» স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সংস্কারের চেয়ে এক্টিভেট করা বেশী জরুরী

প্রকাশিত: ০১. আগস্ট. ২০২০ | শনিবার


খছরু চৌধুরী

বাংলাদেশে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ এর অপ্রত্যাশিত আক্রমণের সব চেয়ে খারাপ দিকটা হলো প্রতিদিন মানুষ মরছে। স্বজনের বিয়োগ বেদনায় কেউ কেউ ট্রমালজিতে ভোগছে। আর মন্দের ভালোটা হলো স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় গৃহিত কর্মপদ্ধতির নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং ইহার সাথে সম্পৃক্ত দুর্নীতির ভয়াবহ চালচিত্র জনগণের আলোচনায় উঠে এসেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মের পদ্ধতি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এতে জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশে সচেতনতা ও রাষ্ট্রের সাথে জনগণের স্বাস্থ্য বিষয়ক মানবিক মৌলিক অধিকার রক্ষার সম্পর্কের ঘাটতি গুলোও চিহ্নিত করছে।

সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবায় বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে গত শতাব্দীর শেষ দশকের শ্লোগান ছিল “২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য”। এই শতাব্দীর প্রথম দশকে বাংলাদেশ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি অর্জনে সফলতার ঢাক-ডোল বাজিয়ে কেউ কেউ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিকে বিশ্বের রোল মডেল বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বর্তমানে সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা এসডিজি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ। কিন্তু করোনাভাইরাস প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা-বাস্তবতায় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির লাগামহীন ব্যর্থতায় জনগণ হতাশ। এতদিনের ফাঁকা বুলির আড়ালে লুকিয়ে থাকা চিকিৎসা বাণিজ্যের ‘অমানবিক দৈত্য’ যখন জনসমক্ষে বেড়িয়ে পড়ল তখন অল্প কিছু দিন আগের প্রচারিত রোল-মডেল স্বাস্থ্য সেবা সারা বিশ্ববাসী মানুষের কাছে দুষ্টদের দ্বারা পরিচালিত মডেল হিসেবে পরিচিতি পেল, সাথে বিনষ্ট হলো দেশের ভাবমূর্তি। সরকারের অন্যান্য অনেক উন্নয়ন কার্যক্রমের সফলতাগুলো স্বাস্থ্য সেবার ব্যর্থতার কাছে ছাপা পড়ে যাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য মৌলিক দায় সরকারের হলেও প্রথমত দায়বদ্ধতা পদ্ধতির এবং দ্বিতীয় দায়বদ্ধতায় থাকেন ব্যক্তি। ব্যক্তি বলতে যে বা যারা পদ্ধতিটাকে লিড করেন। আমাদের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সেবাদনের অবকাঠামোর বিভাজন মূলত তিন ধরনের। প্রাইমারি, সেকন্ডিয়ারী ও টার্শিয়ারী। প্রাইমারীর মধ্যে রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইহার অধস্তন প্রতিষ্ঠানগুলো। যেমন – ইউনিয়ন পর্যায়ের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য কর্মী দ্বারা বাড়িতে বাড়িতে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেবার প্রক্রিয়াকে বুঝায়। সেকেন্ডিয়ারী পর্যায়ের সেবা প্রাপ্তির জন্য জেলা সদরের ১০০, ১৫০ ও ২০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, মাতৃ মঙ্গল ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। টার্শিয়ারীর মধ্যে মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল গুলো রয়েছে। তার মানে দাঁড়ালো, সরকার তার জনগণকে স্বাস্থ্য সেবাদানের জন্য রিমোট এরিয়া থেকে মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতাল পর্যন্ত অবাধ যাতায়াতের একটা সুযোগ বা চেইন অব সিস্টেম তৈরি করে রেখেছেন। যা সন্দেহাতীতভাবে চমৎকার। এখন প্রশ্ন হলো- এই সিস্টেমটা একটিভ কি না? একটিভ না থাকলে কেন একটিভ নয়? কারা, কোন স্বার্থে সিস্টেমটা কলাপস্ করে রেখেছেন? এবং সিস্টেমটা ইনএকটিভ করে রাখার (অপ)কৌশল গুলো কি কি? এই কয়েকটিমাত্র প্রশ্নের সহজ উত্তর দানের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির ব্যারিয়ার গুলো চিহ্নিত হয়ে যাবে এবং ইহা অপসারণ করতে পারলে বাংলাদেশের জনগণের জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনা কার্যকর অর্থেই বিশ্ববাসীর কাছে রোলমডেল হিসেবে পরিগণিত হবে।

যে কোন ব্যবস্থাপনা ফলপ্রসূ করার পূর্বশর্ত হলো ভারসাম্যপূর্ণ জনবল। এখানের জনগণের প্রতিনিধি মন্ত্রী, সাংসদ ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরা কার্যত আমলা নির্ভর এবং এতটাই অদক্ষ যে উনারা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সংকট বলতে শুধু ডাক্তার বা নার্স সংকট বুঝে থাকেন – এর বাইরে খতিয়ে দেখার মতো সময় তাদের নেই। যে মন্ত্রী মন্ত্রণালয় চালানোর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন – তিনি তাঁর মেয়াদকালে মন্ত্রণালয় পরিচালনা করার গাইড লাইন্স হিসেবে “জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি” নামের কাগজগুলো পড়ে দেখার সময় পান কি না, আমার সন্দেহ রয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য এখানেই।

জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি লঙ্গন করে আকাশ পাতাল তফাতের ভারসাম্যেহীন স্বাস্থ্যজনবল দিয়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করায় কভিড-১৯ আক্রমণের আগে থেকেই মুখথুবড়ে পড়েছিল সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। যারা দেখার, মানে পদ্ধতিটাকে লিড করেন তারা তা দেখেও না দেখার ভান করতেন। কারণ পর্দার অন্তরালে থাকা চিকিৎসা বাণিজ্যের লাভ-ক্ষতির হিসাব ও বণিকদের কালো হাত সব সময় তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতো এবং এখনো করছে। ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি একটিভ রাখতে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি নির্দেশিত স্বাস্থ্য-জনবলের অনুপাত যেখানে ১ঃ৩ঃ৫ এ থাকার কথা, সেখানে এই চিত্রটা উল্টে গেছে। অর্থাৎ ১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স ও মিডওয়াইভস্ এবং ৫ জন অন্যান্য ধরণের মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নিয়োগদানের বিধান থাকলেও সেই নিয়ম মানা হয়নি। জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও রোগপ্রতিরোধের নিমিত্তে সরকারের হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে তৈরি করা ২২০০ দক্ষ স্বাস্থ্যজনবলের নিয়োগ প্রক্রিয়া ২০০৯ সাল থেকে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অন্যান্য ধরনের মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়াও বন্ধ ছিল ২০১১ সাল থেকে। ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির বর্তমান অবস্থায় ৫৮ হাজার চিকিৎসকের সৃজিত পদের বিপরীতে ৪৮ হাজার নার্স-মিডওয়াইভস্ এবং ১৫ হাজারের মত সকল ধরনের মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট এর সৃজিত পদ রয়েছে। এই জনবল বৈষম্যের কারণে সরকারি স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম ইনএকটিভ ছিল এবং এখনো আছে। হাজারে হাজার ডাক্তার নিয়োগ দিলেও জনবল ভারসাম্য ফিরিয়ে না-আনলে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুফল ভোগ করার অধিকার জনগণ পাবে না।

আমাদের চোখের সামনে এই সরকার স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তির অধিকার সহজলভ্য করতে জেলা সদর হাসপাতালে আধুনিক মানের এবং উচ্চমূল্যের এম আর আই, সিটিস্ক্যান, সনোগ্রাপি, ইকোমেশিন, দাঁতের মেশিননারীজ ইত্যাদি যন্ত্রপাতি বরাদ্দ দিয়ে রেখেছেন কিন্তু শুধু জনবলের অভাবে এই মেশিনারীজগুলো মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে, মানুষ সেবা বঞ্চিত হচ্ছে। রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম – চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই মহৎ কর্ম নির্দেশ উপেক্ষিত করে কার্যকতঃ কভিড-১৯ সহ সংক্রামক-অসংক্রামক ও খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট রোগ বিস্তৃতির পথ খোলা রাখা হয়েছে। এগুলো করা হয় দেশে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা চিকিৎসা বাণিজ্যের দোকানগুলোর ব্যবসায় চাঙা রাখার গোষ্ঠী স্বার্থে। যারা সরকারি ব্যবস্থাপনার উপর অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে এগুলো করান তারা কখনো জনগণের বন্ধু নয়। এরা সাহেদ-সাবরিনাদের দোসর।

যারা সংস্কার সংস্কার বলে চিৎকার করছেন তাদের সাথে আমার ভিন্নমত হলো, যে পদ্ধতি আছে আগে সেই পদ্ধতিটা বুঝেন, পদ্ধতিটার ব্যারিয়ারগুলো চিহ্নিত করেন এবং সেগুলো অপসারনের ব্যবস্থা করেন। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, জনস্বাস্থ্য বিষয়ক আইন-কানুনের অনুসরন করে, প্রয়োজনীয় ভারসাম্যপূর্ণ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে পুরোপদ্ধতিটাকে একবার সচল করেন, আমি হলফ করে বলতে পারব, বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা পদ্ধতি হবে পৃথিবীর সেরাদের একটি। দেশের একটি মানুষও সরকারী স্বাস্থ্য সেবার টাচ না-পেয়ে মারা যাবে না। এখানে মাঠ-পর্যায়ে রোগপ্রতিরোধী কাজের জন্য মাত্র ৭ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (স্যানিটারী ইন্সপেক্টর) নিয়োগ দিলে খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট রোগ পালিয়ে যাবে, সংক্রমক-অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধও সম্ভব হবে। আর সকল ধরনের ৩৫ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নিয়োগ করতে পারলে দেশের মানুষ সরকার ও ব্যবস্থাপকদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে বাধ্য হবে।

লেখকঃ জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট, স্বাসেপ এর সাংগঠনিক উপদেষ্টা।
mkmchowdhury@gmail.com

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৬৮ বার

Share Button

Calendar

August 2020
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031