» ম্যাডাম এর সঙ্গে সওয়াল জবাব

প্রকাশিত: ০৫. এপ্রিল. ২০২০ | রবিবার

সিমকী ইমাম খান

৮,

বিছানায় পড়ে থেকে প্রিয়জনদের করুণ মুখচ্ছবি দেখছি। কিছু ভালো লাগছিল না । দিনটি আমার জীবনে কালো তারিখ হিসেবে রয়ে যাবে । ২০১৩ এর ২৯শে ডিসেম্বর । মার্চ ফর ডেমোক্রেসির আন্দোলনে আমি প্রচন্ড মার খেয়ে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়েছিলাম । বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ । সেই কষ্টের মধ্যেও মনে পড়ছিল আমার মায়ের কথা। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কথা । তিনি কেমন আছেন। আমার এ অবস্থা দেখলে তিনি কি বলবেন। এ সব ভাবনায় ব্যাকুল হয়ে পড়ছিলাম ।
দুএকদিন পর গুরুতর অসুস্থ শরীর নিয়ে গুলশান কার্যালয়ে ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে যাই । কিন্তু বিস্মিত হয়ে গেলাম। এ অবস্থায় আমাকে যেখানে সবার অভ্যর্থনা জানানোর কথা সেখানে সবাই কেমন যেন নিরুত্তাপ । ভাবলেশহীন মুখ । আমাকে এমনকি কেউ বসার জন্যও বলছে না । অপমানিত বোধ করলাম। নিজে থেকেই বললাম, ম্যাডামের সংগে দেখা করতে এসেছি , ম্যাডাম আমাকে ডেকেছেন । কিন্তু আমাকে তখন সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়নি ।
এভাবে প্রায় তিন ঘন্টা আমাকে অসুস্থ শরীর নিয়ে ওয়েটিং রুমে বসে থাকতে হয় । আমার সারা শরীরে তখন প্রচন্ড ব্যথা । বসে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছিল । মনে হচ্ছিল পড়ে যাবো । কেন ওরা আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছে ভেবে পাচ্ছিলাম না।
তখন মনে পড়ল, সরকারদলে একজন প্রভাবশালী ‘ইমাম’ আছেন , আমার দুরের আত্মীয় । সেকারণে কি ওরা আমাকে আওয়ামীলীগের লোক মনে করছে ! জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দল করে এই বুঝি প্রতিদান পেলাম!
প্রায় ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পাওয়া গেল। যন্ত্রণায় তখন আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল । মাকে বললাম, আমি মার্চ ফর ডেমোক্রেসির আন্দোলনে প্রচন্ড আঘাত পেয়েছি । গুরুতর অসুস্থ শরীর নিয়ে এ অবস্থায় আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি ,আপনি আমাকে ডেকেছেন তাই । আমাকে প্রায় তিন ঘন্টা অফিসে বসিয়ে রাখা হয়েছে । আপনার সাথে দেখা করতে দেয় নি ।
ঘরের ভেতরে বসা ছিলেন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া । আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন ।আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ ।তারপর বললেন, কারা এটা করেছে কেন করেছে ?
আমি বললাম ,ম্যাডাম আমি জানি না কারা করেছে ।
তিনি তখন বললেন, ঠিক আছে আমি এটা দেখছি।

তারপর আমি ওনাকে বললাম, ম্যাডাম আমি নাকি আওয়ামী লীগের এজেন্ট । কারণ ইমাম পরিবার আমাদের আত্মীয় হয় । শুধু এই কারণে প্রায় এক বছর আমাকে আপনার গুলশান কার্যালয় ঢুকতে দেয়া হয়নি।
তিনি মৃদুস্বরে বলেন, তুমিতো আমাদের গুলশান কার্যলয়ের মিটিংয়ে সবসময় উপস্থিত থাকো না তাহলে তুমি কিভাবে আওয়ামী লীগের এজেন্ট হয়ে কাজ করবে !

আমি বললাম, ম্যাডাম, আপনি কি মিটিং করেন সেটা তো আপনারা রুম থেকে বের হওয়ার আগেই সরকারি দল জেনে যায়। আমি স্ট্যান্ডিং কমিটির কোনো মেম্বার না। আমি আপনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে আসি আর আমার কোন ব্যক্তিগত কথা থাকলে আমি তা আপনার কাছে বলতে আসি আমি কি করে সরকারি দলের এজেন্ট হলাম? ম্যাডাম এই বিষয়টা আপনি দেখবেন তার উত্তরে বলেন, অবশ্যই আমি তা দেখব, দেখব না কেন!!

