» স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য

প্রকাশিত: ২৬. মার্চ. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার: দীর্ঘ দিনের অধীনতা এবং অনিশ্চয়তা ঘন অন্ধকারে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এ জনপদ জ্বলে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রদীপটি। দীর্ঘ ৯ মাসের জমাটবাঁধা অন্ধকারে এ- প্রদীপটিই এ- জনপদের সাতকোটি মানুষের মনে জ্বালিয়ে রেখেছিল আশার ক্ষীণ আলো।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে তাই হয়ে উঠে দিবালোকের মতো উজ্জ্বল । ২৬ মার্চে সূচিত স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাটি ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় জীবনের বিস্তীর্ণ উপত্যকার হাজারো প্রান্তে অসংখ্য রক্তস্রোত সৃষ্টি করে, চুড়ান্ত পর্যায়ে তাঁর সম্মিলিত প্রবাহ ।

১৬ ডিসেম্বরে সমাজ জীবনের দূকুল ছাপিয়ে যে মহাপ্লাবনের সৃষ্টি করে তাঁর ফলে জন্ম লাভ করে স্বাতন্ত্র্য এবং স্বাধীনতার স্বর্ণদ্বীপ স্বাধীন সার্বভৌম আজকের এই বাংলাদেশ ।

২৬ মার্চকে তাই এজাতি স্বরণ করে আত্নশক্তির প্রতীক হিসেবে । স্বরণ করে আত্মমর্যাদার দিগদর্শন রুপে । স্বরণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার দূর্জয় প্রত্যয় হিসেবে । এদেশে রয়েছে রোগ-শোক – ব্যাধি- দারিদ্র্য-অপুষ্টি । এদেশে রয়েছে অনগ্রসরতা । রয়েছে অদক্ষতা- অশিক্ষা- অজ্ঞতা।

কিন্তু ২৬ মার্চের সেই প্রদীপের আলোয় হারিয়ে গেছে পরাধীনতার গ্লানি। নিশ্চিহ্ন হয়েছে আত্মনিবেদনের দাসসুলভ মানসিকতা। বিলুপ্ত হয়েছে পরনির্ভরশীলতার অভিশাপ। এই তো আমাদের ইতিহাস । এটিই আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য ।

২৬ মার্চে যার সূচনা,১৬ ডিসেম্বরে তারই পরিপুর্ণতা। দুটিই কিন্তু রক্তাক্ত দিন। রক্তসিক্ত ২৬ মার্চ সকলকে ডাক দিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে। নিজেদের যুদ্ধ নিজেরা করে শক্ত হাতে বিজয় ছিনিয়ে আনার দৃঢ় সংকল্পের অঙ্গীকার। এজন্য ২৬ মার্চকে বলা যেতে পারে রক্তদানের আকুতি প্রতীক। আত্মশক্তি উদ্বোধনের উজ্জ্বল নিশানা।

আর ১৬ ডিসেম্বর হলো এক জীবন- মরণ-সংগ্রামের শেষ সফল অধ্যায়। গৌরবদীপ্ত বিজয়ের স্পর্শধন্য এক রেড লেটার দিবস। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে দূটিই উজ্জ্বলতম দিন। ২৬ মার্চে যেহেতু এর সূচনা,তাই এ দিনটি আমাদের রক্তসিক্ত স্বাধীনতা দিবস। এ দিনটি আমাদের অধীনতার শেকড় সমূলে ধ্বংস করার সূচনাকারী জাতীয় দিবস ।

২৫ মার্চের রাত্রিকে এ জাতি চিহ্নিত করেছে ইতিহাসের সবচেয়ে তমসাছন্ন রাত্রি হিসেবে। কাল রাত্রি রুপে। কাল রাত্রি বলা হয় দুটি কারণে। এক. এ- রাত্রিতে এ-জনপদের নিরস্ত্র ও নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর নৃশংসতা হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। চাপিয়ে দেয়া হয় জনগণের ওপর শতাব্দীর সবচেয়ে অসম যুদ্ধ । এক হিসেবে বলা হয়েছে, সে কাল রাত্রিতে শুধু ঢাকা নগরীতেই প্রায় পঞ্চাশ হাজার নরনারী প্রাণহানি ঘটে এবং তখন এমন এক সময় যখন কর্মক্লান্ত মানুষের ঘুমে অচেতন । দুই. জাতীয় ইতিহাসের এ দূর্যোগময় মুহূর্তে জাতীয় নেতৃত্ব জনগণকে কোনো দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম হয়নি। এর পূর্বে তিন সপ্তাহব্যাপী আন্দোলনে গণমনে পাকিস্তান বিরোধী উন্মাদনা চরমে ওঠে।

