সুরমা ও বরাক উপত্যকায় ভাষার লড়াই

প্রকাশিত: ১:১৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯

সুরমা ও বরাক উপত্যকায় ভাষার লড়াই

আনোয়ার চৌধুরী

সময়টা বিশ শতকের কুড়ির দশকের শেষ দিকে। ১৯২৭ সনের ৫ই অক্টোবর । তৎকালীন আসাম প্রদেশের রাজধানী শিলং শহরের সুরম্য পার্লামেন্ট ভবনে শরৎকালীন অধিবেশন চলছিল রোজকার মতো। ১৯২২ সনের এপ্রিল মাসে সিলেটের মাইজভাগ গ্রামে সংঘটিত ছিন্ন কোরাণের ঘটনার জের তখনো শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন যাবৎ মামলা পরিচালিত হলেও ঘটনার মুল হোতা দারোগা আবদুল হামিদ আখন্দের কোন শাস্তি না হওয়ায় সরকারের প্রতি জনগণের ক্ষোভ অব্যাহত ছিলো।র্ সদর সিলেট থেকে নির্বাচিত এমএলসি আবদুল হামিদ চৌধুরী সোনা মিঞা দারোগার বরখাস্ত দাবী সম্বলিত একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন বাঙলা ভাষায়। চৌধুরী সাহেব বাঙলা ভাষায় পেশ করা প্রস্তাবের জের টেনে বাংলাতে প্রশ্ন করেন ও জানতে চান সরকার এ বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছেন? বার বার প্রশ্ন করেও তিনি কোন উত্তর পাননি। সরকার পক্ষে আইন মন্ত্রি কোন জবাব না দিয়ে নিরবতা পালন করেন। অধিবেশনের সভাপতি মাননীয় স্পীকারও নিরব। তিনিও কোন ভুমিকা নিচ্ছেননা । সোনা মিঞা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। তখন হবিগঞ্জ থেকে নির্বাচিত এমএলসি গোপেন্দ্র লাল দাস চৌধুরী ও সিলেটের এমএলসি রাজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরীর পীড়াপীড়িতে সরকার পক্ষ থেকে আইন মন্ত্রি মৌনতা ভেঙ্গে জানালেন যে, মাননীয় সদস্য বাংলা ভাষায় প্রশ্ন করায় তিনি উত্তর দিতে অপারগ। কারন বাংলা আসাম প্রদেশ ও পার্লামেন্টের অফিসিয়াল ভাষা নয়। তাঁর এহেন মন্তব্যের সাথে সাথেই সোনা মিঞা সাহেবসহ অন্য সদস্যগন জোর প্রতিবাদ জানান। শুরু হয় তমুল বিতর্ক। তিনি বলেন ৫৩ সদস্যের পার্লামেন্টে বড় অংশই বাংলাভাষী। বাংলায় প্রশ্ন করার অধিকার তার রয়েছে। তার সাথে সুর মিলিয়ে বৃহত্তর সিলেটের অধিকাংশ সদস্য একযোগে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন এবং দাবী করেন যে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার প্রত্যেক সদস্যের রয়েছে বিধায় মন্ত্রি মহোদয় জবাব দিতে বাধ্য। কিন্তু স্পীকার সাহেব ও আইনমন্ত্রি নিজ নিজ সিদ্ধান্তে অনঢ়। অন্যদিকে সোনা মিঞা সাহেবও তার যুক্তিতে অটল। সংসদে অচলাবস্থ তৈরী হয়। সকল বাংলাভাষী মেম্বর এক জোট হলে স্পীকার ও মন্ত্রি প্রবর নতি স্বীকার করেন। আপোষ রফা করেন । সিদ্ধান্ত হয় বিধায়ক আবদুল হামিদ চৌধুরী বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিতে পারবেন এবং মাতৃভাষায় প্রশ্ন করতে পারবেন । তবে স্পীকার কিংবা মাননীয় মন্ত্রিগন উত্তর দিবেন ইংরেজী ভাষায়। আংশিক বিজয় অর্জিত হওয়ায় সোনা মিঞাসহ অন্যরা তা মেনে নেয়। বৃটিশ শাসিত আসামে বাংলা ভাষার অধিকার অর্জনের শুরুটা এভাবেই হয় যা ছিল আমাদের দেশে ১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলনের সিকি শতাব্দী আগে। কিংবা মাননীয় মন্ত্রিগন উত্তর দিবেন ইংরেজী ভাষায়। আংশিক বিজয় অর্জিত হওয়ায় সোনা মিঞাসহ অন্যরা তা মেনে নেয়। বৃটিশ শাসিত আসামে বাংলা ভাষার অধিকার অর্জনের শুরুটা এভাবেই হয় যা ছিল আমাদের দেশে ১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলনের সিকি শতাব্দী আগে।


তারপর অনেক দিন গত হয়,সুরমা –কুশিয়ারা ও বরাক নদী দিয়ে অনেক জল গড়ায়। বৃটিশ রাজ বিদায় নেয়। ১৯৪৭ সনে ভারতবর্ষ ভেঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভাঙ্গে বাঙলা এবং আসামও। এমনকি বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় ‘শ্রীভুমি’ সিলেটকেও ভেঙ্গে দুটুকরা করে জুড়ে দেয়া হয় আসাম ও পুর্ববঙ্গের সাথে । ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের ভাষা বাঙলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে পাকিস্তান কেšদ্রীয় সরকার। উর্দুভাষী খাজা নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন পুর্ববঙ্গের প্রাদেশিক সরকারও উর্দুর পক্ষে অবস্থান গ্রহন করে। পূর্ব বাংলার জনগন সরকারের সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ জানায়। দাবী জনানো হয় পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার। কিন্তু সরকার আপন সিদ্ধান্তে অনঢ়। কোন অবস্থাতেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হবেনা। গড়ে উঠে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্র,শিক্ষক,বুদ্ধিজীবি,কবি সাহিত্যিক,শিল্পী ও রাজনীতিবীদসহ সকল শ্রেনী পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। শুরু হয় ধর্মঘট, হরতাল, পিকেটিং ও প্রতিবাদ সভা। ভাষার দাবীতে গড়ে উঠা আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে সরকার দমননীতির আশ্রয় গ্রহন করে। পাকিস্তানের উজির নাজির এমনকি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মহম্মদ আলী জিন্নাহও উর্দুর পক্ষেই অভিমত দেন যা ছিল দুঃখজনক। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত থেমে থেমে চলে জেল জুলুম ও হত্যাকান্ড। শুরু থেকেই রাজধানী ঢাকার সাথে শ্রীহট্টবাসীও সে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।