» সিলেটে ওয়াটারকিপার্স এর নানা উদ্যোগ

প্রকাশিত: ২১. মে. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

সুমন শুদ্ধ

মার্চের শেষের দিকে বাংলাদেশে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে লক-ডাউন ঘোষণা করা হলো তখন ওয়াটারকিপার্স চায়নার বন্ধু হাও জিন -এর সাথে কোভিড ১৯ সংকট নিয়ে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ -এর সমন্বয়ক শরীফ জামিল কথা বলেন। কিভাবে বাংলাদেশ এই সংকট থেকে বের হয়ে আসতে পারে সে সব নিয়ে তাঁদের কথা হয়। চায়নার বন্ধুরা তাঁদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।

সে সময় বাংলাদেশ জুড়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীর সংকট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা চলছিল। স্বাস্থ্যকর্মী সহ জরুরী সেবাদানকারীদের ব্যাক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে সর্বমহলে তখন চরম উৎকন্ঠা।
শরীফ জামিল চায়নার বন্ধুদের এই সংকট নিরসনে কিছু করার জন্য হাও জিন -কে অনুরোধ করেন। হাও জিন তাঁদের সাধ্যমত চেষ্টা করবেন বলে জানান। পরবর্তীতে ওয়াটারকিপার্স চায়না’র বন্ধুরা উদ্যোগ নিলে কুয়ানতাং রিভার ওয়াটারকিপার, গ্রিনঝেজাং রিভার ওয়াটারকিপার ও চীনেরday কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশের জন্য তিন হাজার ব্যাক্তিগত সুরক্ষা পোশাক, এক হাজার সুরক্ষা চশমা ও আঠার হাজার মাস্কের ব্যাবস্থা করে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়- বাংলাদেশে কিভাবে সামগ্রীগুলো পাঠানো হবে তা নিয়ে।
নৌপথে পাঠালে অনেক সময় লাগবে। বিকল্প হচ্ছে আকাশপথ। কিন্তু তা চলমান পরিস্থিতিতে যা অত্যন্ত ব্যায়বহুল। এই ব্যায় নির্বাহ করা ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভবপর নয়। তাছাড়া বাংলাদেশে এই উপহার সামগ্রী রিসিভ করতে হলেও আমলাতান্ত্রিক অনেক জটিলতা মোকাবেলা করতে হবে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-চায়না ই-মেইল যোগাযোগ চলতে থাকে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী প্রদানের অনুরোধ করে শরীফ জামিল চোখে অন্ধকার দেখেন। চায়নার বন্ধুরা সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যাবস্থা করে ফেলেছে কিন্তু বাংলাদেশ তা নিতে পারছে না। এখন উপায়? উপায় হয়ে যায়। ভালো উদ্যোগ থেমে থাকে না। এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত করা হয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন /বাপা -কে।

শরীফ জামিল নিজেই বাপা’র সাধারণ সম্পাদক। তিনি বাপা’র অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করে বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে (আই ই ডি সি আর)-এর পরিচালক ডঃ মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা-র সাথে যোগাযোগ করেন। আই ই ডি সি আর সুরক্ষা সামগ্রীর চালানটি রিসিভ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা করতে সম্মতি জ্ঞাপন করে। ওয়াটারকিপার্স চায়না, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, বাপা ও আই ই ডি সি আর-এর মধ্যে কো-অর্ডিনেশন করতে থাকেন শরীফ জামিল।
বাংলাদেশে সুরক্ষা সামগ্রীর চালান রিসিভের নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও আকাশপথের ব্যায় নির্বাহের ব্যাবস্থা তখনো হয়নি। অবশেষে ওয়াটারকিপার বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের তনিয়া বনিতিতিয়াস সহযোগিতার হাত বাড়ালেন।পাশাপাশি চায়নার আরও কিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠানো এগিয়ে আসে। অবশেষে চালানটি গত ১৩ই মে বাংলাদেশে এসে পৌঁছে ।

