» সাহিত্য সাধনায় আত্মরস

প্রকাশিত: ০৪. নভেম্বর. ২০১৮ | রবিবার

শিশির বিন্দু বিশ্বাস

যে সাহিত্যরস আপনার চেতনা ও বোধ জাগ্রত করে। সত্যের আলোয় আলোকিত করে তোলে
সর্বময়জীবন।জীবনবোধে অঙ্কিত করে নৈতিকতা , শিল্পসংস্কৃতির সমুদ্রসেচে আহরণ করে মূল্যবোধের মুক্তামানিক।সেই সাহিত্যরস আমাদের নিয়ে যায় কখনোবা কল্পনাররাজ্যে কখনোবা সমাজের ভিন্ন ভিন্ন সত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে।অবচেতন মনের রাজ্যে অনেক সাহিত্যের চরিত্র বাস করে,যেমন একজন লেখকেরও নিজের রচনার অনেক চরিত্রকে অবচেতন মনে ধারন করতে হয়।আমরা কাব্যে,প্রবন্ধে,গল্পে,উপন্যাসে যে সুন্দরের দেখা পাই তা আমাদের আত্মরসকে সাহিত্যরসের দর্শন দিয়ে আমাদেরকে পরমাত্মার কাছে নিয়ে যায় ।পশুপাখির জীবন থাকলে মানুষের মত তাদের কি চেতন অবচেতন মন নেই? কিংবা গাছের প্রাণ থাকলে তাদের কি মনোজগৎ আছে?আমরা সাহিত্যে দেখতে পাই সাহিত্যিকের অনেক চরিত্রই পাখি ,পশু, বৃক্ষর সাথে কথা বলছে আবার তারা  উত্তরও দিচ্ছে।এটি কি শুধুই লেখকের নিছক কল্পনা? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে লিখেছেন তাঁর বিভিন্ন রচনায় তিনি ব্রহ্মের সাথে আছেন ,ব্রহ্ম নিয়ে তিনি আধ্যত্মিক বিশ্লেষণ দিয়েছেন।মানবতার সুররচিত করেছেন আমাদের লালন সাঁইজি তাঁর গানে ,আধ্যাত্মবাদের সহজ সরল ভাষায় । তিনি নিজের ভিতর মনের মানুষকে অন্বেষণ করে ভাবতত্ত্বের মাধ্যমে পরমব্রহ্মের জ্ঞানরস বিলিয়েছেন মাটির মানুষের মাঝে।উপরে আসীন বিধাতা মাটির মানুষের মাঝে নিজের স্তুতি, জ্ঞানে, প্রজ্ঞায়, শিল্পের ছোঁয়ায় পুলকিত হয়ে ভক্তের মনে ধরা দেয়।আধ্যাত্মবাদ তাই শুধু সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে বা নিজ আত্মরসের নিমিত্তে কোন প্রক্রিয়া নয়।আমাদের মনোজগতে আমাদের অন্যজীবনে আমরা কিভাবে সত্যের অনুসন্ধানে নিজেদের মনকে সাহিত্যে ডুবিয়ে দেই আর সেখান থেকে কিভাবে পরমাত্মাকে অনুধাবন করি তাই হচ্ছে সাহিত্যে আত্মরস পেয়ে তাকে সাধনায় চরমের কাছে সমর্পণ করে দেয়া ।এখন এই পরমাত্মাজীবনবোধে নিজেদের সামাজিক জীবনে সদাচারের মাধ্যমেও পাওয়া যায় যা আমাদের প্রকৃত শিক্ষা ,মূল্যবোধ  ও নীতি,বিবেককে গঠনমূলক করে গড়ে তোলায় সাহায্য করে।আমরা সাহিত্যচর্চায় নিজেদের অনেক ভুলকে সংশোধন করে নিজেদের মানবসত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলি আমাদের মনের মাঝে আনন্দ আসে।সত্যের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা পায় আর অসত্যের কালো ছায়া হাওয়ায় মিলিয়ে যায় ।আমাদের মনে আশা জাগায় নিরাশায় ডূবে যেতে থাকা মনকে আবার হাটতে শেখায় এই সাহিত্যচর্চা।