১৯৪৭-১৯৫২ সময়কালে সিলেটী ছাত্র,শিক্ষক,সাংবাদিক,রাজনীতিবিদ ও নারীসমাজ বিভিন্নভাবে ও পর্যায়ে বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। সিলেট জেলা শহর ছাড়াও এর অর্ন্তগত ৪টি সাব-ডিভিশনে এমনকি অনেক থানা পর্যায়েও আন্দোলনের ঢেউ লাগে। উল্লেখ্য যে, ঢাকার পরে সিলেটেই ভাষা আন্দোলন গতি লাভ করে। পরবর্তীকালে ঢাকায় সংগঠিত ভাষা আন্দোলনেও সিলেটী ছাত্রদের অংশগ্রহন ছিলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ন। ১৯৪৭ সনের সেপ্টেম্বর মাসেই বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে এগিয়ে আসে পাকিস্তান তমুদ্দুন মজলিশ নামে সদ্য গঠিত একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। সংগঠনটির কর্ণধার ছিলেন আবুল কাশেম নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের একজন তরুন অধ্যাপক। অচিরেই অধ্যাপক শাহেদ আলী, রাজনীতিবিদ মাহমুদ আলী ও দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ প্রমুখের উদ্যোগে সিলেটে সংগঠনের কার্যক্রম শুরু হয়। তাঁরা বাংলা ভাষার পক্ষে প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। সিলেটে সংগঠন হিসেবে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে বলিষ্ঠ ভুমিকা রাখে তমুদ্দুন মজলিশ,সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ ও সিলেট মহিলা মুসলিম লীগ। আর সংবাদ পত্র হিসেবে অগ্রনী ভুমিকা পালন করে মুসলিম সাহিত্য সংসদের মুখপত্র মাসিক আল ইসলাহ যার সম্পাদক ছিলেন নুরুল হক দশঘরি। অপরটি হলো সাপ্তাহিক নওবেলাল । সে পত্রিকাটিও বাংলা ভাষার পক্ষে অসাধারন ভুমিকা পালন করে। এ পত্রিকার সাথে জড়িত ছিলেন রাজনৈতিক নেতা আসামের সাবেক মন্ত্রি মাহমুদ আলী ও তাঁর স্ত্রী নারী নেত্রী হাজেরা মাহমুদ এবং সম্পাদক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ।
৪৭ সালের আগষ্ট মাসেই ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ’ শিরোনামে বাংলা ভাষার সপক্ষে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে মাসিক আল ইসলাহ । একই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্ব মাসে পর পর তিনটি সাহিত্য সভায় বাংলা ভাষার পক্ষে জোড়ালো দাবী তোলা হয়। ৪৭ সালের ৯ নভেম্বর সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ একটি সাহিত্য সভার আয়োজন করে। সভায় শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা সুনামগঞ্জ নিবাসী মুসলিম চৌধুরী ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন । উক্ত প্রবন্ধে তিনি উর্দুর পরিবর্তে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোড়ালো যুক্তি তুলে ধরেন। বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে ৩০ নভেম্বর তারিখে সিলেট আলীয়া মাদ্রাসার সেমিনার কক্ষে একটি সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয় । সুসাহিত্যিক মতিন উদ্দিন আহমদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিলেটের কৃতি সন্তান প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁর প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। তিনি তথ্য ও যুক্তি দিয়ে প্রমান করেন যে পাকিস্তানের শতকরা ৬৪ জনের মুখের বুলি বাংলাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। কিন্তু স্থানীয় মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল অংশের নেতৃত্বে একটি গুন্ডা বাহিনী অতর্কিতে হামলা করে সভাটি পন্ড করে দেয়। মুজতবা আলীর প্রবন্ধটি পরে মাসিক আল ইসলাহ ও কোলকাতার চতুরঙ্গ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তারপর ১২ ডিসেম্বর আরেকটি আলোচনা সভায় দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বাংলা ভাষার সপক্ষে একটি মুল্যবান প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
বস্তুত ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই সিলেটের ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক,লেখক, বুদ্ধিজীবি, নারী সমাজ ও প্রগতিশীল রাজ নৈতিক নেতৃবৃন্দ বাংলা ভাষার পক্ষে শুধু কলমই ধরেননি রাজপথেও নেমে এসেছিলেন।
তারপর ১৯৪৮ সনের জানুয়ারী মাসে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রি সরদার আবদুর রব নিশতার প্রথমবারের মতো সিলেট সফরে আসেন। মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সিলেট জেলা শাখার সভাপতি ছাত্রনেতা আবদুস সামাদ আজাদ(পরবর্তীকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রি) এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মান্যবর মন্ত্রির সাথে দেখা করেন। ছাত্র নেতৃবৃন্দ বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবী উত্থাপন করেন। সিলেটের নারী সমাজের পক্ষ থেকে নারী আন্দোলনের পথিকৃত সিলেট জেলা মুসলিম লীগ মহিলা শাখার সভানেত্রী জোবেদা রহিম চৌধুরী ও সহসভাপতি সৈয়দা শাহার বানু’র নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে দেখা করেন এবং বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মেনে নেয়ার অনুরোধ সম্বলিত স্মারক লিপি পেশ করেন। তাঁরা ফেব্রুয়ারী মাসে পুর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিনের নিকটও স্মারকলিপি প্রদান করেন। উক্ত স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন জোবেদা রহীম চৌধুরী(খান বাহাদুর আবদুর রহিম চ্যেধুরীর স্ত্রী), সৈয়দা শাহার বানু(অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাহেবের মা), সৈয়দা লুৎফুন্নেছা খাতুন,সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন(উভয়ই সৈয়দ মুজতবা আলীর ভগ্নি), রাবেয়া খাতুন( প্রফেসর সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মা), রাবেয়া আলী( সৈয়দ মুজতবা আলীর স্ত্রী),জাহানারা মতিন(সাহিত্যিক মতিন উদ্দিনের স্ত্রী),রোকেয়া বেগম, শামসি খানম চৌধুরী,নুরজাহান বেগম,সুফিয়া খাতুন,মাহমুদা খাতুন ও শামসুন্নেছা খাতুন প্রমুখ প্রগতিশীল মহিলাগন। সাপ্তাহিক যুগভেরী ও ইংরেজী ইষ্টার্ণ হেরাল্ড তখন মুসলিম লীগ সমর্থক পত্রিকা। পত্রিকা দুটি ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে কাজ করে। স্মারকলিপিতে স্বাক্ষরকারী নারী সমাজের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ প্রচারনা চালায় ইস্টার্ণ হেরাল্ড। হেরাল্ড পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকায় একটি প্রতিবাদী নিবন্ধ লিখেন। তিনি কুৎসা রটনাকারীদের মাতৃভাষার বিশ্বাসঘাতক ও কুপুত্র বলে অভিহিত করেন। ৪ঠা মার্চ সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকা বাংলা ভাষাকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে।
