» সেলিনা হোসেনের সৃষ্টিকর্ম

প্রকাশিত: ১৪. জুন. ২০১৯ | শুক্রবার


কামরুল ইসলাম

মানুষের জন্ম যেখানেই হোক না কেন, বিশ্ব পরিমণ্ডল অবারিত। সর্বমানবচিত্তের যোগ স্থাপনই প্রত্যেক লেখকের প্রধান প্রচেষ্টা থাকে। লেখকরা কাল অতিক্রম করতে পারেন তাঁর সৃষ্টিশীলতায়। যাঁরা পারেন, পেরেছেন, কালের ইতিহাসে তাঁরা সর্বকালের হয়ে থাকেন। সেলিনা হোসেন (জন্ম: ১৪জুন ১৯৪৭) সাহিত্যের সাধক, সৃষ্টিশীল তপস্যাই তাঁর প্রধান কর্ম। সমকালে তাঁর সাহিত্যে বলিষ্ঠতায় ২০১৮ সালে নারী লেখক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকিতে mother of literature, এই কথা বলেছিলাম। সকল কর্মের ভেতর প্রকাশের অভিপ্রায় বর্হিজগতের সাথে অর্ন্তজগতের মিলন বন্ধন করে। সেই আলোর উপস্থিতি অন্তরলোকে, যে সেই আলোয় বসবাস করে, তিনিই পারেন দ্যুতি ছড়িয়ে পরিপার্শ্বকে আলোকিত করতে। আমরা এমনই আলোর ছায়ায় বসবাস করি, এমন দ্যুতি নিজের স্বরূপের ভেতর প্রবেশ করে, সেই তেজ-জ্যোতিতে চমকে উঠি। অতি নিকটে থেকেও হয়তো আমরা সেই পরম অনুভবকে হেলাফেলায় দেখতে পাই না। বিশ্বপটে কত ছবি, কত ঘটনার আর্বিভাব হয়, সেই বৃহতের ভেতর আলোকশিখা নিয়ে জ্বলজ্বল করে ওঠে। তখন বুঝতে পারি স্বামীজি ( স্বামী বিবেকানন্দ) -র মতো,
‘Arise! Awake! And stop not till the Goal is reached.
আমরা বাংলা সাহিত্যের পথে, সাধ্যমতো প্রয়াস অব্যাহত রেখে চলেছি। এই পথ সহজ নয়, এ এক কঠোর তপস্যার। সেই তপস্যা সাধনে যিনি বাঙালি ও বাংলা ভাষীর পথিকৃতরূপে সমকালে অগ্রসর
হয়ে সকলকে পথ দেখাচ্ছেন, তিনিই সেলিনা হোসেন। Mother of literature , এই অনুভব কোথা থেকে কেমন করে হৃদয়মন্দিরে এসে জানিয়ে দিল। আমাদের পরম সৌভাগ্য এমন মহীয়সীর ছায়াতলে আমরা আমাদের সাধন প্রয়াস অব্যাহত রেখেছি।
এই মহীয়সীর স্নেহতলে যে পথ দেখেছে, সেই পথের পথচলায় তারা সমাজ সংসারে আলোকিত করুক। অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতায় আমাদের ভেতর যেন অযথা অহম প্রবেশ না করে, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এই পথচলা সাধনার, আনন্দময় ধ্যানস্থ শক্তির উদ্বোধন হোক সকলের ভেতর। প্রতিদিনের সাধনাই জীবনের মুক্তিলাভকে বিকশিত করে। এই পথ মননশীলতার ও জ্ঞান সাধনার।
সেলিনা হোসেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে বহুমাত্রিক প্রতিভাধর কথাসাহিত্যিক। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যের সাথে মিলেমিশে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে শক্তিশালী বলয় সৃষ্টি করেছে। বাঙালির ভাষা আন্দোলন, সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে অসামান্য দক্ষতায় তিনি সৃষ্টি করেছেন উপন্যাস, ছোটগল্প এবং বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ। তাঁর গল্প উপন্যাস ইংরেজি, ফরাসী, রুশ, মেলে, কানাড়ী, হিন্দী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
সেলিনা হোসেনের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমিতে এবং ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমির প্রথম মহিলা পরিচালক হন। তিনি বাংলা একাডেমির অভিধান প্রকল্প, বিজ্ঞান বিশ্বকোষ প্রকল্প, বিখ্যাত লেখকদের রচনাবলী, লেখক অভিধান, চরিতাভিধান, এবং একশত এক সিরিজ, গ্রন্থসমূহ প্রকাশনার দায়িত্বপালন করেন। ২০ বছরেরও বেশি সময় ‘ধান শালিকের দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ৪৩টি, ছোটগল্পগ্রন্থ ১৫, শিশুকিশোর সাহিত্য ৩৭টি, ইংরেজিতে অনূদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৩টি।
