শিরোনামঃ-


» সৈয়দ মুজতবা আলী ও তাঁর রাজনৈতিক চেতনা

প্রকাশিত: ১১. সেপ্টেম্বর. ২০২০ | শুক্রবার

সৌমিত্র দেব
সৈয়দ মুজতবা আলী একজন ‘বহুভাষাবিদ’ হিসেবে খ্যাত ছিলেন। বিশ্বের নানা ভাষা তিনি পড়তে এবং লিখতে জানতেন। সাহিত্যিক হিসেবে তার নাম সর্বজনবিদিত। বাংলা রম্যসাহিত্যে তিনি আজো তুলনাহীন। লিখেছেন উপন্যাস, যা তার স্বাতন্ত্র্ সমুজ্জ্বল। প্রবন্ধে যুক্তিনিষ্ঠতা ও রসবোধ বিস্ময়কর। অল্পবিস্তর কবিতাও লিখেছেন। ছোটগল্প আর ভ্রমণ কাহিনীর কথা তো বলে শেষ করা যাবে। কিন্তু রাজনৈতিক চেতনা? পাঠক চমকে উঠবেন হয়তোবা। কারণ একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে মাঝে মধ্যে দায়িত্ব পালন করলেও তার কোন শত্রুও একথা বলতে পারবে না যে তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন। একথা সত্য, তিনি সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক ভাষ্য রচনা করেছেন কিন্তু তাই বলে রাজনীতির প্রতি তার খুব উৎসাহ ছিল, এটা বলা যাবে না। পাঠকের সাথে আমি এব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত। মুজতবা আলী রাজনীতিবিদ ছিলেন না, রাজনীতির প্রতি তার কোন উৎসাহও ছিল না, কিন্তু তার ভেতরে ছিল ক্ষুরধার রাজনৈতিক চেতনা যা তিনি শৈশব থেকে শুরু করে আমৃত্যু লালন করে গেছেন।
মুজতবা আলীদের পরিবারের অতীত ইতিহাস অনুসন্ধান করলেও তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার পরিচয় পাওয়া যায়। কথিত আছে তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন হযরত শাহজালাল (রাঃ) এর সহচর এবং সিলেট বিজয়ের অন্যতম নায়ক সৈয়দ নাসিরউদ্দিন সিপাহসালার। পরবর্তীতে তারা তরফের সৈয়দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। শোনা যায়, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় ইংরেজ রাজ দরবারে ভূমির জন্য দরখাস্ত দিতে রাজি হননি বলে এই পরিবার অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। সেখানে ব্যতিক্রম হয়ে দেখা দেন মুজতবা আলীর পিতা সৈয়দ সিকন্দর আলী। তিনি ইংরেজ বিরোধিতার মনোভাব ত্যাগ করে বৈষয়িক জীবনে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন। আপন যোগ্যতা বলে ইংরেজ সরকারের অধীনে সাবরেজিস্টার পদে উন্নীত হন এবং এক পর্যায়ে খানবাহাদুর খেতাব লাভ করেন। কৃষ্ণকুমার পালচৌধুরী তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন,
‘ম্যাট্রিক ক্লাশে পড়াশুনা করি। খানবাহাদুর সৈয়দ সিকন্দর আলী সাহেব খুব স্নেহ করতেন। ঘন ঘন যাতায়াত ছিল তার বৈঠকখানায়। তাঁর সাথে ইংরেজিতে কথা বললে খুব খুশি হতেন। ইংরেজির প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল’।১
মুজতবা আলীর জন্ম ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তখনকার সিলেট জেলার অন্তর্ভুক্ত করিমগঞ্জ শহরে। বর্তমানে করিমগঞ্জ ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় অসম রাজ্যের একটি জেলা। অবশ্য তার জন্ম তারিখ নিয়ে বিতর্ক আছে। বহু জায়গায় তিনি নিজে তার জন্ম তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর বলে উল্লেখ করেছেন। করিমগঞ্জে তখন সিকন্দর আলী সাহেব চাকুরি করতেন। সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার একটি সুন্দর বিবরণ দিয়েছেন মুজতবা আলীর মধ্যম অগ্রজ সৈয়দ মুর্তাজা আলী।
‘মুজতবা আলীর জন্মকালে-বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে ব্রিটিশ রাজত্বে নিরঙ্কুশ শান্তি ও সচ্ছলতা ছিল। সাধারণ মানুষের মাছ-ভাতের অভাব হত না। দুর্ভিক্ষের লক্ষণ দেখা দিলে ৫ (পাঁচ) টাকা মণ দরে রেঙ্গুনি চাইলে বাজার সয়লাব হত। সাধারণ মানুষের জীবন ছিল পল্লীগ্রামের দীঘির জলের মতো নিস্তব্ধ, শান্ত ও নিথর।
১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয় রুশ-জাপান যুদ্ধ। এই যুদ্ধেই সর্বপ্রথম এশিয়ার এক ক্ষুদ্র জাতি রাশিয়ার মতো ইউরোপের এক শক্তিশালী প্রাচীন সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে এশিয়াবাসীদের মনোবল বৃদ্ধি করে। ১৯০৪ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি লর্ড কার্জন এসে আহসান মঞ্জিলে অবস্থান করেন ও কার্জন হলের ভিত্তি স্থাপন করেন। পরের বছর বাংলা বিভাগ হয়ে রাজনৈতিক ঝড়ে দেশকে কম্পিত করে’।২