আবেদন নিবেদনে কাজ না হওয়ায় সিলেটবাসী রাজপথে নেমে আসে। ১৯৪৮ সনের ৮ মার্চ তারিখে তমুদ্দুন মজলিশ ও মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের উদ্যোগে স্থানীয় গোবিন্দ চরণ পার্কে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে জনসভা আহবান করে। ছাত্র নেতা পীর হাবিবুর রহমান ও মকসুদ আহমদের নেতৃত্বে গোটা শহরময় প্রচারনা চালানো হয়। শহরবাসী বাংলা ভাষার পক্ষে ব্যাপক আগ্রহ দেখায়। লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় গোবিন্দ চরণ পার্ক। মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল নেতারা প্রমাদগনে। তারা জনসভা পন্ড করার ষড়যন্ত্র করে। মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতা মাহমুদ আলীর সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। কিন্তু সভা আরম্ভ হতেই গুন্ডারা চারিদিক থেকে আক্রমন শুরু করে। আয়োজক ও উপস্থিত জনগনকে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে সভা পন্ড করে দেয়। আহত নেতৃবৃন্দের অনেকই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। সিলেটে নিন্দার ঝড় উঠে। হামলার নিন্দা করে মুসলীম লীগ নেতা আবু আহমদ আবদুল হাফিজসহ ১৮ জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বিবৃতি প্রদান করেন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করে সিলেট জেলা মহিলা মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে জোবেদা রহীম চৌধুরী একদিনের ব্যবধানে একই স্থানে ৯ মার্চ একটি প্রতিবাদ সভা আহবান করে। কিন্তু জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১৪৪ ধারা জারী করে সে সভাও পন্ড করে দেয়।
১৯৪৮ সনের ১১ মার্চ ভাষার দাবীতে ধর্মঘট পালিত হয়। অবশেষে ১৬ মার্চ তােিরখ মুখ্যমন্ত্রি খাজা নাজিম উদ্দিন ছাত্রদের ৮ দফা দাবী মেনে নিয়ে চুক্তি সম্পাদন করতে বাধ্য হন। কিন্তু নানা ছল চাতুরীর মাধ্যমে সরকার ১৯৪৮ সনের ভাষা আন্দোলন স্তিমিত করতে পারলেও শেষ রক্ষা হয়নি । খাজা নাজিমুদ্দিন চুক্তি ভঙ্গ করলে ১৯৫২ সনে বিস্ফোরণ হয় ঢাকায়। সে পর্বে সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ,মৌলবীবাজার ও ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শ্রীহট্টের ছাত্র সমাজ গৌরবুজ্জ্বল ভুমিকা পালন করে। ছাত্রনেতা পীর হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় সিলেট জেলা সর্বদলীয় কর্মপরিষদ।২১ ফেব্রুয়ারীর রক্তাক্ত ঘটনার মাধ্যমে বাংলা ভাষা তার মর্যাদা ফিরে পায়। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সিলেটে টানা ৪ দিন হরতাল পালিত হয়। ভাষা আন্দোলনের দুই পর্বে ছাত্র নেতা তসদ্দুক আহমদ,আবদুস সামাদ আজাদ,আহমদ কবীর চৌধুরী,শামসুদ্দিন আহমদ(১৯৭১ সনে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ) আখলাকুর রহমান(জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক),সৈয়দ শাহাদৎ হুসেন( আজাদ পত্রিকার স্বনামধন্য সাংবাদিক),জাকারিয়া চৌধুরী(পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা),শাহ এএমএস কিবরিয়া(পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী),এম সাইফুর রহমান(সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রি),আবুল মাল আবদুল মুহিত(সাবেক অর্থমন্ত্রি), রওশন আরা বাচ্চু(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও ৫২ ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী) রাজনীতিবিদ আবু আহমদ আবদুল হাফিজ(সিলেট জেলা মুসলিম লীগের সাধারন সম্পাদক),মাহমুদ আলী(সা’দুল্লাহ মন্ত্রিসভার সদস্য ও নওবেলাল পত্রিকার সম্পাদক) নুরুর রহমান(সাবেক মন্ত্রি), নাছির উদ্দিন চৌধুরী( যুক্তফ্রন্ট সরকারের আইন মন্ত্রি), খান সাহেব নুরুল হুসেন খান(সাবেক এমএলএ)দেওয়ান মোয়াজ্জেম আহমদ চৌধুরী(সাবেক এমএনএ) দেওয়ান ফরিদ গাজী(সাবেক মন্ত্রি), এনামুল হক মোস্তফা শহীদ(সাবেক মন্ত্রি), মানিক চৌধুরী(সাবেক এমএনএ), কমরেড বরুন রায়(বামপন্থী রাঝনীতিবিদ ও সাবেক এমপি)প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী, সাহিত্যিক অধ্যাপক শাহেদ আলী, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, দেওয়ান গোলাম মর্তুজা, নুরুল হক দশঘরী, আসাদ্দর আলী, মুসলিম চৌধুরী,কবি দিলওয়ার,সরেকউম এজেড আবদুল্লাহ,মৌলবী আবদুল্লাহ বিএল, আবদুর রহীম.মতছির আলী, তসদ্দুক আহমেদ,এএইচ সাদত খান, আবদুল লতীফ চৌধুরী(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহনের জন্য কারাবরণ করেন), আবদুর রকীব চৌধুরী(২১ ফেব্রুয়ারীর পরে গ্রেফতার হন), আজিজুল হক(পরবর্তীকালে জেলা ও দায়রা জজ) চৌধুরী আবদুল হাই(ন্যাপ নেতা ও সাবেক এমপি),আমিনুর রশীদ চৌধুরী(যুগভেরী পত্রিকার সম্পাদক),জোবেদা রহীম চৌধুরী,হাজেরা মাহমুদ,সৈয়দা শাহারবানু, সাঈদা সিদ্দিকী,সিরাজুন্নেছা চৌধুরী,সায়েমা চৌধুরী, হেনা দাস, সৈয়দ সফিক উদ্দিন আহমদ,হাবিবুর রহমান প্রমুখ শ্রীহট্টবাসী পাকিস্তানীদের সাথে লড়াই করে বাঙলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে অনেক জেল জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছেন। সিলেট থেকে প্রকাশিত পত্রিকা নওবেলাল ও আল ইসলাহ প্রভৃতি ঐতিহাসিক ভুমিকা পালন করে। অবশেষে পাকিস্তান সরকার বাংলার মানুষের কাছে নতি স্বীকার করে বাংলা ভাষার দাবী মেনে নেয়। বলা যায় যেদিন পাকিস্তান পার্লামেন্টে রাষ্ট্র ভাষা বিল পাশ হয় সেদিন শ্রীহট্টবাসী সোনা মিঞার স্বপ্ন পুরোপুরি সফল হয়।