তাঁর রচিত ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, ‘কাঁটাতারে প্রজাপতি’, ‘ভালোবাসা প্রীতিলতা’, ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’, ‘লারা’, ‘ভূমি ও কুসুম’, আগস্টের একরাত’, ‘সাতই মার্চের বিকেল’ ‘বিপণœ শহরের দহন’, ইত্যাদি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ‘স্বদেশে পরবাসী, ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন , একাত্তরের ঢাকা, নিজেরে করো জয় ইত্যাদি প্রবন্ধগ্রন্থ এবং ‘নারীর ক্ষমতায়ন: রাজনীতি ও আন্দোলন’, ‘জেন্ডার বিশ্বকোষ’, ‘বাংলাদেশ নারী ও সমাজ’ ‘দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী গল্প’ ইত্যাদি সম্পাদিত গ্রন্থ বিশেষ মর্যাদা বহন করে।
সেলিনা হোসেন দরিদ্র, ছিন্নমূল, দুঃস্থ অসহায় নারী ও শিশুদের জন্য বেসরকারী সেবা সংস্থা ‘ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছেন। অসামান্য সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি দক্ষতার সাথে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বহু সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০১০ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচকডক্টর অব লিটারেচরে ভূষিত করে। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮০), সাহিত্যে একুশে পদক (২০০৯) সহ বহু পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করে।
সেলিনা হোসেন মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃত ও অনন্য কথাসাহিত্যিক। জন্মস্থান রাজশাহী শহর, পৈতৃক নিবাস লক্ষীপুর জেলার হাজিরপাড়া গ্রাম। এ. কে মোশাররফ হোসেন ও মরিয়ম-উন-নিসার নয় সন্তানের মধ্যে চর্তুথ সন্তান তিনি। শৈশবের আঙিনা করতোয়া নদীর পাশে, তারপর পদ্মা নদীর অববাহিকায়। রাজশাহীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা যেমন ছিল, ততোধিক আগ্রহ ছিল সাহিত্যে। ১৯৬৯ সালে ছোটগল্পবিষয়ে প্রবন্ধ রচনার জন্য ড. মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক লাভ করেন। জীবনের নানামাত্রিকতায় অনুধাবন করেছেন সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবেশ। সেই অনুধাবনের বিরল ঐশ্বর্য বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শোনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, আর বোধকরি সেই চেতনাই লালিত হয়েছে জীবনব্যাপী।
বাংলা একাডেমিতে জীবনের সিংহভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন, আর সেই সময় গভীর সংযোগ ঘটে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গ্রন্থের । উপন্যাস ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ প্রকাশিত হবার পর তাঁর ব্যাপ্তি, খ্যাতি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। জীবনের বিভিন্ন বাঁকে লিখে চলেছেন অবিরাম, আর লিখতে গিয়ে বাস্তবকে বোঝার জানার ব্যাকুলতা, ভৌগোলিক স্থানে পরিভ্রমণের মাধ্যমে বিষয়ের প্রতি গভীর সংযোগ তাঁর সৃষ্টিকর্মকে করে তুলেছে বহুমাত্রিক । মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ের বহু অজানা তথ্যে তাঁর গল্প, উপন্যাস স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে পাঠক গবেষককে বিস্মিত করে। লিখেছেন গদ্য সাহিত্য,যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন দেশ বিদেশের সেমিনারে। সমকালে তিনি কথাসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃত ।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ধারায়, যাঁরা জীবনকে প্রতিনিয়ত সমর্পিত করেছেন, সৃষ্টি করেছেন অসামান্য সাহিত্য-কর্ম, সেই পথরেখায় উজ্জ্বলতর হয়ে নান্দনিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণতার অবদান রাখতে সমর্থ হয়েছেন এই কথাশিল্পী । ছোটগল্প, উপন্যাস যেন মৃত্তিকার সাথে বন্ধন করে আনন্দ-অনুভবে সদা জাগ্রত করে চিত্তকে। মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, দেশপ্রেম, নারী জাগৃতি, নৃ-গোষ্ঠীর প্রতি মমত্ববোধ, শিশু-কিশোরদের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা, সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক চিরায়ত মানবিক মূল্যবোধ তাঁর লেখায় অপূর্ব বন্ধন সৃষ্টি করে। বাঙালি-জীবনের মহোত্তম ভাবনায় প্রণীত তাঁর বহুবিধ প্রবন্ধ অসামান্য মননশীলতার পরিচয় দেয়। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিবাদী মনোভাব, তাঁকে আন্তর্জাতিক মানবে পরিণত করে।
বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ বিশ্বব্যাপী যে পথের সূচনা করেছে, তা সম্ভব হয়েছে, তাঁর মতো ধ্যানস্থ শক্তির দৃঢ় প্রত্যয়ে। আর অনুভব করি, কবিগুরুর ভাবনায়, ‘সূর্যের ভিতরের দিকে বস্তুপিণ্ড আপনাকে তরল-কঠিন নানাভাবে গড়িতেছে, সে আমরা দেখিতে পাই না, কিন্তু তাহাকে ঘিরিয়া আলোকের মণ্ডল সেই সূর্যকেই কেবল বিশ্বের কাছে ব্যক্ত করিয়া দিতেছে। এইখানে সে আপনাকে কেবলই দান করিতেছে, সকলের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করিতেছে। মানুষকে যদি আমরা সমগ্রভাবে এমনি করিয়া দৃষ্টির বিষয় করিতে পারিতাম, তবে তাহাকে এইরূপ সূর্যের মতোই দেখিতাম। দেখিতাম, তাহার বস্তুপিণ্ড ভিতরে ভিতরে ধীরে ধীরে নানা স্তরে বিন্যস্ত হইয়া উঠিতেছে, আর তাহাকে ঘিরিয়া একটি প্রকাশের জ্যোর্তিম-লী নিয়তই আপনাকে চারি দিকে বিকীর্ণ করিয়াই আনন্দ পাইতেছে। সাহিত্যকে মানুষের চারি দিকে সেই ভাষার রচিত প্রকাশম-লীরূপে একবার দেখো। এখানে জ্যোতির ঝড় বহিতেছে, জ্যোতির উৎস উঠিতেছে, জ্যোতির্বাষ্পের সংঘাত ঘটিতেছে।’ সাহিত্যের এই পথরেখা চিনতে পারলেই বিশ্ব সাহিত্যের দ্বার বোঝা যায়। ‘এই বিশ্বসাহিত্যে আমি আপনাদের পথপ্রদর্শক হইব এমন কথা মনেও করিবেন না। নিজের নিজের সাধ্য অনুসারে এ পথ আমাদের সকলকে কাটিয়া চলিতে হইবে।… গ্রাম্য সংকীর্ণতা হইতে নিজেকে মুক্তি দিয়া বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে বিশ্বমানবকে দেখিবার লক্ষ্য আমরা স্থির করিব, প্রত্যেক লেখকের রচনার মধ্যে একটি সমগ্রতাকে গ্রহণ করিব এবং সেই সমগ্রতার মধ্যে সমস্ত মানুষের প্রকাশচেষ্টার সম্বন্ধ দেখিব, এই সংকল্প স্থির করিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে।’ কবিগুরুর ‘বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে উপরোক্ত কথা বলে আমাদের চলার পথ চিনিয়ে দিয়েছেন। কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন বিশ্বসাহিত্যের মহাকালের অগ্রযাত্রায় স্থান করে নিয়েছেন। এই গর্বিত ইতিহাসের সাথে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের সৃষ্টিশীলতা বাংলা সাহিত্যের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যকে শক্তিশালী করছে। সমকালের বাংলা সাহিত্যের তিনিই গড়ঃযবৎ ড়ভ খরঃবৎধঃঁৎব. কালের এই অগ্রযাত্রা কালজয়ী হোক।
আমরা যখন দেখি, তাঁর সৃষ্টিকর্ম অনূদিত হয়ে পাশ্চাত্যে পঠিত হচ্ছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচিতে অর্ন্তভুক্ত হয়েছে, তা সত্যিই বাংলাদেশের গৌরব বহন করে। দেশে-বিদেশে বহু সম্মানে ভূষিত এই প্রতিভাধর সাহিত্য-শিল্পী। এই মহীয়সী কথাশিল্পীর সৃষ্টিসাধনা মহাকালের পথে কালজয়ী হোক, নিত্য নতুন সাধনা-সৃষ্টিকর্মে পূর্ণতার আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলা সাহিত্য। তাঁর সাধনা সমকাল ও অনাগত কালের অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হবে, এমন প্রত্যাশা করি।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২৮ বার

Share Button

Calendar

November 2019
S M T W T F S
« Oct    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930