অনেক সময় আমাদের নিজেদের জীবনের অনেককিছুই মিলে যায় লেখকের কল্পনা আর সত্যের সাথে।আমরা অবাক হয়ে যাই কিন্তু এটি মনোজগতের একটি অন্য জীবন যা লৌকিক কিংবা ভৌতিক জীবনের অংশ মাত্র। আমাদের আত্মরস আমাদের আত্ম তৃপ্তি দেয় খুব কম। কারন, আত্মরসে ডুবে গেলে তার গভীর থেকে গভীরে যাওয়াটা সাধনায় রূপান্তরিত হয় ।আত্ম তৃপ্তি একমাত্র আসে তখন পরম ব্রহ্মকে পাওয়ার মাঝে।আত্মরসের চলমান প্রক্রিয়া আমাদের শুধুই অসীমের দিকে নিয়ে যেতে থাকে এক জ্ঞানের আলোর দিকে যার প্রকৃত অর্থ গতিশীল এবং অস্থির। ঠিক  সময় ,প্রকৃতি, অবস্থান এর সাথে যেমন বিধাতার দেয়া ভাগ্য সম্পর্কযুক্ত, সেরকম।আমাদের সাহিত্যচর্চা আমাদের অনেক অজানার কাছেই নিয়ে যায়। এটি একান্তই ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন ।আমরা নিজেদেরকে নিজেরাই খুঁজে ফিরি সবকিছুর মাঝে কিন্তু জ্ঞান আমাদের একটি ছাঁচেফেলে দিয়ে কিছুটা শান্ত করে দেয় । কিছুটা আত্ম তৃপ্তি আমরা পাই ।আমাদের লোভ, লালসা,হিংসা,অহংবোধ,মিথ্যাচার,অসততা সব ধুয়ে মুছে পরিশোধিত হয়ে শুচি এনে দেয় ।অন্যায় ধাবিত হয় ন্যায়ের পথে।আসে শান্তি আসে পবিত্রতা আসে পরম সত্য মনের মাঝে ।দেহের ভক্তিদ্বারে ঘন্টাধ্বনি বাজায় চিত্তের আনন্দ যা ঈশ্বরের পরম পাওয়া ভক্তের মন থেকে আসে।নিজেকে সাহিত্যের সাধক করে গড়ে তোলার মাঝে লুকিয়ে থাকে চরম পাওয়ার আত্মউপলব্ধি, যা একজনকে একজীবনে অনেক জীবনের ভিন্নভিন্ন স্বাদ গ্রহণের মাধ্যমে আসলের সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেয় ।মানুষ আলোকিত জীবনের প্রত্যাশায় জ্ঞানপিপাসু হয়ে উঠে আর চরমের দিকে উঠে যায়।এর ফলে প্রাপ্তি সেই আত্মরস,যা আমাদের সামাজিকতায় পরিশ্রান্ত আত্মাকে দেয় প্রশান্তি আর সাহিত্যসাধনার চূড়ায় আরোহণ করে সাধক পায় আত্মরস যা অমৃতসম।আধ্যাত্মিকতার সাধনায় সাধক পায় ব্রহ্মকে যার চূড়ায় আসীন থাকেন পরমব্রহ্ম ।
সাহিত্যসাধনা আর আধ্যাত্মিকতা যেই সাধনাই হোক না কেন সৎ উদ্দেশ্য থাকলে এবং নিষ্ঠাবান হলে চিত্তে আত্মরস মনে আনন্দ নিয়ে আসে আর দেখা পাওয়া যায় পরমব্রহ্মের।মনের মাঝেই বিরাজমান তিনি যিনি সদাই থাকেন কর্মসাধনে।যিনি পরমব্রহ্ম ও কর্মে নিজেকে খুঁজে পেতে চেয়েছেন সেখানে তিনি প্রকৃত সাধক,আবার নিজের মনে আত্মরস পান তিনি আনন্দে আর সঠিক পথের দিশা পান কর্মে।সাহিত্য থেকে আমরা যে আত্মরসে নিজেদের মজিয়ে তুলি তার শতভাগ যদি কর্মেপ্রতিফলিত হয় ,তাহলে আমাদের জীবনের মানসিক ও সামাজিক মুক্তি আসবে ।