দীর্ঘ ৭ বছর লড়াই করে সিলেট তথা পূর্ববঙ্গবাসী বাংলা ভাষার অধিকার পেলেও শ্রীহট্টের ঈশানকোণের প্রতিবেশী বরাক উপত্যকা বাঙলাভাষী হয়েও সরকারীভাবে বাংলায় ভাব বিনিময় করতে পারেনা। তাদের ছেলে মেয়েরা স্কুল কলেজে বাঙলা ভাষায় অধ্যয়ন করতে পারেনা। অফিস আদালতে বাংলা ভাষায় সরকারের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনা। কারন একটাই বাঙলা আসামের অফিসিয়াল ভাষা না,যেমনটা ছিলনা ১৯২৭ সনেও।অফিসিয়েল ভাষা ইংরেজী অথবা অসমীয়া। পরাধীন আমলে যে নীতি স্বাধীনতার পরও একই নীতি। হায়রে দুখিনী বাংলা! তোমার দুর্গতির বুঝি শেষ নেই। কিন্তু শতকরা ৯০ ভাগ বাঙ্গালী অধ্যুষিত বরাক উপত্যকা তা মেনে নিবে কেন? শুরু হয় গুঞ্জণ। দাবী উঠতে থাকে বাংলা ভাষাকে আসাম তথা বরাক অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালতের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। ক্রমে ক্রমে জনমত গড়ে উঠে । সাথে অরেকটি দাবী যুক্ত হয় বাঙ্গালী অধ্যুষিত বরাক অঞ্চলকে ইউনিয়ন টেরিটরি বা নিদেন পক্ষে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষনা করতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক ঐক্যের অভাবে দাবীটি তীব্রতা পায়নি। এমনকি বাংলাভাষীদের মধ্যেও কিছুটা দ্বিধা দ্বন্ধ ছিলো। এরপর সুযোগ তৈরী করে দেয় স্বয়ং অসমীয়া জনগোষ্ঠি এবং তৎকালীন আসাম রাজ্য সরকার।
পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৫৪ সনের বাজেট অধিবেশনে অসমীয়াভাষী কংগ্রেস দলীয় এমএলএ ধরনীধর বসুমাতারী অসমীয়াকে আসামের রাজ্য ভাষা করার লক্ষ্যে পার্লামেন্টে একটি বেসরকারী বিল উত্থাপন করে। সরকারের আশ্বাসে বিলটি তখনকার মত স্থগিত হলেও অসমীয়াকে রাজ্য ভাষা করার পায়তারা চলতে থাকে পুরোদমে। বাংলাভাষীরা সরকারের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে নিজেদের মতো করে প্রতিবাদ করে। একই বছরের ১৯ জুন করিমগঞ্জ শহরে অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গভাষা সাহিত্য সম্মেলন। উক্ত সম্মেলনে আসাম সরকারের বাংলা ভাষা বিরোধী কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দা করা হয়। ষাটের দশকের শুরুতে নিখিল আসাম সাহিত্য সভা এবং আসাম জাতীয় মহাসভা নামে দু’টি সংগঠন অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আসাম সরকারের নিকট দাবী জানায়। তারা এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারনাও চালায়। শুধু তাই নয় তারা ক্রমাগতভাবে বাঙ্গালী ও বাঙলা ভাষার বিরুদ্ধে আপত্তিজনকভাবে বক্তব্য উপস্থপান করতে থাকে। ১৯৬০ সনের এপ্রিল মাসে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির ২ দিন ব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় শিলং শহরে। সম্মেলনে অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সরকারের নিকট দাবী জানায়। আসামে তখন বিমলা প্রাসাদ চালিহার নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায়। সঙ্গত কারনেই আসাম সরকার তাদের প্রস্তাব লুফে নেয়। মুখ্যমন্ত্রী চালিহা অচিরেই অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের অফিসিয়েল ভাষা করা হবে বলে ঘোষনা প্রদান করেন।

মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষপাতমুলক আচরণ দেখে বাংলা ভাষীরা শংকিত হয়ে উঠে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে নিখিল আসাম বঙ্গভাষাভাষী সমিতি একটি প্রতিনিধি দল গঠন করে ৫ এপ্রিল ১৯৬১ তারিখে দিল্লী প্রেরণ করে। তারা অসমীয়ার পাশাপাশি বাংলা ভাষাকে আসামের অন্যতম রাজ্য ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট আরজি পেশ করে এবং দ্রুত কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ চান। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়টি রাজ্য সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত বলে বাংলাভাষীদের দাবী পাশ কাটিয়ে যায়। প্রতিনিধি দলটি গভীর হতাশা নিয়ে বরাক উপত্যকায় ফিরে আসে। জুলাই মাসের ১ম সপ্তাহে শিলচর শহরে অনুষ্ঠিত হয় দু’দিন ব্যাপী ‘নিখিল আসাম বাঙলা ভাষা সম্মেলন’। উক্ত সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার এমএলএ চপলাকান্ত ভট্টাচার্য। সম্মেলনে করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি,শিলচর ও ব্রহ্মপুত্র অঞ্চলের সমতল ও পাহাড়ী এলাকা থেকে হাজার হাজার বাঙ্গালী যোগদান করে। শুধু তাই নয় অসমীয়া ছাড়া এতদাঞ্চলে বসবাসকারী অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির বহু লোকও যোগদান করে। ফলে সম্মেলনটি বহুভাষী সম্মেলনে রুপ নেয়। আয়োজকগন বাংলা ভাষার সাথে সাথে অন্যান্য জাতিসমূহের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যও দাবী উত্থাপন করে। সকল ভাষাভাষীর নিকট গ্রহনযোগ্য ফর্মুলা বের না হওয়া পর্যন্ত অসমীয়াকে রাজ্য ভাষা করার প্রস্তাবটি স্থগিত করারও অনুরোধ করা হয়।