শৈশবেই মুজতবা তার কৌতূহল আর সাহসের জন্য একজন ইংরেজ কর্মকর্তার নজর কেড়েছিলেন। এই ঘটনাটিকে তার রাজনৈতিক চেতনার অঙ্কুর বলে ধরে নেয়া যায়। অগ্রজ সৈয়দ মােস্তফা আলীর লেখায় বিষয়টি এসেছে। এভাবেÑ
‘তাঁর বয়স যখন পাঁচ তখন ওহংঢ়বপঃড়ৎ এবহবৎধষ ড়ভ জবমরংঃৎধঃরড়হ মি. হিজলেট আইসিএস (পরবর্তীকালে শ্রীহট্টের জনপ্রিয় ডি.সি, সুরমা উপত্যকার কমিশনারও, বোধ হয় কিছু কাল আসামের চিফ সেক্রেটারি) চাড়াডাঙ্গা সাব রেজিস্ট্রি অফিস পরিদর্শনে আসেন। সেকালের অজপাড়াগাঁয়ে অবস্থিত অফিসে হৈ চৈ পড়ে গেল। সাহেব ওহংঢ়বপঃরড়হ ঋড়ৎস পূরণ করছেন, আর বারান্দায় ও বাইরে কৌতূহলী লোক সমাবেশ। সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে একটি ছোট ছেলে সাহেবের বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা রিস্ট ওয়াচে হাত রাখলো। সাহেব অমায়িক সজ্জন। একটু হেসে খবর নিলেন… ছেলেটি কার। বাবা কাছেই ছিলেনÑ বললেন, ‘ও আমার পুত্র’Ñ ও পুত্রের আচরণে একটু লজ্জিত হওয়ার ভাব দেখালেন। সাহেব বললেন, ঘবাবৎ সরহফ. ঐব রিষষ নব ধ মবহরঁংÑ কোন চিন্তা করো নাÑ ছেলেটি উত্তরকালে একটি প্রতিভা হবে।’৩
সাহেব যাকে প্রতিভা বলছেন তা আসলে বালকের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ যা। পরাধীন দেশের শিশুর থাকে না। তাকে নানান শৃঙ্খলে ওই বয়স থেকেই অবদমিত হওয়ার শিক্ষা দেয়া হয়। মুজতবা সেখানে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
স্কুল জীবনে একটি রাজনৈতিক ঘটনা মুজতবা আলীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সে প্রসঙ্গে যাবার আগে একটু তার স্কুল জীবনের বর্ণনা দিতে হয়। বাবার চাকরির সুবাদে বালক বয়সেই তাকে নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছিল। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় সুনামগঞ্জের এক পাঠশালায়। ১৯১৫ সালে তিনি ভর্তি হন মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৮৯১ সালে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরই-এর প্রধান শিক্ষক শরচ্চন্দ্র চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ ‘দেবীযুদ্ধ’ রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে ব্রিটিশ রাজশক্তির হাতে নিষিদ্ধ হয়েছিল। স্কুলের অনেক শিক্ষকের মধ্যে ছিল বিপ্লবী চেতনা। তাছাড়া ১৯১১ সালে মৌলভীবাজার শহরের একটু দূরে জগৎসী গ্রামে ‘দোলগবিন্দ আশ্রম’ এ ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে বিপ্লবীদের সরাসরি সংঘর্ষের কথা মুজতবার অগ্রজ সৈয়দ মোস্তফা আলী তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ আত্মকথায় বিশদ ভাবে আলোচনা করেছেন। যা তার কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে অবহিত করিয়েছিলেন বলে ধরে নেয়া যায়। যা হোক ১৯১৮ সালে আবার মুজতবা তার বাবার সাথে পাড়ি দেন এবং সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৮৬৯ সালে স্থাপিত এই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। সর্বভারতে সুপরিচিত রাজনৈতিক নেতা বিপিন চন্দ্র পাল, ব্রতচারী নৃত্যের প্রবর্তক দেশ হিতৈষী গুরুসদয় দত্ত আইসিএস এবং শিক্ষাবিদ আবদুল করিম প্রমুখ এই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন কৃতি ছাত্র। এসব ব্যক্তি ও ঘটনা মুজতবা মানসে রাজনৈতিক চেতনা সৃষ্টিতে পরোক্ষভাবে হলেও কিছু কাজ তো করতেই পারে।
তা ছাড়া ওই স্কুল জীবনেই মুজতবা আলীর মনে সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক আসে। মেজ ভাই মুর্তাজা আলীর সাথে মিলে তিনি কুইনিন’ নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করেন। তবে এসব পত্রিকার নিয়তি সব সময়েই নির্ধারিত। সকলের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করে বন্ধুদের হাতে হাতে ঘুরতে ঘুরতে অচিরেই পত্রিকাটি বুদবুদের মতো মিলিয়ে যেতো। তবু কিশোর মনে এর রেশ রয়ে যেতে অনেকদিন। এ প্রসঙ্গে মুর্তাজা আলী লিখেছেনÑ