চালানটি বাংলাদেশে পাঠানোর পুর্বে হাংঝু ঝেজাং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রিভার এঞ্জেল খ্যাত শিশু কিশোরগণ উপহারের প্রায় ৮৫ কার্টন সামগ্রীতে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে ভালবাসার স্বারক হিসাবে চিত্রাঙ্কন করে দুই দেশের জাতীয় পতাকা ও ‘বেঙ্গল টাইগারের জন্য পান্ডার উপহার’ শীর্ষক চিত্র। শিক্ষার্থীরা এই কার্টনগুলো নিজেরা বহন করে সাংহাই বিমানবন্দরের নির্ধারিত এয়ারকার্গোতে উঠিয়ে দেয়।

অবশেষে ১৩ই মে বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে (আই ই ডি সি আর)-এর মাধ্যমে উপহার সামগ্রী দেশে এসে পৌঁছায় । যদিও দেশে ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীর সংকট অনেক কমেছে কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মী সহ জরুরী সেবাদানের সাথে জড়িত সরকারী ও বেসরকারী অনেক ব্যাক্তির কাছে এখনো প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী নেই।

রিসিভ করা এ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীর বড় অংশ বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে (আই ই ডি সি আর) ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কাছে বাপা ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ-এর পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

ওয়াটারকিপার্স চায়না’র বন্ধুদের পাঠানো এই উপহার সামগ্রী থেকে সামান্য কিছু অংশ বাংলাদেশের চারটি রিভার ওয়াটারকিপারকেও দেয়া হয়েছে। সিলেট বিভাগের সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার্স ও হবিগঞ্জের খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার্স- কে স্থানীয় প্রয়োজন বিবেচনা করে স্বাস্থ্যকর্মী সহ জরুরী সেবাদানের সাথে জড়িত সরকারী ও বেসরকারী ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

গত ১৬ই মে সিলেট ও হবিগঞ্জে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী এসে পৌঁছে। ঐ দিনই ‘কলের গাড়ী’ খ্যাত সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের জরুরী খাদ্য সহায়তার মানবিক উদ্যোগে জড়িত স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য ৫০টি ব্যাক্তিগত সুরক্ষা পোশাক (পিপিই), দশটি সুরক্ষা চশমা ও দেড় শত মাস্ক হস্তান্তর করা হয়। গ্রহণ করেন সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেট-এর সভাপতি মুশফিক আহমেদ মিশু ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেট-এর সভাপতি লিটন চৌধুরী ।

১৭ই মে পরিবেশ ও প্রাণীপ্রেমিদের একটি বেসরকারী উদ্যোগে পনেরোটি ব্যাক্তিগত সুরক্ষা পোশাক (পিপিই), ৮টি সুরক্ষা চশমা ও ৫০টি মাস্ক হস্তান্তর করা হয়। এই উদ্যোগ থেকে সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন খাদ্য সংকটে থাকা বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়াল খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়।
উল্লেখ্য যে, বাপা সিলেট লক ডাউন শুরুর সপ্তাহান্তে চাষনীপীর মাজারের অভুক্ত বানরদের ও নগরীর বেওয়ারিশ কুকুরদের খাবার দিয়ে এই উদ্যোগের সুচনা করে এবং বিভিন্ন মহলের প্রতি আহ্বান জানায়- এদের সহায়তা দেয়ার জন্য। পরবর্তীতে (ভূমিসন্তান বাংলাদেশ ও আনিমেল লাভারস সিলেট(ALS)সহ আরো কিছু সংগঠন ও ব্যাক্তি কুকুরদের জন্য নিয়মিত খাবার প্রদানের উদ্যোগ নেয়। যা বর্তমানে পরিবেশকর্মী ও প্রাণীপ্রেমিদের একটি সমন্বিত উদ্যোগ হিসাবে চলমান রয়েছে।
প্রতিদিন এই কার্যক্রমে ১৫ কেজি চাল ও বয়লার মোরগের প্রায় সাত-আট কেজি ঘিলা-কলজার খিচুড়ি রান্না করা হয়। কোনরুপ ব্যাক্তিগত সুরক্ষা পোশাক ছাড়াই আটটি টিম প্রতিদিন রাতে মহানগরীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় দুই শতাধিক কুকুরকে খাবার পৌঁছে দেয়। এই উদ্যোগের পক্ষ্যে সামগ্রীগুলো গ্রহণ করেন ওয়াজিয়া আহমেদ । এ সময় উপস্থিত ছিলেন অরূপ শ্যাম বাপ্পি ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৪৯ বার

Share Button

Calendar

September 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930