ভাষার প্রশ্নে যখন দুই সম্প্রদায় মুখোমুখি অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল তখন একশ্রেনীর অসমীয়া রাজনীতিবিদ অসমীয়া ও বাঙ্গালীদের মধ্যে দাঙ্গা হাঙ্গামা বাঁধিয়ে দেয়। শুরু হয়ে যায় বাঙ্গালী নিধনঅভিযান। প্রাথমিক সূত্রপাত ঘটে গোয়াহাটিতে একটি ছাত্র মিছিলে পুলিশ গুলি চালানোর কারনে । পুলিশের গুলিতে রঞ্জিত বরপুজারী নামে কটন কলেজের এক অসমীয়া ছাত্র মারা যায়। ফলে অসমীয়ারা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সকল রাগ বাংলা ভাষীদের উপর। তারা বৃটিশ আমলের ন্যায় কুখ্যাত‘বঙ্গাল খেদা’আন্দোলন শুরু করে। বৃটিশ আমল থেকেই অসমীয়রা বাঙলাভাষীদের ঘৃনাভরে ‘বঙ্গাল’ হিসেবে সম্বোধন করতো। বাঙ্গালীদের প্রতি তারা ছিলো চরম মারমুখি। সরকারী প্রশাসনযন্ত্রও অনেকটা তাদের পক্ষে ছিলো । অনুকুল পরিবেশ পেয়ে তারা বাংলা ভাষীদের উপর ঝাঁপিয়ে পরে। শুরু হয় লুটতরাজ, অগ্নি সংযোগ ও খুন খারাপি। ৬০ সালের জুলাই থেকে স্টেম্বর মাস পর্যন্ত দাঙ্গা চলে পুরোদমে। দাঙ্গার শিকার ব্রম্মপুত্র উপত্যকায় বসবাসকারী বাঙ্গালীরা মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অসমীয়ারা জোরপূর্বক গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়,কটন কলেজ,ডিব্রগড় মেডিক্যাল কলেজ ও আসাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে বাঙ্গালী ছাত্রদের বের করে দেয়। প্রায় ৫০ হাজার বাঙলাভাষী পালিয়ে পার্শ্ববর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় গ্রহন করে । আরো ৯০ হাজার বাংলাভাষী বরাক উপত্যকা ও পাশ্ববর্তী এলাকায় আশ্রয় নেয়। অনেক বাঙ্গালী ছাত্রের শিক্ষা জীবনে নেমে আসে মারাতœক বিপর্যয়। অনেকের শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটে অকালেই। রাজ্য জুড়ে দেখা দেয় হৃদয় বিদারক মানবিক বিপর্যয়। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা বরাক অঞ্চল। এক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপে দাঙ্গা খানিকটা প্রশমিত হয়। দাঙ্গার ব্যাপকতায় প্রাদেশিক সরকারের ভিত কেঁেপ উঠে। টনক নড়ে কেন্দ্রীয় সরকারেরও। বাধ্য হয়ে বিচারপতি গোপাল মালহোত্রার নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। কমিশন রির্পোট থেকে জানা যায় যায় অসমীয়াদের আক্রমনে আপার আসামের বাঙ্গালী অধ্যুষিত ২৫টি গ্রামের ৯ জন বাঙ্গালী নিহত হয়(যদিও বেসরকারী হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ৪০ জন) ,আহত হয় শতাধিক,ধ্বংস হয় ৫৮টি বাড়ী ও ৪০১৯টি গৃহ। শ্রী অজিত প্রাসাদ জৈন এর নেতৃত্বে একটি সংসদীয় কমিটি আসামের দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শণ করে। অত;পর কেন্দ্রীয় সরকার শ্রী গোবিন্দ বল্লভ পন্থ মহাশয়ের নেতৃত্বে একটি ডেলিগেট প্রেরণ করে। তারা প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রিবর্গ,উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ, শিলচর বার এ্যাসোসিয়েশন,কাছাড় জেলা কংগ্রেস কমিটিসহ নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিবর্গ ও সংগঠনের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য গঠিত হয় রিলিফ কমিটি।
এহেন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ১৯৬০ সনের অক্টোবর মাসে অসমীয়া মুখ্যমন্ত্রি বিমলা প্রাসাদ চালিহা অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পার্লামেন্টে একটি বিল উত্থাপন করেন। যেন আগুনে ঘৃতাহুতি। বিক্ষোভ দেখা দেয় বরাক উপত্যকাসহ গোটা আসামের বাংলাভাষীদের মধ্যে। দাঙ্গার ক্ষত না শুকাতেই সরকারের কান্ডকজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তে বাংলাভাষীদের মনে মারাতœক ক্ষোভের সঞ্চার করে। করিমগঞ্জ থেকে নির্বাচিত এমএলএ রণেন্দ্র মোহন দাস পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেন এই বিলের মাধ্যমে এক তৃতীয়াংশের ভাষা দুই তৃতীয়াংশের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী কংগ্রেসী বিধায়কগন ও অ-কংগ্রেসী অবাঙ্গালী বিধায়কগন বিলের প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেন। বাঙলাভাষী বিধায়কদের আপত্তি স্বত্ত্বেও সংখ্যা গরিষ্ঠতার সুবাদে(৫৬-০) পাশ হয়ে যায় অংংধস (ড়ভভরপরধষ) খধহমঁধমব অপঃ(অখঅ),১৯৬০ । বিতর্কিত আইনটি বহু ভাষাভাষী অধ্যুষিত বৈচিত্রময় আসামে বিভেদের সূচনা করে। নন-আসামীরা এটিকে কালো আইন হিসেবে চিহ্নিত করে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের তুলনায় ছাত্র-শিক্ষক, শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের মানুষই অধিকহারে প্রতিবাদী হয়ে উঠে। তারা সাধারন জনগনকে সঙ্গে নিয়ে এহেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নেয়।১৯৬১ সনের ৫ ফেব্রয়ারী কাছাড়.হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জবাসী মিলে গড়ে তুলে ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’। নেতৃত্ব দেন বরাক উপত্যকায় অভিবাসী সিলেটী সম্প্রদায়। ৮ ফেব্রুয়ারী হাইলাকান্দিতে অনুষ্ঠিত সভায় বিশিষ্ট আইনজীবি আবদুর রহমান চৌধুরীকে সভাপতি, নলিনী কান্ত দাসকে সম্পাদক ও বিধুভুষন চৌধুরীকে কোষাধ্যক্ষ করে ২৮ সদস্য বিশিষ্ট গনসংগ্রাম পরিষদের কমিটি গঠন করা হয়। কাছাড় জেলার ৩টি মহকুমাতেও সংগ্রাম পরিষদের কমিটি গঠন করা হয়। ১৪ এপ্রিল তারিখে বরাক উপত্যকার তিন মহকুমায় পালিত হয় ‘সংকল্প দিবস’। ভাষার বিষয়ে সাধারন মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয় পক্ষকাল ব্যাপী লং মার্চ বা পদযাত্রা। সত্যাগ্রহীরা তিন মহকুমার ২০০ মাইল পথ অতিক্রম করে ২রা মে শিলচর শহরে পদযাত্রা সমাপ্ত করে। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বরাক উপত্যকার বাসিন্দারা ব্যাপকভাবে আন্দোলনে অংশ গ্রহন করে। সকলেই বাংলাকে আসামের অন্যতম অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবী জানায়। পদযাত্রার পর গণসংগ্রাম পরিষদের সভাপতি রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষনা দেন ১৩ মে তারিখের মধ্যে বাংলা ভাষাকে আসামের অন্যতম অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বকিৃতি দিতে হবে অন্যথায় ১৯ মে তারিখ পুর্ণ দিবস হরতাল পালিত হবে। পরিষদ অবশ্য অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠির ভাষার স্বীকৃতি প্রদানের জন্যও আহবান জানায়।