সম্পাদকের গৌরবান্বিত আসনের অধিকারী ছিলাম আমি নিজে। সহকারী আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুজতবা আলী। পত্রিকার নাম ছিল ‘কুইনিন’। অপ্রিয় সত্যভাষণই আমাদের লক্ষ্য ছিল।৪
বড় ভাই সৈয়দ মােস্তফা আলী ছিলেন সাহিত্যের অত্যন্ত সমঝদার। তিনি প্রবাসী, মানসী, সাহিত্য, কোহিনুর ইত্যাদি পত্রিকা সংগ্রহ করে নিয়মিত পাঠ করতেন। পাঠাগার থেকে বই নিয়ে আসা ছিল তার নেশা। যা সংক্রমিত হয়েছিল প্রায় সকল ভাই-বোনের মধ্যে। বোনদের মধ্যেও কেউ কেউ পরবর্তীকালে কবিতা লিখেছেন।
ছোটবেলা থেকেই মুজতবা খুব কবিতা ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন ওমর খৈয়াম থেকে অনূদিত কবিতার মুগ্ধ পাঠক। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অনুবাদের তারিফ করতেন। তাই ১৯১৯ সালে গোবিন্দ নারায়ণ সিংহের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ যখন সিলেট আসেন তখন মুজতবা আলী ছুটে গিয়েছিলেন নোবেল বিজয়ী কবির বক্তৃতা শুনতে। ছেলেদের উদ্দেশ্যে দেয়া রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘আকাক্সক্ষা’। কবির ভাষণ কিশোর মুজতবার মনে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। কাউকে কিছু না জানিয়ে সে চিঠি লিখেছিল কবির কাছে। চিঠিতে প্রশ্ন ছিলÑ ‘আকাক্ষা উচ্চ করতে হলে কি করতে হবে।’ রবীন্দ্রনাথ তখন সিলেট থেকে গিয়ে আগরতলা অবস্থান করছিলেন। সপ্তাহ ঘুরতেই আকাশী রঙের খামে ও চিঠিতে মুজতবার কাছে রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে লেখা জবাব এলো। দশ-বারো লাইনের এ চিঠির মর্ম ছিলÑ
‘আকাক্ষা উচ্চ করতে হলে মনে রাখতে হবে, স্বার্থ যেন মানুষের কাম্য না হয়। দেশের মঙ্গল ও জনসেবার জন্য উদ্যোগ কামনাই মানুষকে কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। তোমার কি করা উচিৎ, তা এতো দূর থেকে বলে দেয়া যায় না। তোমার অন্তরের শুভেচ্ছাই তোমাকে কল্যাণের পথে নিয়ে যাবে।’
অপ্রত্যাশিত এই চিঠি সেদিন সৈয়দ পরিবারে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল । কিশোর মুজতবার চৈতন্যকে অনুধাবন করতে হলে সে সময়কার সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যের পটভূমিকে বিচার করতে হবে। স্কুলে তার সহপাঠী বন্ধু সয়ফুল আলম খানের লেখায় পাওয়া যায় তারই এক বিবরণÑ
‘১৯০৯ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত যুগকে যদি সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রাক কৈশোর যুগ বলা হয়, তবে, এ সময়ের ধাক্কা ছিল মুসলমানদের বাংলা সাহিত্য প্রবেশের যুগ। ১৯১১ ইংরেজীতে দিল্লীর দরবারে তদানীন্তন ভারত সম্রাট পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদ করে পুনরায় অবিভক্ত বাংলা স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। ১৯১৩ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নোবেল প্রাইজ লাভ করেন। ১৯১৪ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত খেলাফত আন্দোলন ভারতীয়। মুসলমানদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ১৯১৮ সালের শেষের দিকে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের বিরতি ঘটেছে, আর ১৯১৯ সালে। জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকা-ের প্রতিবাদে কবিগুরু তদীয় নাইট’ খেতাব বর্জন করেছেন। এই যুগান্তকারী ঘটনাবলীর প্রভাব তৎকালীন ছাত্রসমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একই সাথে শুরু হয়েছে ১৯২১ সালে মহাত্মাগান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন। অসহযোগ আন্দোলনে ছাত্রসমাজ সরকারী স্কুল-কলেজ বর্জন করছেন এবং এ সময়েই সিলেট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত সৈয়দ মুজতবা আলীর দিক নির্ণয়ের মুহূর্ত এসে দাঁড়ায়।’৫
