টা পরিস্থিতি বা অপমানজনক অবস্হার সৃষ্টি হলে তৎক্ষনাৎ সে বেরিয়ে পড়বে একথা ডাহা সত্যি।
যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকেই চলে যাবে।
বাসার গেটে পৌঁছানোর সাথে সাথে দারোয়ান দৌড়ে এসে কি যেন বলার চেষ্টা করল।
ইতি হনহন করে উপরে চলে গেল।
ইতিকে দেখে মা জড়িয়ে ধরতে চাইল।
পারল না।
দু’জনই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
কাঁদতে কাঁদতে ইতির মা বলল, তোর বাবা স্ট্রোক করেছে। ডানদিক প্যারালাইজড।
তুই কষ্ট পাবি দেখে বলিনি।
কোন শব্দ না করে ইতি বাবার রুমে গেল।
বাবার দুচোখের কোণে জল দেখে ইতি অবাক হল।
যাকে সবাই আয়রণ ম্যান বলে ডাকতো!
তার চোখে পানি!
কাছে যাওয়ার আগেই বাবা মুখ ফিরিয়ে নিল। ইতিও রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
নিজের রুমে যেতেই হঠাৎ সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেল!!
সাথে সাথেই ডাক্তার আনা হল।
ডাক্তার নিবিড়ভাবে দেখে বললেন, ভীষণ উইক। মেন্টাল স্ট্রেস পড়েছে। কিছুদিন রেস্ট নিতে হবে। আপাতত ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি।

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ইতি।
তার সহজ সরল মা দিনদিন কেবল সরলই হচ্ছে। কোন প্রশ্ন করেননি, কোন কারণ জানতে চাননি।
মা যেন সব জানেন। এরকম একটা ভাব।

ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিল ইতি।
আঁধারের বুক চিরে জেগে উঠা আলোর অপেক্ষায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো ইতি।

জোহরা রুবী
১৭০৫২০২০

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২০৪ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031