আসাম সরকার আন্দোলনকারীদে সাথে আলাপ আলোচনার পরিবর্তে দমন নির্যাতনের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। ১২ মে তারিখে সরকার শিলচর শহরে আসাম রাইফেলস, মাদ্রাজ রেজিমেন্ট ও সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ মোতায়েন করে। তারা রাস্তায় রাস্তায় টহল দিয়ে জনমনে ভীতির সঞ্চার করে। ১৮ মে তারিখে পুলিশ আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩জন নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা া হলেন নলিনীকান্ত দাস,রথিন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভুষন চৌধুরী। বিধু চৌধুরী ছিলেন বাঙলা সাপ্তাহিক যুগশক্তি এর সম্পাদক। তাঁর দুই ছেলেও সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ গ্রহন করে।
১৯ মে তারিখটি আসামের বাংলাভাষী মানুষের ইতিহাসে এক অবিস্মরনীয় দিন। বাংলাদেশের যেমন ২১ শে ফেব্রয়ারী তেমনি বরাক উপত্যকার ১৯ মে। পূর্ব ঘোষনা মোতাবেক ঐদিন ভোর থেকেই স্বতঃস্ফুর্ত হরতাল শুরু হয়ে যায় সমগ্র বরাক ভ্যলীতে। করিমগঞ্জ, শিলচর ও হাইলাকান্দির সর্বত্রই পিকেটিং। সরকারী অফিস আদালতের সামনে শুরু হয় অবস্থান ধর্মঘট। শিলচরে রেল ষ্টেশন এলাকায় ভোর হতেই সত্যাগ্রহীরা জড়ো হয়। শিলচর থেকে ভোর ৫-৪০ মিনিটে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনে একজন যাত্রীও ছিলনা। একটি টিকেটও বিক্রি করতে পারেনি ষ্টেশন মাষ্টার। চলেনি বাস ট্রাক মোটর কিংবা অন্যকোন যানবাহন। দুপুর পর্যন্ত শান্তিপুর্ণভাবেই কর্মসূচি পালিত হয়। দুপুরের পর ষ্টেশন এলাকায় আসাম রাইফেলস এর ফোর্স হাজির হয়। বেলা ২-৩০ ঘটিকার সময় কাটিগড়া থেকে গ্রেফতার করা ৯ জন সত্যাগ্রহীকে নিয়ে একটি ট্রাক রেল ষ্টেশনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। ষ্টেশনে থাকা পিকেটারগন তখন এগিয়ে গিয়ে গ্রেফতারকৃতদের মুক্ত করে । তখন তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তখন কে বা কারা ট্রাকটিতে অগ্নি সংযোগ করে। ট্রাকের চালক ও এস্কর্টের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ফোর্স প্রান ভয়ে পালিয়ে যায়। দমকল বাহিনী দ্রুত উপস্থিত হয়ে আগুন নেভাতে সচেষ্ট হয়। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে বেলা ২-৩৫ মিনিটে প্যারা-মিলিটারী ফোর্স ঘটনাস্থলে উপস্থি হয়ে রেল ষ্টেশন ঘেরাও করে পিকেটারদের বেদম প্রহার শুরু করে। একই সাথে চলে অসংখ্য টিয়ার শেল নিক্ষেপ । অল্প কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষন শুরু করে। ১৭ রাউন্ড গুলি বর্ষন করে নারকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এতে ১২ জন বিক্ষোভকারী বুলেট বিদ্ধ হয়। আহত হয় আরো শতাধিক। বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত,কংগ্রেস নেতা সাবেক এমএলএ সতীন্দ্র মোহন দেব পৈত্রিক নিবাস হবিগঞ্জের আন্দিউড়া গ্রামে), লোক সভার সদস্য শ্রীমতি জ্যো¯œা চন্দ(পৈত্রিক নিবাস হবিগঞ্জের সজন গ্রামে) প্রমুখ রাজনীতিবিদের চেষ্টায় ধীরেন্দ্র মোহন দেবের বাসভবনে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। তারপর এ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ করে হাসপাতালে প্রেরণ সম্পন্ন হয়। ঐদিনই ৯ জন সত্যাগ্রহী হাসপাতালে মৃত্যুবরন করেন। গোটা রেল ষ্টেশন ও হাসপাতাল রক্তে ভেসে যায়। আহতদের আর্ত চিৎকারে শিলচরের আকাশ ভারী হয়ে উঠে। পরের দিন রেল ষ্টেশনের পাশের জলাভুমি থেকে আরো দুইজন সত্যাগ্রহীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর পরই শিলচরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক হেমন্ত মজুমদারের নির্দেশে সমগ্র শহরে পুলিশ কারফিউ জারী করে। কিন্তু কে শুনে কারফিউ। উত্তেজিত জনতা কারফিউ ভেঙ্গে সিভিল হাসপাতালে জড়ো হয়। গোটা শহর বিক্ষুব্দ লোকে লোকারন্য হয়ে যায়। পরের দিন হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ মিছিলসহকারে শহীদদের শব নিয়ে শিলচর শ্মসান ঘাটে যায় এবং শেষকৃত্য সম্পন্ন করে। পরে পাওয়া দুজনের লাশও একইভাবে পরের দিন যথাযোগ্য মর্যাদায় সৎকার করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ষোল বছরের ছাত্রী কমলা ভট্টাচার্য যিনি মাতৃ ভাষার দাবীতে প্রথম আত্ম উৎসর্গকারী নারী। শহীদের তালিকায় আরো ছিলেন উনিশ বছরের ছাত্র শচীন্দ্র পাল,কাঠমিস্ত্রি চন্ডীচরণ ও বীরেন্দ্র সুত্রধর,চায়ের দোকানের কর্মী কুমুদ দাস, বেসরকারী সংস্থার কর্মচারী সত্যেন্দ্র দেব, ব্যবসায়ী সুকোমল পুরকায়স্থ,সুনীল সরকার ও তরনী দেবনাথ,রেল কর্মচারী কানাইলাল নিয়োগী এবং আত্মীয় বাড়ীতে বেড়াতে আসা হিতেশ বিশ্বাস প্রমুখ ভাষাপ্রেমী । জীবনদানকারীদের তালিকা বিশ্লেষন করলেই স্পষ্ট হয় যে আন্দোলনে সকল শ্রেনী পেশার লোকজন অংশ গ্রহন করেছিল। এটি কোন বিশেষ গোষ্ঠির দাবী ছিলনা-দাবীটি ছিল সার্বজনীন। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে,শহীদদের অধিকাংশই বৃহত্তর সিলেট তথা সুরমা উপত্যকার অধিবাসী যারা দেশ বিভাগের পর করিমগঞ্জ,শিলচর কিংবা হাইলাকান্দিতে অভিবাসী হয়। যেমন শচীন্দ্র পাল ও বীরেন্দ্র সুত্রধরের বাড়ী ছিল হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানায়,চন্ডিচরণ সূত্রধরের বাড়ী হবিগঞ্জের জাকেরপুর গ্রামে,আর কমলা ভট্টাচার্যের বাড়ী ছিল সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানায়,কুমুদ দাসের কুলাউড়া থানায়,সুকোমল পুরকায়স্থ করিমগঞ্জের অধিবাসী ছিেেলন। তাছাড়া ভাষা আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন কিংবা সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন বা লেখালেখি করেছেন তাদের সিংহভাগই ছিলো বৃহত্তর সিলেটের অধিবাসী কিংবা জীবনের সোনালী দিনগুলো সিলেটেই অতিবাহিত করেছিলেন।রথীন্দ্রনাথ সেন(১৯১২-১৯৯৪),নলিনীকান্ত দাস(১৯১৯-১৯৯৯),আবদুর রহমান চৌধুরী(১৯২২-২০১১),বিধুভ’ষন চৌধুরী(১৯০৭-১৯৭৫),পরিতোষ পাল চৌধুরী(১৯৩৩),শিবানী বিশ্বাস(১৯৪২),অমিতাভ চৌধুরী(১৯২৮) সকলেই ছিলেন শ্রীহট্টের সূর্য সন্তান।

এই ভয়াবহ ও নারকীয় হত্যা যজ্ঞের ফলে আসামে বাংলাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতি স্বত্তার ভাষার প্রশ্নটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে এবং আন্দোলন আরো গতি পায় । আন্দোলনটি সাধারন জনগনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বরাক অঞ্চলের নন-অসমীয়ারাও আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক,বুদ্ধিজীবি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দাবীর সাথে একাত্মতা ঘোষনা করে।শুধু বরাক অঞ্চল কিংবা আসাম রাজ্য নয় গোটা ভারতেই নিন্দার ঝড় উঠে।আসাম সরকার বাধ্য হয়ে গৌহাটি হাইকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জি. মেহরোত্রার নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। কিন্তু আসাম সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিশনের উপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে না পারায় কাছার গণসংগ্রাম পরিষদ এর আহবানে ইন্ডিয়ান সপ্রিমকোর্ট বার এ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিষ্টার এন.সি. চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশনও গঠিত হয়। উক্ত কমিশনে সদস্য ছিলেন পশ্চিবঙ্গের প্রথিতযশা আইনজীবি সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়(পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রি), সপ্রিম কোর্টের এডভোকেট অজিত কুমার দত্ত, ব্যারিষ্টার ¯েœহাংশু কুমার আচার্য এমএলর্সি,ক্যালকাটা উইকলী নোটস্ এর সম্পাদক ব্যারিষ্টার রণদেব চৌধুরীর মতো বিখ্যাত নাগরিকগন। ব্যারিষ্টার মায়া রায়কে কমিশনের সদস্য সচিব নিয়োগ করা হয়। শুধু তাই নয় নিহতদের শোকাতুর পরিবারবর্গের সঙ্গে দেখা করতে আসেন জননেতা প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, ডঃ ত্রিগুনা সেন( কোলকাতায় অভিবাসী সিলেটী ভারতের সাবেক মন্ত্রী)ও ত্রিদিব চৌধুরীর মতো উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদগন। বরাক উপত্যকা থেকে একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রি জওহরলাল নেহরু ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রি লালবাহাদুর শাস্ত্রীর(পরবর্তী কালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে দেখা করেন এবং ঘটনা বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন। পন্ডিত নেহরু সমুদয় বিষয় অবহিত হয়ে গভীরভাবে মর্মাহত হয়ে শহীদদের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ করেন এবং সমস্যা সমাধানের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রি লালবাহাদুর শাস্ত্রী মহাশয়কে দায়িত্ব প্রদান করেন।
পন্ডিত নেহরুর মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্য লালবাহাদুর শাস্ত্রী আসামে এসে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌছার জন্য সচেষ্ট হন। শাস্ত্রী মুখ্যমন্ত্রি চালিহাসহ আসাম প্রাদেশিক সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, অসমীয়া ও বাংলাভাষী বুদ্ধিজীবি সহ সকলেরর সাথেই আলাপ আলোচনা করে বেশ কিছু সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন এবং তিনি একটি আপোষ ফর্মুলায় উপনীত হয়ার চেষ্ঠা করেন। তার অন্যতম সুপারিশ ছিল আসাম বিধান সভা কর্তৃক পাশকৃত ভাষা আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা । দ্বিতীয়ত রাজ্য পর্যায়ে অসমীয়ার সাথে ইংরেজী ভাষাকে আসামের কমন অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে রাখা তৃতীয়তঃ সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠির মাতৃভাষাকে সংরক্ষণের জন্য শক্তিশালী বিধান অর্ন্তবুক্ত করা চতুর্থতঃ ভাষার প্রশ্নটি স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দেয়া। স্থানীয় সরকার দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে নিজ এলাকার অফিসিয়াল ভাষা কোনটি হবে তা নির্ধারন করবে। কিন্তু নিখিল আসাম সাহিত্য সভা কোন অবস্থাতেই নিজেদের দাবী থেকে সরে আসতে চায়নি। তারা অসমীয়াকেই আসামের সরকারী ভাষা হিসেবে অক্ষুন্ন রাখার পক্ষপাতি,বাংলা ভাষাকে স্থান দিতে মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। তারা শাস্ত্রি মহাশয়ের নিকট তাদের দাবীর স্বপক্ষে স্মারকলিপি প্রদান করে। অন্যদিকে বাংলা ভাষার বিষযে কোন সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা না থাকায় আসামের বাঙ্গালীরাও পুরোপুরি সন্তোষ্ট হতে পারেনি। পরে অনেক কাঠখড় পুরিয়ে আসাম সরকার বাধ্য হয় ভাষা সংক্রান্ত আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে। সংশোধিত আইনে বিধান করা হয় আসামের বরাক অঞ্চলের ৩টি মহকুমা (পরে জেলা) শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জের অফিসিয়াল ভাষা হবে বাংলা।