সে সময়ে একটি ফুল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো মুজতবার রাজনৈতিক সত্তা প্রকাশিত হল। তিনি তখন ক্লাশ নাইনের ছাত্র ও ফার্স্ট বয়। সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও হিন্দু বোর্ডিং ছিল ডেপুটি কমিশনারের বাংলোর খুব কাছে। সরস্বতী পূজার সময় কয়েকজন ছাত্র বাংলো থেকে ফুল চুরি করে। পরের দিন ইংরেজ ডেপুটি কমিশনার জে.এ. ডসন এই অপরাধে অভিযুক্ত ছেলেদের ডেকে আনেন। তার হুকুমে চাপরাশী ছেলেদের গায়ে বেত মারে। তখনকার উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এটা ছিলÍএকে খঞ্জনের বাড়ি তার উপরে মৃদঙ্গের তালি। ছাত্ররা ধর্মঘটে গেল। মাত্রা পেল আন্দোলন। তখন কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের স্কুলে ফেরৎ পাঠানোর জন্য সরকারি চাকুরে অভিভাবকদের উপর চাপ দিতে লাগলো। বাধ্য হয়ে সৈয়দ সিকন্দর আলী ছেলে মুজতবাকে স্কুলে ফিরে যেতে বললেন। কিন্তু মুজতবা আর স্কুলে ফিরে যাননি।
বিষয়টা ছিল হিন্দু ছাত্রদের। তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় অনেকেই পরে স্কুলে। ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুজতবা এটাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে না দেখে সমাজ চেতনায় বিচার করেছেন। চাপরাশীর হাতে বেত্রাঘাত তিনি সমগ্র ছাত্র সমাজের অপমান বলে গায়ে মেখেছেন। তাই পিতার শত ধমকানিতেও আর ইংরেজ নিয়ন্ত্রিত সরকারী বিদ্যালয়ে ফিরে যাবার জন্য তার মন টলেনি। তাই সিলেট শহরের রাজনৈতিক আবহাওয়া থেকে দূরে সরিয়ে দেবার জন্য বাবা সিকন্দর আলী জেদী ছেলেকে তার ইচ্ছে মতো শান্তিনিকেতনে পড়তে পাঠালেন। সেখানে রবীন্দ্র সান্নিধ্যে এসে মুজতবা বিশ্ব পরিব্রাজনের দীক্ষা লাভ করলেন। মুর্তাজা আলীর ভাষায়Ñ
‘মুজতবা আলীর মনের বাতাবরণ গঠিত হয়েছে রবীন্দ্র সাহিত্যের রসধারায়। তার মানস জগত রবীন্দ্রনাথেরই সৃষ্টি। তার চিন্তা ও অনুভূতির জগতে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবই বেশি। তার রচনা শৈলী ও সাহিত্যের রসধারায় শান্তিনিকেতনের আবহাওয়া বিশেষভাবে কার্যকর। তার হস্তাক্ষর ছিল বিশ্বকবির মত।’৬
শান্তি নিকেতনে মুজতবা প্রথমে স্কুল বিভাগে ভর্তি হন। তারপর সেখানে কলেজ বিভাগ উদ্বোধন হলে সম্ভবতঃ তিনিই বাইরে থেকে আসা বিশ্বভারতী কলেজ বিভাগের প্রথম ছাত্র। একাদিক্রমে পাঁচ বছর অধ্যয়ন করে মুজতবা বিশ্বভারতী স্নাতক হন।
বিশ্বভারতীতে অধ্যয়ন সমাপ্তির পর মুজতবা আলীগড়ে পড়তে যান। সেখানে তিনি সহজেই ছাত্রমহলে খুব জনপ্রিয় হয়ে পড়েন। ইন্টারমিডিয়েট ছাত্র ইউনিয়নের ভিপিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু আলীগড়ের পরিবেশে অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা, যা বিশ্বভারতীর উদারতায় বড় হওয়া মুজতবা আলীকে মােটেও আকৃষ্ট করেননি।
১৯২৭ সালে মুজতবা আলী আফগানিস্তানের শিক্ষা বিভাগে চাকুরি পেয়ে। কাবুল যান। সেখানে শান্তি নিকেতনের দুজন অধ্যাপক রেনোয়া ও বগদানভ কর্মরত ছিলেন। মূলতঃ তারাই তাদের প্রিয় ছাত্র মুজতবার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। তখনকার কাবুলের পরিবেশের দিকে তাকালেই আমরা বুঝতে পারবো তিনি কেন সেদিন কাবুল থেকেই তার কর্মজীবনের সূচনা করেছিলেন। তার দেশে বিদেশে’, ‘শবনম’ প্রভৃতি বইতে এসেছে কাবুল প্রবাসের সরসচিত্র। একদিকে কাবুলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য অন্যদিকে এর শাসক আমানুল্লার সংস্কার আন্দোলন তাঁকে মূলতঃ সেখানে টেনে নিয়েছিল। আধুনিক চেতনার অধিকারী আমানুল্লাহ খান তুরস্কের মােস্তফা কামালের মতো আমূল পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন তার দেশের পরিবেশ। প্রবর্তন করেছিলেন পাশ্চাত্য ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার । তিনি প্রচলন করেন সাহেবী পােশাকের আর বিলোপ সাধন করেন পর্দা প্রথার। সব মিলিয়ে গোঁড়া কাবুলীরা তার উপর ক্ষেপে যায়। আফগানিস্তানের এই উত্তাল রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর রাজসাক্ষী মুজতবা আলী তা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রচনায়। এমন কি দৈনিক পত্রিকায় তাঁর সর্বশেষ কলাম যা ঢাকার পূর্বদেশ পত্রিকায় ২১ জুলাই ’৭৩ থেকে ২৫ অক্টোবর ’৭৩ পর্যন্ত পরিবর্তনে অপরিবর্তনে শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল, তার অধিকাংশ স্থান জুড়েছিলো আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের নেপথ্য কাহিনী। মুর্তাজা আলী লিখেছেনÑ
