শিরোনামঃ-


» সৌভাগ্যের মেঘদূত

প্রকাশিত: ১৩. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

কামরুল হাসান

মহাকবি কালিদাস অমর হয়ে আছেন তার ম্যাগনাম ওপাস কাব্য ‘মেঘদূত’ এর জন্য। সেই থেকে সকল কবিই যক্ষ হয়ে মেঘকে দূত বানাতে চান তাদের প্রিয়া অলকার কাছে প্রেমবার্তা পাঠাতে। ‘মেঘদূত’ নামে আবৃত্তি সংগঠন গড়ে তুলেছেন আমার আযৌবন বন্ধু রবীন্দ্রপ্রেমী ও সংস্কৃতিসেবী মসয়ূদ মান্নান। সংগঠন আর মসয়ূদ মান্নান যেন সমার্থক। রাষ্ট্রদূত হয়ে দেশে দেশে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মেঘদূত হয়েছেন। বাংলাদেশের আবৃত্তি সংগঠনগুলোর মাঝে মেঘদূত বেশ গোড়ার দিকের সংগঠন। কবিতা লিখি বলে আমাকে সে দলে রেখেছেন মসয়ূদ মান্নান। আরেক কারণ, আমি তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন। এ দলে কবি আছেন আরও দুজন, যাদের একজন সৌমিত্র দেব, অন্যজন কাজী দিনার সুলতানা বিনতি। এ সংগঠন পুরোপুরিই তার প্রতিষ্ঠাতা নির্ভর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত মসয়ূদ মান্নান যখনি বিদেশের কোন এসাইনমেন্ট শেষে দেশে পোস্টিং পান, তখনি মেঘদূতের কার্যক্রম ডানা মেলতে থাকে। তিনি বিদেশে মানে মেঘদূতের ডানা গুটানো। দীর্ঘদিন ধরেই মধ্য এশিয়ার চারটি দেশের রাষ্ট্রদূত তিনি, দীর্ঘদিন ধরেই মেঘদূত নীরব। তার সদস্যরাও কেউ কেউ চলে গেছে দূরে। সাকিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি গবেষণা করছে; সৈয়দ মুতাকিল্লা বহুজাতিক ব্যাংকের নবীন কর্মকর্তা, আর যিনি প্রবীণ না হলেও প্রাজ্ঞ হয়েছেন ওই ব্যাংকের কাজেই সেই সালাহউদ্দিন আহমেদ বিটিভিতে ইংরেজি সংবাদ পাঠ নিয়ে ত্রস্ত। দিনার সুলতানা কাব্যের লৌকিকতার জগৎকে পাশে রেখে পারলৌকিক জগতের অনুধ্যানে রত, ডাক্তার ফারহানা আছেন শিশুদের সেবায়, আমিনুর রশিদ অনলাইন রেডিও আর সংসার নিয়ে নিমগ্ন সাগুফতা হোসেন। এ দলে চিকিৎসক আরো একজন আছেন, তিনি মসয়ূদের নানা বলে সকলেরই নানা, ডা. রশিদ হায়দার।

গত বুধবার সৌমিত্র দেবের একমাত্র ছেলে সৌভাগ্যের জন্মদিন উপলক্ষে পারিবারিক ও অন্যান্য অতিথিদের সাথে মেঘদূত সদস্যরাও ছিল আমন্ত্রিত। কবি সৌমিত্র দেব চেয়েছিলেন মেঘদূত হয়ে উঠুক সৌভাগ্যের দূত। সৌভাগ্য এই যে রাষ্ট্রদূত স্বয়ং বাংলাদেশে উপস্থিত। সেদিন রাত্রি আট ঘটিকায় তিনি যখন দিনের আরো দশটি প্রোগ্রাম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে লেক সিটি কনকর্ডের দিকে ছুটছেন, তখন হঠাৎ মনে পড়লো কবিবন্ধুটি কথা। বইমেলার বই নিয়ে ব্যস্ত কবি তো তারিখ গুবলেট করে বেমালুম ভুলে আছে আজই সেই দিন। সৌভাগ্য ওই ফোনকলটি এসেছিল। আরেক সৌভাগ্য এই জ্যামজট আক্রান্ত শহরে উবার বা পাঠাও মোটরবাইক সার্ভিস। আমি রাষ্ট্রদূতের ফোন পাওয়া মাত্র বলেছিলাম, ‘হে বন্ধু লইয়া যাও আমারে।’ কিন্তু তার তরী ততক্ষণে তরতর করে এগিয়ে গেছে বহুদূর, যেমনটা সে আমাদের ছেড়ে এগিয়ে গেছে জীবন সাফল্যে। অগত্যা সেই ম্যাজিক ঘোড়া, যা রেসকোর্সের সকল ঘোড়াকে ডিঙ্গিয়ে যায় তার চিকন দেহের চপল গতি আর সুযোগসন্ধানী রীতিতে, অবলম্বন হলো।