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে,স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করলেও আসাম সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিশনের দাখিলকৃত প্রতিবেদন দীর্ঘ ৫৫ বছর পরও জনসমক্ষে আসেনি । দেয়া হয়নি নিহত অথবা আহতদের কোন ক্ষতিপুরণ। বুলেট বিদ্ধ কৃষ্ণকান্ত বিশ্বাস নামে একজন সত্যাগ্রহী দীর্ঘ ২৪ বছর অবর্ণনীয় কষ্ঠ সহ্য করে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে পরাজিত হন। স¦াধীন কমিশন ঘটনার জন্য সার্বিকভাবে রাজ্য সরকারকেই দায়ী করে। অবশেষে দীর্ঘ সংগ্রাম ও বহুজনের আত্মত্যাগের ফলে বাংলা ভাষার বিজয় সুচিত হয়।বরাক অঞ্চলে পাঠদানে ও অফিস আদালতে সরকারী কাজ কর্মে বাঙলা ভাষা ব্যবহারে নিশ্চয়তা পায়। ধীরে ধীরে গ্রেফতারকৃত সত্যাগ্রহীদেরও মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। নিজ ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে আসামের বাংলাভাষীদের আরো অনেক সংগ্রাম করতে হয়। বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হয়। ১৯ মে’র অর্জন বার বার বাধাগ্রস্থ হয়েছে। তাইতো দেখি ১৯৭২ এবং ১৯৮৬ সনেও বাংলা ভাষার জন্য প্রান দিতে হয়েছে। ১৯৭২ সনের আগষ্ট মাসে গৌহাটি ইউনিভার্সিটি এক সার্কুলার জারী করে নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ সমুহের শিক্ষার মাধ্যম হবে অসমীয়া। সাথে সাথে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। আবার ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসে। ১৭ আগষ্ট তারিখে বিতর্কিত ও বৈষম্যমুলক সার্কুলারের বিরুদ্ধে করিমগঞ্জ শহরে ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। যথারীতি পুলিশ গুলি চালায়। বিজন চক্রবর্তী নামে একজন ছাত্র শহীদ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে আপোষ করে। কমন ভাষা হিসেবে ইংরেজী বহাল থাকবে এবং অসমীয়া গ্রহনে কোন বাধ্যবাদকতা থাকবেনা মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ১৯৮৫ সনে আসাম মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বাংলা ভাষাকে অবনমন করে আরেকটি বিতর্কিত সার্কুলার জারী করে। করিমগঞ্জে ছাত্ররা প্রতিবাদ মিছিল বের করে,হরতাল –অবরোধের মত কর্মসূচি গ্রহন করে। পুলিশ গুলি চালিয়ে জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস নামে দুজন ছাত্রকে হত্যা করে। ১৯৯৬ সনে এক মনিপুরী ছাত্রী তার মাতৃভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার জন্য প্রান বিষর্জন দেয়। এভাবে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বরাক উপত্যকা তথা আসামের বাঙ্গালীদের বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে হচ্ছে।
অনেক মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আসামে বাংলা ভাষার দাবী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদিও বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম এখনো চলমান আছে। তবে অর্জনও কম নয়। আজ কেবল শিলচর শহর থেকেই ৫টি বাংলা দৈনিক পত্রিকা বের হচ্ছে। করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দিসহ অন্যান্য শহর থেকেও যথেষ্ট সংখ্যক বাংলা দৈনিক,সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা বের হয়। ভারতে পশ্চিম বাঙলার পর বরাক উপত্যকা বাঙলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। গড়ে উঠেছে প্রচুর স্কুল কলেজ ও ইউনিভাসর্িিট যেখানে বাংলা ভাষা অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছে অসংখ্য ছাত্র/ছাত্রী। গড়ে উঠেছে অনেক গবেষনা প্রতিষ্ঠান যেখানে বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তর গবেষনা কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। রবীন্দ্র,নজরুল ও সুকান্তের জন্ম জয়ন্তি উদযাপিত হয় সারম্বরে।বাংলা নববর্ষ ও পৌষ মেলা উদযাপিত হয় মহা ধুমধাম্ ে। গড়ে তুলা হয়েছে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ,সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ,শহীদ স্মরণ সমিতি,মাতৃভাষা সুরক্ষা সমিতিহ অসংখ্য সংগঠন। ভাষা শহীদদের স্মরণে শিলচর শহরে স্থাপন করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার।শিলচর ষ্টেশনের নামকরণ করা হয়েছে ভাষা শহীদ ষ্টেশন। ২০১১ সনে ছোটেলাল শেঠ ইনস্টিটিউটে স্থাপন করা হয়েছে ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্যের ব্রোঞ্জ মুর্তি। প্রতি বছর ১৯ মে তারিখে পালন করা হয় ভাষা শহীদ দিবস। ১৯ মে’র স্মরণে অনেক শোক গাথা রচিত হয়েছ্ ে। প্রকাশিত হয়েছে অনেক গল্প উপন্যাস,নাটক,কবিতা ও প্রবন্ধ। সুরমা উপত্যকার একজন হিসেবে বরাক অঞ্চলের বীর শহীদদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। ওদের আত্মত্যাগের সাথে ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রয়ারীর শহীদদের বহুলাংশে মিল খোঁজে পাই। জানিনা মাতৃভাষা বাংলার জন্য আরো কত লড়াই করতে হবে। বরাক ও সুরমা উপত্যকার জনগনকে।
লেখকঃ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রনালয়ে যুগ্মসচিব হিসেবে কর্মরত।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com