আমাদের ব্যক্তি জীবন ও আধ্যাত্মবাদ আলাদা কিছু নয় ।পরম ব্রহ্ম কর্মেও পাওয়া যায় ,সাধনায়ও পাওয়া যায় ,আত্মরস শুধুই সেই পথের দিশা তৈরি করে দেয়।নিজের ভিতরে যে জ্ঞানের আলোকে ধারন করে তার আত্ম তৃপ্তি একটি ধাপে সীমাবদ্ধ আর সাধক মনের আত্ম তৃপ্তি এক পরম ব্রহ্মকে পাওয়াতে অধিষ্ঠিত করে দেয়  ।এখন আপনি কর্মে তাকে পাবেন নাকি সাধনায় আত্মরসে  নিমগ্ন চিত্তে তাকে নিজ মনে ধারন করবেন তা আপনাকে আপনার মনের ভিতরের শুদ্ধতাইজানিয়ে দেবে। আপনি আপনার অনেক অজানাকেই খুঁজে পাচ্ছেন সাহিত্যে, আবার নিজের মনের প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছেন ঠিক নিজেকে আপনি চিত্রায়িত করে তুলছেন সাহিত্যিকের এক একটি চরিত্রে ।মানসিক এই বলয়ের মাঝে আপনি আপনার মূল্যবোধের যে চর্চা করছেন তাতে আপনি কি একজন আদর্শ মানুষ হয়ে উঠছেন না? আমি বলবো শুধু মানুষ নন প্রকৃত সাধক হয়ে ওঠা উচিৎ।প্রাকৃতিক জ্ঞান মানুষকে দেয় সুন্দরের খোঁজ আর সাহিত্যে শিল্পের জ্ঞানে আমরা পাই আনন্দ।সুন্দর আর আনন্দ আমাদের গড়ে তোলে আত্মমহিমায় বলীয়ান করে ।সুন্দর সমাজ গঠনে সাহিত্য চর্চা ছাড়া অন্য কোন পথ নেই ।আমাদের সঠিক সত্য  জানতে হবে,বুঝতে হবে,কল্পনা শক্তি ও জ্ঞানবাদকে জাগ্রত করে মানবতার পথে শান্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে ।নিজের অহং এবং সোহম এর যে একটি মনস্তাত্ত্বিকদ্বন্দ্বে আমরা প্রতিনিয়ত ভুগে থাকি। তার একমাত্র উত্তর সাধনা আর ব্যাপকভাবে নিজের মাঝে আত্মরস সঞ্চারণের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করা।যা ন্যায়ের আর অন্যায়ের মধ্য হতে পবিত্রতার শুদ্ধাচারের এক অধ্যায় রচনা করবে ।মানুষ অনেক বিজ্ঞান মুখী জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই সময়ে প্রয়োজন মানুষকে সত্যের কাছে নিয়ে যাওয়া ।যান্ত্রিকতা আমাদের জীবনবোধকে আমিত্ববোধে বেধে ফেলছে। সামগ্রিকতার মাঝে যে জীবনের আসল উদ্দেশ্য লুক্কায়িত তা বুঝতে বুঝতে তাদের শেষ দিনটি চলে আসে ।জীবন শেষ হয়ে যায়, তবু এই পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে একজনের কি দায়িত্ব তা বুঝেও যেতে পারে না। আমাদের জীবনের প্রকৃত অর্থ নিজেদের  জানতে হবে।জীবন পথের পথিক উদ্দেশ্য ছাড়া জন্ম নেয় নি ।উদ্দেশ্য নিজের মাঝেই নিহিত শুধু সঠিকভাবে তার অন্বেষণ প্রয়োজন ।সেই সাথে প্রয়োজন ব্যক্তি জীবনে তার  প্রয়োগ।ভুলের পথের পথিকেরা  আবার সাহিত্যে আত্মরস খুঁজে পাক ,কেউ সাধক ,কেউ বা পাঠক যেই হোক  কিন্তু প্রকৃত মানবতার সুরে সবাই গেয়ে উঠুক শান্তির জয়গান ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৭৭ বার

Share Button

Calendar

May 2019
S M T W T F S
« Apr    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031