প্রগতি সরণি দিয়ে আমাদের পঙ্খীরাজ উড়াল দিয়ে এসে পড়ে কুড়িল ফ্লাইওভারের চক্রাকার গোলকধাঁধায়। সেখানে জলাধারটি বেষ্টন করে সে যখন লুপে ওঠার পায়তারা করছে তখন হঠাৎই সহিসের মনে পড়ে যায় তিনশ ফিট রাস্তা দিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক রাস্তা আছে লেক সিটিতে যাওয়ার। অতিকায় বসুন্ধরা কনভেনশন হলগুলোর আলোকিত জৌলুষের পেছনে, প্রদীপের নিচে অন্ধকার এলাকাটির মধ্য দিয়ে চঞ্চল পায়ে ঘোড়া এগিয়ে যায় অচঞ্চল লক্ষ্য নিয়ে। খোদার কসম, ওই এলাকায় আমি কখনো যাই নি, কেবল মানুষের গৃহনির্মাণ প্রচেষ্টায় মুগ্ধ থাকি আর দেখি ‘সাধ্যমতো ঘরবাড়ি।’ এলোমেলো সে প্রচেষ্টা, তখন মনে হয়, ‘কী ঘর বানাইনু আমি শূন্যেরও মাঝার।’

দুপাশে দোকানপাটের আলোয় আলোকিত একটি সড়ক, কেবলি বাঁক নিয়েছে পূবে, তার কোমর ধরে ঘোড়া ছোটে। অবশেষে এসে পড়ে এই শহরের প্রান্তদেশে কৃষকের বসতভিটে আর চাষের জমিন লোপাট করে দিয়ে যে নাগরিক কনডোমিনিয়ম গড়ে উঠেছে এই বিপুল বসতিতে। রাজধানীর প্রথম কনডোমিনিয়ম এই লেক সিটি কনকর্ড। আমি এর আগে একবারই এসেছিলাম এখানে, তখনো নামকরণের স্বার্থকতা, অর্থাৎ লেকটি খুঁজে পাইনি। অনুমান করি বর্ষাকালে নিচু জমিগুলো জলভরাট হয়ে লেকের চেহারা পেত। তা ইনারা একটি কৃত্রিম লেক না হয় বানাতেন। কী বল্লেন, লেক? বাড়ি তোলার জায়গা নেই, লেক। তবে থাকা উঁচু বৃহৎ দালানসারি গায়ে গায়ে লেগে থাকলেও এই কনডোমিনিয়মটির নকশা কিন্তু চমৎকার। আফটার অল এটা এদেশের শীর্ষ রিয়েল স্টেট বিল্ডার কনকর্ডের প্রকল্প। তাদের সুনাম আছে। তারা একে বলে স্যাটেলাইট সিটি।

বহুকাল আগে আমি যখন উত্তরা থাকতাম তখন বিমানবন্দর সড়ক থেকে বাসের জানালা দিয়ে হঠাৎই একদিন দেখেছিলাম দূরে দালানসারির এক ধূষর মায়াবী জগৎ, মনে হয়েছিল বাড়ির পাশে আরশিনগর। সে নগরে প্রথম এসেছিলাম কবি সৌমিত্র দেবের বাড়িতেই, তখনো সৌভাগ্য সৌভাগ্যপুত্র হয়ে আসেনি, একমাত্র সৌভাগ্য সৌভাগ্যজননী পলা দেব প্রাপ্তি। আর্চবিশিষ্ট প্রবেশপথের মুখে দাঁড়িয়ে আমি ভাবি এই বিপুল দালানসারির কোন অঞ্চলে সেই জন্মদিনের পার্টি।খেজুরপত্রের চিরল ফোকর দিয়ে দৃশ্যমান কনডোমিনিয়মটি দেখে মনে হয় মন্দ নয় এমনি একটি নগরের ক্ষুদ্র সংস্করণের ভেতরে বসবাস করাটা। নগরে কেউ কাউকে চেনে না, এখানে মনে হয় সেই অচেনা বিষয়টি কিছুটা দূরীভূত হয়। লোকেরা কনডোমিনিয়মের প্রশস্ত শানবাঁধানো সড়ক ধরে স্বাস্থ্যচর্চা করছে। মুহূর্তে মনে হলো কোন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আছি, যেখানে সকলের জন্য গৃহ, সকলের জন্য স্বাস্থ্য। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী সৌমিত্র দেব স্বভাবতই এখানে শান্তি খুঁজে পেয়েছেন।