‘আফগানিস্তানে রাষ্ট্রবিপ্লব হলে মােল্লাদের সহায়তায় ভিস্তির ছেলে বাচ্চাই সেকাও কাবুলের সিংহাসন দখল করেন। আমানুল্লাহ্ পালিয়ে গেলেন। রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের পর পড়াশুনার পাঠ উঠে গেল। বিদেশীরা দ্রুতগতিতে নিজেদের দেশে ফিরে গেলেন’।৭
ফলে মুজতবাও আমানুল্লাহ বিহীন মধ্যযুগীয় কাবুল থেকে ফিরে এলেন। এরপর ১৯২৯ সালে হুমবল্ট বৃত্তি নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী জার্মানীতে যান। সেখানে বিভিন্ন টার্মে বার্লিন ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নের মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। ১৯৩২ সালে তিনি বন্ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.ফিল. ডিগ্রি লাভ করেন। সেখানে জর্মনদের তীব্র জাতীয়তাবোধ মুজতবা চৈতন্যে প্রভাব বিস্তার করেছিলো।
দ্বিজাতি তত্ত্বকে মুজতবা আলী কখনই মেনে নিতে পারেননি। মেনে নেননি অভিশপ্ত বঙ্গবিভাগ। তবু ১৯৪৭ সালে ইংরেজদের সহায়তায় ভারতবর্ষের অবাঙ্গালি বেনিয়া শক্তি সে কাজটিই করে ছাড়লো। সৈয়দ মুজতবা আলী রাজনৈতিক চেতনার দিক থেকে কতোটা অগ্রসর ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘পূর্বপাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামের প্রবন্ধ রচনা থেকে। পাকিস্তান স্বাধীন হবার মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যেই সিলেট শহরে পূর্বপাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হওয়া উচিৎ, এ নিয়ে একটি সভা ডাকা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ৩০ নভেম্বর সেই সভায় পাঠ করার জন্য মুজতবা আলী প্রবন্ধটি লিখেছিলেন। পরবর্তীতে এটি প্রকাশিত। হয়েছিল ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে কলকাতার চতুরঙ্গ’ পত্রিকায়। তখনো এদেশে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তেমন আলোচনা শুরু হয়নি। অনেকেই মনে করেন। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে এটা ছিল প্রথম প্রকাশ্য সমাবেশ। উর্দুপ্রেমী অনগ্রসর মানুষেরা সেদিন তার ভাষণ সমাপ্ত হবার আগেই সভাকে প- করে দিয়েছিলো।
১৯৪৯ সালের জানুয়ারী মাসে সৈয়দ মুজতবা আলী বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। সাত মাস স্থায়ী এই অধ্যক্ষ জীবনে তিনি কয়েকটি রাজনৈতিক ঘটনার মুখােমুখি হন। ড. সৈয়দ মুজতবা আলীকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়ােগের জন্য প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ জোর দাবী জানিয়েছিল।
কিন্তু মুসলিম লীগপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক মহল তাকে কখনোই সুনজরে। দেখেনি। মুজতবা গবেষক ড. নূরুর রহমান খান লিখেছেনÑ
‘স্থানীয় মুসলিম লীগপন্থীরা অধ্যক্ষ হিসেবে সৈয়দ মুজতবা আলীর নিয়ােগের দবি সমর্থন না করলেও ছাত্রদের দাবির নিকট নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং আলী সাহেবকে অধ্যক্ষ নিয়ােগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একটা বৈরী পরিবেশের মধ্যে মুজতবা বগুড়ায় পদার্পন করেন। প্রথমতঃ সরকারি দল ও কর্তৃপক্ষের মনোভাব তার প্রতি সুপ্রসন্ন ছিল না। অধ্যাপকম-লীর একাংশ মুজতবার আগমনে প্রীত হননি ব্যক্তিগত স্বার্থহানির আশঙ্কায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আমূল পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তর বঙ্গের দিনাজপুর, রাজশাহীর নাটোর, বগুড়ার ভাতকোট প্রভৃতি অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠছে। সশস্ত্র আন্দোলনের তরঙ্গে সর্বত্র কিছুটা কাঁপন লেগেছে।