তারপর আমি বললাম, ম্যাডাম আমাকে আওয়ামীলীগ বানিয়ে দেয়া হয়েছে । কারণ ইমাম পরিবার আমাদের আত্মীয় হয়। আমার কথা হল ইমাম পরিবারের সাথে যদি আমার তিল পরিমাণ যোগাযোগ থাকে তাহলে আপনি আমাকে যে শাস্তি দেবেন তা আমি মাথা পেতে নেব।তখন ম্যাডাম বললেন তুমি যদি আওয়ামী লীগ হও তাহলে আমিও আওয়ামী লীগ । কারণ আমারও তো কোন না কোন আত্মীয় আওয়ামী লীগে আছে তাই বলে কি আমি আওয়ামী লীগ হয়ে গেলাম? এটা কোন কথা নয় মন খরাপ করোনা আমি এসব দেখবো তুমি কাজ করতে থাকো।

কথা প্রসঙ্গে আমি ম্যাডাম কে বলেছিলাম ম্যাডাম আমার পরিবার থেকে রাজনীতি করতে আমাকে নিষেধ করা হচ্ছে । কারণ আমি যদি মার্চ ফর ডেমোক্রেসি আন্দোলনে প্রাণ হারাতাম তাহলে আমার মেয়েরা আজ এতিম হয়ে যেত। কিন্তু বিএনপির হয়তো কোনো ক্ষতি হত না । আমার চারটা মেয়ে ওরা আমার খুব আদরের । ওদেরকে আজ কে দেখতো । আমার স্বামীও আমাকে রাজনীতি করতে নিষেধ করছেন । তখন ম্যাডাম বললেন, তুমি আমাকে দেখো । আমি কিসের জন্য রাজনীতি করছি আমারও তো দুটো ছেলে ছাড়া কেউ নাই । সন্তানরা আজ আমার কাছে নেই একজন লন্ডনে আরেক জন মালয়েশিয়াতে । তখন কোকো ভাই বেঁচে ছিলেন ।আমি কিসের জন্য রাজনীতি করি কার জন্য আজ রাজনীতি করি। কিন্তু যত বাধা আসুক আমি রাজনীতি ছাড়বা না।
সেদিন ম্যাডামের কথাগুলো শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি । সিদ্ধান্ত নিলাম যতই বাধা বিপত্তি আসুক না কেন রাজনীতি করবো । মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ম্যডামের হাত ধরে দেশের জন্য কাজ করে যাবো ।

আরেকটা বিষয় ম্যাডামকে বললাম ম্যডাম আমি যে মার খেলাম মার্চ ফর ডেমোক্রেসির আন্দোলনে । আমার প্রাণ নিতে চেয়েছিল ওরা । সাংবাদিক ভাইরা আমার জীবন বাঁচিয়েছে আল্লাহর হুকুম ছিল তাই ঐদিন আমি প্রাণে বেঁচে যাই । এই দিনটাকে আপনি একটা দিবস হিসেবে চিহ্নিত করে রাখতে পারেন । তখন ম্যাডাম বললেন, বিষয়টা আমি মাথায় রেখেছি , দেখি কি করা যায় । পরে এ-ই বিষয়টা নিয়ে আর তেমন কোন কথা হয়নি।

আর একটা কথা বলেছিলাম ম্যাডাম আমি যে মার্চ ফর ডেমোক্রেসির আন্দোলনের মার খেয়েছি আপনি কি তা দেখেছিলেন । ম্যাডাম বললেন, আমি লাইভ দেখতে পারিনি । আমাকে বালুর ট্রাক দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। তবে আমি পরে ভালোভাবে তা দেখেছি তোমাকে ওরা যেভাবে মেরেছে আমার মনে হয়েছে কোন পশুকেও এভাবে কেউ মারে না। তারপর উনি বললেন তুমি রাজনীতি চালিয়ে যাও আমি সব সময় তোমার পাশে থাকব তোমাকে দেখবো ।আমি বললাম আমার জন্য দোয়া করবেন । তখন ম্যাডাম বললেন, অবশ্যই দোয়া করবো । তুমি কাজ চালিয়ে যাও উল্লাপাড়ায় । আমি বললাম ঠিক আছে ম্যাডাম।

