» সোয়াম্প ভিলেজ অন্তেহরি ও একজন নাজিয়া শিরীন

প্রকাশিত: ২৬. অক্টোবর. ২০১৯ | শনিবার

আবুল কালাম আজাদ

অনেকেই যাচ্ছেন সোয়াম্প ভিলেজ অন্তেহরি । চাইলে নাগরিক জীবনের যন্ত্রণা ছেড়ে আপনিও ঘুরতে যেতে পারেন। সে জন্য যেতে হবে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে। মৌলভীবাজারের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরীনের চেষ্টায় এই গ্রাম এখন জ্বলে উঠেছে পাদপ্রদীপের আলোয় । তিনি রেডটাইমস ডটকম ডটবিডিকে বলেন , পর্যটন নগরী মৌলভীবাজারের প্রধান আকর্ষণ হবে অন্তেহরি ।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে সিলেট বিভাগের প্রতিটি জেলা উপজেলায়। এই সিলেটে আছে হাওর-বাওর, পাহাড়-নদী, নানা জাতের বৃক্ষরাজি, আছে জলবন, সোয়াম্প ফরেস্ট।হিজল আর করচ গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের কিরণে চিকচিক করছে জল। এর মধ্যে মৃদু বাতাসে জলাভূমির ছোট ছোট ঢেউ বাড়ি খাচ্ছে গাছের সঙ্গে। ঢেউয়ের শব্দ আর পাখির কলতান বাদে চারপাশে হিরণ্ময় নীরবতা। এমন এক টুকরো সবুজ বনের ভেতর ভাসমান একটি গ্রাম। নাম ‘অন্তেহরি জলের গ্রাম’।

মূলত রাজনগরের সবচেয়ে বড় জলাভূমি কাউয়াদিঘি হাওরকে কেন্দ্র করে অন্তেহরি গ্রামে লোকবসতি গড়ে উঠে প্রায় শত বছর আগে। গ্রামটি বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপ ধারণ করে, যখন হাওর পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। আর তখনই অন্তেহরি ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। অন্তেহরি গ্রাম বছরে ছয় মাস জলমগ্ন থাকে। বর্ষার শুরুতে পার্শ্ববর্তী কাউয়াদিঘি হাওরে পানি বেড়ে এই গ্রামটি জলাবদ্ধ হয়। তখন অন্য ১০টি গ্রামের মতো থাকা অন্তেহরি গ্রামের রূপ পাল্টে মোহনীয় হয়ে ওঠে। খাল, বিল, পুকুর কিংবা গ্রামীণ রাস্তা-ঘাট সব একাকার হয়ে যায় হাওরের পানিতে। বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত জলের গ্রাম হিসেবে অন্তেহরি নিজেকে পূর্ণ রূপে আবিষ্কার করে।অন্তেহরি জলের গ্রাম। অগোছালো জলার বনের ভেতর নৌকায় করে পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়ানো যায়। গ্রামের মেঠোপথের মতো সবুজের বুক চিরে চলে নৌকা। ডানে-বামে গ্রামের সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনের চিত্র। পুরো গ্রামই পানির ওপর ভাসমান। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির যাতায়াতের মাধ্যম শুধুই নৌকা। এ যেনো একটি বাড়ি একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির বাঁকে-বাঁকে মাছ শিকারের নানা আয়োজন। এমন দৃশ্য দেখতে দেখেতে হঠাৎ আপনি প্রবেশ করতে পারবেন বিস্তৃত কাউয়াদিঘি হাওরে। পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়েছে, মানে বিকেল। জলারবনে ভ্রমণের জন্য বিকেলই উত্তম সময়। তাই শহরের বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পেতে আপনার যাত্রা যদি অন্তেহরি হয়, তাহলে বিকেলই চেয়ে নিন। বিকেলেই অন্তেহরির মানুষের জীবন আর জীবিকার দৌড়ঝাঁপ প্রত্যক্ষ করা যায়।

জলারবনের মাঝখান দিয়ে টলটলে জলের ওপর দিয়ে ছুটে চলে মাঝির ডিঙি নৌকা। এই জলই সেখানকার জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধানতম মাধ্যম। চলার পথে কোথাও চোখে পড়বে নৌকার ওপর জাল টানছেন জেলেরা। আবার কোথায় শিশুরা পাল্লা দিয়ে শাপলা কুড়াচ্ছে, কখনো বা দেখা পাবেন বাড়ির উঠানে কৃষাণীর বিরামহীন পরিশ্রমের চিত্র।এসব দেখতে দেখতে আর প্রকৃতিকে উপভোগ করতে করতে মাঝি আপনাকে নিয়ে যাবে কাউয়াদিঘি হাওরে, তখন পশ্চিমাকাশে সূর্য ডুবতে যাচ্ছে। ঘরে ফেরা উড়ন্ত পাখিদের বিচরণ প্রকৃতিকে করে তুলে আরও আকর্ষণীয়। ঝাঁকে-ঝাঁকে সাদা বক উড়ে বেড়ায় আকাশে। এ যেনো পাখিদেরও স্বর্গরাজ্য। প্রকৃতি যেনো তার রূপের লাবণ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে আপনার মাঝে।