ফলে শাসকগোষ্ঠী আতঙ্কিত। নবোদ্ভূত আন্দোলনকে সূতিকাগারেই নির্মমভাবে নিষ্পেষণে তারা বদ্ধপরিকর। পুলিশী নির্যাতন চ-রূপ পরিগ্রহ করে এবং কম্যুনিস্ট দমন ও ক্যুনিজম’ প্রতিরোধের নামে তখন থেকেই এক বীভৎস বর্বরতার সূচনা। ক্যুনিস্ট দলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছাত্ররা আত্মগোপন করায় কলেজের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র ছিন্ন হল। তাদের সমর্থক অধ্যাপকবৃন্দও পড়লেন বিপাকে। ফলে সৈয়দ মুজতবা আলী কলেজে এসে এক বিরূপ পরিবেশের শিকার হলেন । কলেজের বহু দুর্নীতির কথা তার কর্ণগোচর হয়েছিল। এজন্যে অধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেও হিসেবপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে বুঝিয়ে না দেয়ার জন্যে তিনি কোন কাগজপত্রে স্বাক্ষর দানে বিরত থাকেন। এতেও স্বার্থান্বেষী মহলের ক্ষুব্ধ হওয়ার যথেষ্ট কারণ নিহিত। বহুদিন থেকেই এ মহল কলেজের অর্থে নধরকান্তি লাভ করেছে। স্বার্থহানির কারণেই তারা নবাগত অধ্যক্ষের প্রতি বিরূপ হয়েছিলেন এবং তাকে বগুড়া থেকে বিতাড়নের হীন ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে।
বগুড়ার তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মুজতবা আলীর মধ্যম অগ্রজ সৈয়দ মুর্তজা আলী। অধ্যক্ষের নির্দিষ্ট কোন বাড়ি না থাকায় সৈয়দ মুজতবা আলী বগুড়ায় এসে তার সহোদরের বাড়িতেই উঠেন। সৈয়দ মুজতবা আলী কলেজের নিয়ম শৃঙ্খলার প্রতি কঠোর মনোভাব গ্রহণ করায় এবং তার উদার ধর্মমতের কারণে অধ্যাপকদের একাংশ তাকে সুনজরে দেখেনি। কলেজের জনৈক প্রবীণ অধ্যাপকের নেতৃত্বে আলী সাহেবের বিরুদ্ধে এক জঘন্য চক্রান্তের সূচনা হয়। তার বগুড়া আগমনের পূর্ব থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের বীজ দানা বাঁধতে থাকে। ভাষা বা শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনা মুজতবা উচ্চ কণ্ঠেই করতেন। মজলিশী আলাপআলোচনায় তার মুসলিম লীগ বিরোধী মনোভাব কখনো প্রচ্ছন্ন থাকেনি। ক্রমেই তিনি বৈরী পরিবেশে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। মুজতবার বিরুদ্ধে অভিযোগ-তিনি ক্যুনিস্ট, পাকিস্তান বিরোধী, কলকাতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ইত্যাদি। এই ডামাডােলের মধ্যে কলেজ বার্ষিকী প্রকাশ যেন মুজতবা বিরোধী মহলে ঘৃতাহুতি হলো। বার্ষিকীর একটি নিবন্ধে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা-সাহিত্যসংস্কৃতি-রাজনীতি সংক্রান্ত কর্মকা-ের তথা লীগ সরকারের কঠোর সমালোচনা করা হয়। পত্রিকা প্রকাশের আয়ােজন ও রচনা নির্বাচনপর্ব পূর্বেই সম্পন্ন হয়েছিল। মুজতবা আলী কলেজে যোগদানের পর বার্ষিকীটি প্রকাশিত হয় এবং প্রথা অনুযায়ী অধ্যক্ষের একটি আশির্বাণী তাতে স্থান লাভ করে এবং সেটি কবিতায়। ক্ষুব্ধ লীগপন্থীরা বার্ষিকী প্রকাশের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব অধ্যক্ষের স্কন্ধে চাপিয়ে তাকে অপদস্ত করার চেষ্টা করে।’৯
এই ছিল সেই সময়ের বাস্তব অবস্থা। পাকিস্তান রাষ্ট্রের শৈশবে শাসক পক্ষ প্রায় সময়েই যে কোন মুক্তমনের মানুষকে কমুনিস্ট’ ও ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দিয়ে নাজেহাল করার চেষ্টা চালাতো। সেখানে মুজতবার রাজনৈতিক চেতনা তাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে তারা তাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করে। বিষয়টি শ্রীমতি গৌরী আইয়ুবের ভাষায় এরকমÑ