বলদর্পী ইয়াহিয়া খানের ১ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনিদিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণার ফলে সবার অলক্ষ্যে ছয়-দফা দাবি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য এক দফা দাবিতে রুপান্তরিত হয়েছে। পাকিস্তানের ঘাতক বাহিনী যে প্রতিশোধ গ্রহণে উন্নত্ত হয়ে উঠবে তা জাতীয় নেতৃত্বের অনুধাবনে আসেনি। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে প্রথম শিকার হলেন হাজার হাজার সাধারণ জনগণ । নিমর্মভাবে নিহত হন তারা কোনো কিছু বোঝার পূর্বেই। কোনো রকম সাবধানতা অবলম্বনের আগেই। এ মৃত্যু যে কত করুণ, কত নিমর্ম তা এ জনপদের জনগণ জেনেছেন। সেই নিমর্ম মৃত্যু কিন্তু বৃথা যায়নি।

তাদের রক্তের বাংলা মাটি শুধু যে উর্বর হলো তাই নয়, এক এক ফোঁটা রক্ত রক্তবীজের মতো সৃষ্টি করে এক একজন অজেয় সৈনিক । শত্রু কবলিত বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা লড়ে গেছেন জীবন বাজি রেখে । এ-জন্যেই তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃতি হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র ।এ-মুক্তিযূদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ।

এ -কারণে মুক্তিযুদ্ধের সোনালি ফসল যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ তাঁর জন্মও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত । ভারত বা পাকিস্তানের জন্ম যেভাবে হয়েছে তা থেকে সম্পুর্ণ ভিন্ন প্রত্রুিয়ার জন্ম লাভ করে বাংলাদেশ। কোনো ধরনের দেন দরবার বা গোলটেবিল বৈঠকের ফল বাংলাদেশ নয়। নয় কোনো কূটকৌশলের ফল। নয় কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দাক্ষিণ্য।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ জন্ম লাভ করেছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে। জনগণের সচেতন উদ্যোগের ফলে। সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে। ঘন অন্ধকার কাটিয়ে উঠে উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশ। এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন পূর্ব বাংলার- ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক- মজুর অখ্যাত পল্লির দূরন্ত তরুণ, নগরীর হাজারো বস্তির উদ্ধত যুবক, মহানগরীর যুবশক্তি, মিল-ফ্যাক্টরির শ্রমিক, বিভিন্ন পেশার প্রশিক্ষিত নাগরিক। শিক্ষার্থীরা শিক্ষায়তন ছেড়ে, কৃষকদের অনেকে চাষাবাদ ছেড়ে, অনেক শ্রমিক মিল- ফ্যাক্টরি ছেড়ে, পেশাজীবীদের অনেকে নিজ নিজ পেশা ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে শরীক হলেন। কেউ কেউ স্ব স্ব অবস্থানে থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। শিল্পী – সাহিত্যেকদের শিল্পকর্ম ও রচনাসম্ভার একই উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত হয়। দীর্ঘদিনের সঞ্চিত উদ্যোগ এবং আত্মত্যাগের মহোৎসব মূর্তে হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধে। তারা যেন চিৎকার করে বলে উঠেছিল- সরে দাঁড়াও । পিছু হটো। আমাদের যুদ্ধ আমাদের করতে দাও। তোমরা আমাদের বিজয় ছিনিয়ে নেবে না। আমরা মুক্ত হবোই । আমরা স্বাধীন হবোই। সৃষ্টিকর্তা এবং ন্যায়নীতি আমাদের পতাকা এবং প্রতীক।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যময় প্রকৃতি এটিই। এটি ছিল এক জনযুদ্ধ । সত্যি বটে, কিছুসংখ্যক বিপথগামী এ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। কিন্তু শক্তি বলতে যা বোঝায়, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের তেমন শক্তি তখনো ছিল না। পরবর্তী পর্যায়ে সুসংহত হয়ে শক্তির পর্যায়ে কোনদিন তাঁরা আবিভূত হতে পারেনি। পরবর্তী সুসংহত হয়ে শক্তির পর্যায়ে কোনদিন তাঁরা আবিভূত হতে পারেনি। বরাবরই জনগণের তীব্র ঘৃণার কুয়াশায় তাঁরা আচ্ছন্ন থেকেছে ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৪৩ বার

Share Button

Calendar

September 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930