জন্মদিনের তারিখ ভুলে যাওয়া আমি তো চলে এসেছি তাড়াহুড়ো করে, বালকটির জন্য কোন উপহার ছাড়াই। সৌভাগ্য যে পার্টি হবে যে দালানে তার নিচতলাটি একটি শপিংমল, যেখানে খেলনার দোকান আছে তিনটি। সৌভাগ্য ছেলে বলে একটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত স্পোর্টস কার নেই, মেয়ে হলে হয়তো একটি ব্যাটারিবিহীন পুতুল নিতে হতো। শাহনাজ কালেকশন নামের দোকানে শাহনাজ নামের রমণী ও তার মেয়ে যত্ন করে সেটি প্যাক করে দেয়। লিফটের ছয় মানে সাত তলায় এসে দেখি এক আপাত শান্ত ভেতরে গমগম চাইনিজ রেস্তোরাঁ, যার অভ্যন্তরে একটি বড় দেয়ালের দুপাশেই চেয়ার টেবিল। একপাশে নিয়মিত ও বিচ্ছিন্ন অতিথিগণ, অন্যপাশে সৌভাগ্যের জন্মদিন উৎসব।

ঢুকেই যার দেখা পাই তিনি এ আসরের সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ – কবি সৌমিত্র দেব। অমন সুপুরুষ সহসা চোখে পড়ে না। মতিভ্রম হতে পারে, তবে পুরুষ হয়েও রমণীয় চোখে তাকে দেখলাম। এগিয়ে এলেন তার প্রখরাবতী সহধর্মিণী পলা দেব যিনি ওই নায়ককে সংসারী বানিয়েছেন। সৌভাগ্যের হাতে উপহারটি তুলে দিয়ে আমি গিয়ে বসি একটি বড় টেবিলে যেখানে বসেছেন মেঘদূত প্রধান মসয়ূদ মান্নান ও অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিগণ। দেরিতে আসার কারণে আমি সন্ধ্যারাতের গানগুলো মিস করেছি, তবে বক্তৃতা নয়। রাষ্ট্রদূত এমনিতেই ছয় ফুট, তার পদও অতটাই উঁচু, ফলে পাদপ্রদীপের আলো তার উপরেই পড়ে থাকে। তিনি বিশ্ব শান্তি আনায়নে কবিতার ভূমিকা নিয়ে বক্তৃতা করলেন, আমি পড়লাম কবিতা। কবিতা পড়লেন আরো একজন। কবির পুত্রের জন্মদিনে কবিতা থাকবেই। মসয়ূদ পাঠ করলো শান্তির সপক্ষে কবিতা।বাংলাদেশ পোয়েট্রি এসোসিয়েশন ও মেঘদূতের ব্যানারে জন্মদিন হচ্ছে অথচ আমি, মসয়ূদ আর সৌমিত্র ছাড়া কেউ আসেনি সম্ভবত দূরত্বের কারণে। স্যাটেলাইট সিটি বলে কথা!

প্রথমে কেক কাটা, পরে অতিথিগণ সারিবদ্ধভাবে খাবার তুলে নিলেন নিজ নিজ প্লেটে। খাবার ছিল স্যূপ, ফ্রাইড রাইস, ফ্রাইড চিকেন ও ভেজিটেবল। উৎসবে তিনজন নারীর রূপ ছিল অসামান্য, যাদের একজন পলা দেব নিজেই, দ্বিতীয়জন তার মাসি, তৃতীয়জন, ইনিই বোধকরি সোনার মুকুটটি পাবেন, মাসির ভাবী, যিনি পলা দেব তার কী হয় তা বলতে গিয়ে সম্পর্কের জটিলতায় আটকে গেলেন, তার জটিল সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সমুখে দাঁড়িয়ে থাকি মাত্র, পলক পড়ে না।


ফিরি রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে, যিনি সম্প্রতি সস্ত্রীক কক্সবাজার গিয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-৩৭ ব্যাচের বার্ষিক (বনভোজন বলা কি ঠিক হবে?) সমুদ্রদর্শনে, যার ইংরেজি নাম গেট-টুগেদার। আমাকে সান্ত্বনাস্বরূপ বললেন, ‘মন খারাপ করো না। তোমার পৃথিবীটি অনেক বড়।’ সেই বড় পৃথিবীর একটি আকাশ আজ মেঘে ঢাকা। মসয়ূদের বিশ্বাস মেঘ চিরে রৌদ্র ফুটবেই।

লেখক ঃ কবি ও অধ্যাপক

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৮৩ বার

Share Button

Calendar

February 2020
S M T W T F S
« Jan    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829