তিনি বগুড়া কলেজে অধ্যক্ষের পদ নিয়ে সেখানে কিছুদিনের জন্যে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই পূর্বপাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত অকপটে ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় তিনি ব্যক্ত করেছিলেন। মনে রাখা দরকার যে তখনো উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন দানা বাঁধেনি। কিছু বাঙ্গালি প-িতও কায়েদে আজমের উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা বলে। গণ্য করার প্রস্তাবে প্রতিবাদ তো জানাননি বরং নানা যুক্তি দিয়ে সমর্থন করার প্রয়াস করছিলেন এবং আরবী, ফারসী ও ব্যাপক উর্দুচর্চাকে সাগ্রহে সমর্থন করছিলেন, বরং মুজতবাই সর্বপ্রথম ঐ সমস্যাটিকে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন। ইতিহাস থেকে আরো কিছু নজির টেনে উর্দু ভাষার দাবি কতটা অযৌক্তিক তা প্রমাণ করেছিলেন। ফলে অচিরেই তিনি কর্তৃপক্ষের বিষ নজরে পড়েন এবং পূর্বপাকিস্তান ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হন। তাই বলতে গেলে ভাষা আন্দোলনের সর্ব প্রথম বীজটি তিনিই বপন করেছিলেন।১০
সব কিছু মিলিয়ে মুজতবার পক্ষে আর এদেশে থাকা সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে তাঁর সহোদরকেও যখন জড়িত করে ষড়যন্ত্রমূলক পদাবনতি ঘটানো হলো। এমন কি ড. আলীর গ্রেফতারের আশঙ্কা পর্যন্ত দেখা দিল তখন তিনি আর এদেশে থাকা সমীচিন মনে করলেন না। চলে গেলেন ভারতে। এই ঘটনাকে কেউ কেউ তাঁর পলায়ন হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান। কিন্তু ড. নূরুর রহমান খানের মতেÑ
‘দেশ বিভাগের পর সৈয়দ মুজতবা আলী ভারতেই থেকে যান এবং দ্বিজাতি তত্ত্ব’কেও তিনি সম্পূর্ণ রূপে অগ্রাহ্য করেন। অনেকের ভ্রান্ত ধারণা সৈয়দ মুজতবা আলী বগুড়া থেকে পলায়ন করে ১৯৪৯ সালে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। আসলে ‘৪৯ এর জানুয়ারিতে তাকে কোলকাতা থেকে ধরে এনে বগুড়া আজিজুল হক কলেজ অধ্যক্ষের পদে বসানো হয়েছিল। পরিস্থিতি জটিলাকার ধারণ করলে তিনি গোপনে পুনরায় কোলকাতা প্রত্যাবর্তন করেন। পরবর্তীকালে পাসপাের্ট প্রথার প্রচলন হলে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পাসপাের্ট সংগ্রহ করেন। সুতরাং পাকিস্তানী নাগরিক পরিচয়ে তিনি কোলকাতা ‘হিজরৎ’ করেননি।১১
উপরোক্ত মত অনুযায়ী েেবাঝা যায় মুজতবার রাজনৈতিক সত্তা কতটা প্রখর ছিল। ১৯৪৭ সালে বাঙ্গালি রাজনীতিবিদেরা যে দ্বিজাতি তত্ত্বকে মানতে বাধ্য হয়েছিলেন, লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী তা মেনে নেননি। ভাষা আন্দোলনের প্রথম দিকে তিনি চেতনার যে বীজ রোপন করেছিলেন তা দ্বিজাতি তত্ত্বকে কবর দিয়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মহীরুহের আকার ধারণ করে।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজতবা আলী সব চাইতে মানসিক সংকটে সময় কাটিয়েছেন। তার স্ত্রী-পুত্র-পরিবার ছিল অবরুদ্ধ পূর্বপাকিস্তানে আর তিনি ভারতীয় নাগরিক। স্বাভাবিক কারণেই শত্রু রাষ্ট্রের নাগরিকের পরিবারের উপর পাকিস্তান সরকারের সুনজর ছিল না। তাদের কথা ভেবে মুজতবা খুব অস্থিরতা অনুভব করতেন। সেই অপ্রকাশিত বেদনা তাকে সকলের অগোচরে তিলে তিলে নিঃশেষিত করেছে। সেই সময়ের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন অবরুদ্ধ দেশে পরিবারের দুশ্চিন্তায় ও অমঙ্গল আশঙ্কায় মুজতবা আলী পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। আমরা তাকে প্রবোধ দিয়ে বলতাম, যদি বাংলাদেশ বেঁচে থাকে তবে আপনার স্ত্রী-পুত্ররাও বেঁচে থাকবে।১২
তবু সেই সঙ্কট মুহূর্তেও মুজতবা তার আশাবাদী রচনা থামিয়ে দেননি। বিভিন্ন লেখায় এ সময় তিনি বাঙালি জাতির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন। সৈয়দ মুজতবা আলীর চেতনা প্রসঙ্গে লেখক সুনির্মল কুমার দেব মীন বলেনÑ
সমকালীন বাংলা সাহিত্য ধারার প্রভাবে মুজতবা আলীকে আমরা দেখি রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন দত্ত, নজরুলের প্রতিবাদ, বিদ্রোহ আর বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হতে। মধুসূদনের উদ্যম, নজরুলের বিদ্রোহ এবং রবীন্দ্রনাথ আর। সত্যেন্দ্রনাথের সার্বজনীনতার সংস্কার বর্জিত মুক্তবুদ্ধিতে আমরা পাই ড. আলীর চেতনার সার্বিক প্রসার ঘাটতে।১৩