এর অনেকটা পর্যটকদের কাছে পরিচিত হলেও অনেক এলাকা এখনো রয়ে গেছে প্রচারের আড়ালে। তেমনি একটি এলাকা মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার একটি গ্রাম। এই গ্রাম উপজেলার কাওয়াদীঘি হাওর সংলগ্ন জলের গ্রাম অন্তেহরী।

বছরে ৬-৮ মাস এই গ্রাম জলমগ্ন থাকে। জলমগ্ন এই গ্রাম, গ্রামের রূপ বাংলাদেশের আর অন্য কটা গ্রামের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পুরো গ্রামই পানির উপর ভাসমান, ঠিক যেমন ভেসে আছে শাপলাসহ নানা জাতি-প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির বাঁকে বাঁকে নানা প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ যা এক অন্যরকম মোহনীয় দৃশ্য।

এই গ্রামেই আছে সোয়াম্প ফরেস্টের হিজল-তমাল-করচসহ বিভিন্ন গাছগাছালি। অন্তেহরি ছাড়াও আশেপাশের অনেকগুলো গ্রামে জলারবন রয়েছে। বড়ই অদ্ভুত এই গ্রামগুলোর দৃশ্য। কোনো গাছের হাঁটু পর্যন্ত ডুবে আছে পানিতে। একটু ছোট যেগুলো, সেগুলো আবার শরীরের অর্ধেকই ডুবিয়ে আছে জলে। কোথাও চোখে পড়বে মাছ ধরার জাল পেতেছে জেলেরা। কোথাও ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার কারণে কেমন অন্ধকার লাগবে পুরো বনটা। আবার কোথাও একেবারে ফাকা শুধু থই থই পানি।

মাঝেমধ্যেই গাছের ডালপালা আটকে দিবে পথ। হাত দিয়ে ওগুলো সরিয়ে তৈরি করতে হবে পথ। গাছের ডালে বাসা বেধেছে নানা প্রজাতির পাখি। আবার অনেক গাছে আশ্রয় নিয়েছে অনেক প্রজাতির বন্যপ্রাণী। বর্ষায় লোকালয় পানির নিচে চলে যায় তাই এসব বন্যপ্রাণী উঠে পড়ে গাছের ওপর। শীতকালে এখানে দাপিয়ে বেড়ায় বনবিড়াল, বেজি, শিয়ালসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী।

সারা গ্রাম পানির নিচে থাকলেও ছোট একটি বাজার আছে অন্তেহরি গ্রামে। সেই বাজারে ডিঙি নৌকা নিয়ে এসে জড়ো হন আশেপাশের গ্রামবাসী। মনে হবে পানির উপর ভাসমান কোন এক জাহাজ।
ঢাকা থেকে বাসে করে মৌলভীবাজার ৪৫০ (নন-এসি বাস) বা ট্রেনে শ্রীমঙ্গল। সেখান থেকে ৩০ টাকা ভাড়া দিয়ে মৌলভীবাজার। তারপর মৌলভীবাজারের চাঁদনীঘাট এলাকা থেকে সিএনজি অটোরিকশা করে কাদিপুর জনপ্রতি ভাড়া নেবে ৩৫ টাকা। সেখান ২-৩ ঘণ্টার জন্য নৌকা ভাড়া নেওয়া যাবে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়।মৌলভীবাজার জেলা শহর থেকে অন্তেহরি গ্রামের দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। শহরের চাঁদনীঘাট ব্রিজসংলগ্ন জগতপুর স্ট্যান্ড থেকে ৩০ টাকা ভাড়ায় সিএনজি চালিত অটোতে যেতে পারেন, কিংবা রিজার্ভ গাড়ি নিয়েও সোজা চলে যেতে পারেন অন্তেহরি বাজারে। সেখান থেকে নৌকা ভাড়া করে ঘুরতে পারেন পুরো গ্রাম।
অবশ্যই অভিজ্ঞ মাঝি নিয়ে নৌকা চড়তে যাবেন। সাঁতার জানা না থাকলে লাইফ জ্যাকেট পরে নেওয়া উত্তম।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৬২৪ বার

Share Button

Calendar

August 2020
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031