আর একটা কথা বলেছিলাম ম্যাডাম আমি তো আপনার অর্ডারেই কাজ করি । আপনি বলেছেন আমাকে ঢাকা এবং উল্লাপাড়াতে কাজ করার জন্য । আমি কিন্তু ঢাকা ও উল্লাপাড়াতে সমান ভাবে কাজ করে যাচ্ছি ।আমি তো আপনার কথার বাইরে যাব না । আমি কোন কিছুতেই ভয় পাইনা। আপনি আবারও বলছেন আমাকে রাজনীতি করতে । আমি আপনার কথা মতো রাজনীতি করছি । কখনো রাজনীতি থেকে আমি সরে যাবো না । তবে এখন আমি চরম অসুস্থ । আমার সারা শরীরে ব্যথা । পায়ে হাঁটুতে প্রচন্ড ব্যথা । আমি ঠিকমতো হাঁটতে পারছিনা তখন তিনি বললেন, ঠিক আছে তুমি চিকিৎসা করো প্রয়োজনে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করে আসো।

আরো একটি প্রশ্ন আমি ম্যাডামকে করেছিলাম । আমি তো কোন হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে চাই না । আমার আত্মিয় ও কিছু বন্ধু-বান্ধব আছে ডাক্তার । তারাই আমাকে আপাতত বাসায় সব ধরনের চিকিৎসা দিচ্ছেন । কারণ আমি অনেক ভয় পেয়েছি । আমার উপরে যে আঘাতটা হয়েছে এখনও আমার বুক ধক ধক করছে। এত কঠিন আঘাত আমি এখনো মন থেকে সইতে পারছিনা ।শরীরে প্রচন্ড ব্যথা ।আমি সারারাত ছটফট করি । বিছানায় শুয়ে ঘুমাতে পারিনা ।
তখন ম্যাডাম বললেন, ঠিক আছে তুমি আপাতত বাসায় চিকিৎসা নাও । কিছুটা সুস্থ হলে তুমি বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করে এসো । কোন কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবে ।
এরপর ম্যাডাম পাশে দাঁড়ানো এডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া স্যারকে বলছেন ,তুমি সিমকীর দিকে খেয়াল রেখো আর কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবে। আমি বললাম ঠিক আছে ম্যাডাম আমি কিছুটা সুস্থ হলে বিদেশে চিকিৎসা করে আসব আপনি আমার জন্য দোয়া করবেন আর আমার কিছুর প্রয়োজন নাই আপনার দোয়া টাই আমার জন্য যথেষ্ট।

সবশেষে ম্যাডামের সাথে আমার যে কথা হয় সেতা খুব গুরুত্বপূর্ণ । আমি বলেছিলাম ,ম্যাডাম আমি তো অনেকদিন ধরে বিএনপির রাজনীতি করি এখনো আমি করে যাচ্ছি এবং দলের জন্য আমি অনেক ঝুঁকি নিয়েছি ভবিষ্যতেও যেকোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে আমি প্রস্তুত । প্রয়োজনে আমি জীবন দিয়ে হলেও রাজনীতি করবো।
তখন ম্যাডাম বললেন, ঠিক আছে তুমি উল্লাপাড়া নিয়ে কাজ করো । উল্লাপাড়াতেই তুমি রাজনীতি করো এবং ম্যাডাম বললেন তুমি আগে সুস্থ হয়ে নাও তারপর সংসারের পাশাপাশি তুমি রাজনীতি করো ভালভাবে।
আমি বললাম , ম্যাডাম আমিতো অর্থনৈতিকভাবে ইনশাআল্লাহ সচ্ছল আমার তেমন কোন সমস্যা নেই । পরিবার-পরিজনকে গুছিয়ে আমি উল্লাপাড়া তে রাজনীতি করবো ইনশাল্লাহ । আপনার কথা মত ।
তখন ম্যাডাম বললেন, তুমি উল্লাপাড়া নিয়ে থাকো উল্লাপাড়ায় তুমি ভালো করবে । আমার মাথায় আছে তুমি উল্লাপাড়ায় জোরে সোরে কাজ চালিয়ে যাও। ভবিষ্যতে তুমি কেন্দ্রে চলে আসবে । এখন উল্লাপাড়া নিয়ে তুমি ভালভাবে কাজ করো । এবং ম্যাডাম মুচকি হেসে বললেন, উল্লাপাড়া মানেই সিমকী ইমাম খান।।

এডভোকেট সিমকী ইমাম খান ঃ সদস্য, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটি

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৯২৯ বার

Share Button