সৈয়দ মুজতবা আলী রাজনৈতিক চেতনার দিক থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রগতির পক্ষের লোক ছিলেন। তাই বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ঢাকায় ফিরে আসতে তার কোন দ্বিধা ছিল না। বৃহৎ বাংলার সমর্থক হয়েও তিনি ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারি খ-িত বাংলা অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশে আসেন। হয়তো তিনি আশা করেছিলেন, বাংলাদেশ হবে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাধীন, সুখী, সমৃদ্ধ একটি দেশ। কিন্তু অচিরেই তার সে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তিনি হয়ে। পড়েন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারেরও কঠোর সমালোচক।১৪ তাই ঢাকায় মাত্র দশ মাস কাটিয়েই তিনি আবার কলকাতা প্রত্যাবর্তন করেন। সেখানে এবার পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। ১৯৭৩ এর ১৩ ডিসেম্বর শেষবারের মতো কলকাতা ছেড়ে ফিরে আসেন ঢাকায়। এদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে মুজতবা আলী ভারতের নাগরিকত্ব নিলেও বাংলাদেশের প্রতি যে টান অনুভব করতেন তা শুধু তার মননে কর্মে বা রচনা শৈলীতেই প্রকাশিত হয়নি তার অন্তি ম বাসনায়ও রূপায়িত হয়েছে। নিজের লেখা শহর ইয়ার’ উপন্যাসটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন শ্রীযুক্ত পশুপতি খানকে, এই শর্তে-সে যেন আমাকে ভালো করে আমার মায়ের গোরের পাশে কবর দেয়। উল্লেখ্য, সৈয়দ মুজতবা আলী ওরফে সিতুর মায়ের সমাধি হচ্ছে মৌলভীবাজার শহরে। কুটিল রাজনীতির কারণে তিনি যে দেশে বেশী দিন বাস করতে পারেননি, যে মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন জীবনের বেশীর ভাগ সময়, মৃত্যুর পর তিনি সেই জননী ও জন্মভূমির কোলে ফিরে আসতে চেয়েছেন। কিন্তু মুজতবা যেন জীবন নাটকের এক ট্রাজেডির নায়ক। তার এই অন্তিম ইচ্ছাটিও শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই থেকে যায়।
১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ মুজতবা আলীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। সেদিনই রাতে তাকে ঢাকার পুরনো গোরস্থানে কবর দেয়া হয়। মায়ের গোরের পাশে নয়, মায়ের ভাষার দাবিতে যারা প্রাণ দিয়েছিল বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সেই অমর শহীদ আবুল বরকত ও শফিউর রহমানের পাশে। এভাবে সৈয়দ মুজতবা আলীর অন্তিম ইচ্ছাকে মূল্যায়ন করা না গেলেও তার রাজনৈতিক চেতনাকে ঠিকই সম্মান জানানো হয়েছে। মুজতবা আলীর সাহিত্য বিচার করে আগামীতে আরো ভুরি ভুরি গ্রন্থ রচিত হবে কিন্তু বাংলা, বাঙালিও বাংলাদেশ। থেকে কেউ তার চেতনাকে আলাদা করতে পারবে না। যতদিন বাংলা বেঁচে থাকবে ততদিন সৈয়দ মুজতবা আলীও ভাষা শহীদদের পাশাপাশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
তথ্যসূত্র
১. মুজতবা প্রসঙ্গÑ সুনির্মল কুমার দেব মীন সম্পাদিত।
২. মুজতবা কথা ও অন্যান্য প্রসঙ্গÑ সৈয়দ মুর্তাজা আলী।
৩. সৈয়দ মােস্তফা আলীর প্রবন্ধ, মুজতবা প্রসঙ্গ (প্রাগুক্ত)।
৪. আমাদের কালে কথাÑ সৈয়দ মুর্তাজা আলী।
৫. সয়ফুল আলম খানের প্রবন্ধÑ মুজতবা প্রসঙ্গ।
৬. মুজতবা কথা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (প্রাগুক্ত)।
৭. ঐ।
৮. সিলেটে ভাষা আন্দোলনের পটভূমি আব্দুল হামিদ মানিক।
৯. উৎসগÑ (সৈয়দ মুজতবা আলী সংখ্যা) সৌমিত্র দেব সম্পাদিত।
১০. প্রসঙ্গ মুজতবা আলীÑ ড. বিজনবিহারী পুরকায়স্থ সম্পাদিত।
১১. সৈয়দ মুজতবা আলীÑ নূরুর রহমান খান (বাংলা একাডেমী)।
১২. প্রগতিশীল লেখক ইউনিয়ন আয়ােজিত সৈয়দ মুজতবা আলীর ৯৯ তম। জন্ম দিনে কবি আল মুজাহিদির স্মৃতিচারণ।
১৩. সুর্নিমল কুমার দেব মীনের প্রবন্ধÑ মুজতবা প্রসঙ্গ।
১৪. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুজতবা আলীর একজন নিকটাত্মীয়ের সাক্ষাৎকার।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২০৬ বার

Share Button